ভালোবাসার প্রতিদান । পর্ব -০১

কবুল বলবো…..!ঠিক এমন সময় রিয়াশের বাবা,অর্থাৎ আমার হবু শ্বশুর এ রুমে এসে বলেন,
“এই বিয়ে হবে না!কাজী সাহেব আপনি চলে যান!”
উনার মুখে এ’কথা শুনে আমি চমকে উঠি।সাথে আমার মা,-বাবা,ভাই-ভাবী আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীরাও।বাবা বলেন,
“এ আপনি কি বলতেছেন,বেয়াই সাহেব?বিয়ে হবে না মানে?!”
“জ্বী,ঠিকই বলছি!আপনার ওমন চরিত্রহীনা একজন মেয়েকে আমি কখনোই আমার ছেলের বউ করতে পারবো না!”
“কিন্তু কি করেছে আমার মেয়ে?”
বাবার প্রশ্নবাণে রিয়াশের বাবা সাথে সাথে উনার ডান হাতে থাকা ফোনটা সবার সামনে উঁচিয়ে ধরেন।ফোনের স্ক্রিনে অর্ধনগ্ন একটা ছবি ভাসছে।যেখানে একটি মেয়েটি পরম তৃপ্ততায় একটি ছেলেকে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে তার ঠোঁটে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে।মেয়েটির পরণে একটা স্কিন টাইট গেন্জি!আর নিচে হাঁটুর উপরে অব্দি ছোট্ট একটা প্যান্ট!ছেলেটি মেয়েটির উন্মুক্ত সেই হাঁটুর অংশতে খাঁমছে ধরে আছে!কী বিভৎস একটা দৃশ্য!ওয়াক!কিন্তু ছবিটির সেই মেয়েটির চেহারার সাথে আমার চেহারার কোনো অমিল নাই।অর্থাৎ সেই মেয়েটিই আমি।আর যার আষ্টেপৃষ্টে
আমার সারা শরীর লেপ্টে আছে সেই ছেলেটিকেই আমি চিনতে পারছি না।কখনো দেখেছি বলেও মনে হয়না!পায়ের তলা থেকে যেন আমার মাটি সরে গেল।আমি শূন্যে ভাসছি।ভারহীন দেহ নিয়েই বসা থেকে এবার সোঁজা উঠে দাঁড়াই,
“এসব কি!?এ ছেলেকে আমি ত চিনি না!”
এ’কথা বলা মাত্রই মা হনহন পায়ে দ্রুত আমার দিকে এগিয়ে এসে সজোরে আমার দুই গালে দুটা চড় বসিয়ে দেন!
“আর একটা কথাও বলবি না তুই!অপরাধ করেছিস এখন ইনিয়ে বিনিয়ে যে নাটক সাঁজাবি তা আমি খুব ভালো করেই জানি!ধূলোয় মিশিয়ে দিলি সব!সমাজে আর মুখ দেখানোর জায়গা রাখলি না!”
বলে মা ব্যথাতুর মনে মুখটা অন্যদিক ফিরিয়ে নেন।আমি ছলছল চোখে মার দিকে খানিক্ষন তাকিয়ে থাকি।আমি বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছি ছবিটা দেখার পর মা তা বিশ্বাস করে ফেলেছেন।আমি আসলেই ওই ছেলেটির সাথে ওভাবে নগ্নবস্থায় ছিলাম!ওভাবে নিজের সব তাকে বিলিয়ে দিয়েছিলাম।কিন্তু আমি কি এরকম মেয়ে?মা কি এতটা কাল তার মেয়েকে ভালো করে চেনতে পারে নি?বুকটা প্রচন্ড ভার হয়ে আসে আমার।মাথার প্রতিটি নিউরন একে একে ঝট পাঁকাতে থাকে।এবার আমি বাবার দিকে তাকাই।বাবার যদি বিশ্বাস না হলো?সেই আশায় তাকিয়ে দেখি বাবাও মার মতন অন্যদিক মুখ করে আছেন।তারপর ভাইয়ার দিকে তাকাই।ভাইয়াও তাই।তবে ভাবী অস্থির ভঙ্গিমায়।ভাইয়া,মা এবং বাবাকে শান্ত করার চেষ্টায়। আর আত্মীয়-স্বজন এবং প্রতিবেশীদের কথা বললে তারা আরো আগেই নিজেদের মাঝে ছোট্ট একটা হৈ চৈ ও শুরু করে দিয়েছে আমাকে নিয়ে।।কেউ একজন আবার বলছে,”ছিঃছিঃ মেয়েটা এত খারাপ!সে এই ছেলেটার সাথে সম্পর্ক রেখে আবার অন্য একটা ছেলের সাথেও সম্পর্ক রেখেছিল।তাও শারিরীক সম্পর্কের সম্পর্ক!”
তাহলে সবাই কি ওই ছবিটা বিশ্বাস করে ফেলেছে?আর আমাকে কারোই বিশ্বাস হলো না!?তাহলে আমি খারাপ,বেশ্যা,আমি পতিতা?প্রচন্ড দুঃখে-কষ্টে,রাগে,ঘৃণায় আমি এবার ডান দিকে ঘুরে হল রুমের দিকে তাকাই।কারণ সে রুমে রিয়াশ বসে আছে।অর্থাৎ আমার হবু বর!শুধু হবু বর বললেও ভুল হবে।আমার ভালোবাসার প্রেমিক বলতে পারেন, যার সাথে আমার পাঁচ পাঁচটা বছর সম্পর্ক ছিল।সেই পাঁচটা বছর অতিবাহিত হওয়ার পর অতঃপর আজ আমরা দুইজন বিয়ের পীড়িতে বসলাম।পরিবারও আমাদের সম্পর্ক টা ভালোয় ভালোয় মেনে নিল।আশা আছে রিয়াশ অন্তত আমাকে অবিশ্বাস করবে না।ভালোবাসার মানটা সে রাখবেই।ভেবেই হলরুমের দিকে এগুলাম। দরজা বরাবর আসতেই দেখি রিয়াশ সামনে দাঁড়িয়ে।সে এই রুমেই আসতেছে।রিয়াশকে দেখামাত্রই আমার টলমল দুই চোখ চঞল হয়ে উঠে।বলে উঠি,
“রিয়াশ?আঙ্কেলের ফোনের ওই ছবিটা তুমি দেখেছো?বিশ্বাস হয়েছে তোমার?”
কিন্তু আশাতে আমার গুড়বালি দিয়ে রিয়াশ আমাকে পাশ কেঁটে তার বাবার দিকে চলে গেলো।গিয়েই বললো,
“বাবা,এখানে আর একটা সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে নই।চলো এবার..!”
“হ্যাঁ,চল!”
দুজনে হেঁটে চললো আমার সামনে দিয়ে!আমি তাকিয়ে থাকলাম।ব্যাথাতুর চোখে তাঁকিয়ে থাকলাম!এটা কি হলো!শেষপর্যন্ত রিয়াশও ওই ছবিটা..?নাহ এ আমি বিশ্বাস করি না !রিয়াশ আমাকে অবিশ্বাস করতে পারে না।রিয়াশকে আমি আবার জিজ্ঞেস করবো!পিছন থেকে দৌড়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম রিয়াশের ।হাত ধরে বললাম,
“রিয়াশ কেউ আমাকে বিশ্বাস করে নি!তুমিও করলে না?”
রিয়াশ আমার এ’কথার জবাব না তুলে সরাসরি তার হাতের দিকে তাকালো।হুংকার দেওয়া গলায় বলে উঠলো,
“আমার হাত ছাড়ো!”
“নাহ রিয়াশ নাহ।তুমি এরকম করতে পারো না!তুমি আমাকে বিশ্বাস করো!আমার ওই ছেলের সাথে কোনো সম্পর্ক ছিল না।আমি ওই ছেলেকে চিনিও না।আমার তো শুধু তোমার সাথেই সম্পর্ক ছিল।আর তা তুমি ভালো করেই জানতে!”
এবার রিয়াশ এক ঝটকায় মেরে আমার হাতের মুঠো থেকে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে তারপর বলে,
“আচ্ছা যদি তা না-ই হয়ে থাকে তাহলে ওই ছেলের সাথে তোমার একসাথে ওমন বিশ্রী ছবি কীভাবে ক্যাপচারড হলো!আর তোমার ছবি ওই ছেলে পেলোই বা কীভাবে?তুমিতো ফেসবুক,টুইটার,মেসেন্জার,হোয়াটসঅ্যাপ কোনোটাতেই ছবি আপলোড করো না!যদি করতে তাহলে মানতাম যে কেউ খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে ছবিটার বাজে ব্যবহার করেছে!তাও না!”
“রিয়াশ আমি এসবের কিছুই জানি না।আমার ছবি কীভাবে ওখানে গেলো,আর কেনই ওরকম হলো সত্যি আমি কিছুই জানি না।”
“তুমি সবই জানো!খুব ভালো করেই জানো।যেই ছেলেটার সাথে শারিরীক সম্পর্ক করলে সে ছেলেটা এখন হয়তো তোমাকে টো মেরে চলে গেছে তাই বদনাম রটানোর আগে আগেই অন্যকারো গলায় ঝুঁলিয়ে পড়তে নাটক শুরু করে দিয়েছ!তবে যে-ইই ছবিটা বাবার নাম্বারে এস এম এস করে পাঠিয়েছে তাকে আমার পক্ষ থেকে অনেক অনেক ধন্যবাদ নাহলে তোমার ওই আসল রূপটা কখনোই দেখতাম না!”
“রিয়াশ এভাবে বলো না। আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে একটু বুঝার চেষ্টা করো.!আচ্ছা আমি কি ওরকম মেয়ে?বলো?”
“শোনো প্রিয়া?এখন এসব আমাকে বলে আর লাভ নেই।তুমি যদি আমাকে বলো ওই ছেলেকে তুমি চেনো না,কখনোই দেখো না বা ওই ছেলের সাথে তোমার কোনোরকম সম্পর্কই ছিল না বা তোমার ছবি কেউ মিসইউজ করেছে তা আজ কেন সারাজনম বললেও আমি বিশ্বাস করবো না।এবার পথ থেকে সরো !দেরী হয়ে যাচ্ছে আমার!”
স্তব্ধ আমি!
“কী হলো,সরো?”
সরে গেলাম! চোখের সামনে থেকে রিয়াশ চলে গেলো।আর তার পেছন পেছন সবাই!বরযাত্রীরা,প্রতিবেশীরা এবং আত্মীয়-স্বজনরা!বাহিরের লোকগুলো জায়গা ফাঁকা করার পর আমার মা,বাবা ভাইও জায়গাটা ফাঁকা করে দিল শুধুমাত্র ভাবী ছাড়া!ভাবী আমার দিকে এগিয়ে,
“প্রিয়া?মন খারাপ করিস না!প্রতিটা খারাপের পেছনে কিছু ভালো দিকও থাকে!এ নিয়ে আপসেট হোস না।ধৈর্য্য ধর!আল্লাহকে ডাক!আল্লাহই সব ঠিক করে দিবেন।”
আমার চোখজোড়া এবার তীব্রভাবে জ্বালা করে উঠে।এতক্ষণে চেপে রাখা পানির বাঁধ এবার দুই চোখের কার্ণিশ বেয়ে টপটপ করে বেয়ে পড়তে থাকে!আমি ভাবীর বুকের দিকে আলতো ঢলে পড়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বলতে থাকি,
“আমি ওরকম খারাপ মেয়ে অন্য ছেলের সাথে এতটা বিশ্রীভাবে ছবি তুলবো?আর তুলবোই বা কেন ওই ছেলেকে ত আমি চিনিই না!”
ভাবী চুপ করে থাকেন!ছোট্ট একটা গাঢ় নিশ্বাস ফেলা ছাড়া।
“ভাবী, তোমার বিশ্বাস হয় আমি ওভাবে ছেলেদের সাথে ছবি তুলবো?আমি এতটাই খারাপ?”
“নাহ প্রিয়া!”
“তাহলে সবাই কেন আমাকে বিশ্বাস করলো না!কেন সবাই ওই ছবিটি দেখেই বিশ্বাস করে ফেললো!রিয়াশও করলো না!ও না আমার সাথে পাঁচটা বছর সম্পর্ক রেখেছিল?ও কি আমাকে চেনে না,জানে না!”
কথাগুলো বলতে বলতে আমি আরো ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে থাকি!ভাবী আমাকে সামলানোর চেষ্টা করেন।কিন্তু ভাবীর চেষ্টাতে কাজ হয়নি।হবেও না!আর কখনো হবে না!যে দাগ আজ মনে কেঁটেছে তা এই জীবনেও মন থেকে মুছে ফেলতে পারবো না।!এমন সময় রুমের বাইরের থেকে ভাইয়ার ডাক আসে।ভাবীকে উদ্দেশ্য করে,
“নয়না চলে আসো বাইরে!ওখানে থেকে কি করতেছো।আসো বলছি!”
ভাইয়ার কঠিন কথা শুনে ভাবী দ্বিধা ভরা চোখে দরজার দিকে তাকান।দরজা থেকে চোখ নামিয়ে তারপর আমার দিকে।ভাবী যে আমার সাথে আছেন ভাইয়া রেগে তা ভাইয়ার কন্ঠতেই বুঝলাম।রাগবেন না ই বা কেন আমিতো আজ থেকে সবার চোখে বেশ্যা,চরিত্রহীনা,নষ্টা!একজন চরিত্রহীনা,নষ্টা,বেশ্যা মেয়ের সাথে অন্যরা কেন মিশবে! কন্ঠদ্বার স্বাভাবিক করে ভাবীকে বলি,
“ভাবী যাও।ভাইয়া তোমাকে ডাকছে।।তুমি আমার সাথে থেকে খামোখা নিজের সংসারে কেলেংকারী করো না!”
“প্রিয়া…!”
মাথা নুইয়ে ফেললাম!ভাবী আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বলেন,
“আমি পরে আবার আসতেছি!একদম কাঁদবি না!”
বলে চলে যান।
চলবে…