Breaking News

অ্যাডভেঞ্চার । পর্ব- ১৫

প্রত্যেকের মুখেই মাস্ক লাগানো। টি-শার্ট কেটে কিংবা রুমাল দিয়ে মাস্ক বানিয়ে নিয়েছে ওরা।
তারপরেও নাকেমুখে ধুলো গিয়ে মাঝেমধ্যেই কেঁশে উঠছে।
লুক আর আর্চি বাদে অন্য সবাই ইতস্তত ঘরময় হেঁটে বেড়াচ্ছে।
প্রত্যেকের মগজেই কিছু একটা ভাবনা চলছে। আর্চি আর লুকও ভাবনায় মগ্ন।
পায়ে ব্যথা থাকাতে বাকিদের মত হাঁটাহাঁটি করতে পারছে না ওরা।
এদিকে তখনো কাচের দরজাটার উপরে ধাক্কা দিয়ে চলেছে দানবগুলো।
ওই ধাক্কা সহ্য করে দরজাটা যে এখনো টিকে আছে, সেটা দেখেই অবাক হচ্ছে ওরা।
একটা পর্যায়ে একটা ময়লা লোহার চৌকির উপর বসে পড়ল সাকিব।
দুই হাতের থাবার মধ্যে মুখটাকে রেখে কিছু একটা ভাবতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর ওর পাশে এসে বসলো ল্যারি৷ কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকার পর সে বলল,
“কী করা যায় বলো তো?”
কোন জবাব দিল না সাকিব। একই ভঙ্গিতে বসে থাকলো। ল্যারিও আর কিছু বলল না।
সাকিবের মত সে-ও দুই হাতের থাবার মধ্যে মুখটাকে লুকালো।
হঠাৎ সোজা হয়ে বসে সাকিব বলল, “বিল্ডিংটা তো বহুতল, তাই না?”
“হুম।” হাতের মধ্যে মুখ রেখেই বলল ল্যারি। তারপর একটা দম নিয়ে সোজা হয়ে বসলো।
“বেশ বড় বিল্ডিংই এটা।”
“তাহলে চলুন, উপরে উঠি।”
“কিন্তু উপরে উঠে কী হবে?”
“জানিনা। হয়তো এই ধুলোর হাত থেকে বাঁচবো।” কথাটা বলেই কেঁশে উঠলো সাকিব।
ওর নাকে মুখে ধুলো গেছে।
হাঁটাহাঁটি বাদ দিয়ে সিয়ারা আর রাফিমও ওদের কাছে এল।
এম্মা আর ক্যারি এল একটু পরে।
আর্চি আর লুক নিজেদের যায়গায় বসে থেকেই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।
গভীর মনোযোগে ওদের কথা শুনছে।
“সাকিব ঠিকই বলেছে।” একপর্যায়ে বলল সিয়ারা।
নাকেমুখে ধুলো যাওয়াতে কেঁশে নিল একবার। “এখানে থাকলে এই ধুলোর জন্যই মারা পড়ব।”
“কিন্তু, উপরে গিয়ে করব’টা কী?” প্রতিবাদের ভঙ্গিতে বলল ল্যারি৷
“এক বোতল পানি আর এক টিন মাংস ছাড়া খাবারও আর কিছু নেই। উপরে গিয়ে খাব’ই বা কী?”
“কিন্তু এখানে পড়ে থেকেই বা করবে টা কী?” পালটা প্রশ্ন করল সিয়ারা।
কোন জবাব দিতে পারলো না ল্যারি৷ খুকখুক করে কয়েকবার কাঁশলো শুধু।
.
দেওয়ালের দিক থেকে রাফিম এসে জানালো ওপাশে উপরে উঠার সিড়ি আছে।
সবাই উঠে পড়ল। ক্যারি আর রাফিম মিলে উঠালো আর্চিকে।
ল্যারির কাধে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল লুক। সিড়ি ভেঙে উপরে উঠতে শুরু করল সবাই৷
তবে আর্চির ভিষণ কষ্ট হচ্ছে।
ক্যারি আর রাফিমের কাধে সম্পুর্ন ভার দিলেও মচকে যাওয়া পা’টা নাড়াতে পারছে না সে।
একেকটা সিড়ি ভাঙছে আর যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠছে৷
এদিকে ক্যারি আর রাফিমের অবস্থাও ভালো না৷
এমনিতে এই অবসন্ন শরীরে সিড়ি ভেঙে উপরে উঠাটাই কষ্টকর তারপরে আবার
আর্চিকে প্রায় তুলে নিয়ে যেতে হচ্ছে ওদের।
অল্পতেই ওরা হাঁপিয়ে গেল৷ সিয়ারা আর সাকিব ওদের স্থলাভিষিক্ত হলো৷ নিঃসন্দেহে কাজটা ভিষণ পরিশ্রমের।
সিয়ারা আর সাকিবও হাঁপিয়ে গেল। বারবার থেমে থেমে জিড়িয়ে নিতে লাগল৷
একতলায় উঠে একটা দরজার সামনে দাঁড়াল ওরা।
এটা এই ফ্লোরে যাওয়ার সদর দরজা। ক্লান্ত হয়ে যাওয়া লুক এই ফ্লোরে ঢুকে দেখার প্রস্তাব জানাল।
নিমরাজি ল্যারি দরজায় দু’টো ধাক্কা দিয়ে জানালো এটা খোলা
অসম্ভব সুতরাং এই ফ্লোরে ঢুকে লাভ নেই৷ তারচেয়ে বরং আরও উপরে উঠা যাক।
ওকে সমর্থন জানাল বাকি সবাই৷ এই ফ্লোরে ঢুকে কি হবে! মাত্র দ্বিতীয় তলা এটা৷
সুতরাং এখানেও ধুলো থাকার সম্ভবনা প্রবল।
আর ওরা তো ধুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্যই উপরে উঠছে।
সুতরাং লুকও আর কিছু বলল না। অন্যদের কথা মেনে নিল।
কিন্তু বাধ সাধলো সাকিব। কিছুক্ষণ দরজাটা ভালো করে দেখে নিয়ে বলল,
“এই দরজাটা দেখে একদম নতুন বলে মনে হচ্ছে। যদিও এটা নতুন নয়, অন্যগুলোর মতই পুরোনো।
কিন্তু এটা অনেক শক্ত। এতদিনেও এটার রঙ চটেনি। সুতরাং ভেতরে দরকারী কিছু আছে।”
“দরকারী কিছু!” ভ্রু কুচকে বলল ল্যারি। “কী সেটা?”
.
“সেটা জানিনা। তবে আমার মনে হচ্ছে এই ফ্লোরে আমরা দরকারী কিছু পাব।”
“কিন্তু এটা খুলবে কিভাবে? দরজা খোলা কিংবা ভাঙার মত তো কিছুই নেই আমার কাছে।”
ল্যারি আসলে ঠিকই বলেছে। দরজাটা ওরা খুলবে কিভাবে? ধাক্কা কিংবা লাথি মেরে যে এটা খোলা যাবে না, সেটা ওরা বেশ বুঝতে পারছে। তাহলে?
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে সাকিব বলল, “আপনারা এখানে থাকেন, আমি আসছি।” একটু থেমে আবার বলল, “রাফিম, তুই আয় আমার সঙ্গে।”
“কোথায় যাবে?” জিজ্ঞেস করল ল্যারি।
“নিচে।” সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে বলল সাকিব। ওর পিছু পিছু এল রাফিম। নামতে নামতে সে জিজ্ঞেস করল, “কী নিতে যাচ্ছিস?”
কোন জবাব দিল না সাকিব। চুপচাপ নেমেই চলল। অগত্যা রাফিমও আর কিছু বলল না। নিচে নেমে সাকিব বলল, “সবথেকে ভালো অবস্থায় যে সিলিন্ডারটা আছে, সেটা খুঁজে বের কর।”
“কিন্তু সিলিন্ডার দিয়ে করবিটা কী?”
“যা বলেছি তাই কর।”
.
আর কিছু বলল না রাফিম। সিলিন্ডার খুঁজতে শুরু করল। সাকিবও খুঁজছে।
সিলিন্ডারের অভাব নেই এখানে। কিন্তু সবকটার অবস্থায় শোচনীয়।
ধুলো পড়ে মরচে ধরে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা।
খুঁজে খুঁজে অবশেষে মোটামুটি ভালো অবস্থায় থাকা একটা সিলিন্ডার খুঁজে পেল সাকিব।
রাফিমকে ডাক দিয়ে দু’জনে মিলে সেটা তুলে নিয়ে উপরে উঠতে লাগলো।
বেজায় ভারী এই সিলিন্ডারটা। উপরতলা পর্যন্ত বয়ে নিতে ওদের জান বেরিয়ে গেল।
মস্তবড় একটা গ্যাস সিলিন্ডার আনতে দেখে অন্যরা ভিষণ অবাক হলো।
ল্যারি জিজ্ঞেস করল, “এই সিলিন্ডার দিয়ে তুমি কী করবে?”
“দরজা খুলব।” হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিল সাকিব।
ওর মুখে এটা শুনে আরও বেশি অবাক হলো ওরা।
ওরা ভেবে পেল না গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কিভাবে দরজা খোলে।
ক্যারি জিজ্ঞেস করল, “এটা দিয়ে দরজায় ধাক্কা মারবে না কি?”
“নাহ।”
“তাহলে?”
“দেখো কি করি।”
ওরা কেউ আর কিছু বলল না৷ প্রত্যেকেরই সাকিবের উপর পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
জানে কোন অকাজ করবে না সাকিব।
কিন্তু এই গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে কিভাবে দরজা খুলবে সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছে ওরা।
“কাজটা হবে কিনা, আমি জানি না।” বলল সাকিব। “তবে হওয়ার সম্ভবনা আছে।
যাইহোক, তোমরা সবাই সরে যাও। বিপদ ঘটার সম্ভাবনা আছে।”
চুপচাপ নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল ওরা।
সাকিব কি করে সেটা দেখার জন্য চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।
.
সিলিন্ডারটা নিয়ে দরজার সামনে রাখলো সাকিব। ওটার মুখ দরজার নব অবধি পৌঁছেছে দেখে সন্তুষ্ট হলো।
তারপর সাবধানে সিলিন্ডারের মুখের ভাল্বটা সামান্য ঢিলে করে দিল৷
আর সঙ্গে সঙ্গে মুখ দিয়ে সাপের মত হিসহিস করে গ্যাস বেরোতে শুরু করল।
লাইটারটা বের করল সাকিব। সে জানে কতটা ঝুঁকি নিচ্ছে সে।
এতদিনের পুরোনো সিলিন্ডারটার উপর কোন বিশ্বাস নেই।
যেকোনো সময় এটার ভাল্ব পুরোটা খুলে গিয়ে মারাত্বক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।
সেটা ঘটলে সরে যাওয়ার সময়টুকুও পাবে না ও। সঙ্গে সঙ্গে মারা পড়বে।
কিন্তু এটা ছাড়া আর উপায়ও নেই। তাছাড়া মাঝেমধ্যে এরকম ঝুঁকি নিতে হয়।
চোখ বুঝে আল্লাহর নাম নিয়ে লাইটারটা জ্বেলে সিলিন্ডারের মুখে ধরল সাকিব।
ধরার সঙ্গে সঙ্গে দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো।
তারপর ভাল্বটা ঘুরিয়ে গ্যাস বেরোনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিল। আগুনও বেড়ে গেল।
নীলচে আগুনের শিখাটা সরাসরি দরজার নবের উপর পড়তে লাগলো।
সেটা দেখে সন্তুষ্ট হয়ে অন্যদের কাছে ফিরে এল সাকিব। অপেক্ষা করতে লাগলো।
উত্তেজনায় সবাই দম বন্ধ করে আছে। কি ঘটতে চলেছে সেটা নিয়েই উত্তেজিত ওরা।
একটা একটা মুহুর্ত করে সময় যাচ্ছে।
গ্যাসের নীলচে আগুন দরজার ধাতব নবটাকে পুড়িয়েই যাচ্ছে। আস্তে আস্তে সেটা লাল হতে শুরু করল।
আশেপাশের কাঠে ইতিমধ্যে আগুন ধরে গেছে। তারপরে একপর্যায়ে নবটা খসে পড়ল।
টারই অপেক্ষা করছিল সাকিব। দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে ওকে বাধা দিল এম্মা।
বলল, “কি করছ কি তুমি? কাঠে আগুন ধরে গেছে। যেকোন সময় সিলিন্ডারটা ব্ল্যাস্ট করতে পারে।”
এবার অন্যরাও একই কথা বলল। কিন্তু কারোর কথা শুনলো না সাকিব। আবার কেউ বাধা দেওয়ার আগেই দরজার কাছে পৌঁছে গেল সে। সিলিন্ডারের ভাল্ব ঘুরিয়ে গ্যাস চলাচল বন্ধ করতে গেল। কিন্তু ভাল্ব তখন আগুনের মত গরম হয়ে আছে। হাত দিতেই পুড়ে গেল হাত। তারপর শার্টটা খুলে সেটা দিয়ে ভাল্বটা ঘুরিয়ে গ্যাস চলাচল বন্ধ করে দিল। গ্যাস চলাচল বন্ধ করতেই আগুন নিভে গেল। কিন্তু কাঠে তখনও আগুন জ্বলছে। সেটা নেভাতে মোটা ফ্লানেলের শার্টটা আগুনের উপর চেপে ধরল। নিভে গেল আগুন। কিন্তু ও নিজেও জানতো না, কতবড় ঝুঁকি ও নিয়েছিল৷ তাও, কাজটা যে হয়েছে এতেই খুশি ও। তবে আসল কাজ এখনো হয়নি। দরজাটা এখনো খোলেনি৷ এবার জোরে কয়েকটা ধাক্কা দিতেই দরজাটাও খুলে গেল। আর দরজা খুলতেই ওপাশের দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল সবাই৷
চলবে…..

No comments