গল্পঃ – খলনায়ক | লেখকঃ – নিরব ইসলাম | পর্বঃ- ৫

লুবনা উদাস হয়ে স্যার এর কক্ষ থেকে বের হয়ে এলো।
শিমু লুবনাকে দেখেই কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো,কিরে স্যার কি বললো?
লুবনা অন্যমনস্ক হয়ে শুধু ভাবছে ইকুর কথা।
শিমু লুবনাকে ধাক্কা দিয়ে বললো এই লুবনা কথা বলিসনা কেন?
লুবনা: শিমু ইকু টাকা দিয়ে গেছে।
শিমু: ইকু কে?
এই দাড়া দাড়া ইকু ওই লোকটা না যাকে আমরা খুঁজতাম।
লুবনা: হুম।আমি আর খুঁজে পাইনি তাকে।
শিমু: আচ্ছা উনি এতদিন পর?কি করে সম্ভব?
লুবনা: আমি কিছু বুঝতেছিনা। জানিস আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন ঘোরের ভেতর আছি।কিছুক্ষন বাদেই সব ঘোর কেটে যাবে।
শিমু: আচ্ছা চল রুমে যাই। ওসব কথা পরে হবে।
কিছুক্ষণ যেতেই লুবন শিমুকে বলছে,শিমু ইকুকে কই গেলে পাবো?
ও কি আদৌ আমার কাছে ধরা দিবে?
শিমু কিছুই বললোনা।
রুমে গিয়ে বার বার ভাবছে,কি করে ইকু আমার খোঁজ পেল..
কি করে ইকু আমায় এখনো আগের মতন অনুসরণ করে!
লুবনা শিমুর দিকে রহস্য নিয়ে তাকিয়ে বললো,শিমু তুই কি চিনিস ইকুকে?
শিমু বই পড়া রেখে লুবনার দিকে তাকিয়ে বলে,কি বলিস তুই?
আমি চিনলে কি তোকে স্যার এর কাছে যেতে বলতাম?
তাহলে ইকুর কাছেই পাঠাতাম।
লুবনা বসে বললো,আমি কই পাব ওকে?
শিমু: আচ্ছা শোন তোর সাথে কখনো দেখা করতে চায়নি?
লুবনা: নবীন বরনের অনুষ্ঠান শেষ হবার সময় একটা পিচ্চির কাছে প্রথম চিঠি দেয়।
তা এক বছর আগের ঘটনা..
চিঠিতে লেখা ছিল,লাল শাড়িতে বেশি ই সুন্দর লাগে।বেশিক্ষণ বাইরে থাকবেন না…নজর লাগবে।
ইকু..
এর পর আমি খুঁজেছি। না পেয়েছি সেই পিচ্চি ছেলেকে না পেয়েছি ইকুকে।
শিমু: হু এই কাহিনি তো আমিও জানি।
এরপর আর চিঠি দিত?
লুবনা: হু তিন বার দিয়েছে।
শিমু কি বলিস?
লুবনা: হু দু দিন পর পর ই আমাদের বাসার সামনের বারান্দায় চিঠি পেতাম।
মাঝে মাঝে বলতো পড়ার টেবিলটা আরেকটু জানালার পাশে আনতে তাতে দেখতে সুবিধা হয়।
মাঝে মাঝে বলতো, রাতে বারান্দায় দাড়িয়ে আমাকে খুঁজলে কি পাওয়া যাবে?আমি তো অন্ধকারের মানুষ… আলোর পিছনে ছুটি।
অদ্ভুত বেপার কি জানিস,ও দিন রাত আমার বাসার সামনে থাকতো কিন্তু আমি ওকে দেখতাম না।
লুকিয়ে থাকতাম বারান্দায় যেই দেখবো চিঠি রেখে যায় সেই হাতে না হাতে ধরবো।
কিন্তু পেতাম না।
শেষবার চিঠি মায়ের হাতে পরে।
এর জন্য আমায় অনেক বকা খেতে হয়।
আমি রাস্তা দিয়ে হাটলে শুধু নজর রাখতাম কেউ আমায় দেখছে কিনা।কিন্তু আমি পাইনি।
বাবা মারা যাবার পর এসব ভুলে গিয়েছিলাম।আজ আবার নতুন করে আমার জীবনে আসলো।
আমি তো নতুন করে আর স্বপ্ন দেখতে চাইনা শিমু…
শিমু: আজ কি দিল দেখি।
চিঠি খুলে দেখে,মন দিয়ে খুঁজলে নাকি সব পাওয়া যায় আগে বিশ্বাস হতোনা কিন্তু আজ করি।
এই টাকা টা দয়া ভেব না।বন্ধু হিসেবে নিও।
যখন দেখা হবে দিয়ে দিও।
ইতি- ইকু।
শিমু: আচ্ছা বল আমায়, সেদিন কে ছিল স্যার এর রুমে?
লুবনা: স্যার এর ছেলে।আচ্ছা ও কি ইকু?
শিমু হো হো করে হেসে দিল।
লুবনা: হাসিস কেন?
শিমু: ও হবে ইকু?
ও ফাউল একটা ছেলে।
নেশাখোর, গুন্ডা প্রকৃতির।
ও আর যাই হোক এতো টাকা দিয়ে তোর উপকার করতোনা।
একদিন এক দোকানদার টাকা কম দিয়েছে বলে তাকে সবার সামনে কান ধরিয়েছে।
লুবনা মুখ মলীন করে জানালার কাছে গিয়ে দাড়ালো।
না আমি আর ভাববো না কাউকে নিয়েই।আমার কাউকে লাগবেনা কাউকে না….
এই বলে সান্তনা দিচ্ছে লুবনা নিজেকে।
বলতে বলতে পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।
লুবনা পাশাপাশি একটা টিউশনি করিয়ে চলে যায়।
ইকু এর পর আর চিঠি দেয়নি।
রাস্তাঘাট এ যাকে দেখে যে তার দিকে তাকিয়ে আছে তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করে,আপনি কি ইকু।
বার বার না কথা শুনে লজ্জাকর অবস্থায় পরেছে বার বারই।
সব ভুলে গিয়ে পড়ায় মন দিতে গিয়েও বার বার অতীতের কথা মনে পরে যাচ্ছে লুবনার।
কি করে ভুলবে সে দিনগুলি!
মাঝে মাঝেই ঘুমের ঘোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে।
শিমু ভোরে উঠেই লুবনাকে বললো,লুবনা তোর একটা মুক্তি দরকার।
লুবনা অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,মুক্তি?
শিমু: হুম,তুই চাস না যে বিয়ে নামের খেলা হয়েছে তোর সাথে তার একটা বিচার হোক?
লুবনা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে বললো,ওদের বিচার আল্লাহ করবে।আমি করার কে?
যে মামা নিজের ভাগ্নি কে বিয়ের নামে বিক্রি করে দেয় সে মামার বিচার পুলিশ কি করবে?
শিমু: তুই এই বিয়ে থেকে মুক্তি চাস না?
লুবনা: হুম চাই..খুব চাই।
শিমু: ডিভোর্স দিয়ে দে।
লুবনার বুকে মোচর দিয়ে উঠলো।
বিয়ের বন্ধন বুঝে উঠতে না উঠতেই বিচ্ছেদ এর বেপার এর সম্মুখীন হতে হবে এটা মেনে নেয়া কোন মেয়ের পক্ষেও সম্ভব নয়।
শিমু: কি ভাবছিস?
লুবনা : হু দিব।
শিমু: আমার কাকা উকিল একজন।কাল তোকে তার কাছে নিয়ে যাব। তুই যতদিন এই বেপার দিয়ে বের হয়ে না আসিবি ততদিন এগুলো তোকে যন্ত্রনা দিবে।
কিচুদিনের মাঝেই লুবনা তার স্বামীকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দিল।
লুবনা চাইলেই তাদের বিরদ্ধে মামলা দিতে পারতো কিন্তু তা সে করেনি।
মা,ছোট ভাইকে যে মামাই দেখে।মামা না থাকলে মা,ভাইকে কে দেখবে! এই কথা ভেবেই কিছু করতে পারেনি…
হুট করেই আবার এক ধাক্কা পেয়ে গেল লুবনা।
কিছু জীবন নদীর পাড় এর মতন।
প্রতিনিয়ত ভাংতে থাকে।লুবনার জীবনটাও ঠিক ওমন।
শিমুর বিয়ে হয়ে গেছে।সে এখন তার শ্বশুর বাড়ি থাকে।লুবনা একটা ছোট বাসা ভাড়া
নিয়েছিল,
লুবনার টিউশনি ও চলে গেছে।
দু মাসের ভাড়া বাকি তাই ঘরের মালিক ঘর ছেড়ে দিতে বলেছে।
নিজের সরঞ্জাম নিয়ে ক্যাম্পাসের পুকুর পাড়ে গিয়ে বসে আছে লুবনা।
কিছুক্ষণ বাদেই দেখতে পেল স্যার এর ছেলেটা বসে বসে পুকুরে ঢিল ছুড়ছে।
লুবনা পাশে গিয়ে বললো,কি করছেন এখানে?
ছেলেটি লুবনার দিকে তাকিয়েই বসা থেকে উঠে দাড়ালো।
একি লুবনা?
লুবনা: আপনি আমার নাম ও জানেন?
ছেলেটি থতমত খেয়ে বললো,ওই যে বাবা বলেছে।
লুবনা: আপনার নাম কি?
-ইকবাল।কি করেন এখানে?
লুবনা: কোথাও যাবার জায়গা নেই।
ইকবাল: মানে?
লুবনা: বাসা ছেড়ে দিয়েছি।ভাড়া দিতে পারিনি তাই।
ইকবাল :চলেন কোন বাসার মালিক দেখে আসি।
লুবনা: মালিক দেখে কি হবে? আমিতো আর থাকতে পারবোনা।
ইকবাল: আরে চলুন তো।
জানেন আমার যখন মন খারাপ থাকে তখন এই পুকুরপাড় এ এসে বসি,তারপর ভালো খবর আসেই।
লুবনা: আমিতো আসলাম,আমার ভালো খবর আসবেনা?
ইকবাল: হুম অবশ্যই আসবে।
বাড়ির সামনে যেতেই ইকবাল বাড়িওয়ালাকে ডাক দিল।
-কি হয়েছে এখানে?আমার বাড়ির সামনে এতো চেঁচামিচি কেন?
ইকবাল: একজন মেয়েকে ঘর থেকে বের করে দেয়া কেমন স্বভাব চাচা?
তুমি কি এখানে মস্তানি করবার আইছো?
আমার ওমন পোষা মস্তান আছে।ভয় পাইনা আমি।
ইকবাল: চাচা মস্তানির কি দেখলেন?
দেখো এই মাইয়া ২মাসের ভাড়া দেয়নায়।
লুবনা: তার জন্য আমার অনেক জিনিসপত্র আপনি রেখে দিয়েছেন?
ইকবাল: কি ইনি আপনার জিনিস রেখে দিয়েছেন?
চাচা রুমের চাবি দেন?
-দিবনা কি করবা?
ইকবাল লোকের কলার ধরে বলে,আমি কি করতে পারি তা আপনি আন্দাজ ও করতে পারেন না।
লুবনা ভাবছে, শিমু ঠিক ই বলেছে এ তো পুরাই গুন্ডা।
কিন্তু আমার জন্য এমন গুন্ডামি কেন করছে ইনি?
লোকটা চাবি দিয়ে দিল।
ইকবাল লুবনাকে বললো,এই নিন চাবি।
ঝামেলা হলে আমায় বলবেন?
বাড়িওয়ালা উঠেই বলে এই মেয়ে কি লাগে আপনার?
বউ লাগে?
ইকবাল: কি লাগে তা জানার দরকার নাই।
কত টাকা পান তা আমায় হিসাব করে দিন আমি দিব।কিন্তু ওনার যাতে কোন ক্ষতি না হয় দেখবেন।
লুবনা এসবের কিছুর মানেই বুঝছেনা। এ ছেলে এমন আচরন কেন করছে তার কারন ও অজানা।
লুবনা কিছু না বলে রুমে চলে গেল..
ইকবাল ও সাথে গিয়ে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে দিচ্ছে।
লুবনা: আমি পারবো।
কেন যেন এতো উপকার করার পর ও লোকটাকে ভালো লাগছেনা।
দরজার ওখানে অনেক জন ভিড় করে রহস্যজনক ভাবে তাকিয়ে আছে।
মনে হয় খুব খারাপ কাজ করছে দুজন।
ইকবাল দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে লোকজন কানাঘুষা করছে।
কি বেপার এখানে এতো ভিড় কেন?
কেউ কিছু না বলে যে যার জায়গায় চলে গেল..
ইকবাল যাবার সময় লুবনাকে ফোন নম্বরটা লিখে দিয়ে বললো,দরকার হলে কল দিয়েন।
ইকবাল রুম থেকে যাবার সাথে সাথে লুবনা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো।
লোকটার আচরন লুবনার উপকার হলেও বিরক্তি লাগে।
জুলুম,গুন্ডামি কোন মেয়েরা ভালোবাসেনা।
মেয়েরা ভালোবাসে নায়ক এর মতন কাউকে…
লুবনা ভাবছে তার অদেখা সেই নায়ক কে,ইকু জানলে হয়তো এ বিপদ থেকেও উদ্ধার করতো আমায়।এই ভেবে জানালার পাশে গিয়ে দাড়ালো
সাঁঝের আধার কেটে গিয়ে কেবল রাত এ আধারে ছাইছে চারদিক।
লুবনা সেই আধারে তার বুকের ভেতর অজানা সব ক্ষত ঢেলে দিয়ে এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলছে,ইকু কোথায় তুমি?
পরের দিন লুবনা কলেজ এ যেতেই সবাই ওকে দেখে কানাঘুষা করা শুরু করে দিল।
কেউ ই ওর সাথে কথা বলছেনা।
যার কাছেই যাচ্ছে সেই ওকে রেখে চলে যাচ্ছে।
লুবনা এক মেয়েকে ডেকে বললো কি হয়েছে ইতি?
ইতি: মনে হয় কিছুই জানিস না?
লুবনা: কি জানবো?
ইতি: তুই ইকবাল ভাইয়ের সাথে একসাথে থাকিস?
তার কাছ থেকে টাকা নিস?
কিসের বিনিময় সে টাকা দেয়?
বুঝছিস আমরা কিছুই জানিনা।
শোন এসব ছেলেরা কয়েকদিন ফুর্তি করার পর চলে যায়।
তুই এমন ভুল করিস না।
এর মাঝেই আরেক মেয়ে ইতিকে ডাক দিয়ে বলছে ইতি ওর সাথে কথা বলিসনা তো…
মানুষ বাজে ভাববে…
লুবনা থ’ হয়ে দাড়িয়ে রইলো…
ইকবাল খারাপ জানতাম কিন্তু এতো খারাপ কি করে হয়!
উপকার করে তার সুযোগ নিচ্ছে এভাবে!
আজ ই এর জবাবদিহি চাইবো…দেখবো এবার কি করে নিজের মুখ দেখায়!
এই বলে লুবনা ইকবাল এর খোঁজে বের হলো..
” চলবে……………..