Breaking News

প্রেয়সী || পার্ট: ১|| লেখিকা: সুলতানা তমা

সাদা শুভ্র শাড়ি, এলোমেলো চুলগুলো কোমর ছুঁয়েছে, একহাতে রেশমি চুড়ি অন্যহাতে বুকল ফুলের মালা, পায়ে নূপুর, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে সে ছুটে চলেছে আর রাস্তার দুপাশের লতাপাতা গুলোকে সে আলতো হাতে ছুঁয়ে দিয়ে যাচ্ছে। তার নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ অনুসরণ করে আমিও ছুটছি তার পিছুপিছু, দেখতে চাই সে সত্যিই কোনো মানবী নাকি কোনো পরী। তাকে যে আমার বড্ড চেনা লাগে। তার নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ আমাকে মাতাল করে…
“আয়াস আয়াস”
লাফ দিয়ে উঠে বসলাম, আমার শরীর কাঁপছে। আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকালাম, আম্মু পাশে বসে আছেন। আম্মুর কোলে মাথা রেখে আবার শুয়ে পড়লাম।
আম্মু: আবারো সেই স্বপ্ন দেখছিলি?
আমি: হুম।
আম্মু: এই অসময়ে ঘুমাস কেন বলতো?
আমি: ওই মানবী আমার স্বপ্নে এসে বারবার আমার সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে আম্মু, অবশ্য আমিতো জানিই না ও সত্যি মানবী নাকি কোনো পরী।
আম্মু: কতবার বলবো এইটা শুধুমাত্র একটা স্বপ্ন এছাড়া কিছু…
আমি: কিন্তু আম্মু একই স্বপ্ন আমি বারবার দেখবো কেন? আর ওই মেয়েটাই বা কেন বারবার আমার স্বপ্নে এসে আমাকে বিরক্ত করবে?
আম্মু: আগেই বলেছি এই মেয়ের সাথে তোর কোথাও দেখা হয়েছিল আর ও তোর মনে গেঁথে আছে তাই স্বপ্নে…
আমি: আম্মু কতবার বলবো ওকে আমি কখনো দেখিনি।
আম্মু: স্বপ্নে ওর চেহারা দেখেছিস কখনো?
আমি: না, ও তো শুধু আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
আম্মু: তাহলে বুঝলি কিভাবে ওর সাথে যে তোর কখনো দেখা হয়নি? (আম্মুর এই প্রশ্নে যুক্তি আছে তাই কোনো কথা না বলে ফ্যালফ্যাল করে আম্মুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। কেন যে এই মেয়ে আমাকে স্বপ্নে এসে এতো জ্বালাচ্ছে আল্লাহ্‌ জানেন)
আম্মু: আছর এর আযান হয়েছে উঠে নামাজ পড়ে নে।
আমি: ওকে আম্মু।
আম্মু: ওহ হ্যাঁ মনে আছে তো আজ তোর আব্বুর সাথে এক জায়গায় বিয়েতে যাওয়ার কথা? (আম্মু চলে যাচ্ছিলেন দরজা থেকে ফিরে এসে কথাটা বললেন। বিরক্তি নিয়ে আম্মুর দিকে তাকালাম)
আম্মু: প্লিজ আয়াস এমন করিস না, তোর আব্বু কিন্তু রেগে যাবে তুই না গেলে।
আমি: কিন্তু আম্মু কার না কার মেয়ের বিয়েতে আমি কেন যাবো?
আম্মু: কারণ তোর আব্বু বলেছেন।
আমি: হুম।
আম্মু চলে গেলেন, আমিও ওযু করতে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম।
নামাজ পড়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসলাম, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না সবাই কোথায় গেল?
তনিমা: ভাইয়া? (পত্রিকাটা হাতে নিতে যাচ্ছিলাম ওমনি তনিমার ডাকে কেঁপে উঠে সামনে তাকালাম, ওর হাতে পাঞ্জাবী দেখে বেশ অবাক হলাম)
আমি: পাঞ্জাবী দিয়ে কি করবি? বিএফ কে গিফট করবি নাকি?
তনিমা: আমার কোনো বিএফ নেই বুঝেছ? এইটা তোমার জন্য চাচ্চু দিয়েছেন।
আমি: লাল পাঞ্জাবী দিয়ে আমি কি করবো?
আব্বু: বিয়েতে যাবো পড়ে নাও পাঞ্জাবীটা।
আমি: কিন্তু আব্বু…
আব্বু: যা বলেছি শুনো।
আমি: (নিশ্চুপ)
আব্বু: আমরা আধা ঘন্টা পর বেরুবো।
আমি: তনিমা যাচ্ছে তো আমাদের সাথে? (আমার প্রশ্ন শুনে আব্বু আমার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকালেন। একে একে সবাই ড্রয়িংরুমে চলে আসলো)
আম্মু: তনিমা কেন যাবে? তুই আর তোর আব্বু যাচ্ছিস।
আমি: না মানে তনিমা আমার আশেপাশে না থাকলে সবকিছু কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা লাগে। তাছাড়া যেখানে যাচ্ছি আমিতো সেখানের কাউকে ছিনি না তনিমা থাকলে…
চাঁচি: দেখেছ সবাই আয়াস তনিমাকে কেমন চোখে হারায়।
আম্মু: ছোট বোনকে চোখে হারাবে নাতো কি?
ভাবি: চাচ্চু নিয়ে যান তনিমাকে এতে আয়াস এর মন ভালো থাকবে।
আব্বু: ঠিক আছে।
তনিমা যাচ্ছে শুনে মন ভালো হয়ে গেলো। তনিমার চুল ধরে একটা টান দিয়ে পাঞ্জাবীটা ওর থেকে কেড়ে নিয়ে চলে আসলাম। আব্বু, আম্মু, চাচা, চাঁচি, ভাইয়া, ভাবি, দাদি সবাই আমার চলে আসার দিকে তাকিয়ে হাসছে। এই পরিবারটাকে আমি খুব ভালোবাসি আর সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি তনিমাকে। তনিমা আমার চাচাতো বোন তবুও ওকে অনেক ভালোবাসি কারণ আমার আপন ভাই বোন নেই।
তনিমা আর আমি গাড়িতে বসে বসে এয়ারফোন দিয়ে গান শুনছি। আব্বু সামনের সিটে বসে আছেন। হঠাৎ তনিমা আমার দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠলো।
আমি: কি?
তনিমা: এতক্ষণ লক্ষ করিনি, জানিস তোকে কেমন দেখাচ্ছে?
আমি: কেমন?
তনিমা: নতুন বরের মতো, মনে হচ্ছে আজ তোর বিয়ে।
আমি: থাপ্পড় খাবি ফাজি মেয়ে।
তনিমা: এজন্যই কারো প্রশংসা করতে নেই।
আমি: এইটা প্রশংসা? আচ্ছা বিয়ে তো হয় দুপুরে তাহলে আমরা এই সন্ধ্যাবেলায় বিয়েতে যাচ্ছি কেন? ওখানে থাকতে হবে নাকি?
তনিমা: শুনেছি ওরা হিন্দু। মেয়ের মামা নাকি আমাদের কোম্পানিতে কাজ করে, আব্বু আর চাচ্চুর খুব বিশ্বস্ত লোক।
আমি: হুম বুঝলাম। শেষমেশ হিন্দু মেয়ের বিয়ে খেতে যাচ্ছি।
তনিমা: তাতে কি হয়েছে?
আমি: জানিস তো আমার এসব ভালো লাগে না।
তনিমা: কি আর করার চাচ্চুর ইচ্ছে।
আমি: হুম।
গাড়ি ছুটে চলেছে, আমি কানে এয়ারফোন গুঁজে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। যদিও যেতে ইচ্ছে করছে না তবুও যাচ্ছি কারণ আব্বু চেয়েছেন। আব্বুকে একটু বেশিই শ্রদ্ধা করি ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকে যা চেয়েছি আব্বু আমাকে তাই দিয়েছেন বিশেষ করে স্বাধীনতা। আমি জানি আব্বুও আমাকে খুব ভালোবাসেন, আব্বু যা করেন আমার ভালোর জন্যই করেন। তাছাড়া আমিতো তাদের একমাত্র সন্তান।
পাহাড়ের কাছে ছোট একটি গ্রাম আর সেই গ্রামের ছোট একটি বাড়িতে এসে আমাদের গাড়ি থামলো। বেশ সুন্দর করে পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে।
“স্যার আপনি এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি”
চারপাশে চোখ বুলাচ্ছিলাম হঠাৎ কথাটা শুনে সামনে তাকালাম, উনিই বোধহয় আমাদের অফিসে চাকরি করেন।
–আয়াস বাবা তনিমা মামুনি তোমরা কেমন আছ? তোমরা আসবে আমিতো ভাবতেই পারিনি।
আব্বু: আয়াসকে তো আসতেই হতো।
–স্যার কিছু বললেন?
আব্বু: না, চলো।
আব্বুর পিছু পিছু যাচ্ছি। কিন্তু আব্বু বিড়বিড় করে এই কথা কেন বললেন যে আমাকে আসতেই হতো?
আব্বু বসে কয়েক জনের সাথে গল্প করছেন, আমি পাশেই দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ তনিমা এসে আমার হাত ধরে টানতে শুরু করলো।
তনিমা: দাঁড়িয়ে থাকার জন্য এসেছিস নাকি? বিয়ে শুরু হয়ে গেছে চল দেখবো।
আমি: তুই দেখ গিয়ে আমার এসব ভালো লাগে না।
তনিমা: প্লিজ চল না। আমি কখনো হিন্দুদের বিয়ে দেখিনি।
আমি: তোকে আমি…
তনিমা: বাসায় গিয়ে বকিস, চল প্লিজ!
আমি: ঠিক আছে চল, পাগলী কোথাকার।
তনিমা আমাকে টানতে টানতে ছাদনাতলার কাছে নিয়ে আসলো। বিয়ে শুরু হয়ে গেছে। বর বসে আছে আর পুরোহিত কনেকে আনার জন্য বলছে। আমি আর তনিমা বরের ঠিক পিছন দিকে দাঁড়িয়ে আছি, তনিমা বিয়ে উপভোগ করছে আর আমি ফোন টিপছি। হঠাৎ সাখ আর ওলূর শব্দে সামনে তাকালাম, কনেকে নিয়ে আসা হয়েছে। কনে তো পান পাতা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে আর বর দিব্যি হাসছে।
“এবার শুভ দৃষ্টি হবে, অর্পিতা পান পাতাটা সরা”
অর্পিতা নামটা কিন্তু দারুণ। মেয়েটি পান পাতা একটু একটু করে সরাচ্ছে দেখে বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রইলাম। পান পাতা একটু সরাতেই মেয়েটির চোখ দুটোতে আমার চোখ আটকে গেল, টানাটানা গভীর শান্ত চোখ দুটোতে কেমন যেন নেশা ধরানো কিছু আছে, এই চোখ দুটির দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যাবে, তলিয়ে যেতে হবে শান্ত দুটি চোখের গভীরতায়। হঠাৎ আযানের ধ্বনিতে আমার ঘোর কাটলো, চোখ ফিরিয়ে নিলাম মেয়েটির মায়াবী চোখ দুটোর থেকে।
আমি: তনিমা আমি আসছি।
তনিমা: কোথায় যাচ্ছিস?
আমি: মাগরিব এর আযান হয়েছে নামাজ পড়ে আসি।
তনিমা: ঠিক আছে তাড়াতাড়ি চলে আসিস।
তড়িঘড়ি করে ছাদনাতলার কাছ থেকে সরে আসলাম। কিছুক্ষণের জন্য যেন আমি কোনো এক মোহতে আটকে গিয়েছিলাম। এইটা তো ঠিক না, অচেনা এক মেয়ের চোখ দেখে আমি তার চোখের গভীরতায় হারিয়ে যাচ্ছিলাম কিন্তু কেন? আমার সাথে এসব কি হচ্ছে?
পাহাড়ের পাশের ছোট মসজিদটিতে নামাজ পড়ে মসজিদের বাইরে বসে রইলাম। চারপাশ যেন খুব দ্রুতই অন্ধকার হয়ে আসছে, হয়তো পাহাড়ি এলাকা বলে। সবুজে ঘেরা চারপাশটা একটু ঘুরে দেখতে ইচ্ছে হলো তাই উঠে দাঁড়ালাম, ছোট আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এক পা দুপা করে হাটতে শুরু করলাম। হঠাৎ ছোট একটি রাস্তায় এসে থমকে দাঁড়ালাম, এইতো সেই রাস্তা যে রাস্তা আমি স্বপ্নে দেখি, এই রাস্তা দিয়েই তো ওই মানবী দৌড়ে পালিয়ে যায়। রাস্তার দুপাশের লতাপাতা গুলোর দিকে চোখ পড়লো, এগুলোই তো সে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আলতো হাতে ছুঁয়ে দিয়ে যায়। আচ্ছা তবে কি ওই মানবী এখানেই কোথাও আছে? হঠাৎ ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো, রিসিভ করলাম।
আমি: হ্যালো।
আব্বু: কোথায় তুমি?
আমি: নামাজ পড়তে এসেছিলাম।
আব্বু: এতক্ষণ লাগে? চারপাশ অন্ধকার হয়ে রাত নেমে আসছে, পাহাড়ি এলাকা অচেনা জায়গা কিছু তো ছিনো না যদি কোনো বিপদ হয়?
আমি: আসছি আমি।
আব্বু: তাড়াতাড়ি এসো।
ফোন রেখে বিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
বেশ দূর থেকেই শুনা যাচ্ছে বিয়ে বাড়ির হৈচৈ। কিন্তু আগে তো এতোটা হৈচৈ ছিলনা, কোনো সমস্যা হয়নি তো? চারপাশের মানুষজনরা কি যেন বলাবলি করছে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না।
আব্বু: এই তোমার আসার সময় হলো? (চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম হঠাৎ আব্বু এসে আমার হাত চেপে ধরায় সামনে তাকালাম, উনি তো মেয়ের মামা কিন্তু উনি এভাবে কাঁদছেন কেন?)
তনিমা: ভাইয়া জানো বিয়েটা ভাঙ্গতে বসেছে। (তনিমার কথা শুনে অবাক হলাম, আমিতো দেখে গিয়েছিলাম শুভ দৃষ্টি হচ্ছে এতক্ষণে তো বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা)
আমি: কিন্তু…
তনিমা: মেয়েটার মায়ের অবস্থা ভালো না বোধহয় বাঁচবে না।
আমি: বিয়েটা ভাঙ্গলো কেন?
আব্বু: এখনো ভেঙ্গে যায়নি কিন্তু লগ্ন শেষ হতে আর কিছুক্ষণ বাকি। (ছাদনাতলার দিকে নজর পড়লো বর নেই, অর্পিতা পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে আর ওর চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে)
তনিমা: বর যখন কনের সিঁথিতে সিঁদুর দিবে তখনি বরের ফোন বেজে উঠে ব্যস বর তড়িঘড়ি করে কোথায় যেন ছুটে গেল, যাওয়ার আগে কনেকে বলে গিয়েছিল তার জন্য অপেক্ষা করতে…
আব্বু: কিন্তু লগ্ন শেষ হতে চলেছে তবুও বর আসার নাম নেই। এবার মনে হয় মেয়েটা লগ্নভ্রষ্টা হবে।
আমি: বরের বাড়ির লোকজন কোথায় তাদে…
আব্বু: আরে মেয়ের মামাতো ভাই তো বর। (সব কেমন যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে, আমি যতটুকু জানি হিন্দু মেয়েরা লগ্নভ্রষ্টা হলে তাদের আর বিয়ে হয় না, এবার মেয়েটার কি হবে?)
হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠলো, আম্মু কল করেছেন দেখে একটু দূরে এসে রিসিভ করলাম।
আমি: হ্যাঁ আম্মু বলো।
আম্মু: তোদের ফিরতে কতক্ষণ লাগবে?
আমি: জানিনা আম্মু বিয়েটাই তো ভেঙ্গে যাচ্ছে।
আম্মু: কি বলিস?
আমি: বর কি এক ইম্পরট্যান্ট কল পেয়ে ছুটে গেল আর এদিকে লগ্ন শেষ হতে চলেছে।
আম্মু: মেয়েটা এখন লগ্নভ্রষ্টা হবে।
আমি: হয়তো।
আম্মু: আচ্ছা তাড়াতাড়ি ফিরিস।
আমি: ঠিক আছে।
ফোন রেখে পিছন ফিরতেই আব্বু আর অর্পিতার মামাকে দেখে চমকে উঠলাম, ওরা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে কেন?
আব্বু: আয়াস লগ্ন শেষ হতে আর কিছুক্ষণ সময় বাকি, দুর্জয় মানে বর’কে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।
আমি: তো?
আব্বু: মেয়েটাকে লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার হাত থেকে বাঁচাবি? (আব্বুর কথার কিছুই বুঝতে না পেরে আব্বুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম)
আব্বু: অর্পিতাকে তুই বিয়ে করে নে। (আব্বুর কথা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো, কি বলছে আব্বু এসব? আমি দফ করে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। অর্পিতার মামা এসে আমার পায়ের কাছে হাটু গেড়ে দুহাত জড়ো করে বসে পড়লেন)
আব্বু: তুই পারিস এখন তিনটা জীবন বাঁচাতে। অর্পিতা লগ্নভ্রষ্টা হলে লোকে হাজারটা কথা শুনাবে আর সেটা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটা হয়তো সুইসাইড এর রাস্তা বেছে নিবে। অর্পিতার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, মেয়েটা লগ্নভ্রষ্টা হলে হয়তো উনি মারা যাবেন। আর সুমিতকে দেখ তোর পায়ের কাছে বসে আছে, অর্পিতাকে ছোটবেলা থেকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসে মানুষ করেছে…
আমি: কিন্তু আব্বু আমিই কেন? বিয়ে বাড়িতে কি আর কোনো ছেলে নেই? তাছাড়া আমি মুসলমান আর অর্পিতা হিন্দু, একজন মুসলমান ছেলে আর একজন হিন্দু মেয়ের বিয়ে কিভাবে সম্ভব?
আব্বু: সুমিত যে ছিনিস? ও আমাদের কোম্পানির ম্যানেজার, সবসময় সুখে দুঃখে আমার পাশে রয়েছে আর আজ ওর বিপদে আমি ওর পাশে থাকবো না? অর্পিতা হিন্দু হয়েছে তো কি হয়েছে এখন তো এরকম অনেক বিয়ে হচ্ছে।
আমি: হয়তো হচ্ছে কিন্তু আমি করবো না, হিন্দু মেয়েকে বিয়ে জাস্ট ইম্পসিবল।
আব্বু: আয়াস? আমি বলেছি যখন তখন তোমাকে এই বিয়েটা করতে হবে।
আমি: আব্বু তুমি কিন্তু আমাকে জোড় করছ।
আব্বু: হ্যাঁ করছি, বুঝিয়ে বললে যদি না বুঝো তাহলে তো জোড় করতেই হবে।
তনিমা: চাচ্চু এইটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না, চাঁচি শুনলে…
আব্বু: একদম চুপ। (আব্বুর ধমক শুনে তনিমা ভয়ে এসে আমার পিছনে লুকাল। এখন আমি কি করবো? আব্বু কেন এমন পাগলামি করছেন? আচ্ছা শুধু কি অর্পিতা লগ্নভ্রষ্টা হবে এটাই কারণ নাকি অন্য কিছু?)
আব্বু: চলো আমার সাথে।
আমি: কোথায়?
আব্বু আমার হাত ধরে টানতে টানতে ছোট একটি রুমে নিয়ে আসলেন, বিছানায় একজন অসুস্থ মহিলা শুয়ে আছেন, সম্ভবত উনিই অর্পিতার মা। আব্বু আমাকে টেনে এনে অসুস্থ মহিলার পাশে বসিয়ে দিলেন, উনি আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, উনার চোখে পানি অথচ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
–বাবা? (কাঁপাকাঁপা কন্ঠে উনি আমাকে বাবা ডাকলেন, উনার মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। উনাকে দেখে উনার মুখে বাবা ডাক শুনে আমার ভিতরে কেমন যেন একটা হচ্ছে, ভিতরটা কেমন যেন দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে)
–ওরা বলছে তুমি নাকি অর্পিতাকে বিয়ে করবে? অর্পিতা আমার একমাত্র মেয়ে, ও লগ্নভ্রষ্টা হলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। অর্পিতা লগ্নভ্রষ্টা হলে হয় আমি অসুস্থ অবস্থায় মারা যাবো নাহয় আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।
আমি: না। আমি বিয়ে করবো আপনার মেয়েকে। (জানিনা কিসের টানে বলে ফেললাম এই কথা, আমার কথা শুনে উনার মুখে এক চিলতে হাসি ফুঁটে উঠলো)
আব্বু: চল তাহলে।
আব্বু চোখের পানি মুছতে মুছতে আমাকে নিয়ে ছাদনাতলার দিকে রওনা হলেন।
ভাবছি.. ভাবছি কি হবে আমার ভবিষ্যৎ? একজন হিন্দু মেয়েকে নিয়ে সারাটা জীবন কাটাতে হবে আমাকে? কিন্তু এ কি করে সম্ভব? একজন অচেনা অজানা মেয়েকে হুট করে বিয়ে করে নিচ্ছি পারবো তো তাকে কখনো ভালোবাসতে? স্ত্রীর মর্যাদা দিতে? আচ্ছা একজন মুসলিম ছেলে আর একজন হিন্দু মেয়ের বিয়ে কি আদৌ সম্ভব?
আব্বু: আয়াস আয়াস… (হঠাৎ আব্বুর ধাক্কায় কেঁপে উঠে সামনে তাকালাম, অর্পিতা আমার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে)
পুরোহিত: বিয়ে কি শুরু করবো?
অর্পিতা: না। দুর্জয় আসবে, ও আমাকে বলেছে ওর জন্য অপেক্ষা করতে।
মামা: অর্পিতা পাগলামি করিস না লগ্ন কিন্তু শেষ হয়ে যাচ্ছে। শেষে কি লগ্নভ্রষ্টা হবি নাকি?
অর্পিতা: কিসের লগ্নভ্রষ্টা? আমি মানিনা এসব, আমি দুর্জয়কে ভালোবাসি আর ওকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবো না।
মামা: তাহলে এই কথাটা তোর মা’কে গিয়ে বল, এমনিতে আমার বোনটা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে তোর মুখে এসব শুনে মারা যা…
অর্পিতা: না, মা’র কিচ্ছু হবে না আমি বিয়ে করবো।
আমি: কিন্তু আমার দুইটা শর্ত আছে। (আমার কথা শুনে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে)
তনিমা: ভাইয়া চাচ্চু কিন্তু রেগে যাবে।
আমি: শর্ত দুইটা মানলে তবেই আমি এই বিয়ে করবো।
আব্বু: কি শর্ত?
আমি: উনাকে যদি আমার সাথে সারাজীবন থাকতে হয় তাহলে উনাকে হিন্দু ধর্ম ছেড়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। আর দ্বিতীয়টি হলো এই মুহূর্তে বিয়েটা আমার ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী হবে।
অর্পিতা: এখন নাহয় বিয়েটা আপনার ধর্ম অনুযায়ী হবে কিন্তু আমি ইসলাম ধর্ম কখনোই গ্রহণ করবো না কারণ আমি আপনার সাথে সারাজীবন থাকবোই না, বিয়ের কিছুদিন পরেই আমি আপনাকে ডিভোর্স দিবো।
মামা: আহ্ অর্পিতা কি হচ্ছে কি বলছিস এসব? আয়াস বাবা তুমি যা বলবে তাই হবে, বিয়ে তোমাদের ধর্ম মতেই হবে।
আব্বু: তাহলে শুরু করো।
কাজী সাহেব অর্পিতাকে বারবার কবুল বলতে বলছেন কিন্তু অর্পিতা বলছে না। অর্পিতা বারবার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে, হয়তো দুর্জয় এর আসার অপেক্ষা করছে। অর্পিতা তো দুর্জয়কে ভালোবাসে, আমি ওকে বিয়ে করে কোনো ভুল করছি নাতো? না না ভুল কেন হবে আমিতো অর্পিতাকে লগ্নভ্রষ্টা হওয়ার থেকে বাঁচানোর জন্যই বিয়েটা করছি। আর তিন তিনটা জীবন বাঁচানো কি কখনো ভুল হতে পারে?
অর্পিতা: কবুল… (অর্পিতার কন্ঠে কবুল শব্দটা শুনে ওর দিকে তাকালাম, খুব কাঁদছে)
আব্বু: আয়াস এখানে সিগনেচার কর। (রেজিস্ট্রি খাতায় সিগনেচার করে অর্পিতার দিকে খাতাটা এগিয়ে দিলাম, অর্পিতা কলম হাতে নিয়ে বসে আছে আর চোখের পানি ফেলছে)
মামা: অর্পিতা সিগনেচারটা কর মা।
অর্পিতা: হুম। (অর্পিতা সিগনেচার করতেই আব্বু খুব বড় করে একটা সস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন)
আব্বু: অবশেষে বিয়েটা হয়ে গেল তাহলে।
দুর্জয়: অর্পিতা? (হঠাৎ দূর থেকে দুর্জয় অর্পিতাকে ডেকে উঠলো, অর্পিতা দুর্জয় এর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো)
অর্পিতা: বলেছিলাম তো আমার দুর্জয় ফিরে আসবে এসেছে তো? তোমরা কেউ আমার কথা শুননি, এবার আমি কি করবো?
অর্পিতা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে দুর্জয় এর দিকে ছুটে গেল। দুর্জয় এর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অর্পিতা ঢুকরে কাঁদছে, সাথে দুর্জয়ও কাঁদছে। এবার কি হবে? দুটো ভালোবাসার মানুষকে আমি আলাদা করে দিলাম? এই বিয়েটা করে কি তবে ভুল করলাম আমি…
চলবে?

No comments