শেষ বিকেলের রোদ । পর্ব -৩১

“জিনাত এই হলো আমার মা আর মা ও জিনাত।”
মুগ্ধের কথায় জিনাত ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন?”
মুগ্ধের মা এসে জিনাতের পাশে বসে বললেন,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম মা, ভালো আছি আমি।”
মুগ্ধের মা আবারো মুগ্ধের দিকে জিজ্ঞাসুক দৃষ্টিতে তাকায়। মুগ্ধ মাথা চুলকে বলল,
“মা, আসলে জিনাত তোমার সাথে দেখা করতে চাইছিলো।”
এমন কথা শুনে জিনাত মুগ্ধের দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। মুগ্ধের মা মুচকি হেসে জিনাতকে বলে,
“লক্ষ্মী মেয়ে। (একটু থেমে) আচ্ছা, তোমরা বসো আমি নাস্তা নিয়ে আসছি।”
মুগ্ধের মা উঠতে নিলে জিনাত বাধা দিয়ে বলল,
“আন্টি, ব্যস্ত হবেন না। আমি কি দূরের কেউ নাকি?”
জিনাতের মাথায় হাত বুলিয়ে মুগ্ধের মা বলে,
“তবুও প্রথমবার আমাদের বাসায় এসেছো বলে কথা।”
জিনাত মুচকি হাসে। মুগ্ধের মা ভিতরের রুমে চলে যায়। মা যেতেই জিনাত এসে মুগ্ধের বুকে বেধম ঘুষি মারতে থাকে। মুগ্ধ তবুও হেসেই যাচ্ছে।
একপর্যায়ে জিনাতকে টেনে কাছে এনে বলল,
“মেরে ফেলবে নাকি?”
“প্রয়োজনে তাই করবো।”
“কেন?”
জিনাত দুইহাত ধরে বলল।
জিনাত রাগে কিড়মিড়িয়ে বলে,
“আমি আন্টির সাথে দেখা করতে চেয়েছি? মিথ্যা কেন বললে?”
মুগ্ধ মুখ টিপে হাসে। জিনাত আবারো বলল,
“মিথ্যাবাদী।”
জিনাতের কানের কাছে মুগ্ধ মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“আম্মু সত্যটা ধরে ফেলেছে। উনার কাছে আজ পর্যন্ত কোনোকিছুই লুকাতে পারিনি আমি।”
“লাইক সিরিয়াসলি?”
“ইয়াপ।”
“গুড বয়।”
জিনাত সরে গিয়ে আবারো সোফায় বসে পড়ে৷ মুগ্ধ ওর দিকে তাকিয়ে একবার দাঁত কেলায় তো আরেকবার ভেংচি কাটে। জিনাত হাত তুলে চড়ের ইশারা করলে মুগ্ধ ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বসে থাকে।
অন্যদিকে,
আলিয়ার সবার সাথে তুবার পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। তুবা এখনো আধপাগল অবস্থায় আছে। মাথায় কিছুই ঢুকছে না ওর৷ যাকে ও আলিয়ারের মা ভেবেছিলো সে আসলে আলিয়ারের চাচী। কিন্তু আলিয়ারের চাচী ওকে মিথ্যা পরিচয় কেন দিলো?
আলিয়ার ফোনে তাজিমকে জানিয়ে দিয়েছে তুবা ওর সাথে আছে। আছিয়া আলিয়ারকে ডেকে বলে,
“ফ্রেশ হয়ে নে।”
“হুম, যাচ্ছি আম্মু।”
আলিয়ার নিজের রুমে যায় ফ্রেশ হতে।
জেরিন এসে তুবার পাশে বসে বলল,
“কি ভাবছো?”
তুবা চমকে উঠে জেরিনের দিকে তাকিয়ে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে,
“না, মানে বলছিলাম যে আলিয়ারের তোমার বড় ভাই। তা আপন বড় ভাই নাকি কাজিন?”
“কাজিন, কেন?”
“জিনাত কোথায়?”
“ওহ, তুমি আপুকে চেনো।”
কিছুটা লাফিয়ে উঠে জেরিন।
তুবা ওর হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল,
“ভার্সিটিতে দেখা হয়েছিল।”
“আপু, বাসায় নেই।”
তুবা আড়চোখে একবার সুলতানার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমার আম্মু আলিয়ারের চাচী, তাই তো?”
“হুম।”
সুলতানার দিকে ইশারা করে বলে,
“উনিই তো তোমার আম্মু?”
“হ্যাঁ, কিন্তু এসব কেন বারবার জিজ্ঞাসা করছো?”
এমনসময় বাসার কাজের মেয়েটা এসে তুবার সামনে নাস্তা দিয়ে যায়। আছিয়া ওর পিছুপিছু এসেছে। আছিয়াকে দেখে কিছু বলতে যেয়েও চুপ হয়ে যায় তুবা।
আছিয়া এসে জেরিনকে বলল,
“মা, একটু আলিয়ারের রুমে যা তো। ওর রুমটা গোছানো আছে কিনা দেখে আয়।”
“আচ্ছা।”
জেরিন উঠে যাওয়ার সময় আবার ফিরে এসে বলে,
“তুবা আপুকে নিয়ে যাই?”
“না, তুবা এখন নাস্তা করবে, পরে যাবে।”
“পড়ে নাস্তা করবে, এখন আমার সাথে যাবে।”
বলেই জেরিন তুবার হাত ধরে টেনে নিয়ে যায়।
আছিয়া মুচকি হেসে সুলতানাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মেয়েটা আর বড় হলো না।”
সুলতানা শুনেও না শোনার মতো বসে আছে। ওর চিন্তায় শুধুই তুবা, তুবা কেন এখনো চুপ? মনে হচ্ছে ঝড় আসার পূর্বলক্ষণ।
আলিয়ার রুমে ঢুকে জেরিন খাটে বসে তুবাকে ইশারাকে করে পাশে বসার জন্য। তুবা রুমটা ভালো করে দেখছে। একজন ছেলের রুমও এমন সাজানো গোছানো থাকতে পারে তা তুবার জানা ছিল না। থাকবে কি করে, তাজিম তো অনেক এলোমেলো স্বভাবের।
ওয়াশরুমের দরজা খট করে খোলার শব্দে তুবা সেদিকে তাকায়, আলিয়ার তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বের হয়েছে। তুবা অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
আলিয়ার দুজনের দিকে তাকিয়ে জেরিনকে উদ্দেশ্য করে বলে,
“এখানে কি রে, জেরি?”
“তোমার রুম দেখাতে নিয়ে এসেছি।”
আলিয়ার ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল,
“তো কি দেখলো? তাকে ডিপফ্রিজটা দেখিয়ে আন, খুশি হবে।”
তুবা চোখ ছোটছোট করে আলিয়ারের দিকে তাকায়, আলিয়ার মুখ টিপে হাসছে। জেরিনকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“আমি যাই।”
বলেই তাড়াহুড়ো করে জেরিন বেরিয়ে যায়।
তুবা দরজা লাগিয়ে দেয়। আলিয়ার চমকে উঠে বলল,
“আজব তো, দরজা লাগালে কেন?”
তুবা নিজের ওড়না কোমড়ে বাঁধতে বাঁধতে আলিয়ারের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আলিয়ার মুচকি হাসি দিয়ে বলে,
“বিয়ের আগে এসব ঠিক না।”
তুবা তাড়াতাড়ি হেঁটে ওর কাছে এসে গেঞ্জি টেনে কাছে এনে বলল,
“মনে শুধু নেগেটিভ ভাবনা চলে?”
“কেন তুমি পজেটিভ কিছু করবে নাকি?”
তুবা উপর নিচে মাথা নাড়ে। আলিয়ার বলে,
“কি কর…”
কথা শেষ হওয়ার আগেই তুবা আলিয়ারকে বিছানায় বসিয়ে পিঠে ধুমধুম করে কিল দেয়। আলিয়ার “উহ” করে উঠলে তুবা বলে,
“খুব লাগছে?”
“তো লাগবে না? ওগুলো হাত নাকি হাতুড়ি?”
তুবা গাল ফুলিয়ে ওর পাশে বসে পড়ে। আলিয়ার গেঞ্জি টেনেটুনে ঠিক করে তুবার দিকে তাকিয়ে দেখে ও গভীর চিন্তায় মগ্ন।
আলিয়ার ওর সামনে তুড়ি বাজিয়ে বলে,
“কি ভাবছো?”
“আপনার চাচীর কথা।”
আনমনেই বলে ফেলে তুবা।
আলিয়ার জোরে হেসে বলল,
“আমার কথা না ভেবে চাচী আম্মুর কথা ভাবছো কেন, বেড়াল?”
তুবা আলিয়ার বুকে হালকা একটা ধাক্কা দিয়ে বলে,
“আমি মজা করছি না, উনি আপনার চাচী নাকি মা তাই ভাবছি।”
আলিয়ার কপাল কুঁচকে সন্দেহের সুরে বলল,
“মানে?”
মুগ্ধের বাসায়,
জিনাতের সাথে মুগ্ধের বাবারও কথা হয়েছে। শুভ বাসায় নেই, তাই তার সাথে দেখা হয়নি। এখন মুগ্ধের সাথে ছাদে আছে ও।
জিনাত বলে,
“তোমার মনে হচ্ছে আন্টি-আংকেল আমাদের সম্পর্কটা বুঝতে পেরেছে?”
“হুম, উনারা কি বাচ্চা নাকি?”
“যদি না বুঝে থাকে?”
মুগ্ধ জিনাতের দিকে এগিয়ে এসে ওর দিকে ঝুঁকে বলল,
“আব্বু-আম্মুরও লাভ ম্যারেজ, সুতরাং না বোঝার প্রশ্নই উঠে না।”
জিনাত নিচের ঠোঁট উল্টে মাথা নেড়ে বলে,
“তবে তো আন্টি-আংকেল বেশ রোমান্টিক।”
মুগ্ধ ফিক করে হেসে সরে যায়। রেলিং এর হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জিনাতের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তা তোআমি জানি না।”
“কিন্তু আমি জানি।”
মুগ্ধ হেসে বলল,
“কিভাবে?”
জিনাত মুগ্ধের কাছে এসে বলে,
“ছেলে যা রোমান্টিক তাতেই বোঝা যায়।”
মুগ্ধ ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে থেকে জোরে হেসে দেয়, জিনাতও হেসে দেয়। হঠাৎ জিনাত মুগ্ধকে জড়িয়ে ধরে, মুগ্ধ প্রথমে চমকে উঠলেও পরে নিজেও জড়িয়ে ধরে।
অন্যদিকে,
আলিয়ারকে পুরো ঘটনা জানিয়ে দিয়েছে তুবা। একলাইন বাড়ায়নি বা কমায়নি, পাই টু পাই সবটাই বলেছে। আলিয়ারের চিন্তাভাবনা সবকিছুতে মিথ্যা করে সুলতানার এমন নিকৃষ্ট কাজ মেনে নেয়া খুবই কঠিন। আলিয়ার ধরেই নিয়েছিল সুলতানা ভালো হয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তন আসছে তার মধ্যে। কিন্তু সে ভুলে গেছিলো পরিবর্তন আসতে হলে ভালো মন মানসিকতার প্রয়োজন, যা সুলতানার নেই।
তুবার কথা শেষে পুরো রুমে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে। আলিয়ারের ইচ্ছে করছে পুরো রুমে ভয়ংকর ভাঙচুর করতে কিন্তু এসব করে আদৌ কোনো লাভ নেই।
তুবা একটানে কাছে এনে আলিয়ার বলে,
“সেদিন কেন বলোনি?”
তুবা মাথানিচু করে ফেলে। আলিয়ার ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ থাকা আমার উত্তর না।”
তুবা আমতাআমতা করে বলে,
“আ…আসলে, আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
তুবা সরে দূরে গিয়ে বসে। আলিয়ার এখনো রাগে গিড়গিড় করছে। বিছানার চাদর খামচে ধরে জোরে টানছে, কিছুতেই রাগ কমছে না ওর। আলিয়ারের অবস্থা দেখে তুবা খুব ভয় পাচ্ছে।
তুবা বলে,
“একটা কথা বলি?”
আলিয়ার তুবার দিকে তাকালে তুবা একটা ঢোক গিলে বলল,
“আমাকে সত্যি বিয়ে করতে চান?”
আলিয়ার এগিয়ে এসে তুবাকে দাঁড় করিয়ে বলে,
“সন্দেহ করছো? বিশ্বাস করতে পারছো না?”
“আলি, আমি সেরকম কিছুই বুঝাইনি। আসলে আপনার খারাপ সময়ে আমি তো পাশে থাকিনি, তবে আমাকেই কেন?”
“ভালোবাসি তাই, এরচেয়ে বেশি কিছুই বলতে চাই না।”
“সেদিন যে বললেন জিনাত আপনার পাশে ছিল।”
আলিয়ার তুবাকে আরেকটু কাছে টেনে বলে,
“কি বলতে চাচ্ছো? প্রচন্ড রাগে সেদিন ওই কথাগুলো বলেছিলাম।”
“আমার উপর রাগ ছিল?”
“হ্যাঁ, ছিল আর এখনো আছে। কেন করো এতো লুকোচুরি?”
তুবাকে ছেড়ে আলিয়ার বেরিয়ে যেতে নিলে তুবা ওকে বাধা দিয়ে বলল,
“আজ কোনো ঝামেলা করবেন না, প্লিজ। কাল বা পরশু আমি চাচীকে আলাদা করে কোথাও ডেকে কথা বলবো। উনি যখন নিজ মুখে সবটা বলবে তখনই না হয় জিনাত শুনবে।”
আলিয়ার একটু ভেবে বলে,
“পুরোটা খুলে বলো তো।”
“বলছি, শান্ত হয়ে এখানে বসুন।”
চলবে…..