প্রেমে পড়া বারণ । পর্ব -০৭

ও আমাকে মেরে ফেলবে! বাঁচাও!!
আমি ওদের ফেলে পালাতে চেষ্টা করছি। কিন্তু হিয়া আর রোহান জোর করে আমাকে আটকে রেখেছে!.
— কে?? কে মেরে ফেলবে? কিচ্ছু হবে না, দেখ আমি আছি,আমরা সবাই আছি।
— আপু তোর কি হয়েছে? এমন করছিস কেন? কে ওখানে??
হিয়া কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করলো।
.
আমার মুখ থেকে আর কথা বের হচ্ছে না। তবুও ওদের বুঝাতে চাইলাম।
আঙুল দিয়ে জমিদার বাড়ির দিকে দেখাতে, ওই দিকে ফিরে দেখি কাঞ্চন ঠিক ওদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে!!
কি বীভৎস চেহারা! এ কি রূপ কাঞ্চনের!!
— আ…..
.
আমি চোখ খুলতে পারছি না,সমস্ত শরীরে প্রচন্ড ব্যথা। চোখ খুলে বুঝতে পারলাম আমি বাংলোয় আছি। আমার পাশে সবাই বসে আছে। হিয়া,খুশবু,আনিষা আমার বিছানায় বসে আছে।
রোহান, রিফাত,অনি,তাহসিন ওদেরও দেখলাম এ রুমেই কেউ বসে ,কেউ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আর পলাশ মামা গম্ভীর মুখে চেয়ারে বসে আছেন।
সবাইকে দেখে তড়িঘড়ি করে উঠে বসতে গিয়ে দেখি মাথা তুলতে পারছি না। প্রচন্ড ভার হয়ে আছে মাথা। জ্বরে শরীর জ্বলে যাচ্ছে আমার।
ঘড়ির দিকে তাঁকিয়ে দেখি রাত আড়াইটা বাজে।
— আপু…. উঠিস না। এখন কেমন লাগছে তোর?
উদ্বিগ্ন হয়ে হিয়া জিজ্ঞেস করলো।
মুখে কিছু না বলে চোখের ইশারায় ওকে সান্ত্বনা দিলাম।
পলাশ মামা তাড়াতাড়ি উঠে কাছে এসে বললেন,
— তুমি ঠিক আছো তো?
— মামা, আমরা সকালেই চলে যাবো। যাবার ব্যবস্থা করে দিন।
পলাশ মামার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে গেছে।
— আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন ওকে তাড়াতাড়ি কিছু খায়িয়ে ঔষধ খাওয়াতে হবে।
আনিষা উঠে গিয়ে গরম স্যুপ নিয়ে এসে আমাকে খাইয়ে দিলো।
তারপর জ্বরের ঔষধ দিলো।
রোহান কাছে এসে বসলো।
— সরি রিয়া….
— সরি কেন বলছিস?
— তুই আমার সাথে থেকে কোথায় চলে গিয়ে ছিলি আমি টেরই পাইনি। এতোটা কেয়ারলেস হলাম কি করে!!
কিন্তু তুই ওখানে কেন গিয়ে ছিলি? কি হয়ে ছিলো?
রোহানের কথায় আমার সব মনে পড়লো। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
সব কিছু খুলে বললাম।
— আমি ওর ছবিও তুলে ছিলাম।
রোহান বললো,
— রিফাত ক্যামেরাটা নিয়ে আয়।
ক্যামেরা নিয়ে আসলো, ছবিও আছে কিন্তু শুধু শিউলি ফুলের ছবি। এ ছবিতে কেনো; কোনো ছবিতেই কেউ নেই!
আমি রোহানের হাত থেকে টান দিয়ে ক্যামেরা নিয়ে নিজে দেখলাম। সত্যিই জয়িতা / কাঞ্চনের কোনো ছবি নেই!
ভয়ে হাত পা জমে আসছে আমার।
— ও আমাকে মেরে ফেলবে! ও আবার আসবে আমাকে মারতে।
— কিছু হবে না। আমরা সবাই আছি এখানে।
তাহসিন সান্ত্বনা দিলো।
অনি বললো,
— ধুর! কিসব আবোল তাবোল বলছিস! ভূত বলে কিছু আছে নাকি! তুই নিশ্চয়ই একা একা হারিয়ে গিয়ে ছিলি তাই ভয় পেয়েছিস!
.
জানিস তো ভয় পেলে অবচেতন মনের ভাবনা মস্তিষ্কে হিট করে আর হ্যালুসিনেশন হয়!
অনি কিছুতেই বিশ্বাস করছেন না।
— দেখ অনি, কুসংস্কার বলে সব এড়িয়ে যেতে পারবি না। এমন অনেক কিছু আছে যা বিজ্ঞান প্রমাণ করতে না পেরে কৌশলে এড়িয়ে গেছে!
আর রিয়া কখনো মিথ্যা বলে? ( খুশবু)
— আমি কি বলেছি মিথ্যা বলেছে? বললাম এটা ওর ভ্রম!(অনি)
— রিয়া যা বলেছে সবটাই সত্যি। (রোহান)
— সত্যি মানে? তুই কি করে জানিস??
অনি চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো।
— জানি। রিয়াকে নিয়ে আসার পরে পলাশ মামার সাথে কথা হয়েছে। রিয়া কেনো অদ্ভুত আচরণ করছিলো এসব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জেনেছি – প্রায়ই প্যারানরমাল কিছু ঘটে থাকে বাগানে!
কাঞ্চন নামের একটা মেয়ে সুইসাইড করে ছিলো। আর ছোট কর্তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো এটাও সত্যি। বাগানের সবার মুখে মুখে এই কাহিনী।
আর রিয়ার সাথে এমন কিছু হয়েছে কি না সেটা নিয়েই আমার চিন্তিত ছিলাম।
এখন ওর মুখ থেকে শুনে সব ক্লিয়ার হয়ে গেছে।
আর ওটা মাত্র দশ বছর আগের ঘটনা, সবার সামনে ঘটেছে। বিশ্বাস না হলে মামাকে জিজ্ঞেস কর।(রোহান)
সবাই অবাক হয়ে শুনছে।
— অদ্ভুত! (রিফাত)
এবার পলাশ মামা মুখ খুললেন,
— বাগানে প্যারানরমাল ঘটনা নতুন না। তোমার ভয় পাবে বলে কিছু বলিনি, কারণ তোমাদের আনন্দ মাটি করতে চাইনি। তাছাড়া তোমাদের সন্ধ্যার পরে বের হতেও দিতাম না। এটা আমার খেয়ালে রেখেছি সবসময়, কিন্তু এর মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটে যাবে বুঝতে পারিনি।
তিনটা মেয়ের মৃত্যু হয়েছে ওই পদ্ম পুকুরে। তাই ওই দিকটায় তোমাদের নিয়ে না গিয়ে, অন্যপথে ঘুরিয়ে জমিদার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ছিলো।
.
তিনজনের মধ্যে একজন সেই মালিকের ছেলে, মানে ওদের ছোট বাবুর স্ত্রী, আর বাকি দুজন দুই ম্যানাজারের স্ত্রী।
পুলিশ তদন্ত করে কোনো কূল কিনারা না পেয়ে অপমৃত্যু বলে কেইস ক্লোজ করে দিয়েছে।
এখানকার লোকদের বিশ্বাস সেই মেয়ের অতৃপ্ত আত্মা এসব করেছে। শীতল পাগল নাকি প্রত্যেক মৃত্যুর আগে অস্থির হয়ে বাগানে ওই মেয়ের নাম ধরে ডাকতো আর ছোটাছুটি করতো!
পলাশ মামার কথায় অনি আর অবিশ্বাস করতে পারলো না।
— অবিশ্বাস্য! এমন কিভাবে সম্ভব! সত্যি অবিশ্বাস্য ঘটনা! রিয়াও বলেছে শীতল পাগলের কথা!
পলাশ মামা আবার বললেন,
— তোমাদের সাথে আমার বয়সের ডিফারেন্স বড়জোর ৮-১০ বছর; তাই বলে ভেবো না আমি কুসংস্কার মানি!
কিন্তু আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তা তো অবিশ্বাস করতে পারি না।
— কি দেখেছেন মামা?
খুশবু ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো।
— প্রায়ই বিভিন্ন কাজে বাংলোয় ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়। তো প্রায় সময় দেখি একটা মেয়ে খোলা চুলে বাগানে পাতা তুলে।
আমি দেখেও না দেখার মতো চলে আসি।
কারণ দেখলেই সমস্যা।
ফ্যাক্টরির একটা ছেলে ছিলো, অসীম নাম।
একদিন রাতে সেও দেখে ছিলো।
দেখে বুঝতে পারেনি। ওর মধ্যে একটু প্রব্লেম ছিলো! বুঝতেই পারছো…
তো মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো
— এত রাতে পাতা তুলছিস কেন?
— আমার মন চাইছে।
— বিড়ি আছে তোর কাছে?
— আছে।
— দিবি? (শরীর,মাথা ব্যথা করছে)
— তুই এসে নিয়া যা….
বেচারা বিড়ি আনার নাম করে কাছে যাওয়ার পরে বুঝতে পারে… এটা কোনো মানুষ নয়!
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে!
ও দৌড়ে পালাতে চাইছিলো, কিন্তু পিছন থেকে একটা থাপ্পড় মারে পিঠে।
কোনো রকমে রাস্তায় এসে পড়ে, তখন দুই- তিনজন কুলি রাতে বাড়ি ফিরছিলো, ওদের সামনে পড়লো।
ওরা বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু পরদিন প্রচন্ড জ্বর উঠে। ওর পিঠে পাঁচ আঙুলের দাগ সাথে নখের আচড় পাওয়া যায়।
ছেলেটা মারা যায়। মারা যাবার আগে সবকিছু বলে গেছে।
এখন বুঝতে পারছো কি ঘটে এখানে!!
পলাশ মামার কথা শুনে সবার মুখ শুকিয়ে গেছে।
খুশবু কেঁদেই ফেললো,
— মামা, আমরা কাল সকালেই চলে যাবো!
— হা, মামা… আমাদের দ্রুত চলে যাওয়া উচিত।
তাহসিন বললো।
— যাওয়া উচিত, কিন্তু কালকে যে হরতাল। গাড়িঘোড়া সব বন্ধ!
— মামা,ট্রেনেই যাবো। ঢাকা পৌঁছাতে পারলেই হবে। তারপর ওখান থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা হবে। (রোহান)
— ঠিক আছে, ট্রেনে যাওয়া যাবে।সকালেই ফোন করে ইমার্জেন্সি টিকিট করে দিবো। এখন রিয়াকে একটু ঘুমাতে দাও, তোমরাও শুয়ে পড়ো। (পলাশ মামা)
— আমি একা রিয়ার সাথে থাকবো না।হিয়াও এখানে থাকবি।( খুশবু)
— ওরে বাবা.. আমি তাহলে একা ঘুমাবো নাকি? আমি পারবো না! ( আনিষা)
— ধুর! বাংলোয় কি হবে? তাছাড়া আমরা সবাই তো আছি?
(রোহান বললো),
খুশবু মুখ পেঁচার মতো করে বসে আছে।
.,
ওরা নিজেদের রুমে যাওয়ার পরে খুশবু নাকে মুখে চাদর দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। আমিও মাথা ঢেকে শুয়ে আছি। মনে মনে সূরা পড়ছি।
রাতে আর তেমন কিছু ঘটেনি। বাকি রাতটা স্বাভাবিক কেটে গেলো।
সকালের সূর্যটা অন্যদিনের মতো উঠলেও আমাদের জন্য অন্যসব স্বাভাবিক দিনের মতো হয়নি। কারণ সকাল বেলায় একটা দুঃসংবাদ পেলাম।
রাতে আর তেমন কিছু ঘটেনি। বাকি রাতটা স্বাভাবিক কেটে গেলো।
সকালের সূর্যটা অন্যদিনের মতো উঠলেও আমাদের জন্য অন্যসব স্বাভাবিক দিনের মতো হয়নি। কারণ সকাল বেলায় একটা দুঃসংবাদ পেলাম।
হরতাল চলছে, তাই ট্রেনে যাবো ঠিক হয়ে ছিলো। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনলাম ট্রেন দুর্ঘটনা! ট্রেনসহ সেতু ভেঙে পড়ায় সিলেটের সাথে সারা দেশের ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ! বেশ হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
এটা আমাদের জন্য অনেক খারাপ একটা সংবাদ। তার মানে আরও দু একদিন এখানেই থাকতে হবে!! সবার মন খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু করার নেই। তাই বাধ্য হয়েই থাকতে হবে।
এদিকে বাসায় এসবের কিছুই জানানো হয়নি। কারণ যদি জানতে পারে তাহলে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে আরোও সমস্যা বেড়ে যাবে।
.,
সকালের নাস্তার পরে তাহসিন বললো,
— এখন তো কিছু করার নেই, তাই সবাই খুব সাবধানে থাকতে হবে।
রোহান বললো,
— হা, কেউ একা কোথাও যাবি না। আর কোথাও যাওয়ারও দরকার নেই।।
আমরা সবাই একসাথে বসে আছি।
তাহসিন আর রোহান পলাশ মামার সাথে কথা বলছে।
-,- আমার কিন্তু এসব ভালো লাগছে না। এখনই ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটার ছিলো?!
খুশবু হতাশ হয়ে বললো।
আমি কিছু বলছি না,চুপচাপ শুনছি। সত্যি বলতে আমি ভীষণ ভয় পাচ্ছি। আরও দুটো রাত এখানে থাকতে হবে। জানি না কি কি ঘটবে এই দুইদিন!
.
লাঞ্চের পরে তাহসিন বললো,
— আমি আর রোহান মামার সাথে বের হচ্ছি। তোরা কোথায় যাবি না, বাংলোয় থাকবি।
রোহান, তাহসিন আর পলাশ মামা বেরিয়ে গেলেন।
আমি আর খুশবু আমাদের রুমে এসে শুয়ে আছি। কোথাও যাবো না, তার চেয়ে ভালো একটু ঘুমিয়ে নিই। গতকাল যা হয়েছে তাতে আমার শরীরও খুব একটা ভালো নেই। জ্বর নেই এখন,কিন্তু শরীর অনেক দুর্বল লাগছে সাথে প্রচুর ব্যথা।
.
বিকেলে ঘুম থেকে উঠলাম চেঁচামেচি শুনে।
তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে গিয়ে দেখি অনি, খুশবু,রিফাত আর হিয়া জোরে জোরে কথা বলছে। অনেক অস্থির দেখাচ্ছে ওদের। আর খুশবু কাঁদছে।
— কি হয়েছে? এতো শোরগোল কিসের?
খুশবু! কাঁদছিস কেন??
— আনিষাকে পাওয়া যাচ্ছে না! অনি চিন্তিত মুখে বললো।
— কিহ!! পাওয়া যাচ্ছে না! মানে কি?
— আমি দেখেছি খুশবু আপুর সাথে বেরিয়ে যাচ্ছে।
জিজ্ঞেস করলাম কোথায় যাচ্ছে, বললো দূরে কোথাও না, বাংলোর সামনের রাস্তায়। খুশবু আপুর নাকি দম আটকে গেছে, আর একা যেতেও ভয় পাচ্ছে। তাই আনিষা আপুকে নিয়ে যাচ্ছে।
হিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বললো।
— আমিও দেখেছি।
অনিও সায় দেয়।।
— খুশবু এখানে একা আসলো কিন্তু আনিষা কোথায়??
উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
— আমি ফিরে আসবো কোথা থেকে? আমি তো বাংলো থেকে এক পাও বাইরে রাখিনি!
খুশবু কাঁদতে কাঁদতে বললো।
— মানে কি?? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!.
রিফাত এগিয়ে এসে বললো,
— আপু, আমি বুঝিয়ে বলছি।
হিয়া আর অনি ভাইয়া, আনিষা আপুকে দেখেছে খুশবু আপুর সাথে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু এখন দেখি খুশবু আপু রুম থেকে বেরিয়ে আসছে।।
হিয়া জিজ্ঞেস করলো আনিষা আপু কোথায়, কিন্তু খুশবু আপু কিছুই নাকি জানে না।
ঘুম থেকে উঠে এসেছে মাত্র!.
আমি কিছু বলার আগেই খুশবু হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো।
— আমি তো রিয়ার সাথেই ঘুমিয়ে ছিলাম। মাত্র উঠে আসলাম।
— হা, খুশবু আমার সাথেই ঘুমিয়ে ছিলো।
কিন্তু আনিষা কখন বেরিয়ে গেছে??
.
— এইতো পনেরো – বিশ মিনিটের উপর হবে।( অনি)
— তাড়াতাড়ি ওকে খুঁজে বের করতে হবে, আল্লাহ না করুক দেরি হয়ে গেলে যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়!!
— কিন্তু আমি ওর সাথে যাইনি! ওরা মিথ্যে বলছে কেন?
খুশবু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বললো।
— এখনও বুঝতে পারছিস না?!! ওকে নিয়ে গেছে। সেদিন রোহানের রূপে আমার সামনে এসে ছিলো! আর আজ তোর রূপ নিয়ে আনিষাকে নিয়ে গেছে!!
আর এক মিনিটও দেরি করা যাবে না সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি চল।
অনি আর রিফাত দ্রুত ওদের ব্যাগ নিয়ে আসলো। আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে যাচ্ছি।
— রোহানদের জানানো দরকার। ( অনি)
— তাড়াতাড়ি ফোন কর।
অনি ফোন করে ওদেরকে জানালো।
— আমরা এখন কোথায় যাবো?( খুশবু)
– কোথায় আবার সেই জমিদার বাড়ি -আর পদ্ম পুকুরে! ( অনি)
এমনিতেই গতকালের ধকলে আমার অবস্থা খারাপ, কিন্তু এখন এসবের দিকে খেয়াল দেবার সময় নেই। আনিষা কোথায় আছে, কি অবস্থা আছে কে জানে!
কি হচ্ছে ওর সাথে!!
ভাবতেই আমার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
.
আমরা যে রাস্তায় গেলাম সে রাস্তায় প্রথমে পদ্ম পুকুর পড়ে,তারপর জমিদার বাড়ি।
পদ্ম পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখি পলাশ মামা আরও দুজন লোকের সাথে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমরা পৌঁছানোর আগেই ওনারা পৌঁছে গেছেন।
আনিষা মাঝ পুকুরে ডুবছে আর ভাসছে।।
রোহান, তাহসিন আর একজন লোক আনিষাকে পানি থেকে তোলার জন্য সাঁতরে ওর কাছে যাচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত আনিষাকে তুলে আনলো। যখন তুলে আনলো, তখন আনিষার জ্ঞান ছিলো না।
প্রচুর পানি খেয়েছে।
পুশ করে ওর পেট থেকে পানি বের করার পর ওর জ্ঞান ফিরে।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস নিলাম।
ও কাঁদতে শুরু করে। কোনো কথা বলতে পারছে না, তাহসিনের হাত আঁকড়ে ধরে কাঁদছে তো কাঁদছেই।
আনিষাকে নিয়ে আমরা বাংলোয় ফিরে এলাম।।
.
সন্ধ্যা নেমে গেছে।
রাতে আর কেউ কিছু খেতে পারেনি। আসলে সবাই টেনশনে আছে। এতো দিন এতো উৎপাত করেনি, কিন্তু আমার আসার পরে বেড়ে গেছে।
শুধু আমাকে নয়,অন্যদেরকেও মারতে চেষ্টা করছে!
রাত দশটার দিকে আমি আনিষাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে এলাম। এখানে সবাই বসে আছে।
আনিষাকে জিজ্ঞেস করলো কিভাবে ওখানে গেলো।।
আনিষা বললো,
.
— বারান্দার সামনে হাঁটছিলাম। তখন খুশবু আপু এসে বললো ও একটু সামনের রাস্তায় যাবে,একা যাবে না। আমিও সাথে গেলাম।
কিন্তু উনি হেঁটেই যাচ্ছেন। কিছু সময় পরে বললাম,
— ঐ দিকে যাবো না, বাংলোয় ফিরে চলুন।
তখন উনি আমার দিকে ভয়ংকর ভাবে তাঁকালেন! পরে দেখি খুশবু আপু না! বীভৎস চেহারার একটা মেয়ে!
চিৎকার করতে চাইছিলাম, কিন্তু আমার গলা থেকে স্বর বের হচ্ছিলো না। ও আমার চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে আছে!
তারপর আর কিছু বলতে পারি না।
যখন হুঁশ হলো, তখন দেখলাম পুকুরে ডুবে যাচ্ছি। আমি সাঁতার জানি না। বাঁচার চেষ্টা করছি আর ও….
পুকুর ঘাটে বসে খিলখিল করে হাসছে!.
আনিষা আবার কাঁদতে শুরু করলো।
আ……
খুশবু চিৎকার শুনে দৌড়ে সবাই রুমে যাবার আগেই খুশবু এসে হুমড়ি খেয়ে পড়লো আমাদের সামনে।
থরথর করে কাঁপছে।।
— কি হয়েছে খুশবু?
— ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখি জানালার এক পার্ট খুলে আছে। ওই দিকে চোখ পড়তেই দেখি এক জোড়া চোখ! মাথা নিচে, পা উপরে দিয়ে ঝুলে আছে বাইরে!!
সবাই চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ আমাদের পিছু ছাড়ছে না। আজ রাত কিভাবে কাটবে জানি না।
.
রাত বারোটা বেজে গেছে।
হিয়ার অনেক সাহস । ও ঘুমাবে বলে একাই নিজের রুমে চলে গেলো।
আমরাও কিছুক্ষন পরে ঘুমাতে গেলাম।
রাত যখন প্রায় দুটো।
আমার চোখে ঘুম আসে। কিন্তু ঘুমের ঘোরে মনে হচ্ছে কেউ কানের কাছে ফিসফিস করছে।
ড্রীম লাইট জ্বালিয়ে ঘুমিয়েছি। তাঁকিয়ে দেখি কেউ নেই!
আবার শুয়ে পড়লাম। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে গেছে।
একটু পরেই আবার শুনতে পেলাম কেউ আলমারি খুলছে, রুমের মধ্যে হাঁটছে।
মনে হচ্ছে খুশবু উঠেছে। আমি আর দেখছি না। কিন্তু অতিরিক্ত শব্দে মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে। উঠে বসে পড়ি।
খুশবু গভীর ঘুমে। রুমে কেউ নেই। আলমারীও বন্ধ!
এবার ভয় পেয়ে গেছি। বুঝতে পারছি কি হচ্ছে। ভয়ে চোখ বন্ধ করে হাতের মুঠো শক্ত করে শুয়ে আছি। ঘুম চলে গেছে চোখ থেকে!
.
বেশ কিছু সময় পরে একটা গরম নিঃশ্বাস অনুভব করলাম আমার উপর।
কিছু না বুঝেই হঠাৎ চোখ খুলে তাঁকাই।
যা দেখলাম তার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না!
চোখ খুলতেই দেখি আমার চোখ কাঞ্চনের চোখ বরাবর! দূরত্ব মাত্র কয়েক ইঞ্চি!
শূন্যে ভেসে আমার দিকে ঝুকে তাঁকিয়ে আছে কাঞ্চন!
এই ভয়ংকর দৃশ্য দেখে দুই সেকেন্ড ফ্রীজ হয়ে গেছি,তারপর চোখ বন্ধ করে এক চিৎকার দিলাম।
খুশবু উঠে আমাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে, অন্যরাও এসে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
খুশবু দরজা খুলে দিলো। সবাই আসলো।
কারো বুঝতে বাকি নেই আবার কিছু ঘটেছে। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছি। এক সময় ওদের বললাম।
ওরা এখানেই বসে আছে। আর ঘুমাতে হবে না। রাতটা বসেই কাটিয়ে দিতে হবে।
কিন্তু হিয়া কোথায়?
সবাইকে দেখলেও হিয়াকে দেখতে পাচ্ছি না!
আমি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— হিয়া কোথায়??
— ও তো আমার সাথেই বের হয়েছে রুম থেকে! ( আনিষা)
কেউ কিছু বলার আগেই রোহান দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। ওর পিছনে আমরাও।
হিয়া ওর রুমেই মাথা নিচু করে বিছানায় বসে আছে!
— তুই এখানে একা বসে আসছি কেন?
হিয়ার কাঁধে হাত রেখে রোহান জিজ্ঞাসা করলো।
আমরাও ওর পিছনে রুমে ঢুকলাম।
রোহানের দিকে এমন করে তাঁকালো যে রোহান ভয়ে দুইহাত পিছনে সরে আসলো…
.
চলবে…

আগের পর্ব                                        পরের পর্ব