গাজীপুর জেলা ভ্রমণ গাইড

গাজীপুর জেলা বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল।

ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সংশ্লেষে কালােত্তীর্ণ মহিমায় আর বর্ণিল দীপ্তিতে ভাস্বর অপার।

সম্ভাবনায় ভরপুর গাজীপুর জেলা। গাজীপুর জেলার উত্তরে ময়মনসিংহ জেলা

কিশােরগঞ্জ জেলা, দক্ষিণে ঢাকা জেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে কিশােরগঞ্জ জেলা ও

নরসিংদী জেলা এবং পশ্চিমে ঢাকা জেলা ও টাঙ্গাইল জেলা অবস্থিত। গাজীপুরে রয়েছে

জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরসহ ১৯টি কেপিআই, ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়

ও দেশের একমাত্র হাইটেক পার্কসহ বহু সংখ্যক সরকারী, স্বায়ত্বশাসিত, বেসরকারী

প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র/মাঝারী ও ভারী শিল্প কারখানাসহ দেশের তৈরী পােষাকশিল্পের

বিরাট অংশ। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমা গাজীপুর জেলার

টংগীর তুরাগ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়।

গাজীপুরের দর্শনীয় স্থান

ভাওয়াল রাজবাড়ী, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান, আনসার একাডেমী-সফিপুর, নুহাশ পল্লী, জাগ্রত চৌরঙ্গী,

বলিয়াদী জমিদার বাড়ী, শ্রীফলতলী জমিদার বাড়ী,

নাগবাড়ী-চান্দনা চৌরাস্তা, নাগরী-পাঙ্জুরা চার্চ, রাংগামাটিয়া-কালীগঞ্জ, বঙ্গবন্ধু সাফারি

পার্ক, নাগরী টেলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গীর্জা, বড় ভূইয়া বাড়ী-ভবানীপুর, এছাড়াও

কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক ইউনিয়নের বাঁশতলী নামক গ্রামে সাম্প্রতিককালে

৩০০ বছরের পুরানাে একটি সাদা পাকুড় গাছ আবিস্কৃত হয়েছে যা এ পর্যন্ত

বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় নি। গাছটিকে ঘিরে পর্যটনশিল্প গড়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভাওয়াল রাজবাড়ী

পাওয়াল রাজবাড়ী অবিভক্ত ভারতবর্ষের বাংলা প্রদেশের ভাওয়াল এস্টেটে, বর্তমানে লাদেশের গাজীপুর জেলায় অবস্থিত একটি রাজবাড়ী। এই রাজবাড়ীর আওতায় আাওয়াল এস্টেট প্রায় ৫৭৯ বর্গমাইল (১,৫०० কিমি২) এলাকা জুড়ে ছিল যেখানে প্রায় আাখ প্রজা বাস করতাে। ভাওয়ালের জমিদার বংশের রাজকুমার রমেন্দ্রনারায়ণ রায় খারাে দুই ভাই মিলে এই জমিদারীর দেখাশোনা করতেন।

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান

ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যান। এই উদ্যানটি রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরে প্রায় ৪০ কিলােমিটার দূরে গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর ও শ্রীপুর উপজেলায় অবস্থিত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন (১৯৭৪) অনুযায়ী ৫,০২২ হেক্টর জায়গা জুড় পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের আদলে অভয়ারণ্যের ছাঁচে ভাওয়াল শালবনে এই উদ্যান গড়ে তােলে।

নিরিবিলি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ছুটে আসে এখানে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের মূল-উদ্ভিদ হলাে শাল। এছাড়াও নানারকম গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ এ উদ্যান। জাতীয় উদ্যানের ভেতরে বেশকয়েকটি বনভােজন কেন্দ্র, ১৩টি কটেজ ও ৬টি রেস্ট হাউস রয়েছে। উদ্যানে প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ৬ টাকা। এছাড়া পিকনিক স্পট ব্যবহার করতে হলে, বন বিভাগের মহাখালী কার্যালয় থেকে আগাম বুকিং দিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমী

বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি একাডেমী বাংলাদেশের আনসার বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর থেকে ৪৫ কিলােমিটার দূরে চাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে ৩৫৯ একর আয়তনের একটি এলাকাতে অবস্থিত। বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপির সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য গড়ে তােলা হলেও এখানকার-নান্দনিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারনে এটিকে পিকনিক ও শুটিং-এর জন্য ভাড়া দেয়া হয়। এই একাডেমীতে রয়েছে প্রকৃতিক অকৃত্রিম হোঁয়া- যেখানে অসংখ্য গাছপালা ও পাখ-পাখালির কুঞ্জনে সর্বক্ষণ মুখরিত থাকে। যা কিনা যেকেনাে দর্শনার্থীদের মন ছুয়ে যেতে সক্ষম। এখানে প্রায় ৪২টি পিকনিক স্পট রয়েছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, সবুজে ঘেরা অপূর্ব সুন্দর এই স্পটগুলো।

নুহাশ পল্লী

রাজধানীর অদূরে গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ২০ কিলােমিটার দূরে এক দুর্গম এলাকায় প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ নুহাশ পল্লী গড়ে তুলেছেন। সেখানকার নানা হথাপনা আর অসংখ্য ফলজ, বনজ গাছের পাশাপাশি তিনি বানিয়েছেন ঔষধি গাছের বাগান।

সব মিলিয়ে মনের মতাে করেই ছেলের নামে রাখা নুহাশ পল্লীকে এক স্বপ্নজগত করে তুলেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

তাই আড়াইশ প্রজাতির সবুজ গাছের সেই নন্ন কাননে বারবারই ছুটে গেছেন তিনি।

নুহাশ পল্লীতেই হুমায়ূন আহমেদ গড়ে তুলেছেন স্যু টিং স্পট, দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলা।

একটিতে থাকতেন আর বাকি দুটি ছিল তার শৈল্পিক চিন্তাধারার আরেক রূপ।

বলিয়াদী জমিদার বাড়ী

বলিয়াদী জমিদার বাড়ী কালিয়াকৈর উপজেলায় অবস্থিত প্রাচীনতম জমিদার বাড়ী এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতান্ত্বিক স্থাপনার মধ্যে একটি। বলিয়াদী এস্টেট মােঘল সম্রাট

জাহাঙ্গীর ফরমান বলে প্রতিষ্ঠিত হয় (ইংরেজী ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে)। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে

বলিয়াদী এস্টেটে অন্তর্ভুক্ত ছিল সমগ্র কালিয়াকৈর থানা। কালিয়াকৈর থানার লােক

সংখ্যা ছিল ৩২৭৮ জন। বাংলাদেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী এই এস্টেট আজও তার

কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বলিয়াদী নবাব কুতুব উদ্দিন সিদ্দিকীর পুত্র সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী

বলিয়াদী এস্টেটের প্রথম কর্ণধার ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক বা সংক্ষেপে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক বাংলাদেশের গাজীপুর

জেলার শ্রীপুর উপজেলাধীন মাওনা ইউনিয়নের বড় রাখুরা মৌজা ও সদর উপজেলার

পীরুজালী ইউনিয়নের পীরুজালী মৌজার খন্ড খন্ড শাল বনের ৪৯০৯.০ একর বন ভূমি

ছােট বড় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল হিসাবে পরিচিত।

পার্কের সময়সূচি : সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা, পর্যন্ত

দর্শনার্থীদের জন্য পার্কটি খােলা থাকে। প্রতি মঙ্গলবার পার্ক সাপ্তাহিক বন্ধ থাকে। এই

পার্কে সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে আসা যায়। তারপরও কেউ চাইলে পার্কে থাকতে পারেন।

রাত্রি যাপনের জন্য পাকে বিশ্রীমাগার আছে। থাকতে হলে আগে থেকে বুকিং

দিয়ে যেতে হবে। এছাড়া ঢাকার বাইরে থেকে আসলে গাজিপুর চৌরাস্তা এসে

যেকোনাে হােটেলে থাকতে পারেন। খাওয়া-দাওয়ার জন্য পার্কের প্রধান ফটকের একটু

আাগেই কয়েকটি রেস্তোরা আছে সেখানে খাওয়া দাওয়া করা যাবে। এছাড়া বাঘের

বাজারে কয়েকটি রেস্তোরা আছে সেখানেও খাবারের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া, পার্কের

ভিতরে দুটি ফুড কোর্ট আছে সেখানে ফাস্ট ফুড আইটেম সহ কোমল পানীয়, চিপস

ইত্যাদি পাবেন। সকালে গিয়ে অর্ডার করলে দুপুরের খাবার পাবেন। তবে ভিতরে কিছু

কেনার আগে দাম জিজ্ঞাসা করে কিনবেন।

বেলাই বিল

গাজীপুরের চিলাই নদী এবং সংলগ্ন বেলাই বিল হতে পারে ১টা দিন কাটাবার আদর্শ

জায়গা। বিশাল জলাভুমিতে নৌকায় করে সারাটা দিন পার করুন আর দেখুন জেলেদের

মাছ ধরা। সকালে ও এবং বিকেলে তাজা মাছ পাওয়া যায় এখানটায়। আসার সময়

কিনে নিয়ে আসুন। কানাইয়া বাজারের পাশেই চিলাই নদী। এখানে একটা নৌকা ভাড়া

করে নিন। ছােট নৌকা হলে সারাদিন নেবে ৫/৬শ টাকা। আর বড় নৌকা ২০০০

টাকা। বিশেষ অনুমতি নিয়ে রাতে নৌকাতেও থাকতে পারেন। তবে তার আগে

নিরাপত্তার দিকগুলাে ভালােভাবে যাচাই করে নেবেন। নৌকায় রাত কাটাতে হলে আগে

থেকে বাজার কমিটিকে অবহিত করে অনুমতি নিতে হবে।

 

নন্দন পার্ক

৩৩ একর জমির ওপর তৈরি পার্কটি ২০০৩ সালের ২ অক্টোবর দর্শনার্থীদের জন্য খােলা

হয়। সঙ্গেই রয়েছে ওয়াটার ওয়ার্ল্ড। এটি চালু হয় ২০০৪ সালে। খাবারের জন্য

রয়েছে চারটি ফুড কোর্ট। লকার ও ড্রেসিংরুমের সুবিধাও আছে। নন্দন পার্কটি বিভিন্ন ধরনের বিদেশি রাইডে সমন্বয়ে সাজানো।

আধুনিক ও আকর্ষণীয় রাইডগলোর তালিকায় রয়েছে ওয়াটার কোস্টার, কাটারপিলার, আইসল্যান্ড , প্যাডেল বোট, রিপলিং মুন রেকার , রক ক্লাইমরিং ওয়েব পুল, জিপ স্প্লাইড, কেবল কার, বাম্পার কার নেট এ-বল, সফট বল ক্যানন ইত্যাদি।