Breaking News

ভালবাসার ফুল || পর্ব- ০৪

এক সপ্তাহ পর।

-আমি অফিসে যাচ্ছি,উঠে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিও।

মিহাদ অফিসে চলে যায়।
আমি শুয়ে আছি।মানুষটা এ কয়দিন আমাকে অনেক সাপোর্ট দিয়েছে।
অনেক বুঝিয়েছে।শিশিরের মৃত্যুটা একটা এক্সিডেন্ট।
আর একদিন সবাইকে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে,দুদিন আগে বা পরে।

বাসায় সবাইকে বলে দিয়েছে,
আমি নতুন বিয়ে করে এসেছি এ বাড়ীতে।একটা পরিবার ছেড়ে অন্য এক পরিবারে,অন্য এক পরিবেশে এসেছি তাই আমার সব কিছু মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে।
সবাই যেন আমাকে মানিয়ে নেয়।কেউ যেন আমাকে ভুল না বুঝে।

পরিবারের সবাই আমাকে হাসানোর চেষ্টা করে।ভালো রাখার চেষ্টা করে।
আমার শশুড়,শাশুড়ি,ভাসুর,জা,(মিহাদের ভাবী)
সবাই আমাকে অনেক আদর করে।
সবাই আমাকে বুঝায়।

শাশুড়ি মাঃ-মেয়ে হয়ে জন্ম নিলে একদিন নিজের পরিবার ছেড়ে অন্য একটা পরিবারে সবারই যেতে হয় মা।
এই দেখো,তোমার ভাবীও তো এসেছে এই পরিবারে।তারপর এ সংসার টাকে আপন করে নিয়েছে।
তোমারো এ সংসার টাকে আপন করে নিতে হবে।নিজের ভাবতে হবে।
আমাদের আপন করে নিতে হবে।

-জ্বী মা।
-আর আমাকে তুমি বোন ভাব্বে ঠিক আছে?বড় জা ভাবার কোন দরকার নেই।
আমি তোমাকে ছোট বোন করে নিলাম।
আজ থেকে তুমি আমার ছোট বোন।আমরা দুজন মিলে এই পরিবারটাকে আগলে রাখবো।
-আচ্ছা ভাবী,উঁহু ভাবী না।
তুমি আমাকে আপু বলে ডাকবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে আপু।
-চুল গুলো কেমন এলোমেলো করে রেখেছো।এসো বেধে দেই।

এ বাড়ীর প্রতিটা মানুষ কত্ত ভালো।
আমাকে কত্ত আদর করে।
যেখানে শাশুড়িরা জা এরা নাকি কত্ত রেষারেষি করে শুনি।
সেখানে তারা আমার কত যত্ন নেন,আদর করেন স্নেহ করেন।
মানুষ গুলোকে আমারো যে ভালবাসতে হবে।
সম্মান করতে হবে।

আমিও তাদের আপন করে নেই।
সম্মান করি,সেবা করি।

সন্ধ্যা বেলা সবার জন্য চা বানাই।নাস্তা বানাই।
সবাই এক সাথে বসে খাই আর গল্প করি।

ভাইয়া (ভাসুর) আপুর (ভাবীর)জন্য আর আমার জন্য প্রায়ই বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসেন।
চুড়ি,কসমেটিকস নিয়ে আসেন।

মিহাদও আপুর জন্য আমার জন্য চকোলেট আইসক্রিম নিয়ে আসে।

কখনো কখনো মায়ের জন্য আমার জন্য আপুর জন্য একই রকম শাড়ী নিয়ে আসে।

কি সুন্দর একটা পরিবার।
কে বলেছে শশুড় বাড়ীর মানুষ গুলো কখনো আপন হয়না?
চাইলেই হয়।ইচ্ছে করলেই সবাই মিলেমিশে সুখের একটা সংসার সাজানো যায়।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই এখন আমি আপুকে কিচেন রুমে গিয়ে জিজ্ঞেস করি,

-আপু,কি করতে হবে আমার?
-তুমি কেন এত সকালে উঠেছো?নতুন বিয়ে হয়েছে তোমার।একটু তো নিজের বর কে সময় দাও।
আমাকে হেল্প তো সারাজীবন করতে পারবে।যাও।
-না আপু,আপনি বলেন কি করবো আমি?
-আচ্ছা ঠিক আছে,আমি রুটি বানিয়ে নিচ্ছি।তুমি আলু ভাজি কেটে নাও।

দুপুরে আমি তরিতরকারি কেটে দেই।ভাবী(আপু) রান্না করেন।
তারপর আমি সব রুম ঝাড়ু দিয়ে গোসল করে নেই।
আপু আর আমি দুজন মিলেমিশে কাজ করি।
কাজ শেষে,নামাজ শেষে,খাওয়াদাওয়া করে রেস্ট নেই।
সন্ধ্যায় মায়ের রুমে গিয়ে এক সাথে সবাই বসে গল্প করি।

ধীরেধীরে সবার জন্য আমার মায়া জন্মে গেছে।
সবাইকে ছাড়া আমার এখন একদিনও ভালো লাগেনা।বাবার বাড়ী গিয়ে এক দিন কোন রকম থেকেই চলে আসি।
মনে হয়,আমার সংসার টাকে আমি ছেড়ে এসেছি।

আম্মু বলেন,বিয়ের পর স্বামীর বাড়ীই মেয়েদের নিজের ঘর।
আম্মু,আব্বু, আমার শশুড় বাড়ীর সবাই আমার জন্য খুশি।
আমি কত সহজে এই পরিবারের সাথে মিশে গেছি।

সবার সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক।এক মাত্র মিহাদ ছাড়া।

বিয়ের পরের দিনই মিহাদ আমাকে বলে দিয়েছে:-

-হয়তো আমাকে তোমার মেনে নিতে সময় লাগবে।কিংবা আমার উপর তুমি খুব অভিমান করে আছো।
কিন্তু আমার পরিবারের কেউ যেন এসব কিছু না বুঝতে পারে।
ওরা যেন না বুঝে আমাদের মাঝে যে কতটা দূরত্ব।তাদের কখনো বুঝতে দিওনা প্লিজ।আমি চাইনা তারা কষ্ট পাক।

আর তুমি যেদিন আমাকে তোমার মনে জায়গা দিতে পারবে,ঠিক সেদিনই আমি তোমার কাছে আমার ভালবাসার অধিকার নিয়ে আসবো।এর আগে তোমার উপর কোন রকম অধিকার ফলাবোনা আমি।চিন্তা করোনা।

মিহাদের বাবা আর আমার বাবা বন্ধু।
আমাদের বাসা আর মিহাদদের বাসার দূরত্ব এক ঘন্টার মত।গাড়ীতে করে এলে এক ঘন্টার মত সময় লাগে।
মিহাদের পরিবার আমাদের বাসায় একদিন বেড়াতে আসেন।

সেদিনই মিহাদ আমাকে দেখে পছন্দ করে ফেলে।
আর বাসায় গিয়ে ওর পরিবারে জানায় আমায় ও বিয়ে করতে চায়।

আর যেহেতু মিহাদ প্রতিষ্ঠিত একজন ছেলে,আবার পরিবারও ভালো,পরিচিত।
তাই আমার বাবা মাও রাজি হয়ে যান।
এই ভাবেই হয় আমাদের বিয়ে।

কিন্তু বিয়ের দুই দিন পর ভাবী(আপু)
আমাকে একদিন বলেন,
-তুমি জানো তিতিশ্মা?মিহাদ কিন্তু তোমাকে এক দেখাতে সেদিন শুধু পছন্দই করে ফেলেনি,বরং ভালও বেসে ফেলেছিলো।
আর আমাকে বলেছিলো,
ভাবী,আমি এই মেয়ে ছাড়া কাউকে বিয়েই করবোনা।আর আমি চাই বিয়ের পরেই ওকে আমার সব টুকু ভালবাসা উজাড় করে দিতে।
মানুষ বিয়ের আগে প্রেম করে,আমি বিয়ের পর আমার বউ এর সাথে প্রেম করবো আর খুব খুব ভালবাসবো।

সেদিন আপুর কথা শুনে মিহাদের জন্য একটু মায়া জন্মালেও,
পরক্ষণেই যখন মনে পড়ে গেছে,
মিহাদ আমাকে সেদিন হসপিটালে নিয়ে যায়নি বলেই আমি আমার শিশিরকে শেষ দেখাও দেখতে পাইনি।
আর তখনি মায়াটা আবার বুকের মধ্যেই মিলিয়ে গেলো।

আমি এ বাড়ীর সবাইকে আপন করে নিলেও।
মিহাদকে আমি আজো আপন করে নিতে পারিনি।
জানিনা কোন দিন পারবো কিনা।

আজ আমার আর মিহাদের বিয়ের এক মাস পূর্ণ হয়েছে।
মিহাদ তাই আমাকে আজ ট্রিট দিতে রেস্টুরেন্টে নিয়ে এসেছে।

আমি আসতে চাইনি রেস্টুরেন্টে।
যদি জানতাম রেস্টুরেন্টে নিয়ে আসবে আমাকে, তাহলে আমি আসতামও না।

আমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নিয়ে এসেছে।
যদিও রেস্টুরেন্টে ঢুকেই বলেছে,খাওয়াদাওয়া শেষে রাতে আমাদের বাসায়ই নিয়ে যাবে।

আমাদের বাসায়ও আসা হয়না অনেক দিন।
এক ঘন্টা দূরত্ব বলে আরো আসা হয়না।
গাড়ী জার্নি আমার সহ্য হয়না একদম।বমি বমি লাগে।
যদিও বাইকে চড়তে কোন রকমই প্রবলেম হয়না।
কিন্তু বাইকে করে আসতে হলে মিহাদের সাথে আসতে হবে বলে আমি আসি না।

আজ আপু জোর করে মিহাদের সাথে বাইকে করে পাঠিয়েছেন।
একবারও মিহাদকে জড়িয়ে ধরে বসিনি।
না ধরেই বসে এসেছি।
বেচারা বার বার বলছিলো,
ধরে বসো আমায়,পড়ে যাবে।
শুনিনি কথা।

বসে আছি রেস্টুরেন্টে।
মিহাদ ওয়েটারকে বলে একটা কেক আর আমার প্রিয় খাবার গুলো আনালো।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
এগুলো আপনারও পছন্দ?

-যেহেতু তোমার পছন্দ,তাই আমারো পছন্দ।
-কিভাবে জানলেন আমার পছন্দ এগুলো?
-আম্মুকে ফোন দিয়ে জেনে নিয়েছিলাম।

চলো এবার কেক কাটি।
-কেক কিসের জন্য?
-আজ আমাদের বিয়ের এক মাস পূর্ণ হলো।
সেই উপলক্ষে।

-এক মাস পূর্ণ হলেও সেটা পালন করতে হয়?
আজ প্রথম জানলাম।

-সবে তো শুরু,আরো অনেক কিছুই যে তোমার জানা বাকি।শুধু একটু সুযোগ করে দিও জানানোর।

চলো চলো কাটি কেক।
নাও ছুড়িটা ধরো,
মিহাদ উঠে আমার চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়ায়,
আর ছুড়িটা আমার হাতে দিয়ে আমার হাতের উপর হাত রাখে।
হঠাৎ ওর স্পর্শে আমার সারা শরীর শিউরে উঠে।

আমি কেক টা কাটতে যাবো,আর হঠাৎ ই আমার চোখ যায় আমাদের সামনের টেবিলের দিকে।
মিহাদ আমার অপজিটে বসে ছিলো বলে যেই টেবিল টা মিহাদের কারণে আমার চোখের আড়াল ছিলো।

আর মিহাদ উঠে আসতেই আমার চোখ সেখানে যায়।
আর আমার হাত থেকে শুরু করে সারা শরীর কাঁপতে থাকে।

-এই তিতিশ্মা,কি হলো?
তিতিশ্মা,কি হলো তোমার?
কাঁপছো কেন তুমি?

আমি মিহাদকে কোন উত্তর না দিয়ে আমার হাতের তর্জনি আঙুল দিয়ে সামনের টেবিলের দিকে ইশারা করলাম,
আর সঙ্গে সঙ্গে আমি সেন্সলেস হয়ে গেলাম।

চলবে…

No comments