ভালোবাসার প্রতিদান । পর্ব -০২

চারদিক আঁধারে ভরপুর!পাঁচ মিনিট আগে দূরের একটা বাড়িতে পঞ্চাশ পাওয়ারের একটা বাতির আলো দেখা গিয়েছিল।তার খানিক পর সেই আলোটুকুও নিবে গেল।গৃহস্থ জানলা বন্ধ করে ঘুমিয়ে গিয়েছে হয়তো।এখন কাছে,দূরে সবখানেই নিস্তব্ধতা এবং অন্ধকারে ঢাকা।কেউই জেগে নেই।সবাই ঘুমন্তপুরীতে।শুধু আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে এখনও ঘুমাই নি।ঘুমানোর বহুবিধ চেষ্টা করেছি।কিন্তু চোখে আর ঘুম ধরা দেয়নি।আজকের দিনের প্রবহমান ঘটনা টা আমার বুকের ভেতর যেভাবে কাঁটার মতন বিঁধে গেছে ঘুম কি এত সহজেই আসবে?আসবে না। বিছানা থেকে আবার উঠে বসি।চোখের কোণের জমে থাকা পানিটুকু বাম হাত মুছে নিই।বালিশের কিণার হাতড়ে ফোনটা আবারো হাতে তুলে নিই।স্ক্রিন অন করে রিয়াশের নাম্বারটা সামনে আনি।নাম্বারে কল দিই।সেই আগের মতোই বন্ধ বাতায়।এই নিয়ে পাঁচবার বন্ধ পাচ্ছি।পাঁচবারের আগে কল ঢুকেছে।তবে রিসিভ হয়নি।রিসিভ হতে কতবার যে রিয়াশকে আকুতি মিনতি মেসেজ করেছি তার ইয়ত্তা নেই।অতঃপর রিয়াশ কল রিসিভ করে।রিসিভ করেই তার মুখের সবথেকে বিশ্রী ভাষাগুলো আমাকে শোনায়,
.
“এই নষ্টা মেয়ে,বারবার আমাকে কল করে জ্বালাতন করছিস কেন?আমার সাথেও নষ্টামি করতিস নাকি?তোর মতন৷ মেয়েরা এই রিয়াশের গাঁ ঘেঁষা কেন ছায়াটুকু পাবে না।রেখে দে।নইলে ব্লক মারমু!আর বিরক্ত করবি না আমাকে!আমি তোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নই!”
.
বলে কেঁটে দেয়।আমি অস্ফুট কেঁদে উঠি।অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদি।কেঁদেকুটে তারপর আবার নিজেকে শান্ত করি।তারপর অবাধ,নির্লজ্জ, বেহায়া মনটা সবকথা মুহূর্তে মন থেকে মুছে ফেলে আবারো ওর নাম্বারে কল লাগায়।এই আশায় যে,” রিয়াশ আমাকে ভুল বুঝেছে।তার এই ভুল ভাঙ্গাতে হবে।ভুল না ভাঙ্গালে রিয়াশ আমাকে বুঝবে না।রিয়াশেরও এখানে দোষ নেই।হুটহাট ওমন কিছু দেখলে যে কারোই রাগ হবে।”কিন্তু না! রিয়াশ আমাকে বুঝার আর চেষ্টা করলো ।সাথে সাথে তার ফোন অফ করে দেয়।সেই অফে এখনো অন করে নি!হয়তো এই ফোন আর খুলবেও না কোনোদিন!
.
রাতটা হয়তো আমার নির্ঘুমে কেঁটেছে।পাশের রুম হতে কিছু তীক্ষ্ণ কথা কানে বাঁজতেই আমার তন্দ্রা ঘুম ছুটে যায়।কথা গুলো ভাইয়া এবং মায়েরই।
“মা, আমি আর ওর ব্যাপারে কিছুই জানি না।তোমাদের মেয়ে তোমরা যা ভালো হয় তাই করো।”
“সেটা কেমন কথা, নিরব?ও তোর বোন না?”
“বোন আগে ছিল।এখন আর না!ও কাল মুখে যে চুনকালি দিয়েছে তা আর কি বলবো…!তবে চুনকালি,মান-ইজ্জের কথা বাদই দিলাম,ও নিজেই নিজের যেই ভাবে বদনাম রটিয়েছে ওর বিয়ে আর হবে না!”
“বিয়ে ত একভাবে না একভাবে দিতে হবে!বদনামের কথা ভেবে লাভ নেই!”
“তোমার মেয়ের বিয়ে হলেই ত?!কে বিয়ে করবে ওকে?তোমার কি মনে হয় ওই ছবিটা দেখার পর কেউ আর ওকে বিয়ে করতে রাজি হবে?কেউ হবে না!কেউ না!”
.
“নিরব বাঁজে বকিস না ত!সমস্যার সমাধান আল্লাহ অবশ্যই দেন।”
“আমি বাঁজে বকছি না মা।ঠিকই বলছি।আর আল্লাহর ওয়াস্তে ওর ব্যাপারে আর কিছু শুনতে চাচ্ছি না।আমার অফিসের দেরী হয়ে যাচ্ছে।আমি অফিসে গেলাম। “
তারপর ওপাশ থেকে আর কোনো শব্দটা শুনতে পাইনি।হয়তো ভাইয়া তার অফিসে চলে গেছেন!আমি এবারো কেঁদে উঠি।টপটপ করে ঝরতে থাকে আমার দু’চোখের পানি!এভাবেই কাঁন্না,বিষন্নতা আর একাকীত্বের মধ্য দিয়ে আমার দিনগুলো ছুটা শুরু করে……
.
আজ শনিবার।সেই অভিশপ্ত দিনটির থেকে আজ পাঁচদিন পূর্ণ হলো।ভাবছি আজ একটু বাইরে বের হব।রুমে আর ভাল্লাগছে না ।এ’কটা দিন রুমে একা একাই কাটিয়েছিলাম।মা,বাবা এবং ভাইয়া এখনো আমার সাথে কথা বলে না ভাবী ছাড়া।খাবার-দাবার,কথাবার্তা যা আছে সবকিছুর ভাবী এসেই তয়তালাশ করেন।আমি দশটার দিকে বাসা থেকে বের হই। আসার সময় ভাবীকে বলে আসি।নোয়ারীপুর,মানে আমাদের উপজেলার চওড়া রাস্তাটার মাঝখানটায় এসে দাঁড়াই।চারপাশে মানুষ তেমন নেই।লোকজন কমই বলা চলে।যানবাহনের চলাচলও তেমন একটা নেই।আবার বেশির ভাগ দোকানপাটই বন্ধ।এরকম হবার পেছনে অবশ্যি কারণ আছে।প্রতি শনিবারে নোয়ারীপুর সবকিছু বন্ধ রাখার নিয়ম করা হয়েছে।
.
তারপরও দেখছি কয়েকটা রেস্টুরেন্ট,শপিংমল,মুদি দোকান খোলা আছে।আবার সেখানে মানুষদেরও জড়তা বেশ!কিছুক্ষণ এভাবে দেখার পর ভাবলাম তিথিকে একটু কল করি।একা একা ঘুরতে ভাল্লাগছে না। বিষন্নতা মনটার মতন সবকিছু নিরস নিরস লাগতেছে।মনখারাপের সময় কেউ সাথে থাকলেও মনটা ভালো হয়ে যায়।তখন মন খারাপের মুহূর্তটা আর মনে থাকে না।ও আসলে হয়তো আমার আর মন খারাপ থাকবে না।ঘুরতে ভাল্লাগবে।ভেবেই ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করি।তিথির নাম্বারে ডায়াল করবো এমতাবস্থায় চোখ পড়ে দূরের এই ঝাঁউড়ি গাছটার দিকে।দূরত্ব তেমন বেশি নয়।এই ত্রিশ ফুট হবে।সেখানে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।ছেলেটির পড়নে সাদা টি-শার্ট,শার্টের মাঝখানে কালো টাই বাঁধা,পড়নে কালো প্যান্ট,পায়ে কালো স্যু,বাম হাতে কালো ব্র্যান্ডেড ঘড়ি এবং ডানহাতে একটা ফাইল।সে ফাইলটা বারংবার নাড়িয়ে তুলছে আর এদিকসেদিক তাকাচ্ছে।
.
ছেলেটার তাকানোর ভঙ্গিমা দেখে মনে হচ্ছে সে কোনো গাড়ির জন্যেই অপেক্ষা করছে।ছেলেটিকে দেখার পর আমার ভেতরটা কেনজানি খুব অস্থির অস্থির হয়ে ওঠে।ছেলেটির চেহারা খুব চেনা চেনা লাগতেছে।ছেলেটির মুখটা যেন আমি দেখেছি…..!খানিক্ষন অব্দি চোখের পাতা বন্ধ করে ভাবতে থাকি… কোথায় দেখেছি..!কোথায় দেখেছি…!ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করে আমার চোখের সামনেই ভেসে ওঠে রিয়াশের বাবার ফোনে দেখানো সেইদিনকার সেই ছেলেটির ছবি, যেই ছবিটিতে একটি ছেলের সাথে আমার অাপত্তিকর মুহূর্তের একটা ছবি ছিল!সেই ছেলের চেহারা আর এখন দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেটির চেহারা হুবহু এক!কোনো অমিল নেই!তারমানে….
ধপ করে এবার আমি আমার চোখের পাতা খুলে ফেলি!
“তারমানে এই সেই ছেলে!”
চলবে…..