ভালোবাসি তাই । পর্ব -০৮

সারার কথার কোনো জবাব আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সারাকে কেমন যেন আমার কাছে বড়ই গম্ভীর মনে হচ্ছে। এই সারাকে তো আমি ছিনি না।
– কি আমি ভুল কিছু বলেছি?
আমি চমকে উঠে উত্তর দিলাম,
– নাহ।
– তোকে বারবার এত অপমান করার পরও তুই কেন সায়ন ভাইয়ার কাছে ছুটে যাস মালিহা?
– ভালোবাসি তাই।
– ওনি কোনোদিনও তোকে ভালোবাসবে না। তার থেকেও আমি বলি কি তুই অন্য কাউকে ভালোবাসার চেষ্টা কর। দেখবি সায়ন ভাইয়াকে তুই এমনিতেই ভুলে যাবি।
– সায়ন ভাইয়াকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসা আমার পক্ষে সম্ভব না সারা ।
– অসম্ভব তুই করছিস। চেষ্টা করলেই পারবি। আমার মনে হয় সেরকম কেউ তোর আশেপাশেই আছে। তুই বুঝতে পারছিস তো আমি কার কথা বলছি?
– ইরাম ভাইয়ার কথা বলছিস?
– হুমম। আমার মনে হয় ইরাম ভাইয়া তোকে পছন্দ করে। আর ইরাম ভাইয়া সায়ন ভাইয়ার থেকে কোনো অংশে কম না।
– সারা তুই খুব ভালো করেই জানিস আমি সায়ন ভাইয়ার সাথে কখনো কারোর তুলনা করি না। যে মানুষটাকে ছোট থেকেই ভালোবেসেছি সেই মানুষটাকে চোখের সামনে দেখেও নিজের অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখা আমার জন্য কতটা কষ্টকর সেটা তুই বুঝবি না রে।
– তারপরও একটু কি ভাবা যায় না।
– সময়ের উপরে সব ছেড়ে দিয়েছি। সময় যেভাবে চলতে শিখাবে আমাকে আমি সেভাবেই চলবো।
– আমার কথাটা একটু চিন্তা করিস।
– ভালো লাগতেছে না সারা এসব বাদ দে।
– আচ্ছা ।
.
আমি আর সারা চুপচাপ কিছুক্ষণ হাঁটলাম। তারপর আমরা দুজন ঝিনুক মার্কেটে গেলাম। বিচের পাশেই সেটা। সারা ঝিনুকের তৈরী নানান জিনিস কিনতে লাগলো। আমার তেমন কিছু পছন্দ হচ্ছিলো না। আমি ঘুরে ঘুরে মার্কেটটা দেখতে লাগলাম। হঠাৎ একটা পায়েল চোখে পরলো। পায়েলটা খুব সুন্দর। আমি সেটা মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। তখনি সারা ডাক দিল হোটেলে যাওয়ার জন্য। পায়েলটা আর কেনার সময় পেলাম না। সারার সাথে রুমে চলে আসলাম।।
.
ডিনারের জন্য সবাই রেস্টুরেন্টে আসলাম। সায়ন ভাইয়াকে দেখলাম একটা নেবে ব্লু টি -শার্ট পরে হাতদুটো প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছেন। ওনাকে খুব সুন্দর লাগছিল। ওনি রিসেপশনের সাথেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেহায়া তো তাই বারবার ওনার দিকেই চোখটা চলে যাচ্ছিলো। সায়ন ভাইয়া আর তার বন্ধুরা সামনের দিকেই বসেছে। আমি আর সারা পেছনের দিকে সিট পেয়েছি। ওখানেই দুজন বসে পড়লাম। সারা কিছু ভাবছে আর খাচ্ছে। আমারও সেইম কন্ডিশন। আমার তো ভাবার জিনিসের অভাব নেই। আমি সেগুলোই ভাবছি। এভাবে ভাবতে ভাবতে আমরা ডিনার শেষ করলাম।।
.
আমার আর সারার ডিনার করতে অনেকটা লেট হয়ে গেছে। অনেকেই রুমে চলে গেছে। চোখ বুলিয়ে দেখলাম সায়ন ভাইয়ারাও চলে গেছে। তখন রাত ১০টা বেজে ২০ মিনিট। আমি সারাকে বললাম,
– এত তাড়াতাড়ি রুমে গিয়ে কি করবো? চল দুজনে একটু রাতের সমুদ্র দেখে আসি।
– আচ্ছা চল। তবে এখন সমুদ্র অনেক নিঃশব্দ কোনো মানুষ নেই। তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে হবে কিন্তু।
– আরে যাবো আর আসবো।
– হুমমম।
আমি আর সারা নিস্তব্ধ বিচে পাশাপাশি হাঁটছি। সমুদ্র এখন বড়ই নীরব। যেন সে তার সঙ্গিনীকে হারিয়ে নিজের অস্তিত্বই লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। এত ধীরে ধীরে ঢেউগুলো তীরে আসছে যেন তার কোনো শক্তিই নেই। সমুদ্রের যেন ছন্দপতন ঘটেছে। আমার মনে অনেক কথা জমে আছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে সায়ন ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরে মনের কথাগুলো বলে দেই। কিন্তু ওনার সামনে গেলেই ওনি বলবেন বেহায়া, ছেঁচড়া। ওনার মুখে এসব শুনতে আমার একটুও ভালো লাগে না। সারার হাতটা চেপে ধরে বললাম,
.
– আমাকে ভালোবাসলে কি সায়ন ভাইয়ার খুব ক্ষতি হতো বল? ওনি কি বুঝেন না আমার ফিলিংসগুলো? কেন ওনি এসব মজা ভেবে উরিয়ে দেন? ওনি কি বুঝতে পারছেন না ওনাকে হারানোর যন্ত্রনাটা এখনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছে? কেন বুঝলো না আমার ভালোবাসাটা?
– চুপ করবি? তোর ঐ সায়ন ভাইয়া কখনোই তোর ফিলিংস নিয়ে ভাবে না। তুই ওনার জন্য কষ্ট পাচ্ছিস ওনি তো পাচ্ছেন না। ওনি না খেলে তুইও খাবি না এটা কোনো কথা? তুই ওনাকে অনেক বেশিই তোর ভালোবাসাটা দেখাই ফেলছত। তাই এখন ওনার ডিমান্ড বেড়ে গেছে। এসব নিয়ে আর তুই কক্ষণো ভাববি না। কার জন্য ভাবছিস তুই যে কখনো তোকে ভালোইবাসেনি তার জন্য? এসব মাথা থেকে এখনি ঝেড়ে ফেলে দে মালিহা। সেটাই সবার জন্য ভালো হবে।
.
– আমি কি কম চেষ্টা করেছি সারা? সবসময়ই তো চেষ্টা করছি পারি নাই তো।
– বাদ দে এসব নিয়ে কথা বললেই কথা বাড়বে।
– হুমম।
– একটা গান গাইবি মালিহা? দেখবি মনটা অনেক ফ্রেশ হয়ে যাবে। মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা সকল অভিমানগুলো বেরিয়ে আসবে।
– ভালো লাগছে না রে তুই গা।
– আমার গলায় গান শুনলে তুই এখনি হার্ট -এ্যাটাক করে হসপিটালে চলে যাবি। আর সমুদ্র আমার গান শুনে এখানেই স্থির হয়ে যাবে। কোনো ঢেউই আর আসবে না।
সারার কথায় আমি সশব্দে হেসে উঠলাম। সারাও হাসছে। সারাকে আমার এজন্যই ভালো লাগে। যখন তখন মজা করতে পারে। হাসাতে আমার মনটাও অনেকটা হালকা হয়ে গেল। আমি সারাকে জড়িয়ে ধরলাম। তারপর বললাম,
– তুই একমাত্র আমাকে বুঝিস রে। তোর মত করে কেউ আমায় বুঝে না। আমি তোর মত একজন বন্ধু পেয়ে সত্যিই ধন্য।
.
– হুমম ডং করতে হবে না ছাড়।
আমি আর সারা আবার হোটেলের দিকে রওনা দিলাম। আমার খুব ঘুম আসছিল। আমি সারাকে একহাতে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে আমার মুখটা দিয়ে, চোখ বন্ধ করে হাঁটছিলাম। সারা এতে খুব বিরক্ত হচ্ছিলো সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম। তাই আরো বেশি করে ওকে চেপে ধরলাম। হোটেলের সামনে আসতেই একটা লোক আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমার হাতে ধারালো কিছু লাগলো। লোকটা খুব দ্রুত হেঁটে চলে গেল। আমার হাতটা খুব জ্বালা করছিল। হোটেলের বাইরে খুব অন্ধকার ছিল তাই দেখতে পাইনি। তৃতীয় তলায় আসতেই দেখলাম আমার সাদা জামাটা রক্তে লাল হয়ে গেছে। সারা ভয়ে চিৎকার দিয়ে ফেলল।
.
আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার গায়ে রক্ত এলো কোথা থেকে? সারার চিৎকারে সায়ন ভাইয়ারা সবাই বেরিয়ে এসেছে। এছাড়াও যারা জেগে আছে তারা সবাই ভিড় করে দেখতে এসেছে কি হয়েছে? আমি মাথা নিচু করে ভাবছি রক্ত এলো কোথা থেকে? হঠাৎ কেউ এসে আমার মুখটা তুলে ধরলো। আমি তাকিয়ে দেখি সায়ন ভাইয়া আমার দিকে কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে। ওনার এই দৃষ্টি আমার বড়ই অপরিচিত। ওনি এর আগে কখনো এভাবে আমার দিকে তাকাননি। আমি ওনার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ওনি হঠাৎ আমার হাতটা তুলে ধরলেন। আমার হাত বেয়ে অঝোরে রক্ত পরছে। তারমানে আমার হাত কেটে এত রক্ত বেরিয়েছে? কিন্তু আমি টেরই পেলাম না।
.
আমার কি শোধ -বোধ সব লোপ পেয়ে গেল নাকি। আমার হাতটা তো অনেকটা কেটে গেছে। তারমানে ঐ লোকটা কোনো ডাকাত বা সন্ত্রাসী ছিল। যার কারণে ওর কাছে এরকম ধারালো জিনিস ছিল। আমি হাতের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছি। এরমধ্যে সায়ন ভাইয়া টেনে আমায় তাদের রুমে নিয়ে গেল। ওনার বন্ধুরা কি মনে করে কেউই আসলো না রুমে। ওনি আমাকে খাটে বসিয়ে রেখে পরম যত্নে আমার হাতটা ব্যান্ডেজ করে দিলেন। আমি ওনার দিকে তাকিয়েই আছি। এ কোন সায়ন ভাইয়াকে দেখছি আমি। ওনার হঠাৎ করে কি হলো যে ওনি আমার প্রতি এতটা কেয়ারিং হয়ে গেলেন। এতটা সময় ধরে ওনি আর আমি একসাথে আছি কিন্তু ওনি কোনো কথাই বলছেন না। শুধু নীরবে কাজ করে গেছেন। ব্যান্ডেজ করা শেষ হলে ওনি গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন,
.
– রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিস। নিজের প্রতি আরেকটু কেয়ারিং হওয়া উচিত।
এত রাতে বিচে না গেলেও পারতি। রাত বিরেতে এ এলাকাটা অতটা নিরাপদ না।
তোর অন্য কোনো ক্ষতিও হতে পারতো। যা রুমে যা অনেক রাত হয়েছে।
আমি কোনো কথা না বলেই রুমে চলে এলাম।
সত্যি নিজের প্রতি আমার আরো কেয়ারফুল হওয়া উচিত ছিল।
ব্যান্ডেজটার দিকে বারবার চোখ চলে যাচ্ছে। সায়ন ভাইয়া কি যত্ন সহকারে ব্যান্ডেজটা করে দিয়েছেন।
মনে হচ্ছিলো ওনি আমাকে খুব ভালোবাসেন।
কিন্তু আসলে তো তা না ওনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না।
আচ্ছা লোকটা আমার হাতে আঘাত না করে পেটে করতে পারলো না।
তাহলে হয়তো এতক্ষণে মরেই যেতাম। অন্তত সায়ন ভাইয়াকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে হতো না।
ধুর এসব চিন্তা আমার মাথা থেকে কখনোই যাবে না।
সারা আমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরেছে।
আমিও সকল চিন্তা একপাশে ফেলে রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। একসময় ঘুমিয়ে পরলাম।।
.
সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি দশটা বাজে। কেউ রুমে নেই।
সবাই বোধহয় বিচে গেছে। আমার কেন জানি উঠতে ইচ্ছে করছিল না। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।
তখনি সারা এসে আমায় জ্বালানো শুরু করলো।
সারার জ্বালানোর কারণে তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম। দুজনে আবার বিচে গেলাম।
সারার ইচ্ছে ছিল খালি পায়ে বালুর উপর হাঁটবে কিন্তু রোদের প্রখরতায় জুতো ছাড়া হাঁটাই অসম্ভব।
তাই ওর ইচ্ছেটা মাটিচাপা পড়ে গেল। আমি আর সারা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম।
– কেমন আছিস তুই?
চমকে দেখি যে সায়ন ভাইয়া কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমার দিকেই তার পূর্ণ দৃষ্টি। ওনার চোখের ভাষা আমি বুঝতে পারছি না। যেই চোখে শুধু রাগ,
ঘৃণা থাকতো। সেই চোখ যেন আজ কেমন শান্ত। কিন্তু কেন?
চলবে,,,,,,