ভালোবাসি তাই । পর্ব -১৬

পুরো বাড়ি মানুষে ভর্তি হয়ে আছে। কোথাও এতটুকুফাঁক পাওয়া যাবে না। আমি তো এত মানুষ দেখেপাগলই হয়ে যাচ্ছি। আর আম্মু রান্না -বান্না করতেকরতে পাগল হয়ে যাচ্ছে। যদিও সবাই আম্মুকেসাহায্য করছে তারপরও দুই মেয়ের বিয়ে আম্মু কিআর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে। কাল আমারআর আপুর গায়ে হলুদ। আজকেই প্রায় সবাই চলেএসেছে। তাই হাত গুটিয়ে বসার কোনো জো নেই।যদিও আমাকে আর আপুকে কেউই কিছু করতেদিচ্ছে না। তারপরও আমি টুকটাক কাজ করছি।কাজের মধ্যে থাকলে কষ্টটা কমে তাই আমি সবারনিষেধ সত্ত্বেও কাজ করছি। আজকে আবার কাজওঠিকমত করতে পারছি না। সবকিছু করতেই আমারবিরক্ত লাগছে। আসলে বিরক্ত না কোনো কিছুকরতেই মন সায় দিচ্ছে না। ভালো লাগছে না কিছুই।কাল বাদে পরশু আমার জীবন থেকে আমার প্রথমএবং শেষ ভালোবাসাটাই হারিয়ে যাবে। শালার জীবনইচ্ছেকরছে এই জীবনকে লাথি মেরে ফেলে দেই। কিন্তুকি করবো চাইলেই তো জীবনকে ফেলে দেওয়া যায়না। যতদিন বেঁচে থাকবো এই কষ্ট নিয়েই আমাকেবেঁচে থাকতে হবে।।
সকাল থেকে সবাই ব্যস্ত বিকেলবেলা কমিউনিটিসেন্টারে যেতে হবে। বাড়ির দুই মেয়ের বিয়ে আত্মীয়-স্বজন তো কম না সেজন্য বাবা কমিউনিটি সেন্টারেইবিয়ের আয়োজন করেছেন। বাড়িতে গায়ে হলুদ, বিয়েকোনোটাই হবে না। কমিউনিটি সেন্টারে গায়ে হলুদকরার জন্য সায়ন ভাইয়া আর ইরাম ভাইয়ারাওআসবেন। বিকেলের মধ্যে যে করেই হোক আমাদেরকমিউনিটি সেন্টারে যেতে হবে। তাই জন্য সকালথেকেই ব্যস্ততা। আমি শুধু চুপচাপ এগুলো দেখছি।কোনো কিছুই আমার ভালো লাগছে না। বুকের ভেতরযেন কেউ ইচ্ছেমত হাতুরি পেটাচ্ছে। আমার কাছেএমন মনে হচ্ছে। আপুকেও দেখলাম কেমন গম্ভীর।সবার অদ্ভুদ ভিহেবিয়ার দেখে আমি কিছুই বুঝতেপারছি না কি হচ্ছে? তবে আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছেসেটা আমি বেশ বুঝতে পারছি। কেউ জানে না সায়নভাইয়াকে আমি কতটা ভালোবাসি। সায়ন ভাইয়াহয়তো নিজেও জানে না। সায়ন ভাইয়াকে আমি এতভালোবাসি বলেই হয়তো আমি এভাবে ওনার জন্যস্যাক্রিফাইজ করতে পারছি। সব মানুষই চায় তারভালোবাসার মানুষটা যেন সবচেয়ে বেশি সুখে থাকে।আমিও তার ব্যতিক্রম না। সায়ন ভাইয়া আমাকেভালোবাসলে বাসলো না বাসলে নাই আমি চাই সেযার সাথে ভালো থাকতে চায় তার সাথেই যেন ভালোথাকে।।
– কিরে কি এত ভাবছিস?
আমার ভাবনার মধ্যেই সারা এ কথা বলে উঠলো।ওকে আমি বলেছিলাম আজকেই চলে আসতে। এখনএসেছে। এতটাই নিজের ভাবনায় বিজি ছিলাম যেওকে খেয়ালই করিনি।
– তুই কখন এলি?
– অনেক্ষণ হলো। কিন্তু তুই তো আমাকে এতক্ষণদেখিস নি। কি ভাবছিলি অত বলতো?
– আমি আর কি ভাববো? কি ভাবি সেটা তো তুই ভালোকরেই জানিস।
– মালিহা কাল তোর ইরাম ভাইয়ার সাথে বিয়ে আরতুই এখনো সায়ন ভাইয়াকে নিয়ে ভাবিস?
– কি করবো আমি তুই এ বলে দে? আমি পারছি নাসারা আমি ওনাকে কিছুতেই আমার মন থেকে সরাতেপারছি না। আমার পাগল পাগল লাগছে সারা।
– শান্ত হ মালিহা। এত উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিস কেন?কেউ শুনতে পেলে কি হবে ভাবতে পারছিস?
– হুমম আচ্ছা ওসব বাদ দে।
– হুমম চল তোকে আর মারিয়া আপুকে নিয়ে আমাকেএক্ষুণিই কমিউনিটি সেন্টারে যেতে হবে। আঙ্কেলআমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে।
– এত তাড়াতাড়ি ওখানে গিয়ে কি করবো?
– আরে ওখানেই আলাদা রুম নেওয়া হয়েছে। পার্লারথেকে মহিলারা এসে তোদের দু বোনকে সাজিয়ে দিয়েযাবে বুঝলি?
– হুমম।
– তুই দশমিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নে আমি ততক্ষণেমারিয়া আপুকে বলে আসি ওকে?
– হুমমম যা।
গত তিনঘন্টা ধরে আমাকে আর আপুকে পার্লারেরমহিলারা সাজালো। আমার খুবই বিরক্ত লাগছিলএভাবে সং সাজতে। সবার নাকি সাজতে খুব ভালোলাগে আমার কোনো কালেই সাজতে ভালো লাগেনি।বিয়েতে সব মেয়েরাই কম বেশি সাজে কিন্তু আমারসাজতেই ইচ্ছে করছিল না। শুধু সবাই এটা সেটামন্তব্য করবে সেটা ভেবেই সাজলাম। সাজ শেষ এবারমহিলারা আমার আর আপুর হাতে মেহেদী লাগাতেশুরু করেছে। মেহেদী দিতে গিয়ে আমার মনে হলোপার্লারের মহিলারা যথেষ্ট ধৈর্য্যশীল। মেহেদী দিতেগেলে সবসময়ই আমার হাতের তালু চুলকাবে। যেহেতুতালুতে মেহেদী লাগানো থাকে তাই আমি তো আরহাতের তালু চুলকোতে পারবো না। আমি তখন শুধুনড়াচড়া করা শুরু করি। এখনো সেইম কাহিনী শুরুহয়েছে। কিন্তু পার্লারের মহিলারা কেউ আমাকেকোনো কিছু বলল না। কিন্তু আমি যদি ওদেরজায়গায় থাকতাম এতক্ষণে কনেকে ঝাড়ুপেটা শুরুকরতাম। আমার আবার ধৈর্য্য কম। কিন্তু মেহেদী দিতেঅনেক ধৈর্য্যের প্রয়োজন। আমি যেন না পারতেচুপচাপ বসে আছি। যদি পারতাম এতক্ষণে এখানথেকে উঠে চলেই যেতাম। কিন্তু এখন সেটা সম্ভব নাকারণ আমি বিয়ের কনে মেহেদী তো লাগাতেই হবে।মেহেদী লাগানোর মাঝেই মহিলা আমাকে জিজ্ঞেসকরলো আমার হাজবেন্ডের নামের প্রথম অক্ষর কী?আমার এ বিষয়টা বড়ই বাজে লাগে। হাতে নামলেখানোর কি আছে মনে নাম থাকলেই তো হবে।আমি বলে দিলাম নাম লিখতে হবে না। মহিলাও আরকিছু না বলে নিজের কাজ করতে লাগলো। মেহেদীলাগানো শেষ হতেই মহিলারা চলে গেলেন।পাক্কা বিশমিনিট পর আমি হাত ধুয়ে নিলাম। এবার শান্তিলাগছে। এতক্ষণ দু হাত উপরে তুলে রাখতে রাখতেহাত ধরে গেছে। তখনি সারা কোথা থেকে এলোআমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো।বুঝলাম না এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
– কিরে এরকম হ্যাংলার মত তাকিয়ে আছিস কেন?
– তুই আমার বেস্টু মালিহা?
– কেন ছিনতে পারছিস না ?
– সিরিয়াসলি মালিহা তোকে তো জাস্ট ফাটাফাটিলাগতেছে। আমি তো তোর প্রেমেই পড়ে গেলাম। যদিআমি ছেলে হতাম তোকে ঠিক প্রপোজ করতাম।
– হুমম হয়েছে আর এসব ন্যাকা কথা বলতে হবে না।ভালো লাগছে না।
– তোর আর মারিয়া আপুর কি হয়েছে বল তো?দুজনেরই ভালো লাগছে না। আচ্ছা তোর কেন ভালোলাগে না সেটা আমি জানি কিন্তু মারিয়া আপুর কিহয়েছে?
– আপুর আবার কি হবে? হয়তো সবার জন্য খারাপলাগছে তাই।
– আর একটা কথা তুই হাতে নাম কেন লেখাসনি সেটাআমি জানি। কিন্তু মারিয়া আপু কেন নাম লেখালোনা?
– আপু হাতে নাম লেখায়নি?
– নাহ তো।
– কি জানি আপুর কি হইছে আমি নিজেও জানি না?
– আচ্ছা এসব বাদ দে। তোকে কিন্তু সত্যিই খুব সুন্দরলাগছে। আজকে ইরাম ভাইয়া তোর থেকে চোখইসরাতে পারবে না।
– হয়েছে হয়েছে। এত কথা বলছিস কেন?
– আচ্ছা চল চল।
– কোথায় যাবো?
– কোথায় আর স্টেজে। সবাই অলরেডি চলে এসেছে।সায়ন ভাইয়া, ইরাম ভাইয়া এবং তাদের দুজনের পুরোফ্যামিলিই চলে এসেছে। এখন তোকে আর মারিয়াআপুকে নিয়ে যেতে হবে চল।
– হুমম চল।
স্টেজে আসার পর থেকে আমি নিচের দিকেই তাকিয়েআছি। মুখ তুলতে কেন জানি ভয় লাগছে। কমিউনিটিসেন্টারে চারটা আসন পাতা হয়েছে। বর কনেদেরজন্য। আমার আর আপুর আসন একসাথে। ইরামভাইয়া আর সায়ন ভাইয়া একসাথে বসেছেন। তবেআমরা যে পাশে বসেছি ঠিক তার বিপরীত পাশে।কিন্তু সামনা সামনিই। মাঝখানে অন্যসকলের বসারস্থান। সারা আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলর,
– নিচের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? ইরাম ভাইয়ারদিকে একবার তাকা। আজকে তো সব মেয়েরা ইরামভাইয়ার প্রতি ক্রাশ খাবে। ইরাম ভাইয়াকে আজএকেবারে চকলেট বয় এর মত লাগছে। একবার দেখ।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমি মুখ তুলে সামনের দিকেতাকালাম। কিন্তু প্রতিবারের মত এবারেও ভুলকরলাম। আমার চোখটা এবারেও সায়ন ভাইয়ারদিকেই গেছে। বাসন্তী রঙের একটা পাঞ্জাবী পরে ওনিমুচকি হাসি দিয়ে বসে আছেন। ওনাকে কোনোরূপকথার রাজকুমার বললেও বোধহয় ভুল হবে।আমি ওনার দিকেই তাকিয়ে আছি এক দৃষ্টিতে। যেনওনাকে দেখার পর আমার সময়টাই থমকে গেছে।তখনি ওনি আমার দিকে তাকালেন। আমি এবারলজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলাম। সারা আবার একটাগুঁতো মেরে বলল,
– কিরে কেমন লাগলো?
– ভালো।
– শুধুই ভালো?
– নাহ খুব ভালো। এতটাই ভালো যে তাকে দেখলেআমার পুরো পৃথিবীটাই থমকে গেছে। আমার মনেরভেতরে একটা শিহরন জেগে উঠেছে। তাকে দেখলেশুধু একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করে ভালোবাসি,ভালোবাসি শুধু আপনাকেই ভালোবাসি। তার হাসিদেখার জন্য আমি মরতেও রাজি। বড্ড ভালোবাসি যেতাকে।
– আমি ইরাম ভাইয়ার কথা জিজ্ঞেস করেছি মালিহা।তুই তো সব সায়ন ভাইয়াকে নিয়েই বললি।
আমি এবার বুঝতে পারলাম কি বলতে গিয়ে আমি কিবলে ফেলেছি।
– সরি সারা মনে ছিল না।
– আমার সাথে বলেছিস ঠিক আছে। ভুল করেও অন্যকারো সামনে এসব বলার চেষ্টা করিস না। ভাগ্যিসমারিয়া আপু ওয়াসরুমে গেছে না হয় তো সব ওনিওশুনে ফেলতো। আর কখনো সায়ন ভাইয়ার কথা মনেআনিস না।
– হুমমম।
সারা চলে গেল। আমি মনে মনে বললাম, আমার মনেযার বসবাস তাকে নাকি আমি মনে আনবো না। আরেবাইরে থেকে কি আনবো সে তো আমার মনেই আছে।আমার পুরোটা জুড়ে। তোরা সেটা কেউ জানিস নাতাই এসব বলিস।।
হলুদ অনুষ্ঠান শেষ। আমাকে আর আপুকে সবাইমিলে হলুদ লাগিয়ে ভূত বানিয়েছে। তাই আমাদেরজন্য যে আলাদা রুমটা নেওয়া হয়েছে সেখানে আমরাদুজন ফ্রেশ হতে চলে এলাম। আপুর বেশি অস্বস্থিহচ্ছিলো তাই আপুই আগে ফ্রেশ হতে গেল। আমাররুমে একা একা ভালো লাগছিলো না তাই রুমেরসামনে যে করিডোর আছে সেখানে আসলাম হাঁটতে।কিছুটা সামনে দেখলাম বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবী পরাকেউ অন্য দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। আমিএকটু এগিয়ে গিয়ে দেখতেই বুঝলাম এটা সায়নভাইয়া। হয়তো ওনারাও ফ্রেশ হতে এসেছেন। আমিআর ওনার সামনে পড়তে চাই না তাই পেছন ফিরেহাঁটা ধরলাম যাতে ওনি আমায় না দেখতে পান। তখনিপেছন থেকে ওনি বলে উঠলেন,

– আমাকে নতুন জীবনের জন্য

অভিনন্দন

জানাবি না?

আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে গেলাম। ওনি ধীরে ধীরে হেঁটেএসে আমার সামনেই দাঁড়ালেন। আমি নিচের দিকেতাকিয়ে আছি। ওনি আমার মুখটা তুলে ধরলেন।আমি ওনার দিকে তাকাতেই ওনি একটা মুচকি হাসিদিয়ে বললেন,
– সবাই মিলে তো তোকে একেবারে ভূত বানিয়েফেলেছে। সবাই তো তোকে হলুদ লাগালো আমিওএকটু লাগাই।
ওনার হাতের মুঠোয় আগে থেকেই হলুদ ছিল। ওনিআমার গালে হলুদ ছোঁয়াতেই আমার গাল বেয়েচোখের পানি পরতে লাগলো। ওনি আমার চোখেরপানি ওনার শাহাদাত আঙুল দিয়ে মুছে দিতে দিতেবললেন,
– কাঁদছিস কেন? তুই খুব সুখী হবি দেখিস।
– আমি বোধহয় আর বেশিদিন বাঁচবো না সায়নভাইয়া। আমার মনে হচ্ছে আপনার সাথে এটাইআমার শেষ দেখা।
– তোকে আমি যথেষ্ট স্ট্রং ভাবি মালিহা এসব চিন্তাতোর মাথায় আসে কোথা থেকে? এসবের কথাএকদম মাথায়ও আনবি না।
ওনার কথা শুনে আমার কান্নার বেগ আরো বেড়েগেল। এতক্ষণ ধরে রাখা জেদটা যেন নিমিষেই ভেঙ্গেগেল। আমি ওনার কাছে এক অন্যায় আবদার করেবসলাম,
– আমি কি শেষবারের মত একবার আপনাকে জড়িয়েধরতে পারি? আর কক্ষণো আপনার কাছে কিচ্ছুচাইবো না। এটাই আমার জীবনের শেষ আবদারআপনার কাছে প্লিজ।
ওনি আমার এমন আবদার শুনে একেবারেই চুপ হয়েগেলেন আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়েরইলেন। আমি ওনার এই চুপ থাকাকেই মৌন সম্মতিভেবে ওনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম। ওনি একহাতআমার পিঠে রেখে অন্য হাত দিয়ে আমার মাথায় হাতবুলিয়ে দিতে লাগলেন। আমি তখন ওনার বুকে মাথারেখে ইচ্ছেমত কাঁদছি। চোখের পানি যেন আর বাঁধমানতে চাইছে না। আমার মত বোধহয় সবাই তারভালোবাসার মানুষটাকে ছেড়ে যেতে এভাবেই কাঁদে।আমি কাঁদছি অঝোরে কাঁদছি। এতদিন জমিয়ে রাখাসব অভিমান আজ এই কান্নার মধ্যে দিয়েই বেরিয়েআসছে। আজ আমার আনন্দে -দুঃখে শুধুই কাঁদতেইচ্ছে করছে। কারণ আমি যে আমার ভালোবাসারমানুষটার বুকে মাথা রাখার সুযোগ পেয়েছি।।
চলবে,,,,