Breaking News

শেষ বিকেলের রোদ । পর্ব -২৪



রাত ২ টা,
ছাদে বসে আছে মুগ্ধ, জিনাতের সাথে ফোনে কথা বলছে। সন্ধ্যায় জিনাতের বলা কথাটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না মুগ্ধ। জিনাত আলিয়ারকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, এটা মেনে নিতেই কষ্ট হচ্ছে মুগ্ধের।
“সব কষ্ট আমার জন্য কেন জিনাত? বলতে পারবে এর কারণটা?”
“মুগ্ধ, একটু বুঝতে চেষ্টা করো প্লিজ। তুমি বিষয়টাকে যেভাবে নিচ্ছো, ব্যাপারটা আসলে তেমন নয়।”
জিনাতের কথায় চিৎকার দিয়ে মুগ্ধ বলে,
“ব্যাপারটা তবে কেমন? তুমি আলিকে ভালোবাসো, তবে আমি কি?”
“ওভাররিয়েক্ট করো না মুগ্ধ।”
“আমি ওভাররিয়েক্ট করছি? (একটু থেমে) বাহ, আলিকে ভালোবাসলে আর আমাকে চিঠি পাঠালে?”
জিনাত চুপ করে আছে। মুগ্ধ বলল,
“কি? এখন কেন চুপ করে আছো?”
“বোঝার চেষ্টা করো, মুগ্ধ। আলিয়ারের প্রতি আমি কোনো অনুভূতি ছিল না ওটা আবেগ ছিল।”
মুগ্ধ আবারো চিৎকার করে উঠে,
“একদম চুপ, তুমি মিথ্যা বলছো।”
জিনাত ভয়ে কেঁপে উঠে। মুগ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্তকন্ঠে বলে,
“আলি আর তুমি ছোটবেলা থেকেই বেশ ক্লোজ?”
“হুম, আমরা বন্ধুর মতোই থেকেছি।”
জিনাত এখনো ভয়ে ভয়ে আছে। মুগ্ধও চুপচাপ আছে। জিনাত আমতাআমতা করে বলল,
“মু.. মুগ্ধ, আপনি কি আমার কথাটা একবারও বুঝবেন না?”
মুগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কি বোঝার আছে?”
“যা বললাম, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো।”
মুগ্ধ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
“একটা অনুরোধ করবো জিনাত?”
জিনাত একটা ঢোক গিলে বলল,
“করো।”
“কারো কথায় কাউকে সন্দেহ করো না। আবেগে ভেসে যেও না, কারণ আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। আর একটা কথা যা করবে ভেবে চিন্তে করবে। তোমার প্রতি রাগ উঠলেও একটা কথা ঠিক যে তুমি আমাকে সবটা বলে দিয়ে ভালোই করেছো, এতে পরবর্তীতে আর কোনো সমস্যা হয়তো হবে না।”
জিনাত চুপচাপ মুগ্ধের কথাগুলো শুনছে, মুগ্ধকে যত চিনছে ততই অবাক হচ্ছে সে। মুগ্ধ আবারো বলল,
“আর কোনো কথা কি আছে যা আমি জানি না।”
জিনাত চোখের পানি মুছে নাক ঝেড়ে বলল,
“না, যা বলার ছিল সবই বলেছি।”
“তবে ম্যাডাম, রেডি থাকেন। আপনার বাবা-মা বাসায় ফিরলেই আপনার বাসায় যাচ্ছি।”
জিনাত হেসে দেয়। মুগ্ধ আবারো একটা সুযোগ দিয়ে দেয় জিনাতকে। এটাই তো ভালোবাসা, ভুলগুলোকে শুধরে দিয়ে আগলে রাখা চেষ্টা আর নিজের সাথে মানিয়ে নেয়া।
১ সপ্তাহ পর,
“এতোদিন কেন লাগছে, বাবা? তোমরা তো বলেছিলে তিন-চার দিনেই ফিরে আসবে।”
আবদারের সুরে কথাটা বলল আলিয়ার৷ একটা ছোট বাচ্চা বাবার কাছে যেভাবে চকলেটের আবদার করে, ঠিক সে ভাবে কথাটা বলল আলিয়ার।
ইব্রাহিম হেসে বললেন,
“আসতেই তো চাই কিন্তু তোমার মা-চাচীরাই তো আসতে চাচ্ছে না।”
“কেন? উনাদের আবার কি হলো?”
“তোমার মায়ের নাকি এখানে খুব ভালো লাগছে। শহরের বাতাস নাকি ধুলাবালিতে ভরা, দূষিত আর গ্রামে নাকি শান্তি পায় আর তোমার চাচিও তার কথায় হা তে হা মিলাচ্ছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলিয়ার বলল,
“ঠিক আছে! তাহলে আরও কিছুদিন থেকেই আসো।”
ইব্রাহিম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
“তুমি কি কিছু বলতে চাও, আলিয়ার?”
আলিয়ার বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে। এই মুহূর্তে ওর বাবাকে ওর অসুস্থতার কথা জানিয়ে শুধু শুধু দুশ্চিন্তায় ফেলার কোনো কারণ ও দেখছে না। তার চেয়ে ভালো বাসায় আসলে সবটা বুঝিয়ে বলবে।
আলিয়ার কথা ঘুরানোর জন্য কিছুটা আমতাআমতা করেই বলে,
“আসলে.. ওই ভাবছিলাম, মায়ের কথা মেনে নিই।”
ইব্রাহিম প্রশ্নসূচক বাক্য ছুঁড়ে দিলেন,
“কোন কথাটা?”
আলিয়ার কিছুটা লজ্জা লজ্জা পেয়েই বলে,
“মা যে বিয়ে করতে বলে, সেই কথাটা।”
ইব্রাহিম জোরে হেসে দেয়। তার ছেলে যে এখনো বাচ্চা রয়ে গেছে, তা সে ভালোই বুঝতে পারছে। নয়তো বাবার কাছে কেউ এভাবে নিজের বিয়ের কথা বলে?
ইব্রাহিমের হাসিতে আলিয়ার আর একটু লজ্জা পায়। যদিও এই মুহূর্তে বিয়ে নিয়ে কিছুই ভাবছে না সে। কি করে ভাববে? অসুস্থতার কারণে এমনও হতে পারে ও মারাও যেতে পারে। সুতরাং কোনো মেয়ের সাথে জীবনে জড়িয়ে মেয়েটার জীবন নষ্ট করার কোন মানেই দেখছে না। তুবা ঠিক করেছে ওর থেকে দূরে চলে গিয়ে, না হলে এই কষ্টটা হয়ত সে সহ্য করতে পারত না।
আলিয়ার চুপ থাকায় ইব্রাহিম বলল,
“তুমি কি কিছু ভাবছো, আলিয়ার?”
“কই? না তো, বাবা”
চমকে উঠে খুব তাড়াহুড়ো করে কথাটা বলে আলিয়ার।
ইব্রাহিম খুশি মনেই বললেন,
“এতোটা চিন্তা করো না, তোমার পছন্দের মানুষের সাথেই তোমার বিয়ে দিবো। আমি জানি আমার ছেলের পছন্দ খারাপ নয়।”
আলিয়ারের মুখটা মুহূর্তেই চুপসে যায়। ওর পছন্দের মানুষ মানে তুবার কথা ওর বাবা কিভাবে জানলো? জিনাত জানিয়েছে? যদি জিনাত উনাকে জানিয়ে থাকে তবে তুবাকে মিথ্যা কথাগুলো কে বলল? আবারো কিছু প্রশ্নের বেড়াজালে পড়ে যায় আলিয়ার।
“ঠিক আছে, তবে এখন রাখি? বিকেলে কথা হবে।”
“ঠিক আছে, বাবা।”
আলিয়ার ফোন রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ে। আজ সকাল থেকেই শরীরটা ভালো লাগছেনা, তাই আজ অফিসেও যায়নি। তার উপর এতো প্রশ্ন আর চিন্তায় চিন্তায় মাথাও ঠিকমতো কাজ করছে না।
অন্যদিকে,
ঘড়িতে বেলা ১২ টা, জিনাত তাড়াহুড়া করে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছে। বাসায় গিয়ে রান্না করলেই দুপুরের খাবার খেতে পারবে, আলিয়ার বা জেরিন কেউই তো আর রান্না করবে না।
রিকশার জন্য অপেক্ষা করছে এমনসময় একটু দূরে তুবাকে দেখতে পায় জিনাত। তুবা মনের সুখে কোণ আইসক্রিমের খোসা ছাড়াচ্ছে।
জিনাত তুবার কাছে গিয়ে তুবার পেছন থেকে বলল,
“খুব সুখে আছো মনে হয়?”
তুবা চমকে উঠে পেছনে ফিরে জিনাতকে দেখে বাঁকা হাসে। ওর হাসিতে জিনাত কিছুটা রহস্যও খুঁজে পায়।
তুবা জিনাতের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“তোমরাও তো খুব সুখে আছো আর আমার সুখ দেখলেই হিংসে হয়?”
“দেখো তুবা, তুমি শুনো কম আর বোঝো বেশি।”
তুবা মাথা বাকিয়ে ভাব নিয়ে বলে,
“তা কি কি শুনিনি? আর কি বাকি আছে?”
“আলিয়ারের সাথে আমার বিয়ে হয়নি আর হবেও না। হ্যাঁ, বিয়ে ঠিক হয়েছিল কিন্তু তা ভেঙ্গে গেছে।”
তুবা অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। জিনাত বলে,
“কি হলো? চুপ করে আছো যে?”
তুবা আড়চোখে জিনাতের দিকে তাকায়। নিজের হাতের আইসক্রিমে একটা কামড় বসিয়ে বলল,
“তাতে আমি কি করবো?”
“শুনো, যা হয়েছে তা কেবলই কিছু মিথ্যা আর ভুল বোঝাবুঝির ফল ছিল। আলিয়ার আর আমার মধ্যে কোনো সম্পর্কই নেই।”
“তো আমি কি করবো?”
বলে আইসক্রিম খেতে খেতে চলে যাওয়া জন্য ঘুরে দাঁড়ায় তুবা। দুকদম এগিয়ে যেতেই জিনাত বলল,
“আলিয়ার অসুস্থ।”
তুবা থমকে দাঁড়ায়। ওর জানতে ইচ্ছে করছে আলিয়ারের কি হয়েছে, কেমন আছে সে। তবুও চুপ করে থাকে।
জিনাত আবারো বলে,
“আলিয়ারের দুটো কিডনিই ড্যামেজ হয়ে গেছে।”
তুবার হাত থেকে আইসক্রিমটা নিচে পড়ে যায়। কি শুনছে ও? আলিয়ার এমন বিপদের মুখে আছে আর ও কিনা আলিয়ারের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। নিজের প্রতিই ঘৃণা হচ্ছে তুবার।
জিনাত কথা চালিয়ে যাচ্ছে,
“ট্রান্সপ্লান্ট করার জন্য ডোনারও পাওয়া যাচ্ছে না। সব কাজিনদের সাথে কথা বলেছি, সবাই কোনো না কোনো অজুহাত দিচ্ছে। কে চাইবে নিজের একটা কিডনি স্বজ্ঞানে অন্যকে দিয়ে দিতে?”
তুবা কাঁদছে কিন্তু নিজের চোখের পানি জিনাতকে দেখাচ্ছে না। জিনাত গিয়ে তুবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে,
“এখন কান্না কোনো সমাধান না, আলি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছে। ওর তোমাকে প্রয়োজন।”
তুবা নিজের চোখ মুছে গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“উনার মা উনার সাথে আছেন, আমার মতো কালো আর কুৎসিত মেয়ে না থাকলেও হবে।”
তুবা জিনাতকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয়। জিনাত ওর এক হাত ধরে আরেকহাতে ফোন বের করে তুবার নাম্বারে কল দেয়। তুবা একবার ওর দিকে আরেকবার কাঁধে থাকা ব্যাগের দিকে তাকায়।
জিনাত রাগী সুরে বলল,
“নাম্বারটা সেইভ করে রেখো, হয়তো প্রয়োজন হবে। আলি মরে গেলে ম্যাসেজ অন্তত পাবে।”
জিনাত আর কথা না বাড়িয়ে ফুটপাত থেকে রাস্তার দিকে নেমে যায়।
তুবার ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। না, শুধু ঠোঁট নয়, ওর হাত-পা কাঁপছে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না তুবা। মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়।
জিনাত আবারো দৌঁড়ে ফিরে আসে। আরো কয়েকজন এসে তুবাকে ধরে। ভীড় দেখে সুপ্তিও এগিয়ে এসে দেখে তুবা পড়ে আছে।
জিনাত নিজের ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে তুবার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। সুপ্তি এসে তুবাকে ধরে বলে,
“তুবা, ওই.. কি হয়েছে ওর? (জিনাত উদ্দেশ্য করে) তুবা।”
জিনাত তুবার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“হয়তো প্রেশার লো। তুমি কে?”
“ওর ফ্রেন্ড।”
তুবা ধীরে ধীরে চোখ খুলে। সুপ্তি ওকে ধরে দাঁড় করিয়ে জিনাতকে বলে,
“আপনাকে ধন্যবাদ, আমি ওকে বাসায় পৌঁছে দিবো?”
“আর ইউ শিউর?”
“ইয়াহ”
জিনাত একবার তুবার দিকে তাকিয়ে চলে যায়। তুবা চোখ পিটপিট করে ওর যাওয়া দেখে। মনে পড়ছে সেদিনের কথা যেদিন কলেজের সামনে প্রেশার ডাউন হয়েছিল ওর। আলিয়ার ওকে কতটা কেয়ার নিয়ে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিল, তখন তো ভাবেনি মেয়েটা খারাপ হতে পারে। তবে আজ আলিয়ারের বিপদে ও পাশে থাকতে পারছে না কেন? কার কথা শুনবে ও, নিজের মনের কথা নাকি আছিয়ারূপী সুলতানার কথা? নিজেই নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে কিন্তু বারবার ভেঙ্গে পড়ছে।
.
চলবে……

No comments

info.kroyhouse24@gmail.com