শেষ বিকেলের রোদ । পর্ব -২৯

রাত ১০ টা,
রাতের খাবার খেতে ডাইনিং এ এসেছে তুবা, যদিও সে আসতে চায়নি তাজিমের ভয়ে। কিন্তু এসেই দেখে তাজিম চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। ওর ঠোঁটের কোণে ও গালে এখনো লাল ফোলা অংশটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
অফিস থেকে বাসায় আসার পর কারো সাথে কোনো কথা বলেনি তাজিম, কারো সাথে রাগও দেখায়নি, তুবাকে বকাঝকাও করেনি। ওকে দেখে মনে হচ্ছে ও গভীর মনে কিছু ভাবছে। এই বিষয়টাই তুবার বেশি ভয়ের কারণ, ঝড় আসার আগে প্রকৃতিতে এমন গুমোট ভাব আসে।
তুবা এসে তাজিমের মুখোমুখি বসলো। অনু ভাত, তরকারির বাটি এনে টেবিলে রাখে। তাজিম নিজেই নিজের প্লেটে ভাত-তরকারি নিয়ে খাওয়া শুরু করে। অনু নিজেও অবাক হয়েছে কারণ তাজিম সবসময় সবার সাথে একসাথে খাওয়া শুরু করে। তবুও অনু চুপ থাকে, অফিসে কি কোনো গোন্ডগোল হয়েছে? এমন চিন্তায় অনু ভীষণ চিন্তিত।
তুবার পাশে বসে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কি হয়েছে তোমার ভাইয়ার?”
তুবা একবার তাজিমের দিকে আড়চোখে তাকায়, তারপর নিজের খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। তওবা ও মহসিন এসে চেয়ার টেনে বসে। তওবা বলে,
“বাহ, আজ তাজিম ভদ্র হয়ে গেছে।”
“অভদ্র কি কোনোদিন ছিলাম? যে অভদ্র ছিল তাকে তো কোনোদিন শাসন করোনি।”
কড়াভাবে কথাটা বলে উঠে যেতে নেয় তাজিম।
অনু ওকে আটকে বলে,
“খাবার শেষ না করে কোথায় যাচ্ছো?”
“ইচ্ছে করছে না।”
বলে তাজিম রুমে চলে যায়।
মহসিন অনুকে বলল,
“তোমার সাথে কি ওর মনোমালিন্য চলছে, মা?”
অনু মহসিনের দিকে তাকিয়ে ডানে বামে মাথা নেড়ে বলে,
“না তো বাবা।”
“তবে ওর কি হলো?”(তওবা)
অনু তুবার দিকে তাকায়। তুবা মাথানিচু করে খাচ্ছে আর কি যেন ভাবছে। অনু ভয় পাচ্ছে অন্য বিষয়ে, আলিয়ার আর তুবাকে একসাথে দেখে নেয়নি তো তাজিম?
খাবার শেষে তুবা নিজের রুমে চলে যায়। আজ ওর মনটা এতোই খারাপ ছিল যে বিকেলে মুগ্ধের সাথে দেখা করার কথা বেমালুম ভুলে বসেছে।
নিজের ফোনে ছয়টা মিসড কল দেখে তাও আননোন নাম্বার থেকে, ফোন সাইলেন্ট থাকায় ও শুনতে পায়নি।
তুবা কলব্যাক করে। অপরপাশ থেকে রিসিভ হয়,
“মিস. তুবা, এতোক্ষণে আপনার খেয়াল হলো?”
অচেনা পুরুষকন্ঠ পেয়ে তুবা ভয়ে ভয়ে বলল,
“কে আপনি?”
ওপাশ থেকে রাগী গলায় বলল,
“বাহ রে বাহ, আমাকে এভাবে ভুলে গেলেন? পুরো দুইঘন্টা ধানমন্ডি লেক পার্কে দাঁড়িয়ে ছিলাম।”
তুবা দাঁত দিয়ে জিহ্বা কাটে। বুঝতে পারে ওপাশের ওই অচেনা পুরুষ মুগ্ধ, যার সাথে আজ জরুরি কথা বলার ছিল।
তুবা বেক্কলের মতো হে হে করে হেসে বলে,
“আসলে, আমি একটু সমস্যায় ছিলাম। তাই…”
“তাই আমাকে সাড়ে পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল?”
এমন কথায় তুবা খুবই লজ্জা পায়। পরক্ষণেই বলে উঠে,
“আপনি যে বললেন দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে ছিলেন, এখন আবার বলছেন সাড়ে পাঁচটা থেকে আটটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন। কোনটা সঠিক হুহ?”
এবারে মুগ্ধও হো হো করে হেসে দেয়। তারপর বেশ সিরিয়াস কন্ঠে বলে,
“কি বলতে চাচ্ছিলেন? আর আপনি আসলে কে?”
তুবা কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
“আমি কে সেটা জিনাতকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন। এখন আমি জিনাত ও আলিয়ারের সাথে আপনার সম্পর্ক জানতে চাই।”
মুগ্ধ কপাল কুঁচকে ফেলে। বিব্রত হয়ে বলল,
“আলিয়ারকে তুমি কি করে চেনো?”
“সেটা না হয় আলিয়ারই বলবে।”
“আর জিনাতকে কিভাবে চেনো?”
তুবা মুচকি হেসে বলে,
“প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছি না তো।”
মুগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“আমি আলিয়ারের বন্ধু।”
“সে হিসেবে তো জিনাতের সাথে তেমন কোনো সম্পর্ক থাকা উচিত না। কিন্তু সেদিন হাসপাতালে দেখলাম জিনাত আপনাকে…”
তুবা থেমে যাওয়ায় মুগ্ধ কনফিউজড হয়ে বলে,
“কোনদিন?”
“আলিয়ারের যেদিন অপারেশন হয়েছিল।”
মুগ্ধ কিছুক্ষণ ভেবে বলে,
“আসলে আপনি কে? মনে হচ্ছে আলিয়ার বা জিনাতের কাছের কেউ।”
“হয়তো আবার না।”
“হেয়ালি করছেন কেন? সত্যিটা বলুন।”
“আপনি বলেছেন?”
মুগ্ধ শুয়েছিল, সে উঠে বসে বলল,
“জিনাতের সাথে আমার সম্পর্কটা মনে মনে হয়ে গেছে। বাকিটা বোঝার মতো বুদ্ধি নিশ্চয়ই আছে?”
“ওওওওওওওওও”
বলে সুর ধরে থাকে তুবা।
মুগ্ধ বিরক্ত হয়ে বলে,
“এবার বলুন আপনি কে?”
“জেনে নিন।”
এমনসময় তুবার রুমে আসে তাজিম ও অনু। তুবা কল কেটে, ফোনের সাইড সুইচ টিপে ধরে ফোন সুইচ স্টপ করে দেয়।
মুগ্ধ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলে,
“আজব মেয়ে তো, কেটে দিলো কেন?”
আবারো কলব্যাক করে মুগ্ধ, এবারে ফোন সুইচ স্টপ দেখায়। মুগ্ধের খুব রাগ হচ্ছে। মেয়েরা এমন কেন? কোনো কথা বা কাজ কি ওরা সরাসরি করতে পারে না?
অনু এসে তুবার পাশে বসে। তাজিম ওদের সামনে দাঁড়িয়ে অনুকে বলে,
“তোমার কি মনে হয় তুবাকে আলিয়ার স্যারের ফ্যামিলি পছন্দ করবে? এই মেয়ের তো রূপও নেই যে কেউ ওকে পছন্দ করবে।”
অনু তুবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“রূপ দিয়ে কি হবে? গুণ তো আছে।”
“তুমি কোন গুণের কথা বলছো? আর আব্বু-আম্মু জানলে কি হবে জানো?”
“তাজিম, এতো চিন্তা করো না। আল্লাহ চাইলে সবকিছুই সম্ভব। যদি তুবা আলিয়ারের কপালে থাকে, তো অবশ্যই সে তাকে পাবে।”
তাজিম কোমড়ে হাত দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। অনু বলল,
“তো তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছো?”
তাজিম তুবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুবার কিত্তীকলাব সম্পর্কে তুমি জানতে?”
অনু একটা ঢোক গিয়ে বলে,
“আসলে…”
তাজিম রেগে এসে অনুর গাল চেপে ধরে। তুবা চমকে উঠে চোখ বড় বড় করে ওদের দিকে তাকায়। তাজিম কিড়মিড়িয়ে বলল,
“কতটা অপমানিত হতে হয়েছে আজ জানো?”
অনু খুব কষ্টে বলে,
“ছাড়ো তাজিম, লাগছে।”
তাজিম ওকে ছেড়ে দেয়। অনু মাথানিচু করে কান্না করে দেয়। তাজিম আজকের পুরো ঘটনা খুলে বললে অনু আরো জোরে কান্না করতে থাকে। যা হয়েছে পুরোটা তো ওর জন্যই হয়েছে।
তাজিম তুবাকে বলে,
“তোমার মতামত কি? আলিয়ার যা বলেছে সব সত্যি?”
তুবা মাথানিচু করে ঢোক গিলে, ভয়ে ওর গলা শুকিয়ে গেছে। তাজিম ধমক দিয়ে বলল,
“রাগ আর উঠিয়ো না, তাতে খুব খারাপ ফল পাবে।”
তুবা উপর নিচে মাথা নাড়ে। তাজিম বলে,
“মুখে বলো।”
“হ্যাঁ, আ.. আলিয়ার ঠিক বলে..”
আর কিছু বলার আগেই তুবার ডানগালে একটা চড় পড়ে। তুবার চুপ করে ডানগালে হাত রাখে। অনুও চুপ আছে। অপমানে, লজ্জায় প্রচন্ড রেগে আছে তাজিম। কোনোদিন কারো সামনে মাথানত করেনি তাজিম, কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তুবার জন্য আলিয়ারের ফ্যামিলির সামনে মাথানিচু করতেই হবে। কথাগুলো ভেবেই কান্না পাচ্ছে তুবার, কিন্তু ভাইয়েরসামনে আর কোনো কথা বলার সাহস ওর নেই।
পরেরদিন,
শুক্রবার, ছুটির দিন। মহসিন-তওবার বাসা আজ জমজমাট থাকার কথা থাকলেও সেরকমটা নেই। সকাল ৯: ৪৫, তুবা এখনো ঘুমাচ্ছে, তাজিমও ঘুমাচ্ছে। কালরাতে তুবাকে মারলেও মাঝরাতে ওর রুমে এসে ওকে কান্না করতে দেখে ঠিকই বুকে জড়িয়ে নিয়েছে তাজিম। ভাইবোনের পবিত্র সম্পর্ক তো অনেকটা গভীর, চাইলেই কি সে বন্ধনে ফাটল ধরানো যায়? তাজিম সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে বোনের জন্য মাথানিচু করতে হলে তাই করবে সে, প্রয়োজনে অন্য কোম্পানিতে চাকরি নিবে।
অনু নাস্তা তৈরি করছে, এমনসময় বাসায় কলিং বেল বেজে উঠে। অনু গিয়ে দরজা খুলে দেখে আলিয়ার এসেছে। আলিয়ারকে দেখেই চোখ বড় বড় করে অনু বলল,
“তুমি এখানে?”
“তাজিম ভাইয়ার সাথে কথা বলতে এসেছি।”
অনু দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভিতরে আসুন।”
আলিয়ার ভিতরে গিয়ে সোফায় বসে। অনু বলে,
“তাজিম এখনো ঘুমাচ্ছে, আমি ওকে ডেকে আনছি একটু অপেক্ষা করুন।”
“ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ পর তাজিম ফ্রেশ হয়ে ড্রইংরুমে আসে। অনু আলিয়ারের জন্য নাস্তা পাঠায়।
তাজিম এসে আলিয়ারের মুখোমুখি সোফায় বসে। আলিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলে,
“চা নিন, আমার স্ত্রী খুব ভালো চা বানায়।”
বলেই একগাল হাসে তাজিম।
আলিয়ার মুচকি হেসে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল,
“তুমি করে বলতে পারেন ভাইয়া। আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো।”
তাজিম মাথানেড়ে মুচকি হেসে বলে,
“বুঝলাম, কোন বিষয়ে কথা বলতে এসেছো।”
আলিয়ার মুচকি হেসে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। তারপর বলে,
“আপনি রাজি থাকলে আমার বাবা-মা আপনার বাসায় প্রস্তাব নিয়ে আসবে।”
তাজিম অবাক হয়ে তাকালে আলিয়ার বলল,
“ইসলামিক রীতি অনুযায়ী, মেয়ের বাড়ি থেকে প্রস্তাব যাওয়া উত্তম কিন্তু বাঙালি তো সে নিয়ম উলটে দিয়েছে। তাই আমার এমন প্রস্তাব।”
বলে আবারো হাসে আলিয়ার।
রুম থেকে উঁকি দিয়ে ওদের কথোপকথন শুনছে তুবা। আলিয়ার আর ওর চোখাচোখি হতেই তুবা পর্দা নামিয়ে দেয়। আলিয়ার মাথানিচু করে মুচকি হাসছে।
তাজিম পেছনে ফিরে পর্দা নড়ছে দেখে বুঝতে পারে ওখানে তুবা ছিল।
কিছুক্ষণ পর আলিয়ার বলে,
“আপনার আপত্তি না থাকলে বিকেলে তুবাকে নিয়ে একটু বাইরে যেতে চাই, কিছু কথা ছিল ওর সাথে।”
“তুবা চাইলে যেতে পারো।”
.
চলবে….