প্রেমে পড়া বারণ । পর্ব -০৪

রাগে নিজের মাথার চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে!! ফুস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম,
— এবার যদি আর একটা কথা বলিস,তবে ভূত – পেত্নী না আমি তোর মাথা ভেঙে ফেলবো!!
সারাদিন জার্নি করে এসে একটু ঘুমাবো.. তার উপায় নেই!
খুশবু আর কথা না বলে চুপচাপ চলে গেলো।
.
সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে সবাই বাগানে ঘুরতে বের হলাম। পলাশ মামা আমাদেরকে সব ঘুরিয়ে দেখালেন।
চা গাছগুলো দেখে মনে হয় যেন সবুজ মখমলের চাদর পেতে রেখেছে কেউ!
উফফ… এতো সুন্দর কেন?
এই সুন্দর যদি গিলে নেয়া যেতো..! গপাগপ গিলে নিতাম।
যদি খোঁপায় গোঁজা যেতো…
গুঁজে নিতাম!
চা পাতায় হালকা শিশির শীতের আগমন জানান দিচ্ছে।
সবাই ঘুরাঘুরি করছি,ছবি তুলছি। কিভাবে চা পাতা তুলতে হয় বাগানে যারা কাজ করে তাদের কাছ থেকে শিখলাম। কি সুন্দর করে মাথায় ঝুড়ি আটকিয়ে তারা দু’হাতে পাতা তুলে নিচ্ছে। আমরাও ঝুড়ি মাথায় নিয়ে চেষ্টা করলাম।।
দেখতে যতটা সোজা মনে হয়, ততটা সহজ না। ঝুড়ির ব্যালেন্স রেখে পাতা তুলে নেয়া অনেক কষ্টের!
ঘুরাঘুরি করে লাঞ্চের আগে সবাই বাংলোয় ফিরে আসলাম।
.
শুনেছি এখানে অনেক পুরানো একটা জমিদার বাড়ি আছে। আগের দিনে জমিদারের প্রাচুর্যের নিদর্শন এই বাড়ি, কিন্তু এখন অযত্নে অবহেলায় বাগানের একপাশে কোথাও পড়ে আছে।
লাঞ্চের পরে সবাই রেস্ট নিচ্ছে। কখন ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতে পারিনি।
ঘুম থেকে উঠে দেখি তাহসিন আনিষা হাওয়া। মানে ওরা ঘুরতে বেরিয়েছে।খুশবু, রিফাত, দিয়া,অনি ওরাও বাংলোর সামনে ঘুরাঘুরি করছে।
তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আসলাম ওদের সাথে বের হবো।
এসে দেখি ওরা নেই।
ফোন করলাম,
— অনি, তোরা কোথায় ? একটু আগে দেখলাম সামনে এখন তোদের পাচ্ছি না!
— আমরা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছি।
— রোহান কই?
— ও তো রুমে ঘুমাচ্ছে।
— ঠিক আছে। যা তোরা।
রোহানের রুমে গিয়ে দেখি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে।
— রোহান… রোহান! এই রোহান… উঠ তাড়াতাড়ি।
ডেকেই যাচ্ছি কিন্তু রোহানের খবর নেই!
শেষ পর্যন্ত ধাক্কা দিলাম
— এই রোহান.. অই.. ধুর!
রোহান… উঠ না! রোহান… রোহান…
— কি হয়েছে?
— উঠ.. সবাই বেরিয়ে গেছে। আমি কার সাথে যাবো?
— বের হতে হবে না। ঘুমা।
রোহানের ঘুমঘুম ভয়েস শুনে ভেতরটা মুচড়ে উঠলো।
এই ঘুমঘুম ভয়েস…. ঘোর লাগানোর মতো কিছু একটা।
— অই উঠ!
আরেকটু জোরের ধাক্কা দিলাম।
রোহান খপ করে হাত টেনে পাশ ফিরে শুয়েছে।
হুট করে হাতে টান খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে রোহানের উপরে পড়ে গেলাম।।
রোহান উঠার চেষ্টা করতেই ওর ওপাশে গিয়ে পড়লাম।
আমি বা রোহান কেউই প্রস্তুত ছিলাম না এমন একটা ঘটনার জন্য।
রোহান আমার বন্ধু, কোনো কিছুর জন্য সংকোচ করিনি কখনো। কিন্তু আজ…. রোহান এভাবে হাত ধরবে আর এভাবে পড়ে যাবো….
না পারছি আমি উঠতে, না পারছে রোহান উঠতে। দুজনেই চেষ্টা করছি কিন্তু কেউ সোজা হয়ে বসতেও পারছি না।
রোহানের বুকের কাছে আমার মাথা, ওর শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছি আমি।
এতে আমার অস্বস্তি আরও বেড়ে গেছে।
আমাকে বিব্রত হতে দেখে রোহান বললো,
— হাত পা আর ছোড়াছুড়ি করিস না। আমার নাক ফাঁটিয়ে দিয়েছিস। চুপ করে থাক,উঠতে দে আমাকে।
আমি বারবার উঠার চেষ্টা করতে গিয়ে আমার হাত রোহানের নাকে বেশ জোরেই লেগেছে।
কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম। রোহান এবার উঠে গিয়ে বিছানার নিচে চলে গেছে। পরিবেশ আর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য রোহান বললো,
— তোর কি সমস্যা হে? আমার নাক,পিঠ ভেঙে দিয়েছিস! ওহহ..
রোহান হাত দিয়ে নিজের হাতে পিঠে মালিশ করছে। আবার নাকেও হাত দিচ্ছে।
আমিও তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,
— আমার সমস্যা? গাধার মতো পড়ে ঘুমাচ্ছিস,ডাকতে এলাম আর তুইই তো ফেলে দিলি!
— আমি কি জানতাম নাকি তুই ডেকেছিস! আর আমি ফেলেছি? তুই ইচ্ছে করে পড়েছিস। হাতি একটা!
— উহহ!
আমার কি ঠেকা পড়ছে তোর উপরে ইচ্ছে করে পড়ার? আসছে আমার শাহরুখ!!
তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে,সবাই বেরিয়ে গেছে, আমি একা যেতে পারছি না।
— আচ্ছা তুই যা, আমি আসছি।
.
রোহানের সাথে অন্যদিন হলে অনেক বড় ঝগড়া বেঁধে যেতো। কিন্তু আজ অস্বস্তি হচ্ছে, তাই আর কথা বাড়াইনি।
আমি আর রোহান একসঙ্গে বের হলাম। সেখানে তাহসিন আনিষার সাথে দেখা হয়ে গেছে। চারজন এক সাথে ঘুরছি,তখন অনির ফোন আসলো।
— কইরে তোরা?
— বাগানেই, তোদের তো দেখতে পাচ্ছি না।
— আমরা ফ্যাক্টরির কাছে। এখানে চলে আয়।
পুরনো জমিদার বাড়িতে যাবো। মামা একজন গাইড দিয়েছেন আমাদের সাথে।
— ভেরি গুড! ওয়েট কর। আমরা আসছি।
রোহান জিজ্ঞেস করলো,
— কি বলেছে অনি?
— ওরা অপেক্ষা করছে,একজন গাইড আমাদের জমিদার বাড়ি দেখাতে নিয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চল।
আমরা দ্রুত ফ্যাক্টরিতে পৌঁছে গেলাম।
বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।
গাইড আমাদের তাড়া দিচ্ছে দ্রুত হাঁটতে। এমন সময় সেখানে যেতে ইচ্ছুক না উনি,তবুও অনির জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়ে রাজি হলেও বেশ বিরক্ত হয়েছেন।
.
জমিদার বাড়ি কাছাকাছি যাবার পরে দেখলাম একটা লোক, অদ্ভুত ভাবে তাঁকিয়ে আছে আমার দিকে!
আমি সবার পিছনে পড়ে গেছি। কোথাও ঘুরতে গেলে চারিদিকে ভালো করে দেখতে দেখতে যাই,তাই সবার পিছনে পড়ি। এটাই আমার অভ্যাস।
রোহান আমার সামনে। একটু পরপর ও তাড়া দেয়, তখন দৌড়ে ওদের সাথে যাই।
লোকটার অদ্ভুত ভাবে তাঁকিয়ে থাকা আমার ভালো লাগেনি।
আমি রোহানের কাছে গিয়ে ওর হাত ধরি। রোহান নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলো আমার হাত।
— দেখ, লোকটা কিভাবে তাঁকিয়ে আছে!
রোহান লোকটার দিকে তাঁকায়।
— লোকটা এমন অদ্ভুত! পাগল টাগল হবে হয়তো।।
ওদিকে দেখতে হবে না তাড়াতাড়ি চল।
জমিদার বাড়ি যখন পৌঁছালাম, তখন শেষ বিকেল।
বাড়িটাই শুধু আছে। চারপাশে অনেক বড় বড় গাছপালা।
তবে ঝোঁপঝাড় কিছুটা কম,মনে হচ্ছে কিছুদিন আগে কিছু ঝোঁপঝাড় কাটা হয়েছে।
দেয়ালে শেওলা পড়তে পড়তে আর কিছু দেখা যায় না।
দু-তলা বাড়িটা ঘুরে দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে।
.
খুশবু হিয়ার হাত ছাড়ছেই না। এমনিতেই ভীতুর ডিম,তার উপর এমন নীরব, অন্ধকারাচ্ছন্ন পুরনো জমিদার বাড়িতে এসে খুশবুর ঘাম ছুটে গেছে।
আমার মনে হয় ও কোনো কিছুই দেখেনি। শুধু হিয়ার হাত ঠিকঠাক ধরে আছে কিবনা আর গাইড কোন দিকে যাচ্ছে সেটাই দেখছে।
গাইড তাড়া দেয়ায় সবাই নিচে নেমে যাচ্ছে । আমি সবার পিছনে ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন এপাশ থেকে ওপাশে গেছে।
কাউকে দেখতে পাইছি,তবে একটা ছায়ার মতো মনে হলো।
চমকে তাঁকাতেই দেখি বাদুড় উড়ে গেছে।
সত্যি বলতে প্রথমে ভয় পেয়ে ছিলাম। বাদুড় দেখে স্বস্তি হলো। এই শতবর্ষী পুরনো ভাঙা বাড়িতে বাদুড়, পোকামাকড়, সাপ এগুলো থাকাই স্বাভাবিক।
এদিকে দিনের আলো ফিকে হয় অন্ধকার ভাব চলে এসেছে।
দ্রুত ফেরা দরকার। আর আমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছি।
রোহান আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার উপরে এসে জিজ্ঞেস করলো,
— দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যাবি না?
— চল।
— কি দেখছিস?
— কিছু না, একটা বাদুড় উড়ে গেলো।
— ভয় পেয়েছিস?
— না। দেখলাম কি উড়ে গেলো!
আমি যদি বলি কোনো ছায়া দেখেছি, তবে রোহান এটা নিয়ে আমাকে সব সময় পচাবে।
সেই ভয়ে আর কিছু বললাম না।
রিফাত আর অনি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে ছিলো । ওদের ব্যাগে টর্চ আছে। গাইডের কাছেও ছিলো একটা লাইট।।
এই তিন টর্চ লাইট দিয়ে আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম।।
.
রাতের খাবার পরে সবাই বারান্দায় এসে বসলাম। এতো সুন্দর পূর্নিমার আলো! সবকিছু যেন ভেসে যাচ্ছে রূপালী আলোয়।
এমন উপচে পড়া জোছনায় বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছি সাথে চা বাগানের স্পেশাল চা।।
রোহান গিটারে টংটাং করছে।
পলাশ মামা বললেন,
— কি টুংটাং করছো! একটা গান শোনাও তো।
— ঠিক বলেছেন মামা।
সবাই মামাকে সাপোর্ট দিলো।
হিয়া মাঝখানে বলে উঠে,
— এভাবে না। অপেক্ষা করো আমি আসছি।
হিয়া দৌড়ে ভেতরে যায়। কিছু সময় পরে কিছু কাগজের টুকরো নিয়ে ফিরে আসে।
— এসে গেছি.. এসে গেছি…
এভাবে কোনো মজা নেই। প্রথমে একজন একটা কাগজ তুলবে, সেখানে যা লেখা থাকবে তাকে সেটাই করতে হবে।
— ইয়েস! এইবার জমেছে। এই মেয়ের মাথায় বুদ্ধি আছে।
পলাশ মামা খুব খুশি হলেন। উনি অনেক মিশুক আর আমুদে লোক।
প্রথমে অনির পালা অনি মূকাভিনয় করে দেখালো;যদিও আমরা কিছুই বুঝিনি।
অনি হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলো।
তারপর খুশবু… আবৃত্তি করলো । ভীষণ ভালো আবৃত্তি করে খুশবু।
এভাবে প্রত্যেকের কাছে যাচ্ছে কাগজের টুকরো। পলাশ মামা পাগলের অভিনয় করলো। হিয়া নাচলো। বাকি শুধু আমি আর রোহান।
পাজি হিয়া আর কি কি লিখেছে জানি না। আমার কাছে এলো প্রপোজ করার কাগজ! ভালোবাসার মানুষকে কিভাবে প্রপোজ করবো!! জীবনেও কাউকে প্রপোজ করিনি, কিভাবে করবো এত্তগুলা মানুষের সামনে! অনেক ভেবে ফিল্মি স্টাইলে একটু ডিফারেন্ট ভাবে প্রপোজের অভিনয় করে ফেললাম।
সবাই আমার প্রপোজ স্টাইল দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি!
.
সব শেষে এলো রোহানের পালা। ওর রাজ কপাল! ঘুরেফিরে গানই পড়লো।
রোহান একটু ভেবে গান ধরলো –
* ………….. …………….*
এখন অনেক রাত
তোমার কাঁধে আমার নিঃশ্বাস,
আমি বেঁচে আছি তোমার ভালোবাসায়!
ছুঁয়ে দিলে হাত,
আমার বৃদ্ধ বুকে তোমার মাথা চেঁপে ধরে টলছি কেমন নেশায়!
কেনো যে অসংকোচে অন্ধ গানের কলি
পাখার ব্লেড-এর তালে সোজাসুজি কথা বলি!
আমি ভাবতে পারিনি, তুমি বুকের ভেতর ফাঁটছো,
আমার শরীর জুড়ে তোমার প্রেমের বীজ!
আমি থামতে পারিনি, তোমার গালে নরম দুঃখ,
আমায় দুহাত দিয়ে মুছতে দিও প্লিজ!
তোমার গানের সুর
আমার পকেট ভরা সত্যি মিথ্যে রেখে দিলাম
তোমার ব্যাগ-এর নীলে |
জানি তর্কে বহুদূর
তাও আমায় তুমি আঁকড়ে ধরো,
আমার ভেতর বাড়ছো তিলে তিলে!
কেনো যে অসংকোচে অন্ধ গানের কলি
পাখার ব্লেড-এর তালে সোজাসুজি কথা বলি!
আমি ভাবতে পারিনি, তুমি বুকের ভেতর ফাঁটছো,
আমার…
এখন অনেক রাত…. তোমার কাঁধে আমার নিঃশ্বাস….।।
………………
রোহান কেনো এই গান গাইছে জানি না,কিন্তু গানটা শুনে আমার বিকালের কথা মনে পড়ে গেলো।
রোহানের শরীরের ঘ্রাণ আমি পেয়ে ছিলাম। ওর বুকে- কাঁধে আমার নিঃশ্বাস পড়ে ছিলো! ওর নিঃশ্বাস আমার চুল ছুঁয়ে গেছে!
আমি এসব কেনো ভাবছি?
ভেতরে একটা তোলপাড় শুরু হয়েছে।
.
রোহান আমার বন্ধু। ছেলেবেলার বন্ধু। বন্ধুর বাইরে কোনো দিন ওকে নিয়ে কিচ্ছু ভাবিনি। কখনো মনে হয়নি,ও একটা ছেলে, আমি একটা মেয়ে!
কেবল জানতাম আমি ওর বন্ধু,ও আমার বন্ধু।
সবচেয়ে ভালো বন্ধু, যাকে বেস্ট ফ্রেন্ড বলে।
কিন্তু আজ কেনো জানি সব এলোমেলো লাগছে!
.
রাত প্রায় বারোটা।
সবাই নিজের রুমে চলে গেছে।সারাদিনের ক্লান্তিতে খুশবু শোবার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমে তলিয়ে গেছে। আমার চোখে ঘুম আসছে না। ভেতরে অস্থির অস্থির লাগছে। রোহানের কথা মনে পড়ছে বারবার। ওর সাথে কাটানো সময় গুলো নতুন করে ভাবাচ্ছে।
হঠাৎ মনে হলো কোথাও মিউজিক বাজছে। আস্তে আস্তে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, মিউজিক না,কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে।
অদ্ভুত সুন্দর, করুন সুর। এক মুহূর্তের জন্য ভেতরটা খা খা করে উঠলো।
কি নিদারুণ শূন্যতা এই সুরে।
আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলাম না। সুরটা কাছে আসছে.. আরও কাছে….
মনে হয় বাংলোর পাশে দিয়ে কেউ বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছে।
জানালার কাছে এসে পর্দা সরিয়ে দেখার চেষ্টা করছি। বাঁধ ভাঙা জোছনায় যতদুর দেখা যায়, সব নীরব, ফাঁকা। কেউ নেই।
তবুও শুনতে পাচ্ছি বাঁশি।
.
দেখলাম কেউ একজন বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে বাগানের ভেতরের রাস্তায়। এমনিতেই এখানে কাউকে চিনি না, আর লোকটাকে পিছনে থেকে দেখেছি।
হয়তো বাগানের কোনো ছেলে হবে, রাতে বাঁশি বাজিয়ে বাড়ি ফিরছে।
তবে মানতেই হবে দারুণ সুর। ঘোর লাগানোর মতো।
বিছানায় ফিরে আসলাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে।।
.
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেছে। গড়াগড়ি করতে করতে আর ভালো লাগছে না। উঠে ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় আসলাম।
সবাই তখনও ঘুমে।
আধার কেটে দিনের আলো ফুঁটেছে সবে।
ঘাসের উপর হালকা শিশির।
ভাবলাম বাংলোর সামনে একটু ঘুরে আসি।
এতো সুন্দর সকাল মিস করা যায় না।
ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বাংলোর চারদিকে চা গাছ দিয়ে বিভিন্ন ডিজাইন করা। বাংলোয় ঢোকার রাস্তার দু’পাশেও চা গাছের সারি। সকাল বেলায় এসবকিছুর সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে গেছে।
সকালের স্নিগ্ধ প্রকৃতির কয়েকটি ছবি নিয়ে নিলাম।
বাংলোর সামনে একটা ছোট টিলার মতো আছে। সেখানে একবার গিয়ে ছিলাম সবার সাথে। উপরে পরিষ্কার, কয়েকটা বড় বড় গাছ আছে। এই জায়গাটা আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। একেবারে মনের মতো। উপরে থেকে বাংলোর আশেপাশে খুব ভালো করে দেখা যায়।
আর তারচেয়ে ভালো লেগেছে, ওখানে ৪-৫ টা শিউলি ফুলের গাছ আছে। হেমন্তের মাঝামাঝি হালকা শিশির ভেজা ঘাসে টিলার উপরে আর নিচের দিকে ৪-৫ টা গাছের ফুল বিছিয়ে পড়ে থাকে ; সেই দৃশ্য একবার দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।
সেদিকে যাবো বলে পা বাড়াতেই চোখে পড়লো একটা মেয়ে হাতে একটা ছোট ঝুড়ি নিয়ে উপরে টিলার দিকে যাচ্ছে।
লাল পেড়ে সবুজ শাড়ি মেয়েটার গায়ে। খোলা চুল।
.
এতো সকালে মেয়েটাকে দেখে একটু অবাক হলাম। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি মেয়েটা গুনগুন করে ফুল কুড়াচ্ছে।
দৃশ্যটা মনে লেগেছে, ঝটপট কয়েকটা ছবি নিলাম।
তারপর মেয়েটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মেয়েটার মুখ এখনো দেখতে পাইনি।
কি বলে কথা শুরু করবো বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম,
— তুমি ফুল কুড়াতে এসেছো?
এবার মেয়েটা আমার দিকে ফিরলো।
এতো মায়াবী মুখ!! অবাক হয়ে দেখছি মেয়েটাকে। এ কালো বললে ভুল হবে, চরম ভুল!!
দুধ সাদাও বলা যাবে না।
চাপা শ্যামলা রঙ, চোখ দুটো যেন হরিণের চোখ!
গায়ের রঙ শ্যাম বলেই মেয়েটাকে এতো মায়াবী লাগছে।
যদি ছেলে হতাম! হয়তো প্রথম দেখায় মেয়েটার প্রেমে পড়ে যেতাম।
ওর বয়স কত হবে? ১৬-১৭!
মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাঁকিয়েই আছে। কয়েক সেকেন্ড মনে হয় ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঘোর কাটতেই খেয়াল হলো, আবার জিজ্ঞেস করলাম,
— ফুল কুড়াতে এসেছো?
মেয়েটা একটু মুচকি হেসে মাথা নাড়ায়।
— আমিও কুড়াই তোমার সাথে?
মেয়েটা আবার মাথা নাড়ায়, মুখে কিছু বললো না।
আমি ফুল কুড়াচ্ছি ওর সাথে। কুড়ানোর সময় আবার জিজ্ঞেস করলাম, যদি কথা বলে!
— তোমার বাড়ি কি এখানে?
মেয়েটা আবার মাথা নাড়ায়, তারপর হাতের আঙুল দিয়ে ওর বাড়ি কোন দিকে দেখায়।
মেয়েটা কি বোঁবা! কিন্তু বোঁবা কালা হলে তো আমার কথা শুনতে বা বুঝতে পারতো না। হয়তো অনেক লাজুক! তাই কথা বলছে না। দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
— আচ্ছা, সেই কখন থেকে মাথা নেড়ে যাচ্ছো! তুমি কি কথা বলতে পারো না???
এবার মেয়েটা ফিক করে হেসে উঠলো! সেকি হাসি! হেসে কুটিকুটি!!
ওর হাসি দেখে আমারও হাসি পাচ্ছে। আমিও হাসছি।
— কি নাম তোমার?
— জয়িতা।
মৃদু হেসে বললো।
— ” জয়িতা… বাহ.. ! খুব সুন্দর নাম।
— ফুল কুড়িয়ে কি করবে গো?
ফুল কুড়াতে কুড়াতে বললো,
— পুজো দেবো গো,দেবতার।
বলেই আমার দিকে চোখ তুলে তাঁকালো।
চোখে মুখে হাসির ঝিলিক।
বুঝলাম জয়িতা হিন্দু। বাগানের শ্রমিকদের প্রায় সবাই হিন্দু।
ফুলের ঝুড়ি ভরে গেছে, শিউলি ছাড়াও আরও কয়েক ধরনের ফুল আছে ঝুড়িতে।
মেয়েটা ঝুড়ি হাতে টিলার গা বেয়ে নেমে যাচ্ছে। যাবার সময় কোনো কথা বললো না আমার সাথে, শুধু একবার ফিরে তাঁকালো।
.
অদ্ভুত! একটু তো আলাপ হয়েছে, যাবার সময় তো বলে যেতে পারতো!
আমিও বাংলোয় ফিরে আসলাম। রোহান উঠে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
— কোথায় গিয়ে ছিলি এতো সকালে?
— সামনেই হাঁটছিলাম।
— এতো সকালে একা যাওয়া ঠিক হয়নি। শোন,একা এখানে কোথাও যাবি না।
— আচ্ছা যাবো না।
আগামীকাল আমরা ফিরে যাবো।।
তাই সকালে সবাই ঘুরতে গিয়ে ১২ টার মধ্যে ফিরে আসলাম।
.
লাঞ্চ করে সবাই রেস্ট নিলো।
বিকালে আরও একবার বের হবো।শেষবারের মতো ঘুরে দেখবো। কিন্তু আনিষার ভালো লাগছে না, ও যাবে না। তাই তাহসিনও যাবে না।
বাকিরা বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেছি।
অনি,রিফাত, হিয়া, খুশবু চা বাগানের ইতিহাস নিয়ে কথা বলছে, যুক্তি – তর্ক হচ্ছে।
আর এদিকে রোহান সেই কখন থেকে ফোন ঘাটছে আর হাঁটছে। কোনো কথা ওর কানে যাচ্ছে না বোধহয়!
হিয়া,খুশবু ওরা অনেক দূর চলে গেছে। আমি আর রোহান পিছনে, অনেক পিছনে। রোহান আস্তে হাঁটছে,আর আমার তো অভ্যাস! তার উপর রোহানের সাথে সাথে হাঁটছি।
কিছু দূর গিয়ে দেখি রাস্তা দু’দিকে চলে গেছে। এখন অন্যরা কোন পথে গেছে বুঝতে পারছি।
— রোহান.. এখন কোন রাস্তায় যাবো?
— এদিকে চল।
— ওরা যদি এ রাস্তায় না যায়?ফোন করি একটা।
— ওরাও হারিয়ে যাবে না,আমরাও না।
রোহানের কথায় আর ফোন দেইনি।
.
ভীষণ রাগ হচ্ছে রোহানের উপর। আমি সাথে আছি কিন্তু ও নিজের মতো ব্যস্ত। কি যে করছে! এর মধ্যে ওর একটা ফোন আসলো। কথা শুনে বুঝলাম দেশের বাইরে থেকে ওর কাজিন আনিস ফোন করেছে।
রোহান কথায় মশগুল।
আমি আর কি করি! এদিক সেদিক তাঁকিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ চোখে পড়লো জয়িতাকে।
আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। ও একটু এগিয়ে এসে হাতে ইশারা করলো।
আমিও এগিয়ে গেলাম কথা বলার জন্য।
— কই যাচ্ছো গো?
— ঘুরতে বেরিয়েছি।
— তোমার সাহেব বুঝি??
রোহানকে দেখিয়ে বললো।
আমি একটু হেসে বললাম,
— ও আমার বন্ধু।।
— ওমা! বন্ধুর সাথে একা বেড়াতে এসেছো!!
— একা কেন! আমার আরও বন্ধুরা এসেছে। সাথে আমার কাজিন,ভাই,বোন ওরাও এসেছে।
— পদ্ম পুকুর দেখবে?
— পদ্ম পুকুর? কোথায়?
— অইযে ওইখানে…. রাস্তার ওপাশে।
হাত বাড়িয়ে দেখালো।
— তুমি আমাদের বাংলো চিনো?
— ওমা! চিনবো না কেন?? ও আমি ভালো করে চিনি। সবাই চেনে।
.
মনে মনে ভাবলাম রোহানের কোনো খেয়ালই নেই আমি একজন মানুষ সাথে আছি। এতো সময় কথা বলছি অথচ ফিরে দেখেনি আমি কোথায়! একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো!
জয়িতাকে বললাম — চলো।
রোহানকে কিছু না বলে চলে গেলাম জয়িতার পিছু পিছু। জয়িতার সাথেই বাংলোয় ফিরবো।
হাঁটছি তো হাঁটছি। কিন্তু পদ্ম পুকুর কোথাও দেখতে পাচ্ছি না…
.
চলবে…

আগের পর্ব