ভালোবাসার প্রতিদান । পর্ব -০৩

আমি আর স্থবির থাকতে পারলাম না।রাগে-কষ্টে-ক্ষোভে নড়ে ওঠে আমার সর্বাঙ্গ!ফোনটা নিচে নামিয়ে দ্রুতপদে এগিয়ে যাই ছেলেটির দিকে!ছেলেটি মাথা নুইয়ে ঘড়িতে টাইম দেখতে ব্যস্ত ছিল তখন!আমি সেই ব্যস্ততাকে এক ছটাকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিই।
“আপনি ত সেই যে আমার বাঁজে ছবি বানিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন!তাই না?”
আকস্মিক আমার উঁচু গলার বাক্য ছেলেটির কর্ণকুহরে ঢুকতেই ঘড়ি থেকে চোখ তুলে সামনে তাঁকায়।তাকিয়ে ছেলেটির স্বাভাবিক মুখের ভঙ্গিমা অস্বাভাবিক হয়ে যায়।চোখ,ভ্রু,কপালের স্তর ক্রমান্বয়ে কুঁচকে আসতে থাকে।অপ্রস্তুত কন্ঠে বলে,
“সরি?”
.
“ভাণ করতেছেন?…”
বলে কড়া চোখে তাকাই।তারপর আবার বলি,
“কীভাবে পারলেন অন্যের ছবিকে পর্ণ ছবি করতে?এসব করার আগে একবারও কি বিবেক বাঁধে না যে যার ছবিটি পর্ণ বানাচ্ছেন সে হয় আপনার বোন,নাহয় আপনার মা!আচ্ছা সেটা বাদ দিলাম। পর্ণ ছবি বানিয়ে একজনের বিয়ে ভেঙ্গে আপনার কী লাভ হলো, বলুন তো!? “
ছেলেটি চোখমুখে একটা অপ্রস্তুত ভাব ফুঁটিয়ে বলে,
“আমিতো আপনার কোনো কথাই ইলবুঝতেছি না!কীসের পর্ণ ছবি?আবার কার বিয়ে ভেঙ্গেছি?কী বলতেছেন এসব?”
“সেটাতো আপনিই ভালো করে জানেন!ওরকম নীচু মানসিকতার কাজ করেছেন!”
কথাটি বলার সাথে সাথে ছেলেটি আমার দিকে এবার সরু চোখে তাকায়।খানিকক্ষণ নিরব চোখে তাকিয়ে বলে,
“আমি কিন্তু এখনো ভালো করে ক্লিয়ার হলাম না!দয়া করে আমাকে আবার একটু ক্লিয়ার করে বলুন!”
“নরপশুদের বহু রূপ!জানেন এটা?লোকসমাজে নিজেদের সুন্দর রূপে জাহির করে ধরা পড়ার ভয়ে!অথচ ওই সুন্দরের পেছনে কতই না বিমর্ষ এদের চেহারা!তবে এই বিমর্ষ চেহারাটা ক’দিন লুকিয়ে রাখতে পারবে এরা?বেশিদিন কিন্তু না।ধরা পড়তেই হবে!অলরেডি ত ধরা পড়েই গেলেন…!”
“আপনি এসব আমাকে বলতেছেন, তাই না?দেখেন আমি কিন্তু আপনাকে চিনি না।কখনো দেখিও নি।এই প্রথম দেখলাম মনে হয়।একজন অপরিচিত মানুষ হিসেবে হুটহাট এসে আরেকজন অপরিচিত মানুষকে আপনি এসব বলতে পারেন না!”
.
রাগটা আমার আরো চড়ে যায়!এ তো পুরোই নাটকের মঞ্চ সাঁজিয়েছে এখানে!দাঁতে দাঁত চেপে বলি,
“অপরিচিত ত আমিও বলতেছি!তাহলে অপরিচিত হয়ে আরেকটা অপরিচিত মেয়ের ছবি এতটা বিশ্রীভাবে ফটোশপ করে তাকে সমাজ,পরিবারের সবার কাছে ছোট্ট করতে একটুও গাঁয়ে বাঁধলো না?সে আপনার কোনো ক্ষতি করেছিল?করেনি!তারপরও কেন তার এতটা সর্বনাশ করলেন!?”
ছেলেটা অধৈর্য্য হয়ে গেল।এদিকওদিক একবার বিরক্তি দৃষ্টি মেলে বললো,
“দেখুন আপনার ভুল হচ্ছে কোথাও!আপনি অন্যকারো দোষ আমাকে দিচ্ছেন হয়তো!পর্ণ ছবি এবং বিয়ে ভাঙ্গা এসবের আমি কিছুই করিনি!খামোখা রাস্তার মাঝে কাউকে এসব বলে তার রেপুটেশন নষ্ট করতে আসবেন না!”
“ও আচ্ছা তাই?তাহলে আপনার সাথে আমার ওরকম জঘন্য ছবি বানালেন কেন?!ছবিটাতে ত আপনিই ছিলেন, তাই না?”
.
” ছবিটা আমাকে একটু দেখাতে পারবেন?”
“পারবো!”
এমতাবস্থায় একটা বাস আসে এদিকে।বাসটির নাম “ঢাকা টু নোয়ারীপুর”। অর্থাৎ বাসটি ঢাকায় যাওয়ার উদ্দেশ্য যাত্রা করেছে।ছেলেটি বাসটি দেখামাত্রই অস্থির হয়ে যায়।ফাইলটা ঠিকঠাক আছে কিনা তাতে একফোঁড় তাকিয়ে বাসের দিকে বাম হাত উঁচিয়ে ধরে বাসটা থামানোর চেষ্টা করে।বাস থেমে যায়।আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
” শুনুন?আমার বাস চলে এসেছে।আজ আমার ইন্টারভিউ আছে ঢাকায়।আমাকে এখন ঢাকায় যেতে হবে ।আপনার সাথে কথা বলার সময় হয়তো নেই।আপনি একটা কাজ করুন আমার এই নাম্বারটা রাখুন। পরে সময় করে আমাকে কল দিয়েন।আমি বিস্তারিত সব জেনে নিব।”
.
বলে ছেলেটি আমার হাতে একটা কার্ড গুঁজে দেয়।তারপর ঘাড় ঘুরে বাসের দিকে চলে যায়।কয়েক সেকেন্ডসের মধ্যেই হনহন করে বাস দূরে মিলিয়ে যায়
।বাসটা চলে যেতেই আমি কার্ডটার দিকে শক্ত চোখে তাকাই।”আকাশ ভূঁইয়া অনিল”।খুবই ভালো নাম ছেলেটির।চেহারাও ভালো।কথাবার্তার ধরণও ভালো।কথা বলার মাঝে কোথাও একরাশ চঞ্চলতা নেই।খুবই গম্ভীর আর ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ!তারপরও ছেলেটি ওরকম একটা কাজ করেছে বলে মনে হয়?ছেলেটি ত একদম ই নারাজ ওরকম করেনি!আচ্ছা যদি ছেলেটি ওরকম না ই করে থাকে তাহলে ছবিটি ছেলেটির সাথেই বা কেন!?আর কারো সাথে ট্যাগ হতে গেলো না কেন! হাজারো প্রশ্নবাণে মস্তিষ্কটা টগবগ করে উঠলো।জোরে একটা দম ছেড়ে এবার চারপাশে তাকাই।সূর্যটা ঠিক মাথার উপর এখন।কড়া রোদ পড়েছে।মাথাটাও খুব ভার ভার।এক মুহূর্তেও আর দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব নয়।
.
আলতো দরজা ঠেলে ভেতরে উঁকি দিতেই দেখি ডাইনিং এ মা এবং বাবা বসে আছেন।ভাবী রান্নাঘরে রান্না করতেছেন হয়তো।মা-বাবাকে দেখে কিছুটা দমে যাই।এখন রুমে ঢুকতে গেলে মা-বাবার সামনে দিয়ে যেতে হবে!ইদানীং ভাবি ছাড়া বাসার সবার সামনে দিয়ে হাঁটতে আমার খুব ভয় আর আতঙ্কিত লাগে।হাঁটলে মনে হয় এই বুঝি ভাইয়া রাগ রাগ চোখে আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে।এই বুঝি মা সেদিনের ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে বারবার অভিশাপ দিচ্ছে।এই বুঝি বাবা স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে মনে মনে ভাবছে,মেয়েটাকে কত ভালো ভাবলাম।আর মেয়েটা এত একটা নীচক কাজ করলো!আমি কিছুক্ষণ দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে থাকি।অপেক্ষা করি মা-বাবা কখন উঠে চলে যাবে।হলোও তাই।কয়েক মিনিট পাঁচেক৷ দাঁড়ানোর পরই বাবা উঠে নিজ রুমে চলে যান।আর মা সুক্যেশের চাবি নিয়ে বাবার পেছনে পেছনে দৌড় লাগান।আমি টপ করে ভেতরে ঢুকে যাই।রান্নাঘরের দিকে চোখ রাখতেই ভাবী আমাকে দেখে হেসে দেন।হাসি মাখা মুখেই বলেন,
” ঘুরা শেষ?”
আমি দু’পাশে মাথা নাড়ি।
“আচ্ছা। যা রুমে যা।”
.
আমি রুমে চলে আসি।ব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে বিছানার উপর গিয়ে আলতো করে বসি।হাতে গুঁজে রাখা কার্ডটার দিকে আবার চোখ বুলাই।কিছুক্ষণ কার্ডটির দিকে স্তম্ভিত চোখে তাকিয়ে থাকি।তারপর হঠাৎ ওই ছবিটির কথা মনে পড়তেই আবার উঠে যেয়ে ব্যাগের থেকে ফোনটা বের করি।উদ্দেশ তিথিকে কল করা।তিথি পারবে রিয়াশের থেকে ওই ছবিটা আমাকে কালেক্ট করে দিতে।ওই ছবিটা আমাদের কারো কাছেই নেই।রিয়াশের বাবার ফোনে আছে।যেহেতু উনার ফোনে ওই ছবিটা পাঠানো হয়েছে।আমি ছবিটি সরাসরি দেখালে তারপর দেখবো ছেলেটির ভালো সাঁজার নাটক কোথায় যায়।এই প্রিয়া কি এত সহজেই ছেড়ে দেবে ভেবেছে?কখনোই না!তিথিকে কল করার পর তিথি ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে।
.
“হ্যাঁ,বল?কি মনে করে কল দিয়েছিস?”
“তিথি একটু হেল্প করতে পারবি?”
“কি হেল্প?”
ফোনটা কানের পাশে আরো ভালোভাবে এটে বলি,
“তুই রিয়াশের থেকে আমাকে ওই ছবিটা একটু কালেক্ট করে দিতে পারবি?”
“কেন?”
“প্রয়োজন আছে।প্লিজ না করিস না!”
“তাহলে তুই ই রিয়াশের থেকে ফোন করে চেয়ে নে?”
“কথা হয় না।ও ফোন অফ করে রেখেছে।”
“ওহ,হু সেটাই ত কথা বলার বেচারীর মুখ আর কোথায় রাখলি যে কান্ড ঘটালি!?যাইহোক কালেক্ট করে দিমু নে।”
“তোর বিশ্বাস হয় আমি ওরকম করেছি?”
“আচ্ছা রাখলাম।”
বলে তিথি ওপাশ থেকে কল কেটে দেয়।আমার চোখের কার্ণিশ বেয়ে দু’ফোটা জল গড়িয়ে যায়।!হায় রে জীবন!খামোখা মিথ্যে অপবাদের ঝাঁলে আঁটকা পড়ে কাছে-দূরের সবার কটু কথা শুনতে হয়!
চলবে….