Breaking News

ডাক্তার সাহেব । পর্ব - ৪৩



বুকে ভীষণ পরিমাণ ব্যথা হতে লাগল। শ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হচ্ছে।

কথা বলার অবকাশ যেন পাচ্ছি না। মাথাটা ভনভন করছে আর ঘামছে।

মাকে শুধু হালকা গলায় ডাক দিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

কেমন যেন লাগছে সব।

মা আমার রুমে এসে আমাকে এভাবে দেখে আমার কাছে আসলো দ্রূত। আমাকে ধরে বিভ্রত গলায় বলল

কী হয়েছে তোমার? এমন করছো কেন? খারাপ কী বেশি লাগছে তোমার?
আমি যেন কোনো কথায় বলতে পারছি না । মাকে ধরেই গড় গড় করে মায়ের কাপড়ের উপরেই বমি করে দিলাম। মা আমায় শক্ত করে ধরে বলতে লাগল
- বমি করো খারাপ লাগা কমে যাবে। হয়তো বদহজম হয়েছে।
এটা বলার সাথে সাথে নাক মুখ দিয়ে বমি আসলো। বমি করতে করতে মনে হলো একটু ভালো লাগছে, মুখ না ধুয়েই শুয়ে পড়লাম। মনে মনে অস্বস্তি হতে লাগল মায়ের উপর বমি করেছি এটা ভেবে। কিছুটা নীচু গলায় বললাম
- মা আপনার উপর বমি করতে চাইনি। তবে সামলাতে পারিনি।

মা হাসতে হাসতে জবাব দিল
- তোমার মায়ের কোলে কী কখনও তুমি বমি করোনি? আমি তো তোমার মা। তুমি আমার মেয়ে।
তোমাকে আর মিহুকে আমি কোনোদিন ছেলের বউ মনে করি না।
তামান্নার মতোই মনে করি।
আমি মনে করি আমার ঘরে তিনটা মেয়ে আছে এখন৷ তুমি কেন অযথা চিন্তা করছো।
শ্বাশুড়ি ভাগ্য আমার ভালো সেটা মায়ের কথা শুনেই বুঝা গেল।
আমার মাকেই তো আমি কত কষ্ট করতে দেখেছি।
আমার দাদু আমার মাকে কত কথায় না শুনাত। অথচ নীলের মা আমাকে কত ভালোবাসে।
যখন যা প্রয়োজন তা এনে দিচ্ছে৷ কিছু খেতে মন চাইলে খাওয়াচ্ছে। কাজ তো করিই না।
অথচ কাজের জন্য একটা কথাও শুনতে হচ্ছে না।
আমার কপাল এত ভালো সেটা জানা ছিল না তবে প্রমাণ পাচ্ছি পদে পদে।
কিন্তু এত ভালোবাসা পাওয়ার পরও মনে প্রশ্ন ঝেঁকে বসে আমার কপালে এত সুখ সইবে তো?
মনটা অস্থির হয়ে যায় এ প্রশ্নটা মনে আসলে।
মা বমি পরিষ্কার করে বাথরুমে গেল। একটা বালতি আর গ্লাসে পানি এনে বলল
- সিঁথি উঠে মুখটা কুলি করো। আর মুখটা ভালো করে ধুও। হাবিজাবি আর খেয়ো না।
দেখলেই তো কষ্ট তোমাকে পেতে হচ্ছে সাথে বাবুকে।
আর বেশিদিন তো না মাত্র চার থেকে পাঁচমাস কষ্ট করো। বাবু হয়ে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
আমি শুয়া থেকে উঠে কুলি করে নিলাম। মুখটা ভালো করে ধুয়ে আবার শুয়ে পড়লাম।
রিদির চিন্তাটা আবার মথায় ঝেঁকে বসলো।
কে তার সাথে এমন করেছে এটাই শুধু ভাবছিলাম।
রিদির এ অবস্থা আমি মন থেকে মানতে পারছি না।
বারবার মনে হচ্ছে কেন এমনটা হলো? এমনটা না হলেও পারত।

সময় যেন বহমান নদী। সুখের সময় গুলো যেন আরও দ্রূত চলে যায়। দেখতে দেখতে কাঙ্ক্ষিত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মধ্য দিয়ে কেটে গেল তিনটা মাস।
মা হবার সাত মাসে পৌঁছালাম। রিদি মানসিক হাসপাতাল আছে।
অবস্থা এই উন্নতি এই অবনতির দিকে। রিদির সাথে এই জঘন্য কাজ কে করেছে এখনও হদিশ মিলেনি।
মিহুর বিদেশ যাওয়ার জন্য প্রেসসিং চলছে। এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়েই চলে যাবে সে।
এর মধ্যে আমার এইচ এস সি প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে কতদিন আগে।
ফুলা পেট নিয়েই বেশ কষ্ট করে পরীক্ষা দিয়েছি।
আমার পরীক্ষা দেওয়ার পেছনে আমার মা আর নীলের মায়ের অবদান ছিল প্রকট।
তারা পাশে না থাকলে হয়তো পড়াশোনাটায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতাম না।
তারা আমাকে সাহস না দিলে পরীক্ষায় দিতে পারতাম না।
পেটটা ভীষণ বড় হয়েছে। আগের জামা গুলো তেমন লাগে না।
আয়নার কাছে গেলে পেটের বিশালতা দেখে নিজেই অবাক হই।
ছোট একটা পেটে আরেকজন মানুষের বাস। যে কী না আমি যা খাচ্ছি তাই খায়।
যে কীনা আমার মধ্যে বেড়ে উঠছে। পেটে হাত দিতেই ইদানীং বাবুর নড়াচড়া অনুভব করি।
কী মধুর মুহূর্ত এগুলো। মা হওয়ার অনুভূতি ভীষণ সুন্দর।
আজকাল অন্য কাউকে দরকার হয় না, মনে হয় আমার পেটের বাচ্চাটায় আমার জন্য যথেষ্ঠ করে দিয়েছেন আল্লাহ। মন খারাপ হলেও তার সাথে কথা বলি, ভালো থাকলেও তার সাথে কথা বলি। কী অদ্ভুত মুহূর্তের সূতোর টান। এ টান ছিড়ে যাওয়া অনেক কঠিন। আজকাল বাবু কী খেতে পছন্দ করে আমি সব বুঝি। বাবুকে জিজ্ঞেস করলে বাবু যখন কিক মারে তখন মনে হয় বাবু সেটা পছন্দ করেছে বেশি।
আজকে আল্ট্রা করাতে যাব। আজকে অবশ্য জানতে পারব আমার পেটে আমার রাজপুত্র নাকি রাজকন্যা আছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পেটটা দেখছিলাম আর নিজেই অবাক হচ্ছিলাম। মিহু তাড়া দিচ্ছে দ্রূত বের হতে। নীল নাকি যেতে বলেছে দ্রূত। আমার আল্ট্রাটা নীলেই করবে। আমি পেটটা এপাশ ওপাশ দুলিয়ে দেখতে দেখতে বললাম
- বেশ মোটা হয়ে গেছিরে মিহু। গাল দুটো ঝুলে পড়েছে। গলায় ও মাংসের ভাঁজ পড়েছে। চুলের অবস্থাটা তো আরও খারাপ, পড়তে পড়তে সব শেষ। চোখের নীচে কালিও পড়েছে।
মিহু আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল

- তোকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। মা হলে সব মেয়েকেই সুন্দর লাগে। শুধু শুধু চিন্তা করছিস। তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে, নাহয় নীল ভাইয়া রাগ করবে।
আমি চিরুনিটা হাতে নিয়ে চুল গুলো আঁচড়াতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম বেশ ঝট পাঁকিয়ে আছে। চুল আঁচড়াতে ভীষণ আলসেমি লাগে ইদানীং। তাই এ কয়দিন নীল চুল আঁচড়ে দিত নাহয় মা। মা একটু অসুস্থ আর নীল কাজের প্রেসারে থাকায় টানা তিনদিন আর চুল আঁচড়ানো হয়নি। আমার মা ও রিদিকে নিয়ে একটু ব্যস্ত। তাকে দেখতে গিয়েছে মানসিক হাসপাতালে। আমি চুলটা কোনোরকম আঁচড়িয়ে নিলাম। বড় একটা উড়না দিয়ে পেটটা ঢেকে নিলাম। তারপর মা আর বাবাকে বলে বাসা থেকে বের হলাম।

মিহু আর আমি দরজার বাইরে বের হয়ে জুতো জোরা পরে সিঁড়ি ভেঙ্গে নীচে নামতে শুরু করলাম। বাসাটা তিনতলায় আর কোনো লিফটও নেই। মফস্বলে লিফট আশা করাটা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই না। সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামতে বেশ কষ্ট হলেও নামতে লাগলাম। আমি আগে মিহু পেছনে। হুট করেই মনে হলো পা টা ফসকে গেছে। আমি সামলাতে পারি নি আর। আচমকা সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ি।

চলবে....

No comments