Breaking News

শেষ বিকেলের রোদ । পর্ব -০৬



মাগরিবের নামাজের পর পড়তে বসেছে তুবা। এমনসময় মনে হয় নাম্বারটাতে তো কল করা হলো না। তুবা দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে রুমের আশেপাশে কেউ আছে কিনা। তারপর নাম্বারটা ফোনে তুলে কল দেয় তুবা। তিনবার বেজে কেটে যায়, কেউই রিসিভ করে না।
তুবা রেগে সুপ্তিকে কল দিয়ে বলে,
“বিলাই, হাতি কার নাম্বার দিয়েছিস তুই?”
সুপ্তি ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“কেন? গিফট ভালো লাগে নি?”
“ঘোড়ার ডিমের গিফট, কেউই তো রিসিভ করে না।”
সুপ্তি বেশ স্টাইল করে বলে,
“রিলেক্স মাই জান, মাই এংরি বার্ড। একটু ধৈর্য রাখো, বেবি।”
তুবা হেসে দেয়। সুপ্তি আবারো বলে,
“রাখছি তাহলে, কাল ভার্সিটিতে এসে জানাতে ভুলিস না গিফটটা কেমন লাগলো।”
“আচ্ছা, আচ্ছা, দেখি কে রিসিভ করে?”
সুপ্তি ফোন রাখে। তুবা আবারো ওই নাম্বারে কল দেয়। এবারে রিসিভ হয়। ওপরপাশ থেকে মিষ্টি কণ্ঠি এক নারী বলে উঠে,
“আসসালামু আলাইকুম।”
তুবা একটা ঢোক গিলে বলল,
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
“কাকে চাই?”
তুবা কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও যথেষ্ট স্বাভাবিকভাবে বলল,
“এটা কি স্নিগ্ধার নাম্বার?”
“না, রং নাম্বার।”
“এক মিনিট।”
“জি”
“আপনি কে বলছেন?”
“আমি মিসেস আছিয়া।”
“ওহ, সরি আন্টি।”
তুবা ফোন রেখে রাগে কিড়কিড় করছে। কিছুক্ষণ রাগে নিজের হাতে নিজেই খামচায় সে। তারপর সুপ্তিকে কল করে। সুপ্তি রিসিভ করে বলে,
“কিরে ডোজটা বেশি হয়েছে নাকি?”
তুবা রাগে রি রি করে বলল,
“মিসেস আছিয়া কে?”
“আছিয়া?”
“হুম, আছিয়া। তুই আমাকে তার নাম্বারই দিয়েছিস।”
“কি?”
সুপ্তি চেঁচিয়ে উঠলে তুবা ধমক দিয়ে বলে,
“চুপ, একদম চুপ। তুই আমার সাথে কোনো কথাই বলবি না।”
তুবা ফোন রেখে, মোবাইল বন্ধ করে রাখে। সুপ্তির উপর প্রচন্ড রাগ উঠছে।
অন্যদিকে,
আছিয়া জিনাতের রুমে গিয়ে নক করে। জিনাত দরজা খুললে আছিয়া মিষ্টি হেসে নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখ তো মা, একটু আগে কে কল দিয়েছিল?”
“দাও”
জিনাত ফোনটা নিয়ে দেখে বলে,
“সেইভ করা নেই নাম্বারটা। ছেলে নাকি মেয়ে ছিল?”
“মেয়ে ছিল। কোনো স্নিগ্ধাকে খুঁজছিলো।”
“তাহলে রং নাম্বার। এতো টেনশন করো না তো।”
“হুম”
মিসেস আছিয়া রুমে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর তুবা আবারো কল করে মিসেস আছিয়ার নাম্বারে। এবারে কল করেছে সরি বলার জন্য।
কলিং বেল বেজে উঠলে মিসেস আছিয়া ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করে জিনাতকে বলল,
“মা জিনাত, দরজাটা খুলে দে তো। হয়তো আলিয়ার এসেছে।”
‘আলিয়ার’ নামটা শুনেই চমকে উঠে তুবা। তারমানে সুপ্তি কি ওকে আলিয়ারের নাম্বার দিতেছিল? সুপ্তি কি করে আলিয়ারের নাম্বার পাবে?
সাতপাঁচ ভেবে তুবা কলটা কেটে দেয়। আলিয়ার মায়ের রুমে উঁকি দিয়ে বলে,
“আসসালামু আলাইকুম, আম্মু।”
“ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”
আলিয়ার মুচকি হেসে বলে,
“ফোন কানে কেন? কার সাথে কথা বলো?”
“আর বলিস না রে বাবা, কখন থেকে একটা আননোন নাম্বার থেকে বারবার কল আসছে।”
আলিয়ার চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বলে,
“তোমার সাথেও মাইনষে লাইন মারতে চায়? কালে কালে আর কত কি দেখবো? আচ্ছা, আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।”
আলিয়ার ফ্রেশ হতে যায়।
তুবা সুপ্তিকে ম্যাসেঞ্জারে নক করে বলে,
“আলিয়ারের নাম্বার দিতে চেয়েছিলি?”
“হু”
“কার থেকে নিয়েছিস?”
“শুভ”
কিছুক্ষণ পর তুবা আবার ম্যাসেজ দেয়,
“ওই শুভ গন্ডারটাকে কালকে ভার্সিটিতে ধরবো। ভুল নাম্বার দেয়ার শাস্তি ওকে পেতে হবে।”
“হবে মানে, পেতেই হবে। তা তুই কিভাবে জানলি নাম্বারটা আলিয়ারের?”
“এমনিই।”
তুবা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ভাবছে,
“আলিয়ার তো অনেক থাকতে পারে, কিন্তু এ কোন আলিয়ার? বাজিয়ে দেখতে হবে।”
রাত ১১ টা,
শুভকে পড়ানো শেষ করে রুমে এসেছে মুগ্ধ। সারাদিন অফিস করে এসে এই ছেলেকে পড়ানোটা খুবই কষ্টের কাজ ওর পক্ষে। না পড়িয়েও উপায় নেই, এমনিতে পড়তে বসবে না।
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে মুগ্ধ। তারপর জিনাতকে কল করে। প্রায় ১০-১২ বার কল করলেও রিসিভ হয় না। মুগ্ধ অবাক হয়, তারপর ম্যাসেজ পাঠায়,
“ফোন রিসিভ করো।”
আবারো মুগ্ধ কল দেয়, এবারে রিসিভ হয়। জিনাত বলতে শুরু করে,
“সমস্যা কি আপনার? আমাকে এতো বিরক্ত কেন করছেন? আমার কি নিজের ব্যক্তিগত কোনো কাজ থাকতে পারে না নাকি সারাদিন আপনার সাথে পকপক করতে হবে?”
জিনাতের কথায় কিছুটা অপমানবোধ করে মুগ্ধ। কোনো কথা না বলে কল কেটে দেয়। বামচোখ দিয়ে একফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
জিনাত ফোন রেখে বসে বসে ফুঁসতে থাকে। লজ্জা থাকলে এই ছেলে আর ফোন দিবে না।
এদিকে মায়ের কাছ থেকে আননোন নাম্বারটা এনে নিজের ফোন দিয়ে কল করে আলিয়ার। তুবা রিসিভ করে। আলিয়ার ভদ্র ভাষায় বলে,
“আসসালামু আলাইকুম, আপনি যে-ই হোন না কেন আপনি আমার মাকে আর বিরক্ত করবেন না।”
তুবা বাঁকা হাসছে। এটা যে আলিয়ারেরই কন্ঠ তা বেশ ভালোই বুঝতে পারে। সাধারণত মানুষের কন্ঠ ফোনে শুনতে কিছু অস্বাভাবিক ও অচেনা লাগলেও আলিয়ারের ক্ষেত্রে তেমনটা নেই। হয়তো তুবা ওর কন্ঠটা বেশি রপ্ত করে ফেলেছে।
“কি হলো কথা বলুন”
আলিয়ারের কথায় ধ্যন ভাঙে তুবার।
নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,
“মি. আলিয়ার?”
আলিয়ারের কপাল কুঁচকে যায়। কিছুটা অদ্ভুত লাগে, অচেনা কেউ হলে ওকে কি করে চেনে। তুবা এবারে নিজের আসল চাল চালে। ও স্বাভাবিক কন্ঠে বলে,
“আপনাকে খুব ভালোবাসি, আলিয়ার। আপনার মুখের ভাষায় থুরি চোখের ভাষায় আমি কালা হয়ে যাই, মানে কানে শুনি না আর কি। আপনাকে দেখার পর থেকে আমার আকাশে রাতেও সূর্য উঠে, দিনে কিন্তু চাঁদ উঠে না।”
আলিয়ার বেক্কলের মহাশূন্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কি বলছে এই মেয়ে? ফোনটা কি পাবনার মেন্টাল হসপিটালে গেল নাকি? আলিয়ার একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আবারো ফোন কানের কাছে নেয়।
তুবা বলেই যাচ্ছে,
“আপনাকে দেখার পর ঢাকার ড্রেনকে আমার কাছে নীলনদ মনে হয়, তুলাকে আকাশ মনে হয়। আপনাকে দেখে আমি হয়তো টাইম ট্রাভেল করে ৪ কোটি বছর পিছিয়ে গেছি। যদিও আমি এতো বয়স্ক না। আপনাকে অন্যরা বুড়া বললেও আমার কাছে ২ মাসের বাচ্চা মনে হয়েছে, ইচ্ছে করছিল গাল টেনে চুমো দিই।”
আলিয়ার ভয়ে ভয়ে বলল,
“আপনি কি একটু থামবেন?”
তুবার কোনো থামাথামি নেই,
“আপনাকে নিজের মনে মহাশূন্যে থাকা একমাত্র রকেটে চড়তে দেবো, আপনাকে নিয়ে ইউরেনাসে বেড়াতে যাবো। আলিয়ার আপনি কি আমার বকবক সারাজীবন শুনার জন্য প্রস্তুত।”
আলিয়ার কল কেটে দেয়। এমন পাগলের সাথে কথা বলার কোনো ইচ্ছা ওর নেই। এমনিতেই যা যা শুনিয়ে দিয়েছে তাতেই ওর রাতে দুঃস্বপ্ন আসবে। আলিয়ার শুয়ে পড়ে, আজকে আর কিছুই কল্পনায় আসছে না ওর।
এদিকে তুবা ফোন রেখে হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। আলিয়ার নিশ্চয়ই এখন এসব ভাবতে ভাবতে অজ্ঞান হওয়ার যোগান হয়েছে। আলিয়ারের মুখের এক্সপ্রেশন দেখতে খুব ইচ্ছা করছে তুবার।
পরেরদিন,
আজ জিনাতকে ভার্সিটিতে দিতে যাবে না আলিয়ার। গতরাতের ঘটনা এখনো ওকে ভাবাচ্ছে। এমন বাজে ধরনের রসিকতা কে করবে ওর সাথে? আলিয়ার জিনাতকেই সন্দেহ করছে। কারণ আকারে ইঙ্গিতে জিনাত এখনো বোঝাতে চায় যে জিনাত ওকে ভালোবাসে।
খাবার টেবিলে সবাই কথা বললেও আলিয়ার কোনো কথাই বলছে না। রাগে রি রি করছে সে। কিছুক্ষণ পরপর জিনাতের দিকে তাকাচ্ছে।
মিসেস আছিয়া বললেন,
“আলিয়ার বাবা, খাচ্ছিস না কেন?”
আলিয়ার চমকে উঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কই, খাচ্ছি তো।”
আলিয়ার কোনোমতে খেয়েই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। জিনাত যদি এমন কাজ করে থাকে তবে জিনাতকে সকলের সামনে অপমান করবে আলিয়ার।
তুবা আজ ভার্সিটিতে যায়নি। সুপ্তি ও স্নিগ্ধাকে জানিয়েছে পড়াগুলো নোট করে রাখতে। তুবা বাসায় জানিয়েছে সে ভার্সিটিতে যাবে, কিন্তু মাঝরাস্তায় এসেই তার মত পাল্টেছে। আজ সারাদিন আলিয়ারকে বিরক্ত করে কাটাবে সে।
চলবে..

No comments