Breaking News

বিরহ মিছিল । পর্ব - ১৪



ওয়ারড্রবের ড্রয়ারে কিছু একটা খুঁজছে আদিল। প্রতিটি ড্রয়ার তন্নতন্ন করে। ড্রয়ারে রাখা শার্ট, প্যান্ট, জিন্স এলোমেলো প্রায়। কিছু কিছু শার্ট মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দিশেহারা পারভিন ছেলের ঘরে ঢুকে হাঁকলেন, " অমন করে কি খুঁজছিস?"

আদিল এলোমেলো ওয়ারড্রবে একবার তাকাতাকি করে মায়ের দিকে তাকালো। খোঁজাখুঁজির ঝোঁকে পুরো ওয়ারড্রব এলোমেলো করে ফেলেছে। সলজ্জে আওড়াল,
" স্কুলের র্যাগ ডে হয়েছিল না? আমার সেই টিশার্ট মাম।"
ললাট কুঁচকে যায় পারভিনের। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আওড়ান,
" বছর গড়াতে চললো। কিছুদিন আগে কলেজে ইয়ার চেঞ্জ এক্সাম দিয়ে এলি। এখন নিয়ে তুই টিশার্ট খুঁজছিস।"
ইতস্ততভাবে আদিল বলল, " তুমি জানোই তো মাম, কি পরিস্থিতি তে র্যাগ ডে হয়েছিল।"
পারভিনের মনে পড়ে, এসএসসি পরিক্ষার তিনদিন আগে র্যাগ ডে এর তারিখ রাখা হয়৷
আদিল শুনেই বারণ করে। আদিল যে শুধু বারণ বলছিল তা নয়, তার সহপাঠীদের মধ্যে ও বেশ সংখ্যক দ্বিমত ছিল। স্কুলের শিক্ষকদের জোড়াজুড়ি তে, সবাইকে শেষ-মেষ রাজি হতে হয়।
পারভিন এসে আদিলের পাশে বসলেন।
আদুরে ভঙ্গিতে ছেলের চুল হাতিয়ে ললাটে চুম্বন করে বললেন, " আমি খুঁজে দিবো, তোকে আর কষ্ট করে খুঁজতে হবে না।"
আদিল বাচ্চাদের ন্যায় দু'হাতে মাকে জড়িয়ে ধরল। আহ্লাদী স্বর সঙ্গে আদিলের, "মাম।"

গত চারদিন হচ্ছে মুগ্ধতা আদিলকে ইগ্নোর করছে। যে সে ইগ্নোর নয় শীর্ষ ইগ্নোর। নিজেকে অসহায় লাগছে আদিলের। মনভার। চোখমুখ শুকনো।
সকালে না খেয়ে কলেজের জন্য তৈরি হলো আদিল। বাড়ি থেকে বেরিয়েও কলেজে গেল না।
উদাস মনে স্টেডিয়ামের পিছনের রেস্টুরেন্ট তাতে বসে একা একাই কফি গিলছে। তার ব্যবহারকৃত ফোন টেবিলেই। অনেকক্ষণ ধরে ফোনের দিকে তাকিয়ে গভীর ভাবনায় মশগুল। তাড়াক ফোনটা হাতের আঁজলায় নিয়ে কাউকে কল করতে ব্যস্থ হলো।
একবার, দুইবার রিং হতে হতে কল রিসিভ হলো। সঙ্গে সঙ্গে আদিল উৎকন্ঠে হুকুম জারি করলো,
" আধ ঘন্টার মধ্যে তোমার আমার চোখের সামনে আসা চাই মুগ্ধ। কথার হেরফের করলে আমি নিজেও জানি না কি করবো।"
আদিলের কন্ঠে জোড়,অধিকারবোধ। মুগ্ধতা ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল, " আমি ঘুমাচ্ছি আদিল।"
আদিলের রাগ যেন বেড়ে গেল। ওর চোখের ঘুম কেড়ে এখন সে দিব্যি ঘুমাচ্ছে। কপট রেগে বলল, " তুমি ঘুমাও আমি ও আসছি।"
আদিলের রাগ সম্পর্কে অবগত মুগ্ধতা। সে দোনোমোনো করে বলে উঠলো,
" এই না,না, না! আমি আসছি।"
আদিল মৃদু হাসলো। মেরুদণ্ড টান টান করে বসে বলল,
" আসো, স্টেডিয়ামের পিছনের রেস্টুরেন্টে বসে আমি।"
বিছানা থেকে ধীর গতিতে উঠে মুগ্ধতা বলল, "অপেক্ষা করো, আমি আসছি।"

আধঘন্টার আগেই মুগ্ধতা রেস্টুরেন্টে হাজির হলো। তাড়াহুড়োয় সামনে যা পেয়েছে সেটাই পরে চলে এসেছে৷ কমলা রঙের ওয়ান পিস পরনে। অতি তাড়াতে জামার গলা হেরফের হয়েছে। পিছনের গলা সামনে, সামনের গলা পিছনে।
সশব্দে আদিলের মুখোমুখি চেয়ার টেনে মুগ্ধতা বসলো। কাঁধে ঝোলানো হ্যান্ড ব্যাগ, ফোন টেবিলে রেখে আদিলের দিকে মনোনিবেশ করলো। রাগত্ব কন্ঠে বলল, " ব্যাপার কি?"
আদিল কফির মগ সাইডে রেখে দু'হাতের ভর টেবিলে দিয়ে মুগ্ধতার দিকে ঝুঁকে বলল,
" ব্যাপার তো আমি জিজ্ঞেস করবো। আমায় ভালো লাগে না?"
কথাটি মুগ্ধতার বক্ষ কাঁপন ধরাতে বাধ্য। আন্দাজ করতে পারছে মুগ্ধতা অল্প হলেও, কেমন এমন কথা আদিল বলছে।
মুগ্ধতা আদিলের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে চাইলো। আড়াই বছর আগের আদিলের সঙ্গে এই আদিলের মিল নেই। আগে চিকন থাকলেও এখন বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী। চেহারায় বিশাল পরিবর্তন এসেছে। গালে খোচাখোচা দাঁড়ি, অতলস্পর্শ চোখ, মোটা ভ্রু যুগল,ঠোঁটের রঙ কি বুঝতে পারছে না। আদিলের এতো পরিবর্তনেও মুগ্ধতার অনুভূতি বাড়ে বলে কমেনি।
হৃদপিণ্ড দুরুদুরু করছে মুগ্ধতার। মাথা নত করে বলল, "তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন আদিল?"
আদিলের উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
"তুমি চেঞ্জ মুগ্ধ, তুমি চেঞ্জ।"
মুগ্ধতা শব্দহীন হাসলো। আদিলের দিকে চোখ রাখলো। আদিল মুগ্ধতার দিকে তাকিয়েই ছিল। দুজনের দৃষ্টি বিনিময় ঘটলো। বলল,
"সকালে খেয়েছ?"
ভর্ৎসনা করে আদিল বলল,
"আর আমার খাওয়া...!"
মুগ্ধতা দুঃশ্চিন্তায় বলল,
" তুমি বাচ্চাদের মতো করছো আদিল।"
আদিল এই কথার পিঠে টু শব্দ করলো না। আদিল বুঝছে সে শুধু বাচ্চাদের মতো করছে না, সে পাগলদের ন্যায় উন্মাদ হচ্ছে। দিকবিদিক থমকে যাচ্ছে মুগ্ধতার অনুপস্থিতে। মুগ্ধতা কে ছাড়া এখন তার দিনদুনিয়া ছন্নছাড়া মনে হয়।
মুগ্ধতার সামান্য ইগ্নোর সে মেনে নিতে পারছে না,পারে না। সে এমন ছিল না। আদিল ছটফট কন্ঠে বলল,
" আমায় কেন ইগ্নোর করছো মুগ্ধ?"
.
চলবে

No comments