শেষ বিকেলের রোদ । পর্ব -৩০

বিকেল ৪ টা,
জিনাতকে আজ মুগ্ধ কোনো সারপ্রাইজ দিবে বলে ডেকেছে। সোনালী পাড়ের বেগুনী সুতির শাড়ি পড়েছে সে, মেকআপ করেছে বেশ, ঠোঁটের লাল লিপস্টিকটা জানান দিচ্ছে ও আজ বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে বেরোচ্ছে৷ কারণ সাধারণত জিনাত গোলাপী লিপস্টিক ব্যবহার করে।
বেরোনোর সময় জেরিনের সামনে পড়ে জিনাত৷ জেরিন ওর আপাতমস্তক দেখে বলে,
“শাড়ি কেন পড়েছো?”
জিনাত ভাব নিয়ে বলল,
“সেসব তোর জানার দরকার নেই, তুই বরং আম্মুকে বলিস আমি ফ্রেন্ডের বাসায় যাচ্ছি।”
“আম্মু যদি বিশ্বাস না করে?”
“আরে, করবে না কেন? আমি তো ফ্রেন্ডের বাসায়ই যাচ্ছি। কিছুদিন পর ফাইনাল পরীক্ষা না, তাই একিটা গেট টুগেদার হবে আর কি।”
জিনাতের কথা সম্ভবত জেরিনের বিশ্বাস হয়নি। সে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
“ঠিক আছে।”
জিনাত দাঁত কেলিয়ে বেরিয়ে যায়। জেরিন আবার ওকে ডেকে বলল,
“আসার সময় আইসক্রিম এনো।”
জিনাত বেরিয়ে গেছিলো, দরজা ঠেলে উঁকি মেরে বলল,
“আচ্ছা।”
জিনাত গেইটের সামনে গিয়ে মুগ্ধের জন্য অপেক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর মুগ্ধ বাইক নিয়ে আসে। জিনাতকে দেখে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“কি খবর ম্যাডাম?”
জিনাত গিয়ে বাইকে উঠে বসে বলে,
“খবর অনেক কিছু আছে।”
“যেমন?”
“বাইক তো স্টার্ট দেও।”
মুগ্ধ একগাল হেসে বাইক স্টার্ট দেয়। জিনাত দুহাতে ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,
“তোমার সারপ্রাইজের চিন্তায় আমার খাওয়া, ঘুম সব লাটে উঠেছে।”
“কেন?”
মুগ্ধ সামনের দিকে তাকিয়েই বলল।
জিনাত মুগ্ধের পিঠে মাথা ঠেকিয়ে বলল,
“তুমি বুঝবে না, তুমি ছোট মানুষ।”
মুগ্ধ হেসে বলে,
“আমি ছোট মানুষ আর তুমি বড় বুঝি?”
“হ্যাঁ, বড়ই তো।”
জিনাত মুগ্ধের পিঠে আঙ্গুল দিয়ে খোঁচাতে থাকে। মুগ্ধ রাস্তার একপাশে বাইক থামালে জিনাত বলে,
“কি হলো?”
মুগ্ধ বাইক থেকে নেমে বলল,
“খোঁচা দিচ্ছো কেন? কিছু বলবে?”
জিনাত ডানেবামে জোরে জোরে মাথা নাড়ে। মুগ্ধ হেসে বাইকে উঠলে জিনাত আবারো ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
রাস্তার অপরপাশ থেকে ওদেরকে একসাথে দেখে আলিয়ার। তুবার বাসায় যাচ্ছিলো ও, যদিও জিনাতের আগেই ও বাসা থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু তুবার জন্য ফুল আর গিফট কিনতে গিয়েই দেরি হয়ে গিয়েছে ওর।
ওদেরকে একসাথে দেখে নিজের অজান্তেই মুচকি হাসে আলিয়ার। ওর অগোচরে এই ঘটনা ঘটছে ভেবেই হাসি পাচ্ছে তার। আলিয়ার মনে মনে ভাবে,
“তাও ভালো যে দৃশ্যটা আমি দেখেছি, চাচী আম্মু দেখলে যে কি হতো?”
কথাটা ভাবতেই হাসি পায় আলিয়ারের।
১৫ মিনিট পর তুবার বাসায় পৌঁছায় আলিয়ার। বাসার সামনে দাঁড়িয়ে তুবার নাম্বারে কল দেয় আলিয়ার। রিং হতে থাকলেও কেউ রিসিভ করে না।
তুবা বিছানায় বসে বই পড়ছে, ফোন সাইলেন্ট থাকায় কলের শব্দ শুনতে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর ফোনের দিকে হঠাৎ চোখ যেতেই দেখে মিসড কল উঠে আছে। ফোন হাতে নিতেই আবারো কল আসে।
তুবা রিসিভ করে,
“হ্যালো।”
“তুবা, কোথায় তুমি?”
আলিয়ার সাবলীল কন্ঠ ও কথায় চমকে উঠে তুবা,
“কে.. কেন বলবো?”
“বললে বেড়ালকে মাছ দিবো।”
তুবার কপাল কুঁচকে যায়, সাথে আলিয়ারের উপর প্রচন্ড রাগ হয়। একটা মানুষ এতো তাড়াতাড়ি পল্টি খায় কিভাবে? অদ্ভুত লোক এই আলিয়ার।
আলিয়ার আবারো বলে,
“৫ মিনিটে নিচে আসো।”
তুবা একবার দরজার দিকে তাকায় তারপর বলল,
“পারবো না, ভাইয়া বাসায় আছে।”
“তোমার ভাইয়ার অনুমতিও আছে।”
তুবা একটু ভাবার চেষ্টা করে। অনেক ভেবে আবিষ্কার করলো সকালে আলিয়ার চলে যাওয়ার পর ওকে নিয়ে তাজিম কোনো কথাই বলেনি।
তুবা কল কেটে রেডি হয়ে নেয়। চুলগুলোকে হাত খোঁপা করে বেরিয়ে যায়। আলিয়ারের সাথে ঘুরতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরোয়নি, বেরিয়েছে ওর সাথে ঝগড়া করার উদ্দেশ্যে।
বাসার সামনে গিয়ে আলিয়ারের শার্টের কলার ধরে টেনে বাইক থেকে নামিয়ে বলে,
“কি ভেবেছিলেন আমাকে? অবলা?”
আলিয়ার নিজের শার্টের কলারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বেড়াল ভেবেছিলাম, আজ প্রমাণও পেলাম। এভাবে কেবল বেড়ালই খামচে ধরতে পারে।”
তুবা শার্ট ছেড়ে সরে দাঁড়ায়। আলিয়ার বাঁকা হেসে বাইকের থাকা একগুচ্ছ লাল গোলাপ নিয়ে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তুবা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।
আলিয়ার মুখে আলতো হাসি রেখে বলল,
“গ্রহণ করবে আমার একবুক ভালোবাসা?”
তুবা চুপচাপ আলিয়ারের দিকে তাকিয়ে আছে। আলিয়ার উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“কিছু কথা জানার আছে, চলো।”
তুবার হাত ধরে টান দিলে তুবা মাথানিচু করে বলল,
“সেদিন বললেন আমি আপনার বিপদের দিনে পাশে থাকিনি, থেকেছে জিনাত। তবে আজ কেন আমাকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন?”
আলিয়ার এগিয়ে এসে বলে,
“সব বলবো, আজই বলবো। তবে এখন নয়।”
তুবা আলিয়ারের সাথে বাইকে উঠে বসে। আলিয়ার বাইক স্টার্ট দেয়। এমনসময় তুবার মনে পড়লো ও বাসায় পড়ার সাধারণ সেন্ডেল পড়েই বেরিয়ে এসেছে, পড়নে সাধারণ একটা থ্রিপিজ, মাথার চুলগুলো কোনোরকম হাত খোঁপা করা। লজ্জায় তুবা আশেপাশে তাকাচ্ছে কেউ ওকে দেখছে কিনা।
আলিয়ারের দিকে তাকিয়ে দেখে হালকা নীল শার্ট ও সাদা জিন্স পড়ে আছে। তারমানে সুন্দর একটা গেটআপে বেরিয়ে এসেছে আলিয়ার আর ও? ভেবেই রাগ হচ্ছে তুবার।
তুবা গাল ফুলিয়ে বলে,
“বাইক থামান।”
“ওমা, কেন?”
“থামাতে বলেছি তাই।”
ধমক দিয়ে বলল তুবা।
আলিয়ার বাইক থামালে তুবা নেমে ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমাকে কেমন লাগছে?”
আলিয়ার ওর দিকে কিছুক্ষণ আগে ঠিকমতো খেয়ালই করেনি। এখন ওকে দেখে চোখ বড় বড় করে বলল,
“এসব কি?”
তুবার কান্না করে দেয় অবস্থা। আলিয়ার তাড়াহুড়ো করে বলে,
“ওয়েট ওয়েট।”
তুবা মাথানেড়ে বলল,
“কি?”
“বাইকে উঠো।”
তুবা বাইকে উঠে বসলে আলিয়ার ওকে নিয়ে একটা শোরুমের সামনে যায়। সেখানে ওর জন্য একটা থ্রিপিজ কিনে নেয়।
তুবা চুপচাপ কেবল দেখেই যাচ্ছে। আলিয়ারের অবস্থা দেখে ওর মনে হচ্ছে যাই হোক না কেন আজ তুবাকে ওর সাথেই ঘুরতে হবে।
আলিয়ার ওর সামনে এসে ওকে শপিং ব্যাগটা দিয়ে বলল,
“ওদিকে ট্রায়ালরুম আছে, চেঞ্জ করে এসো।”
তুবা ঠোঁটমুখ বাঁকিয়ে বলে,
“এখন?”
“হুম, তাড়াতাড়ি যাও।”
তুবা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থেকেই ব্যাগটা হাতে নিয়ে ট্রায়ালরুমের দিকে যায়। রুমে ঢুকতে নিলেই আলিয়ার ওকে বাধা দিয়ে বলে,
“এক মিনিট।”
তুবার আগে রুমে ঢুকে আশেপাশে দেখতে থাকে আলিয়ার। তুবা রুমে ঢুকে ওকে কিছুটা ধমকের সুরেই বলে,
“আমি কি আপনার সামনে চেঞ্জ করবো?”
আলিয়ার জিহ্বায় কামড়দিয়ে বলে,
“ওমা, ছি ছি। কিসব বলো তুমি?”
“তো দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
আলিয়ার চুপচাপ বেরিয়ে আসে। শোরুমের দুজন নারী কর্মচারী আলিয়ারের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে আর নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করছে।
কিছুক্ষণ পর তুবা বের হয়ে আসলে আলিয়ার ড্রেসের দাম মিটিয়ে বেরিয়ে আসে। তারপর তুবাকে নিয়ে জুতার দোকানে যায় সেখান থেকে ওকে নতুন জুতা কিনে দেয়। আগে পড়নে থাকা কাপড় ও জুতা একটা ব্যাগে করে তুবা হাতে নিয়ে রেখে।
তারপর ওরা বাইকের কাছে আসে। আলিয়ার তুবার খোঁপা খুলে দেয়। নিজের চিরুনি দিয়ে ওর চুল আঁচড়ে দিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে,
“পারফেক্ট।”
তুবা কনফিউজড হয়ে বলল,
“এতো তোড়জোড় কেন?”
“শাশুড়ির সামনে কি ওভাবে গিয়ে দাঁড়াতে নাকি?”
তুবা একটা ঢোক গিলে বলে,
“শা..শুড়ি?”
“আমার মা।”
তুবার দিকে এগিয়ে এসে বলল আলিয়ার।
এবারে তুবা আরো ভয় পেয়ে যায়। ওর জন্য আলিয়ার আর ওর মায়ের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে না তো?
অন্যদিকে,
জিনাতকে নিয়ে মুগ্ধ নিজের বাসায় এসেছে। ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ বেল বাজাতে নিলেই জিনাত ওকে বাধা দিয়ে বলে,
“আমার খুব ভয় হচ্ছে।”
মুগ্ধ ওকে একহাতে জড়িয়ে ধরে বলে,
“জাস্ট রিলেক্স।”
জিনাত একটু সরে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকায়। মুগ্ধ মুচকি হেসে বেল বাজায়। কিছুসময় পর একনারী কন্ঠ শোনা যায়,
“কে?”
মুগ্ধ একটু জোরে বলল,
“মা, আমি।”
“আসছি।”
মুগ্ধের মা এসে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু মুগ্ধের পাশে একটা মেয়েকে দেখেই চমকে যান উনি। মুগ্ধের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে মুগ্ধ বলে,
“ঘরে ঢুকতে দিবে না?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ।”
দুজনে বাসায় ঢুকে। জিনাতকে সোফার দিকে ইশারা করে মুগ্ধ বলে,
“বসো।”
জিনাত ধীরে ধীরে গিয়ে সোফায় বসে। জিনাত যেখানে বসেছে মুগ্ধ তার পাশের সোফায় বসে মাকে ওর পাশে বসায়। ওর মা জিনাতকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ব্যস্ত।
এদিকে আলিয়ারও তুবাকে নিয়ে নিজের বাসায় পৌঁছে গেছে। একহাতে তুবার হাত শক্ত করে ধরে লিফটে উঠে আলিয়ার। পাশে দাঁড়ানো তুবার মনের অবস্থা যে বেহাল তা আলিয়ার টের পাচ্ছে না। তুবা কিছুক্ষণ পর পর আলিয়ারের দিকে তাকাচ্ছে।
বাসায় বেল বাজাতেই জেরিন এসে দরজা খুলে দেয়। তুবাকে দেখে অবাক হয়ে ফিল্মি স্টাইলে চেঁচিয়ে উঠে,
“ভাইয়া বিয়ে করে বউ নিয়ে চলে এসেছে।”
আলিয়ার তাড়াহুড়ো করে জেরিনের মুখ চেপে ধরে,
“আস্তে চিল্লাপাল্লা কর, তোর মতো মানুষের জন্যই এতো গুজব ছড়ায়।”
জেরিন নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,
“আব্বু আর কাকা বাসায় নেই, বউকে এখন ঘরে তোলা যাবে না।”
“যা, সর।”
আলিয়ার জেরিনকে সরিয়ে দিয়ে তুবার হাত ধরে ড্রইংরুমে আনে। তারপর তুবাকে ওখানেই দাঁড় করিয়ে দিয়ে আছিয়ার রুমের দিকে চলে যায়।
তুবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। জেরিন দরজা বন্ধ করতে করতে বলে,
“ভাবী, বসে পড়ো। আর বলো তো কি খাবে? চা নাকি কফি?”
“পানি?”
জেরিনের প্রশ্নের ঝটপট জবাব দেয় তুবা।
জেরিন হেসে একগ্লাস পানি এনে তুবার হাতে দেয়। তুবা বসে পানি পান করে।
কিছুক্ষণ পর আলিয়ারের সাথে আছিয়া ও সুলতানা বেরিয়ে আসে। উনাদের দেখেই দাঁড়িয়ে যায় তুবা আর তুবাকে দেখে সুলতানার অবস্থা প্রায় যায় যায়। কারণ তুবা মুখ খুললে উনার সম্মান মাটিতে লুটোপুটি খাবে।
চলবে…..