প্রেমে পড়া বারণ । পর্ব -০৬

রাতে বিয়ের লগ্ন,কিন্তু দুপুরেই ছোট বাবু ফিরে আসলেন।
কাঞ্চন এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গেলো বাংলোয়।
— ছোট বাবু…. আপনি এসেছেন!
— তুমি এখানে? আজ না তোমার বিয়ে শুনলাম!
— আপনি ভাবলেন কি করে এ বিয়ে আমি করবো?
— এখানে কেনো এসেছো??
— কেনো এসেছি মানে? !!! আপনি কি বলে গিয়ে ছিলেন ভুলে গেছেন!!?
— রাবিশ! দেখো এখন বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না। তুমি ওই শীতল না কি নাম… ওই ছেলেকে বিয়ে করে নাও।
— ছোট বাবু! কি বলছেন আপনি? আপনার সন্তান আমার গর্ভে! তার স্বীকৃতি দিবেন না?
— কি চাইছো তুমি? ব্ল্যাকমেইল করতে চাও?
— ছোট বাবু!!
কাঞ্চনের চোখ থেকে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। এ মানুষটাকে কাঞ্চন চিনে না। একদম বদলে গেছে। অনেক অচেনা লাগছে। এটা ওর ছোট বাবু হতেই পারে না। কাঞ্চন তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,
— ছোট বাবু, কি হয়েছে আপনার? কেনো এমন করছেন আমার সাথে? আমি কি ভুল করেছি?
ছোট বাবুর আরেকটু কাছে এগিয়ে যায় কাঞ্চন।
— ওখানে দাঁড়িয়েই কথা বলো।
আজ তোমার বিয়ে। যাও বাধ্য মেয়ের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসো।
— আপনি কি ভেবে ছিলেন? এই বিয়ে করবো? কোনো দিনও না। আপনি যদি এখন না আসতেন তবে গলায় ফাঁস দিতাম!
ছোট বাবুর ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের হাসি।
— আপনার সন্তান নিয়ে আমি অন্য কারো ঘরে যাবার আগে গলায় দড়ি দিতাম।
— তাই দাও! যত্তসব…
কাঞ্চন যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। পা টলছে।
— ছোট বাবু!! ….
….এতো দিনের সব কিছু তাহলে মিথ্যে ছিলো?…….
…. সব নাটক ছিলো….. আপনি…..
….
……… আপনি আমার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করে গেছেন?? কত স্বপ্ন দেখিয়েছেন! সব মিথ্যে??
— তুমি কি ভেবেছো?
সামান্য কুলির মেয়ে হয়ে মালিকের ঘরের বউ হবে?
এই স্বপ্ন দেখার আগে ভাবোনি কি যোগ্যতা আছে তোমার? কি তোমার পরিচয়? কি তোমার বংশ,কি জাতকুল?? এমন হাজার মেয়ের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। তাই বলে হাজার মেয়েকে ঘরের বউ করবো??
ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার আগে ভেবে নিও।
আর… এই মেয়ে…
কি যোগ্যতা আছে তোমার?
বলো.. শুনি আমি? বলো?
উচ্চশিক্ষিতা, উচ্চ বংশের মেয়েদের বাবারা হা করে বসে আছে কার মেয়ে আসবে আমাদের ঘরে! তাদের যেমন রূপ, তেমন বংশ মর্যাদা, তেমনি উচ্চ শিক্ষিত।
কি আছে তোমার? এসবের কোনটা আছে যার জন্য তোমাকে ঘরের বউ করে নিবো??!!
না আছে কোনো মেনার!
জানো কিভাবে চলতে হয় আমাদের সমাজে? তোমাকে নিয়ে আমি কারো সামনে মুখ দেখাতে পারবো?
পারবো বন্ধুদের সামনে নিতে? পারবো কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তোমাকে নিয়ে যেতে? কি পরিচয় দিবো নিয়ে?
গাইয়্যা… অশিক্ষিত….. ….
কুলির মেয়ে???!
.
কাঞ্চন কিচ্ছু বলছে না। শুধু তাঁকিয়ে দেখছে ওর ছোট বাবুকে আর চোখ থেকে জল পড়ছে।
কাঞ্চন কোনো রকমে বললো,
— আর আপনার সন্তান?
— এখানে কিছু দিন থাকতে এসে ছিলাম। যাতে বোর না হই,তাই তোমার সঙ্গ নিয়েছি। তার মধ্যে একটা এক্সিডেন্ট ঘটিয়ে বসবে কে জানতো! এখন সব দায় আমার?
— দায় আপনার হবে কেনো বাবু? দায় আমার।
— একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না।তুমি প্রেগন্যান্ট জেনেও ঐ ছেলে বিয়ে করতে চাইছে কেনো? নাকি ওই ছেলের সাথেও এমন সম্পর্ক ছিলো? যার কারণে ও বুঝতে পারছে না কার সন্তান??
— ছিঃ ছোট বাবু!!
— এই যাও তো! ছিঃ আমাকে বলছো?? তোমাকে বলা উচিত। বুঝতে পারছি। দুজনে মিলে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাও।
সন্তান? ঠিক আছে। ওর দায়িত্ব আমার।
একটু অপেক্ষা করো।
.
ছোট বাবু ওনার রুমে চলে গেলেন।কিছুক্ষণ পরে এসে বললেন,
— এই নাও।
কাঞ্চনের মুখের উপর অনেক গুলো টাকা ছুড়ে দিয়ে বললেন ছোট বাবু।
— এই টাকা গুলো দিয়ে কোনো হাসপাতালে গিয়ে এবোরশন করিয়ে নিও। আর ভবিষ্যতে আমার সামনে আসবে না।
.
কাঞ্চন টলতে টলতে বাংলো থেকে বেরিয়ে এলো। ওর মুখ থেকে আর কোনো কথা বের হয়নি। হাঁটতে পারছে না। কোথায় যাচ্ছে সেটাও জানে না।
এক সময় বুঝতে পারলো পুরনো জমিদার বাড়ির সামনে চলে এসেছে।
ওর ভালোবাসা এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা স্বপ্নেও কখনো ও ভাবেনি।
ওর জীবনে আর কিছুই রইলো না। শত কলঙ্কের বোঝা বইতে পারতো যদি…
এই কলঙ্কিত জীবন নিয়ে কোথায় যাবে?
আমার চোখ থেকে পানি পড়ছে। কাঞ্চনের কষ্টে আমার কান্না পাচ্ছে। আমি জয়িতাকে বললাম,
— তারপর কি হলো?
জয়িতা আমার দিকে তাঁকিয়ে বললো,
— তারপর?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও বললো,
— তারপর জমিদার বাড়ির সামনে একটা বট গাছ আছে। সেই গাছের একটা ডালে ঝুলে পড়লো ফাঁসিতে কাঞ্চন!
আর এই দুঃখ সইতে না পেরে শীতল বেচারা পাগল হয়ে গেছে!ক
— খুব কষ্ট হচ্ছে কাঞ্চনের জন্য। এভাবে শেষ হয়ে গেলো ওর জীবন?!.
— শেষ হয়নি তো!
— শেষ হয়নি?!! বেশ অবাক হলাম জয়িতার কথা শুনে।
— না। এক বছর পরে ছোট বাবু বিয়ে করেন। একদিন বাগানে বউ নিয়ে এসে ছিলেন।
আমার ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুত লাগছে। কি হয়েছে তারপর জানতে চাই।
— তারপর কি হয়ে ছিলো?
— একদিন রাতে এই পদ্ম পুকুরে তার লাশ পাওয়া যায়! এই পদ্ম পুকুর পাড়ে কত সময় কাটিয়েছে ছোট বাবুর সাথে। এখানেই প্রেমের শুরু হয়ে ছিলো!
এ কথা শুনে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
— মানে… এ..ই… পু…কুরে?.. কিভাবে??
— কাঞ্চন সহ্য করতে পারেনি। ছোট বাবু ওর সাথে বেঈমানি করে সুখে সংসার করবে? তারপর আরও দুজন ম্যানেজারের বউকেও এই পুকুরে মারে।কারণ কোনো বাবুকে বউ নিয়ে এসে এই বাগানে সুখে থাকতে দিবে না কাঞ্চন!
.
আমি বুঝতে পারছি না কিছু! এদিকে হঠাৎ খেয়াল হলো আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় আমি আর জয়িতা পদ্ম পুকুর পাড়ে বসে আছি। সেই পদ্ম পুকুর…
যেখানে তিন জন মেয়ের মৃত্যু হয়েছে!
— জয়িতা… তোমার ভয় করছে না? চলো এখান থেকে…
জয়িতা আমার কথায় কান দিচ্ছে না। ও বলেই যাচ্ছে,
— ছোট বাবু কাঞ্চনকে কি নামে ডাকতো জানো?
বলেই আমার দিকে ফিরলো।
আমার হাত পা অবশ হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি এখন কি হতে যাচ্ছে!!
— জয়িতা???
— হা আমিই সেই কাঞ্চন… মন জয় করে ছিলাম যে!! তাই নাম দিয়ে ছিলো জয়িতা!
আমি আর নড়তেও পারছি না।
— তু…তু…তুমিই তাহলে সেই কাঞ্চন???
— হে আমিই কাঞ্চন আর আমিই ছোট বাবুর সেই জয়িতা।
— ওদের কিভাবে মেরেছি দেখবে?
ও আস্তে আস্তে পানিতে নেমে গিয়ে আমার সামনে আসলো।।
আমার শরীর বেয়ে ঘাম ছুটছে এবার।
ও আমার পায়ে ধরে টানতে শুরু করলো।
— আমাকে ছেড়ে দাও… কাঞ্চন…
বাঁচাও… কেউ আছো….???
গলা ফাঁটিয়ে চেঁচাচ্ছি।
— তোকেও মরতে হবে!.
— আমাকে ছেড়ে দাও…. প্লিজ। আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি?
— তুই আমার ক্ষতি করিসনি? জমিদার বাড়িতে আমার উপর দিয়ে পা মাড়িয়ে গেছিস! আর তার চেয়েও বড় অন্যায় তুই ছোট বাবুর বউয়ের মতো দেখতে!
তোকে আমি ছাড়বো না।
কাঞ্চন পা ধরে টেনে পানিতে নামিয়ে নিতে চাইছে আমাকে!
শরীরের সব শক্তি দিয়ে শেষ বার বাঁচার চেষ্টায় ওকে ধাক্কা দিয়ে ছিটকে আসি।
.
কোনো রকমে সিঁড়ি গুলো ডিঙিয়ে এলোপাতাড়ি ছুটতে নাকি। কোন রাস্তায় এসে ছিলাম জানি না! চাঁদের আলোয় যেদিকে রাস্তা দেখছি দৌড়াচ্ছি।
দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াই।ঘুরে সেই জমিদার বাড়িতে চলে এসেছি!!!
.
এইতো সেই বট গাছ! এই গাছেই কাঞ্চন গলায় দড়ি দিয়ে ছিলো!!
বাগানের শেষ প্রান্তে জমিদার বাড়ি। এখানে দিনের বেলায়ও মানুষের চলাচল চোখে পড়ে না। আর এখন রাত হয়ে গেছে!
কিছুতেই এ বাড়িতে ঢুকা যাবে না। আরেকটা রাস্তা চোখে পড়তেই সে দিকে ছুটতে থাকি। এখানে ডাকলেও কেউ শুনতে পাবে না,উল্টো কাঞ্চন বুঝে যাবে আমি কোথায়!
গলা শুকিয়ে কলিজা ফেঁটে যাচ্ছে। কাঞ্চনের হাত থেকে বাঁচতে হবে। ও একবার পেলে মেরেই ফেলবে আমাকে।
মৃত্যুর মুখে এসে বুঝতে পারছি মানুষের বাঁচার আকুতি কত!
.
কিন্তু এ রাস্তা কোথায় গেছে? দুদিকে মোড় নিয়েছে… কোন রাস্তায় যাবো!? কোন রাস্তায় গেলে কোনো লোকালয় দেখতে পারবো! এসব ভাবার মতো সময় নেই। দুই সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে এক রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছি।
দূরে একটা আলো দেখা যাচ্ছে।
মনে হয় কোনো বাড়ি। সেখানেই যেতে হবে। এই বাগানে এলোপাতাড়ি ছুটে লাভ হবে না। অন্যদিনের মতো জোছনা নেই আজ। চাঁদ আছে, আলো আছে, তবে অনেক হালকা আলো।।
এ আলোয় পথঘাট মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।
এ কোন বিপদে পড়লাম! কেউ কি আমাকে খুঁজতেও বের হয়নি??
রোহান,তাহসিন… ওরা কোথায়??
হিয়া.. রিফাত… তোরা কোথায়? আমাকে বাঁচা….
রোহান…… আমাকে বাঁচা… ও মেরে ফেলবে আমাকে।
.
কাঞ্চন এখন কোথায় আছে? ও কি আমার পিছনে?
পিছনে ফিরে দেখবো?
না… দেখবো না… কিচ্ছু দেখবো না। চোখ বন্ধ করে দৌড়াবো।
এসব ভাবতে ভাবতে… সামনের রাস্তায় তাঁকালাম। কেউ নেই।
কাঞ্চন মনে হয় বুঝতে পারেনি আমি কোথায়।
পিছনে ফিরে দেখবো? একটু ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরলাম,
— নাহ! কাঞ্চন পিছনে নেই। যে আলো দেখেছি সেদিকেই যাবো ঠিক করে সামনের দিকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে,
_- রিয়া… রিয়া… তুই কোথায়?
— আপু…. আপু……
ওইতো রোহানের গলা শোনা যাচ্ছে… সাথে হিয়ার…
— হিয়া… রোহান…… আমি এখানে…… এখানে
— রিয়া…
.
ওরা আমার কথা শুনতে পাচ্ছে না। আমার গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না! এতো চেঁচিয়ে ডাকছি, কিন্তু ওদের কানে পৌঁছাচ্ছে না।
আমি কয়েকটা টর্চের আলো দেখতে পাচ্ছি।
এ কি! ওরা অন্য দিকে যাচ্ছে কেনো?
এক মুহূর্ত দেরি না করে রোহানদের দিকে ছুটছি। কিন্তু আর পারছি না। হাত পা ভেঙে আসছে।
কোনো রকমে একবার ওদের কানে একটা আওয়াজ পৌঁছাতে পারতাম!
ছুটতে ছুটতে কত বার পড়ে গেছি, আবার উঠে টলতে টলতে ছুটছি। কেবল মনে হচ্ছে কাঞ্চন আমার পিছনে!
আলো একটু জায়গার মধ্যে নড়াচড়া করছে,আমি দেখতে পাচ্ছি।
নিশ্চয়ই ওরা ওখানে আমাকে খুঁজছে। প্রাণপণ চেষ্টা করে পৌঁছে দেখি ওরা নেই!!
চলে গেছে!!
.
কিন্তু এ কি!! কোথায় এলাম আমি? সেই পদ্ম পুকুর পাড়???
যে রাস্তায় এসেছি সে রাস্তায় না গিয়ে পুকুরের পাশে আরেকটা রাস্তা ধরে দৌড়াচ্ছি।
এ কোন চক্রের মধ্যে আটকে গেছি!
আমি জমিদার বাড়ির সামনের বটতলার নিচে এসে বুঝতে পারলাম এ চক্র কাঞ্চনের তৈরি! এ রাস্তা সোজা জমিদার বাড়ি পৌঁছে দিলো!!!
আমাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই? জায়গায় নিয়ে আসলো!
না পারছি চোখ বন্ধ করে রাখতে, না পারছি খুলে রাখতে…
কারণ আমার সামনে গাছে ঝুলন্ত একটা মেয়ের লাশ!
দু’হাতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছি!
কাঞ্চন কি অন্যকাউকে মেরে ফেললো?!!
জানি না এতো সাহস কোথা থেকে আসলো আমার!
এখন তো মরতেই হবে।
কিন্তু মরার আগ পর্যন্ত বাঁচার চেষ্টা করবো।
ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে তাঁকিয়ে দেখি লাশ এখনো আছে! তার মানে অন্যকাউকেই মেরে ফেলেছে!!
কিন্তু পোশাক দেখে তো মনে হচ্ছে পরিচিত পোশাক, এবার আরেকটু ভালো করে তাঁকিয়ে চাঁদের হালকা আলোয় দেখি।
হঠাৎ লাশটা মাথা সোজা করে আমার দিকে দুটো জ্বলজ্বল চোখ তুলে তাঁকালো!
এ কি! আমার লাশ গাছে ঝুলছে!!
আ……
চিৎকার করে সরে গেলাম পিছনে।
নিজের ঝুলন্ত লাশ দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছুটে জমিদার বাড়িতে ঢুকে, একটা ঘরের কোণায় আশ্রয় নিলাম।
.
কাঁদতে কাঁদতে আমি আর পারছি না।
— ওইতো আসছে…. ও আসছে!!
পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। দু’হাতে নিজের মুখ চেঁপে ধরে আছি,যাতে আমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে না পায়।
— রিয়া….. রি……য়া…..
.
ও আমার নাম ধরে সুর করে ডাকছে!
ভয়ে সবকিছু ভুলে গেছি। কতকিছু পড়ছি,আল্লাহকে ডাকছি।
— রিয়া………. রি….য়া…… লুকোচুরি খেলবে?? এ বাড়িতে ছোট বাবুর সাথে আমি কত লুকোচুরি খেলেছি। আমি লুকিয়ে থাকতাম আর ছোট বাবু…. আমাকে…… খুঁজে বের করে…….. বলতেন……… ” টুকি”
‘টুকি’ বলে কাঞ্চন আমি যে ঘরে লুকিয়ে আছি সেই ঘরের জানালা দিয়ে গলা বাড়িয়ে আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে!!
— বাঁচাও…. বাঁচাও….
কেউ আছো???
অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে আরেকটা ঘরে ঢুকে লুকাতে চাইলাম, কিন্তু…
ওই ঘরে ঢুকতে যাবো তখনই দেখি….
কাঞ্চনের মুখ উল্টে ঠিক আমার সামনে!.
.
ওর শরীর উপরে কোথাও… মাথা নিচে ঝুলে আমার দিকে তাঁকিয়ে আছে!!
এই ঘরে যাবার প্রশ্নই আসে না।। ছুটতে ছুটতে সিঁড়ির নিচের জায়গায় আশ্রয় নিলাম। জানালার ভাঙা একটা রডের টুকরো পেয়ে এটাই হাতে নিয়ে চুপটি করে লুকিয়ে আছি। এখন যদি কাঞ্চন আমাকে পায় নির্ঘাত মৃত্যু! হালকা চাঁদের আলো আসছে সামনের বারান্দায়। এখানে সাপখোঁপ থাকার সম্ভাবনা ছিলো, কিন্তু সেদিন দেখেছি এখানে তেমন একটা ঝোঁপঝাড় নেই।সাপ থাকা অসম্ভব কিছু না, বরং স্বাভাবিক।
কিন্তু এখন ভয়ংকর মৃত্যুর চেয়ে সাপের ছোবল খেয়ে মরা বেটার মনে হচ্ছে!
— রিয়া… রিয়া…. তুই কোথায়??
.
রোহানের গলা শুনতে পাচ্ছি!!
রোহান এসেছে!
আস্তে আস্তে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখি রোহান! বেরিয়ে আসলাম। বারান্দায় এসে দেখি রোহান এদিকে সেদিকে সব জায়গায় উঁকি দিয়ে খুঁজছে আমাকে !
— রোহান!
আমি এগিয়ে গেলাম,
— রিয়া! তুমি এখানে কি করছো?? এদিকে আসো! কখন থেকে খুঁজছি!
এ রোহান নয়!! এটা বুঝতে এক মুহূর্ত দেরি হলো না আমার। পাশের একটা টিনের ভাঙা কৌটা ছিলো সেটা ছুড়ে দৌড়াতে শুরু করলাম।।
নাহ,এ বাড়ি থেকে বের হতে হবে। এখানে থাকলে মারা পড়বো,বাঁচার কোনো আশা থাকবে না।।
.
জমিদার বাড়ি থেকে বেরিয়েই হোচট খেয়ে রোহানের উপরে পড়ে গেলাম।
রোহান ঠিকই এসেছে। হিয়া রোহান সাথে আরও কয়েকজন।
রোহানের আওয়াজ পেয়েই কাঞ্চন রোহানের রূপ ধারণ করে ছিলো!!
— রিয়া…..
কি হয়েছে তোর? তুই এখানে কি করছিস!
— আপু…! এখানে কি করছিস তুই? কি হয়েছে আপু??
– ও আমাকে মেরে ফেলবে! বাঁচাও!!
আমি ওদের ফেলে পালাতে চেষ্টা করছি। কিন্তু হিয়া আর রোহান আমাকে জোর করে আটকে রেখেছে…
.
চলবে…