Breaking News

বিরহ মিছিল । পর্ব - ০৪


মুগ্ধতার দিকে বিষ্ময়কর দৃষ্টি আদিলের। হ্যা সে কাল একটি মেয়ে সহপাঠী কে পরিক্ষায় সাহায্য করেছে। গতকালকের কথা মুগ্ধতার জানার কথা না। মুগ্ধতা তো কালকে স্কুলে যায় নি। আদিল অবিশ্বাস্য গলায় বলল,

" তুমি এটাও জানো? আর কি কি জানো আমার ব্যাপারে? কার কাছে খবর রাখো আমার? "
আদিলের অভিব্যক্তি দেখে মুগ্ধতা উচ্চ স্বরে হাসলো। " তুমি ওয়াশরুমে দিনে কতবার যাওয়া আসা করো সেই খবর ও রাখি, শুনবে?"
চোখের পাতা টিপটিপ করে বলল মুগ্ধতা। কন্ঠে তার জোড়। অথাৎ সে সত্যি জানে। আদিল নাকমুখ কুঁচকাল। রাগী গলায় বলল,
" লজ্জাহীন মেয়ে ছি!"
মুগ্ধতার হাসির আওয়াজ চওড়া হলো। রিকশা স্কুল গেটে এসে থামালো। মুগ্ধতা রিকশা থেকে নেমে আদিলকে আদেশ করলো,
" রিকশা ভাড়া দিয়ো ওকে? আমি যাই।"
মুগ্ধতা স্কুল গেটে ঢুকে গেল। আদিল ও নামলো তারপর। রিকশা ভাড়া মিটিয়ে আদিল ও চললো স্কুল গেটের পথে।

ডিসেম্বর মাস। দুপুর একটা। সকালের কুয়াশায় দুপুর একটা বেজেও বোঝার উপায় নেই এখন দুপুর একটা। কুয়াশায় চারদিকের কিছু দেখা যাচ্ছে না। কাল ১৬ ডিসেম্বর। বিজয় দিবস। দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে সরকার করে নানা আয়োজন। পায়রা উড়ানো, গান সেলুট, ডিসপ্লে, কুচকাওয়াজ, আবৃত্তি দিনটিকে মুখরিত করে তোলে।
স্কুলে দুদিন থেকে কুচকাওয়াজ প্রেকটিস করাচ্ছে। মুগ্ধতা এবার কুচকাওয়াজে অংশ নিবে বলে ঠিক করেছে। ডিসপ্লে এইবার করবে না। সেই সিদ্ধান্ত কে প্রাধান্য দিয়ে প্রেকটিস করছে সবার সাথে।
চারবার একটানা মাঠ ঘোরার পর সাদা পৃষ্ঠায় নাম লিখছে দলের লিডার। এই তালিকার নাম গুলো আগামীকাল স্টেডিয়ামে মাঠ প্রদর্শন করবে। ক্লান্ত চোখমুখে ঘাসে বসলো মুগ্ধতা। পা ব্যথা করছে তার। পায়ের তালা ব্যথায় টনটন করছে। ক্লাস রুম থেকে স্কুল ব্যাগ কাঁধে করে ছেলে মেয়ে বের হচ্ছে। মূলত স্কুল ছুটি। গেট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তারা। গেটে এখন ভিড়। এই ভিড়ের মধ্যে আদিলকে দেখা গেল।

মুগ্ধতার ক্লাস রুমে গিয়ে ব্যাগ আনতে হলো না। তার বান্ধবী প্রগতি দৌড়ে দুজনের ব্যাগ নিয়ে আসলো। মুগ্ধতা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ পেল চঞ্চল চোখ যুগলে। প্রগতি মুগ্ধতার কোলে ব্যাগ দিয়ে বলল,
" চল মুগ্ধতা৷ স্কুল প্রায় খালি।"
মুগ্ধতা ভবন গুলোর দিকে একবার তাকালো। দুই,তিন জন কে দেখা যাচ্ছে মাত্র ভবনে। মুগ্ধতা মাথা নাড়িয়ে আশ্বস্ত করে উঠে দাঁড়াল।
দু'মাস পর মুগ্ধতার মাধ্যমিক। মুগ্ধতার হাবভাবে বোঝা সম্ভব নয়। ডিসেম্বরের পনেরো দিন অলরেডি চলে গেছে। সন্ধ্যায় জেঠার বাড়িতে গেল গণিত করতে। গণিত করাটা অজুহাত মাত্র মুগ্ধতার।
ফুলকপির পাকোড়া বানিয়েছেন পারভিন। আদিল টেবিলে বসে খাচ্ছিলো পাকোড়া। কোথা থেকে মুগ্ধতা এসে ঘাপটি মেরে পাশের চেয়ারে বসলো। টেবিলের উপর রাখা ফুলকপির পাকোড়ার প্লেট এক প্রকার টেনে নিজের আয়ত্তে আনলো মুগ্ধতা। উচ্ছ্বাসে বলল,

" পাকোড়া বানিয়েছ জেঠিমা। একা একা ছেলে কে খায়াচ্ছো?"
পারভিন জবাবে হাসলো। মুগ্ধতার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
" যত ইচ্ছে খা। আরও আছে লাগলে বানিয়ে দিবো।"
মুগ্ধতা সাচ্ছন্দ্যে একটা পাকোড়ায় কামড় বসালো। ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে বলল,
" তুমি কতো ভালো জেঠিমা। "
জেঠিমা মৃদু হেসে সে রান্না ঘরে ঢুকলো। আদিল খাওয়া শেষ করে জগ থেকে পানি গ্লাসে ঢেলে খেলো। মুগ্ধতার দিকে ভুল করেও তাকালো না।
মুগ্ধতা একদিকে পাকোড়া খাচ্ছে অন্যদিকে আদিল কে দেখছে। আদিল সেদিকে গ্রাহ্য না করে পারভিন কে বললেন,
" মাম বাবাই এলে আমায় ডেকো।"
আদিল রুমে চলে গেল। মুগ্ধতা চটপটে কন্ঠে বলে উঠলো,
" জেঠা আসেনি জেঠিমা?"
"এখনো আসেনি। কাল স্কুলে অনুষ্ঠান আছে না? সে জন্য দেরি হবে আজ আসতে।"
মুগ্ধতা পানি খেয়ে চেয়ার থেকে উঠলো। অন্য চেয়ারে রাখা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বলল,
" ও তাহলে আমি যাই। আজ জেঠা নিশ্চয়ই পড়াবে না।"
 
ভোর সাড়ে পাঁচটায় মুগ্ধতা ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো। সাড়ে ছ'টা নাগাত মায়ের সঙ্গে স্কুলে উপস্থিত হলো। শীতার্ত সকাল।
হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস বইছে চারিদিক। কুয়াশা অল্প অল্প ঝড়ছে।
জয়দেবপুরের শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে সকাল পনে সাতটায় নিয়ে যাওয়া হলো। গাজীপুরের নামি-দামি, না জানা অসংখ্য স্কুল তারই মাঝে উপস্থিত। লাইনে লাইনে দাঁড়িয়ে মাঠ দখল করে নিয়েছে। আরও স্কুলে আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। মাইকে বলিষ্ঠ পুরুষালি কন্ঠস্বরে আবৃত্তি হচ্ছে।
তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?
পায়রা উড়ানো হলো আকাশে। বাকযন্ত্র বাজছে। আকাশে অনেক গুলো বেলুন ও উড়ানো হলো। দর্শকের স্থানে বসে থাকা ছোট ছোট কিশোর কিশোরীর কতই না উচ্ছ্বাস। চোখের অগোচর না হওয়া অবধি চোখ এক মুহূর্ত সরাতে রাজি নয়।
মাঠ প্রদর্শন শুরু হলো। একের পর এক স্কুল,কলেজ, মাঠে কুচকাওয়াজ করতে করতে এগোয় সামনে। মাইকে নাম বলছে মাঠ প্রদর্শন স্কুল, কলেজের নাম।
মুগ্ধতার স্কুলের কুচকাওয়াজ শেষ হতে মুগ্ধতা স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে গেল। মুগ্ধতার মা এখনো স্টেডিয়ামে। উনি অবশ্য মাঠে ডিসপ্লে দেখবেন বলে বসে।

বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজবাড়ী তে মেলা হচ্ছে।
প্রতিবছর মেলা হয় ঘটা করে। মুগ্ধতা সে দিকেই গেল। আদিল মেলায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলো। মুগ্ধতা চকিতে হাত ধরলো আদিলের। উদ্বিগ্ন স্বরে আওড়াল,
" এই আদিল আমি ম্যাজিক নৌকায় উঠবো। চলো তুমি আমায় উঠাবে।"
বন্ধুরা কথা থামিয়ে ফেললো। ঠাট্টা করে হেসে একজন বলল,
" যা আদিল। তোরই দিন।"
মুগ্ধতা কথা কানে নিল না। চঞ্চল গলায় বলল,
"চলো, চলো।"
আদিল মেলায় তাকিয়ে মুগ্ধতার সঙ্গে চললো।
আদিল আদৌও বুঝলো নিছক কথা এটি?

আদিল মুগ্ধতার জন্য ম্যাজিক নৌকার জন্য টিকিট কাটলো। ম্যাজিক নৌকা চলছে। নৌকায় বসে একেকজন চিৎকার চেচাঁমেচি করছে, কেউবা উপভোগ। আদিল চুপ করেই দেখছে। এর পর মুগ্ধতা উঠবে। মুগ্ধতা কে টিকিট দিয়ে আদিল চলে যেতে চেয়েছিল। মুগ্ধতা এক দমে অনিচ্ছা প্রকাশ করে।
মুগ্ধতার নৌকায় উঠার পালা। এতক্ষণ নৌকায় বসে থাকা লোকজন নামছে। যে যার ইচ্ছে মতো জায়গা দখল করে বসছে। মুগ্ধতা আদিলকে বলল,
" এই আদিল চলো।"
আদিলের কপালে ভাজ পড়লো। ভ্রূদ্বয় কুঁচকালো। বলল,
" আমি কেন? তুমি উঠতে চেয়েছ। তুমি যাও৷
মুগ্ধতা কথা গ্রাহ্য না করে ভিড়ে আদিলের হাত টেনে নৌকায় উঠার সিঁড়ি তে গেল। আদিল কপট রাগ দেখিয়ে আওড়াল,

" আমি তোমার জন্য টিকিট কেটেছি শুধু। তুমিই উঠতে পারবে। পাগলামি করো না মুগ্ধতা।"
মুগ্ধতা ক্রুর হাসলো। হাতের মুঠোয় থাকা টিকিট আদিলের চোখের সামনে ধরে বলল,
" এই তো টিকিট। তুমি আমার জন্য কেটেছ। আমি তোমার জন্য।"
আদিল ঈগল চোখে তাকালো। মেয়েটা এতো সেয়ানা মনে মনে ভাবলো। অনিচ্ছা সহিত বলল,
" আমি এ সবে উঠবো না।"
মুগ্ধতা জোর করে বলল,
" প্লিজ আদিল আজকে শুধু৷ প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ!"
মুগ্ধতার কথা ফেলতে বোধহয় পারে না আদিল। নৌকায় উঠলো দুজনে। আদিল বসলো নৌকার একটি সিটে। মুগ্ধতাও তার পাশের সিটে বসল। দু মিনিট পর নৌকা দুলতে লাগলো। নিচু থেকে উঁচু, উঁচু থেকে নিচু। মুগ্ধতা ভয় পেয়ে গেল এতো উঁচু তে নৌকা উঠায়। আদিল চুপ করেই আছে।
মুগ্ধতা দু' খামচে ধরলো আদিলের হাত। চিনচিন ব্যথায় আদিল হাতের দিকে তাকালো।
খামচানো স্থান থেকে অল্প রক্ত বের হচ্ছে। এইবার মুগ্ধতার দিকে তাকালো।
দেখলো মুগ্ধতা শরীর কাঁপছে। অধর ঈষৎ কম্পিত হচ্ছে। দুই চোখের পাতা খিঁচে মুগ্ধতা। আদিলের কেন যেন বিরক্ত লাগলো না। মুগ্ধতার হাতের খামচি খেয়েও খারাপ লাগলো না।
সে ডেবডেব চোখে মুগ্ধতা কে মুগ্ধকর দৃষ্টিতে দেখলো।

চলবে~

No comments