অতঃপর ভালোবাসা । পর্ব -১৫

আবরার দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ মিনিট যাবত মেঘার বাসার সামনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষারত।
কিছুক্ষণ পরপর হাতে পড়া বেল্টের ঘড়ির দিকে নজর বুলোচ্ছে।
অন্য হাতে ট্যাব নিয়ে কাজে মন রাখার চেষ্টা করছে।
ঘড়ির কাটা যতই কাপুনি দিয়ে এগোচ্ছে ততই ফ্লাইটের টাইম ঘনিয়ে আসছে।
বিরক্তি আর তীব্র মেজাজে হাসফাস করছে আবরারের শরীর।
মনের মধ্যে ঝুড়ি ঝুড়ি কটাক্ষপাত করছে সে মেঘাকে।
.
—” আগে ভাবতাম এই খালাম্মার মাথার এন্টেনা লুজ,নেটোয়ার্ক ঝিরঝির করে মাঝে মাঝে।
এখন তো মনে হচ্ছে ওনার রেডি হওয়ার স্পিডও লুজ।
স্লো মোশন খালাম্মা জানি কোথাকার।
চাচ্ছেন টা কি উনি?
.
মেঘা ঠিক কি করতে চাইছেন এমন প্রসঙ্গের প্রশ্ন মাথায় খেলতেই আবরার ভাবে
.
–“উনি কি চাইছেন, ইচ্ছেকৃত দেরী করবেন?
তারপর ফ্লাইট মিস হয়ে যাক, আমার মিটিং মিস হবে, প্রজেক্ট হাত ছাড়া হয়ে যাবে। লোকজন আমার দিকে আঙুল তুলে বলবে
–” আবরার আহমেদ তার লো স্পিডের এসিসটেন্টের জন্য ব্যবসায় লস খেয়েছে”
.
আর ম্যাডাম জিহানের সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে লাঞ্চ করবেন?
নো নো নো তা হবে না।
জাস্ট ওয়েট & ওয়াচ। করাচ্ছি আমি আপনাকে জিহানের সাথে লাঞ্চ।
আজ ফ্লাইট মিস হলে আপনাকে যদি এয়ারপোর্টে পুতে না রেখে আসি মেঘা!
তবে আমি ও আবরার আরহান আহমেদ নই।
নামের অর্থেই আমার জয়ের চিহ্ন আর কাজেও।
রাতে মেঘার ফোনে আসা জিহানের মেসেজ গুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
প্রতিহিংসায় চোখ জোড়া বুজে নেয় আবরার
.
—“যেতে তো আপনাকে হবেই কিন্তু সেটা আমার সাথে। জিহানের সাথে নয়।
.
আবরার ভেবেই নিয়েছে
তার বন্ধুর কাছে এখন সে সেকেন্ড অপশন,, মেঘার সাথে দেখা করতে আসার জন্য আবরার একটা এক্সকিউজ মাত্র।
আর এ সব কিছুর জন্য আবরারের চোখে শুধু মেঘা-ই দায়ী।
.
—“কি ভেবেছিলেন জিহানকে হাত করে আমায় হারিয়ে দেবেন?
আমার বন্ধু আমায় রেখে আপনাকে সাপোর্ট করে যাবে আমার বিরুদ্ধে জিতিয়ে দেয়ার জন্য?
তা তো আর হচ্ছে না মিস মেঘা।
আপনি আমার কাছে প্রতিনিয়ত হারবেন।
আমাকে চড় মারা এবং সাথে যত অপমান করেছেন কিছুই ভুলিনি। সব উশুল করব তবেই আবরার নামক পিঞ্জিরা থেকে ছুটি পাবেন আপনি। তার আগে নয়।
ভ্রু কুচকে অজান্তেই মত পাল্টায় আবরার
–“নাহ তারপরও মুক্তি মিলবে না তোমার মেঘাদ্রি।
আজীবন তোমাকে আমার ছায়ার খাচায় আটকে থাকতে হবে।
.
আবরারের ফর্সা চেহারায় মুহুর্তেই রক্তরাঙা ছাপ ফুটে উঠছে।
ট্যাবটা পাশে ছুড়ে ফেলে সিটে মাথা এলিয়ে দম ছাড়ে।
অফিসে মেঘার সাথে জিহানের পাশাপাশি এটেসেটে দাড়িয়ে থাকা,ওদের ঠোটের কোনে আনন্দ-আমেজের উচ্ছ্বাস আবরারের স্মৃতিতে জেগে উঠল আবার।
মনের কোনায় বারবার উকি দিচ্ছে সন্দেহ।
.
—” কেন সহ্য হচ্ছে না আমার মেঘার সাথে জিহানকে?
প্রতিশোধের নেশায় ডুবেছি নাকি মনের সন্দেহের নেশায়?
কেন ওদের ঘনিষ্ঠতা আমার শিরায় শিরায় যন্ত্রনার বিষ ছড়াচ্ছে?
জিহান আমার থেকে বিষয়টা লুকিয়েছে বলে?
নাকি আমি এ বিষয়টা কে ই সহ্য করতে পারছি না?
কোনটা??
.
গাড়িতে এসি চললেও মনের দুশ্চিন্তায় ঘামছে আবরার।
গায়ের থেকে ডার্ক ব্লু ব্লেজার টা খুলে পাশে রাখে।
সাদা শার্টের দু হাতা ফোল্ড করে কনুই অবধি গুটায়। বুকের ওপর দুটো বোতাম খুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।
ঠান্ডা আবহাওয়ার প্রকৃতিতে নিস্তব্দতা ভরপুর।
থমথমে শান্ত পরিবেশ জানান দিয়ে যাচ্ছে খুব শীঘ্রই ঝড় হবে।
তাই আজকের মধ্যে কাজ শেষ করে দ্রুত ফিরতে চাইছে আবরার।
কিন্তু মেঘা নামক ঝড় সামলাতে গিয়ে তার প্রজেক্ট না লন্ডভন্ড হয়ে যায় সেই চিন্তায় আবরার চিন্তিত। মেঘাকে সাইজ করতে গিয়ে নিজেই কিনা নিজের পায়ে কুড়াল মেরে বসে।
আবরারকে গাড়ি থেকে বের হতে দেখে ড্রাইভার ফিরোজও বের হয়ে আসে।
আবরারের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
.
–” স্যার কিছু মনে করবেন না,দয়া করে ম্যাম কে একটু জলদি আসতে বলুন।
নয়তো সময় মতো পৌছে দিতে পারব না।
তার ওপর রাস্তায় জ্যাম
স্যার আপনার কিন্তু ফ্লাইট মিস হতে পারে ।”
.
ফিরোজ তো ভুল কিছুই বলে নি।
দেখছি বলে ক্ষীপ্ত মেজাজে আবারো ঘড়ির দিকে তাকালো।
গাড়ির সাথে ঠেস দিয়ে আবার মেঘাকে ফোন দিতে লাগল
মেঘাকে ফোন দিতে দিতে ফিরোজের দিকে চোখ পড়ে তার।
রসগোল্লার মত চোখ নিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আবরার কান থেকে ফোন নামিয়ে ফিরোজের দৃষ্টি বরাবর তাকায়।
.
“অফহোয়াইট কালারের ফরমাল ড্রেসে ওদের দিকেই এগিয়ে আসছে মেঘা।
পায়ে এক জোড়া পেনসিল হিল,
এক হাতে দুটো ফাইল,অন্য হাতে ছোট একটা পার্স।
দীর্ঘ টানা টানা চুলগুলো পনিটেইল করে বেধে কাধের এক পাশে ফেলে রেখেছে।”
.
হতবাক হয় আবরার।
মেঘাকে প্রথমবার ওয়েস্টার্ন গেট আপে দেখল।
এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছে,
সে তার এসিসটেন্ট কে নিয়ে কোনো মিটিং এ যাচ্ছে না। বরং কোনো লেডি বিজনেস পার্টনার যাচ্ছে তার সাথে।
.
সোজা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে
মেঘা আবরারের সামনে দাড়িয়ে আঙুল দিয়ে তুড়ি বাজায়।
আচমকা তুড়ির শব্দে ঘোর কাটে আবরারের।
.
মেঘা ভ্রু কুচকে পেছন ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
.
–“আমাদের বাসার গেটে কয়টা গ্রিল দেয়া তা গোনা শেষ হয়েছে?
শেষ হলে চলুন এবার।”
.
একদিকে পয়তাল্লিশ মিনিটের বেশি সময় ধরে আবরারকে অপেক্ষা করিয়েছে তার ওপর এসেই আজগুবি ডায়লগ শুনিয়ে দিলো।
রেগেমেগে মেঘাকে জিজ্ঞেস করল,
.
–” সামান্য সং এর মতো রেডি হতে আপনার এতক্ষন লাগে?
আবরার আহমেদকে অপেক্ষায় রাখার ফল ভালো হবে না মিস মেঘা।
আর হোয়াট রাবিশ?
আপনাদের গেটের গ্রিল গুনবো কেন আমি?”
.
মেঘা জোর খাটিয়ে হাসি এনে বলে,
.
–” আপনি আর আপনার ড্রাইভার যেভাবে তাকিয়ে ছিলেন আমি তো ভাবলাম সেটাই আপনাদের কর্ম।
আর যাই হোক অফিশিয়াল মিটিং এ এসিস্ট করতে যাচ্ছি আপনাকে।
ফরমাল ড্রেসেই তো আসা উচিত তাই না?
মনে তো হয় ‘ক্লাস ফাইভ’ পাসও করেন নি।
নাহলে ‘ফরমাল স্যুট’ কে ‘সং’ বললেন কিভাবে ভাবতেই অবাক লাগে আমার!!
কি যুগ আইলোরে!!
.
–আরেকটা কথা আমি চাই না আমায় দেখে কেউ বলুক আমি একটা ছোকড়া টাইপ বসের এসিসটেন্ট। “
.
আবরার নিজের পা থেকে ওপর অবধি গেট আপে চোখ বুলিয়ে বলে উঠল,
.
–“আমায় দেখে আপনার ছোকড়া টাইপ মনে হয়?
.
মেঘা দাত কেলিয়ে হাসে,
.
–” নয়ত আবার কি? ভাবেন টা কি নিজেকে বুইড়্যা খাটাশ??”
.
আবরার এর ফিটনেস, হ্যান্ডসাম লুুকিং এর জন্য যেখানে মেয়েরা কারনে-অকারনে ক্রাশ খেয়ে বেহুশ
সেখানে মেঘা তাকে ছোকড়া আর বুইড়্যা খাটাশ ট্যাগ ঠুকে দিল।
মেজাজ দেখিয়ে তেড়ে উঠল আবরার
.
—” আপনি নিজেকে কি ভাবেন ?
দেখে তো মনে তো হচ্ছে একটা দেশী কালবৈশাখির মধ্যে বিদেশী টর্নেডো।”
.
মেঘা নাক ছিটকে পাল্টা জবাব দেয়
.
—” কালবৈশাখের সাথে টর্নেডো মিক্সড করতে আসছে আবরার অশিক্ষিত আহমেদ”
ত্যাড়া ত্যাড়া কথা শুনিয়ে গাড়িতে বসে পড়ে মেঘা।
গায়ের জোরে ধপ করে আটকে দেয় দরজাটা।
আবরার বেশ বুঝতে পারছে হাই ডোজে বেশ খানিকটা এফেক্ট পড়েছে মেঘার ওপর।
জিহানের সাথে লাঞ্চের শিডিউল টা পোস্ট পন্ড হওয়ায় আতে ঘা লেগেছে।
.
বিজয়ের খুুশিতে বাকা হাসি দিয়ে আবরার বসে পড়ে গাড়িতে।
ফিরোজ ড্রাইভ করতে নিলে বাধ সাধে মেঘা।
.
–” ফিরোজ ভাই এসি অফ করে গ্লাস খুলে দিন। আমি ন্যাচারাল হাওয়া খাব এবং স্পেশাল পারসনদের জন্য হাওয়া জমিয়ে রাখব যাতে তাদের পরে স্পেশাল ভাবে হাওয়া লাগাতে পারি।”
.
মেঘা ইনডিরেক্টলি খোচা মারায় খেপে যায় আবরার।
ধমক দিয়ে বলে,
.
–” গ্লাস লক কর ফিরোজ। আমার ডাস্ট এলার্জি আছে”
.
মেঘা পাল্টা জোর খাটিয়ে বলল
.
–” ফিরোজ ভাই! আমি বলছি গ্লাস খুলুন।
আমার এসি তে এলার্জি আছে।”
.
মেঘা বিরবিরিয়ে বলে উঠল
.
–” আমার বিষদাত ভাঙ্গার খুব শখ না তোর খাটাশ । দেখ বিষদাতের যন্ত্রনা কেমন লাগে।।”
.
ফিরোজের মাথায় এ নিয়ে দুবার চক্কর মারল।
কোন নৌকোতে পা রাখবে সে?
কিছুক্ষন আগে বাইরে দাড়িয়ে এক দফা রেষারেষি দেখে ফিরোজের মাথা হ্যাং মেরে আছে।
.
একদিকে আবরারের ফ্লাইটে দেরি হচ্ছে অন্যদিকে মেঘার এমন ঘাড়ত্যাড়ামি।
ঝাঝিয়ে উঠল আবরার
.
–” ফিরোজ! এসি এলার্জিক পারসন দের বলে দাও আমার পাশে বসে গ্লাস খোলার পারমিশন নেই কারও।
.
এমন কথাশুনে মেঘা কিছুটা নীরব থেকে গাড়ির দরজা খুলতে নিলে চমকে যায় আবরার।
মনে আশঙ্কা ভর করে –” মেঘা কি বাসায় ফিরে যাচ্ছেন??”
তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন ছুুড়ে
.
–” এ-একি! কোথায় যাচ্ছেন আপনি।”
.
মেঘা ঠোট বাকিয়ে হেসে উত্তর শুনিয়ে দেয়
.
–” আপনার পাশে বসে গ্লাস খোলার তো পারমিশন নেই,
তাই আমি ফিরোজ ভাইয়ের পাশে বসব।
.
–আশা করি আপনার নাকে কোনো ধুলোবালির সুড়সুড়ি নেই তাই না ফিরোজ ভাই??”
এমন সিদ্ধান্তে শক খায় আবরার।
মেঘার এন্টেনায় ডিস্টার্ব করা শুরু করেছে ।
জিহানের পাশেই মেঘাকে সহ্য হচ্ছে না আবরারের।
তার জন্য কুুটিল -জটিল ছক কষতে হল।
আর মেঘা এখন বসবেন ফিরোজের পাশে।
ইমপসিবল!!!!!!
আবিজাবি চিন্তার রেখা কপালে টেনে হাল ছাড়ে আবরার।
.
–” ওকে! যেতে হবে না আপনাকে। ফিরোজ গ্লাস খুলে দাও।”
.
মেঘা এবার বিজয়ের হাসি ঠোটে ফুটিয়ে দরজা আটকে বসে পড়ে।
অন্যদিকে ড্রাইভার ভাবছে
.
–” এনারা গাড়িতে পাশাপাশি এক মুহুর্ত সমঝোতায় থাকতে পারেন না। সিলেট অবধি পথ কিভাবে পাড়ি দেবেন,,আল্লাহ মালুম।”
মিজান সাহেব অফিসের ফ্লোরে একটা একটা করে ফাইল ছুড়ে মারছেন। হন্তদন্ত হয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস গুলো হাতড়ে যাচ্ছেন।
এত খোজাখোজির পরও শূন্য ফলাফলে বসে পড়েন চেয়ারে।
ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছেন মানসিক দুশ্চিন্তায়।
মেঘার মা তার মেয়ের জন্মের আগেই নিজস্ব সমস্ত অর্থ- সম্পত্তি, স্থাবড়-অস্থাবড় সন্তানের জন্য উইল করে রেখেছিলেন।
তিনি চেয়েছিলেন তার অনাগত সন্তানের জন্য উপহারস্বরুপ এতটুুকুু করতে।
আঠারো বছর পূর্ন হলেই মেঘা সেই সম্পত্তি ব্যবহারে যোগ্যতা লাভ করবে।
এত বছর যাবত সেই উইল যত্ন করে আকড়ে রেখেছিলেন মিজান সাহেব।
মায়ের তরফ থেকে মেঘার জন্য রেখে যাওয়া একটাই উপহার ওটা।
মেয়েটি তেইশে পা রেখেছে সবে।
মিজান সাহেব ভেবেছিলেন এখুনি উপযুক্ত সময় মেঘাকে একসাথে সবকিছু বুঝিয়ে পড়িয়ে দেয়ার।
আর কতদিন বন্ধুর অফিসে রেখে দায়িত্ব শেখাবেন মেয়েকে?
বরং নিজের কম্পানির ব্যবসা একটু একটু করে দেখে সামলে নিতে শিখুক।
দুর্ভাগ্য এটাই যে তিনি কোথাও সে উইল এখন খুজে পাচ্ছেন না।
দুুনিয়াদারি একাকার করেছেন কিন্তু পেপারস গুলো লাপাত্তা।
.
আর না ভেবে ব্যক্তিগত ল’ইয়ারকে দ্রুততার সাথে ফোন তুলে কল দেন তিনি।
ওপাশ থেকে বেশ মোটা ভরাট কন্ঠস্বর বলে উঠল,
.
–” জ্বী বলুন স্যার?
.
মিজান সাহেব গলার আর কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন,
.
–” তমাল,
মৈত্রী আমার মেঘার জন্য যে উইল টা করেছিল তার কথা মনে আছে তোমার?
.
ওপাশ থেকে উকিল তমাল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন হঠাৎ এমন কথা শুনে।
ইতস্তত ভাবে বললেন,
.
–“জ-জ-জ্বী স্যার। মনে থাকবে না কেন?
নিশ্চই মনে আছে।”
মিজান সাহেব আক্ষেপের স্বরে বললেন
.
–” সেই উইল কোথাও খুজে পাচ্ছি না তমাল। আমার স্পষ্ট মনে আছে মেঘার বয়স যখন এক মাস তখন তুমি ওগুলো আমার হাতে দিয়েছিলে।
কয়েক বছর আগেও আমার লকারে ছিল উইলটা। এখন গায়েব।খুজে পাচ্ছি না তমাল।কি হবে বলো তো??
মেয়েটাকে যে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম। না পেলে তো মহা ঝামেলা”
.
তমাল কোনোরকম এ প্রশ্ন এড়াতে বলে উঠল,
.
–” স্যার চিন্তা করবেন না। আমি দেখছি কি করা যায়!
মিজান সাহেবের কলটা কেটে দিয়ে সাথে সাথে তমাল অন্য কাউকে ফোন দেয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ওপাশ থেকে কেউ ফোন রিসিভ করলে
তমাল বলে ওঠে,
.
–” ম্যাম! কেলেঙ্কারি হয়ে গিয়েছে। স্যার তো মৈত্রী ম্যামের উইলের খোজ করছেন আমার কাছে। কি জবাব দেব আমি তাকে??
সত্যিটা কি বলে দেব ???”
.
অন্যদিকে,
মিজান সাহেব ফোন রেখে গভীর চিন্তা এটেছেন মনের ভেতরে।
.
–” কোথায় যাবে সেই দলিল?
আমি ছাড়া এ দলিল একমাত্র ব্যবহারের যোগ্য মেঘা। এছাড়া অন্য কারো পক্ষে তো সম্ভব নয়।
তবে কি মেঘা নিয়েছে ?”
এসব ভেবে মাথা ঝাকালেন মিজান সাহেব।
.
–“না না, তা কি করে সম্ভব? আমার মেয়ে সামান্য অফিশিয়াল পেপার দেখলেই নাক ছিটকায়। বন্ধু বান্ধব আড্ডা ছাড়া তো ওর মাথায় এসবের হুশ জ্ঞানও থাকেনা। তাছাড়া ওকে তো কখনও বলাও হয় নি এসব পেপারস এর ব্যাপারে।
তাহলে কোথায় যাবে এ দলিল?????
জানালার সাথে মাথা ঠেকিয়ে এক নাগাড়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে মেঘা।
সময় মতো এয়ারপোর্ট পৌছোনোর প্রচেষ্টায় প্লেনের বেগেই গাড়িকে টানতে চাইছে ফিরোজ।
বাতাসের দাপটে মেঘার স্ট্রেইট চুলগুলো বারবার চোখে মুখে এসে বিরক্ত করছে। আর আঙুুল দিয়ে একটা একটা করে বারবার সরিয়ে দিচ্ছে।
বিষন্ন মনে প্রকৃতিকে জানাতে চাইছে
.
“তোমার মত আমিও নিস্তব্দ, এক ঝাক আগাম ঝড় হাতে নিয়ে বসে আছি।
তোমার আকাশে যেমন মেঘ জমেছে,তেমনি জমেছে আমারো।”
মেঘা বাইরের দৃশ্য উপভোগে ব্যস্ত, অন্যদিকে আবরার ব্যস্ত আড় চোখে মেঘার বিষন্নতার কারন খুজে বেরাতে।
কিছুটা সে ধারনা করেই নিয়েছে জিহানের সাথে লাঞ্চের ডেটিং ক্যান্সেল হওয়ায় মন খারাপের ভুত চড়েছে খালাম্মার ঘাড়ে।
আবরার-মেঘার নীরব মুহুর্তে নাড়া দিয়ে ঘোলাটে করে দিল জিহানের কল।
মেঘার ফোনে জিহানের কল আসতেই ভ্রু কুচকে তাকায় মেঘা।
আবরারের দিকে একবার তাকিয়ে বাকা হেসে রিসিভ করে।
.
–” জ্বী বলুন ডক্টর জিহান।
.
আবরার জিহানের নাম শুনে বিরক্তিতে মুখ চুুপসে নিয়ে কাজে মন দেয়।
.
জিহান হসপিটালের একটা ওয়েটিং সিটের ওপর বসে অভিমানে বলে ওঠে,
.
–ওই শালার গাধা টা কি আপনার পাশে?”
.
বন্ধুকে এমন টাইটেল দেয়ায় অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে মেঘা।
চোখ এড়িয়ে তাকায় আবরারের দিকে।
.
মাথা নিচু করে এক নাগাড়ে ফোন টিপছে আবরার।
ফর্সা গালে ট্রিম করা খোচা খোচা দাড়ির মাঝে একটা স্পষ্ট কালো তিল মেঘার নজরে পড়ে।
অজান্তেই মেঘার চোখ থেমে যায় আবরার দিকে।
ভাবনায় পড়ে যায়
.
–“ওনার নিখুত সৌন্দর্যের সাথে মেন্টালিটি টুকু নিখুত সুন্দর কেন নয়?
.
–“মেঘকন্যা??”
.
ওপাশ থেকে জিহানের আওয়াজে ঘোর কাটে মেঘা
.
—” গাধা টাধা আছে কিনা খেয়াল করিনি।
বাট গাধার মতো দেখতে একটা খাটাশ আপাতত পাশে আছেন।
.
মেঘার কথায় মৃদু হাসে জিহানও।
.
—” ওর যে কি হয়েছে মেঘা বুঝতেই পারছি না। হঠাৎ করে কেমন একটা রেষারেষি দ্বন্দ্ব পাকিয়ে ফেলেছে । এমন টা ও কখনও করেনা আমার সাথে।
এই দেখুন না আপনার সাথে লাঞ্চের কথা শুনে অমনি আপনাকে সাথে নিয়ে লাঞ্চ আওয়ারেই মিটিং ফিক্সড করেছে।
কিন্তু বিশ্বাস করুন ও জীবনেও কাউকে নিয়ে মিটিং এটেন্ড করে না এমনকি তৃনাকে ও না।”
মেঘার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি ভর করেছে ভীষন।
সে চাইছে ভিমবারকে খেপিয়ে আরেকটু মজা নিতে।
মেঘা পাল্টা জবাব দিল
.
–” আহা!! ডক্টর জিহান, আপনি এতো টেনশন করছেন কেন বলুনতো।
মি. আহমেদের মিটিং তো আর ডেইলি ডেইলি আসবে না,তাই না।
আর আমি বিকেলের পর একদম ফ্রি। লাঞ্চ হয়নি তো কি হয়েছে ডিনার হয়ে যাক আগামিকাল।
.
মেঘা আর জিহানের বাতচিতে আবরারের রাগের মাত্রা ধেইধেই করে বাড়ছে।
দাতে দাত চেপে মুখ বুজে বাইরের দিকে তাকায়।
আবরারের ফর্সা চেহারায় লাল আভা দেখেই মেঘা বুঝে যায় কাজ এগোচ্ছে।
আগুনে আরেকটু ঘি ঢালতে চেয়ে মেঘা এক্সট্রা দুটো আবেগী লাইন জিহানকে শুনিয়ে দিল
.
–” জানেন, জিহান! আমি আপনার জন্য একটা গিফট রেখেছি। পুরো রাস্তা প্রাকৃতিক হাওয়ায় ডুবে ছিলাম। সেখান থেকে খানিকটা হাওয়া আপনার জন্য তুলে রেখেছি। কাল ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে না হয় সে হাওয়া টুকু উপহার হিসেবে গ্রহন করবেন।”
মেঘার এত গভীর কথাগুলো জিহানের কানে পৌছোতে হাসিতে ফেটে পড়ে। কিন্তু মেঘাকে প্রতিউত্তর করার সুযোগ জিহান আর পেল না।
তার আগেই আবরার মেঘার হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারে–
চলবে…