Breaking News

গল্প- মনোহরণী । পর্ব - ০৩



দিনের আলোকে বিদায় জানিয়ে রাতের আঁধারে ডুবে গেছে চারিদিক।

নিশাচর পাখিরা ছাড়া সবাই এখন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।

রাতের শেষ প্রহরের ঘুটঘুটে অন্ধকার কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটেছে।

সেই সঙ্গে আলোর নব্য এক দিনের সূচনা হলো, টেনশন নিয়ে।

সকালের মৃদুমন্দ বাতাস ওর মন ভালো করলেও টেনশন কমাতে পারল না।

কারণ, কয়েক ঘন্টা পরেই ওর এডমিশন পরীক্ষার ফলপ্রকাশ হবে।

আবির ওকে শুনিয়ে বলছে, 'হবে না রে, হবে না।'

আলো টেনশনে সকাল থেকে না খেয়ে চুপ করে বসে আছে।

ওর মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে 'কী যে হবে!'

এর একটুপরেই, রোদ আলোকে কল দিয়ে হেসে জানাল,

- "অভিনন্দন ছিঁচকাদুনী! আপনি সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছেন।"

রোদের একথা শুনে আলো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর কান্নার দু'টো কারণ; প্রথমটা,
রোদের যখন মন ভালো থাকে তখন তাকে 'ছিঁচকাদুনী' বলে ডাকে।
আজ অনেকদির পরে রোদ তাকে এই নামে ডাকল। আর দ্বিতীয়টা হলো,
তার রেজাল্ট। আলো হেঁচকি তুলে কেঁদে প্রত্যুত্তরে বলল, অসংখ্য ধন্যবাদ প্রিয়।"
আলোর কান্না শুনে রোদ মিটিমিটি হাসছে।
এই মেয়ে বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ।
নতুবা সামান্য কারণে কাঁদে? আলো রোদকে 'পরে কল দিচ্ছি' বলে ওর আব্বু-আম্মুকে রেজাল্ট জানাল।
মিশু আলো দুই বান্ধবী ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে।
রেজাল্ট শুনে আলোর আব্বু খুশি হয়ে আলোকে খুব সুন্দর একটা স্বর্ণের আংটি উপহার দিলেন।
মাথায় হাত রেখে কতশত দোয়া করলেন। এভাবে সামনে এগিয়ে যেতে
অনুপ্রাণিত করলেন। আবির দুখী দুখী ভাব নিয়ে আলোকে শপিংয়ে নিয়ে যাবে বলল।
মেঘ আলোকে ফোন দিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল,
-"আমাকে তাড়াতাড়ি ধন্যবাদ দাও বউমণি।
আমি অনেক দোয়া করেছি তাই তুমি চান্স পেয়েছো।"
-"হা হা! এত্তগুলো ধন্যবাদ মেঘবাবু।"
-"স্বাগতম বউমণি।"
দু'জনে বেশ কিছুক্ষন কথা বলে কল কাটল। আলো আজ খুব খুশি তাই গুনগুন করতে করতে রান্নাঘরে গেল।
এখন সে রোদের জন্য পাটিশাপ্টা পিঠা বানাবে।
পাটিশাপ্টা পিঠা রোদের খুব পছন্দ। সে নারকেলের পুর দিয়ে পিঠা বানাচ্ছে।
আলোর আব্বু রান্নাঘরে এসে বললেন, "আমার আম্মা কী বানাচ্ছে?"
আলো মিষ্টি হেসে বলল,
-"পিঠা বানাচ্ছি। আপনি খেতে চাইলে কিনে খেতে পারেন, স্যার।"
-"কিনে খেতে হবে?"
-"অবশ্যই! আমার কষ্টের দাম নেই বুঝি?"
উনি মেয়ের কথা শুনে হাসতে হাসতে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে বললেন,
"এই নিন টাকা। আমাকে তিনটে পিঠা দিন।"
আলো টাকাটা নিয়ে পাশে রেখে ওর আব্বুকে পিঠা দিলো।
আবির লুকিয়ে আলোর পাঁচশ টাকা পকেটে ঢুকিয়ে বলল, -
"আমিও পিঠা খাব। এই নে আরো পাঁচশ টাকা। আমাকেও তিনটা পিঠা দে।"
আলো আবিরকেও তিনটা পিঠা দিলো।
তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ওর আগের পাঁচশ টাকা নেই। ততক্ষণে আবির পিঠা
হাতে নিয়ে খেতে খেতেই দৌড় দিয়েছে। আলো ঠোঁট ফুলিয়ে ওর আব্বুর দিকে তাকাল।
মেয়ের ঠোঁট ফুলানো দেখে উনি হেসে আরো পাঁচশ টাকা বের করে দিলেন।
তখন আলোর আম্মু ভ্রু কুঁচকে বললেন,
- "এখন মেয়ের বানানো পিঠা কিনে খাচ্ছো। আর আমি যে সারাদিন খেঁটে মরি, তার বেলায়?"
-"তোমাকে তো খাঁটানোর জন্য এনেছি।"

একথা বলে উনি শব্দ করে হেসে উঠলেন। আলো ওর আব্বু আম্মুর কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে।
আলোর আম্মু জবাবে কিছু বলতে যাবেন তখনই কলিংবেল বেজে উঠল।
পাশের বাসার এক ভাবি বাচ্চা নিয়ে বেড়াতে এসেছেন।
উনি মাঝে মাঝেই খোঁজ খবর নিতে আসেন। উনাকে দেখে আলোর আব্বু রুমে চলে গেলেন
আর আলো রোদের জন্য পাঁচটা পিঠা আগে তুলে নিয়ে লুকিয়ে রাখল।
আলোর আম্মু এসে পিঠা নিয়ে ওই ভাবি আর উনার বাচ্চাকে খেতে দিলেন।
খুব মজা করে পিঠা খেয়ে বাচ্চাটা দাঁত বের করে হেসে বলল, "আম্মু আরো পিঠা খাব।
" বাচ্চার কথা শুনে ওর আম্মু মুখ কাচুমাচু করছেন। আলোর আম্মু হেসে আরও
দুইটা পিঠা বাচ্চাটাকে দিলেন। তারপর কিছুক্ষণ গল্প করে উনারা চলে গেল।
অবশিষ্ট আছে আর মাত্র দুইটা পিঠা। আলো একটা আর ওর আম্মু একটা নিলো।
আলো পিঠার দিকে তাকিয়ে মুখ গোমড়া করে বলল,
-"এত কষ্ট করে বানালাম অথচ আমিই পেলাম একটা।"
একথা শুনে ওর আম্মু মুচকি হেসে বললেন,
- " এজন্যই তো আমরা মেয়ে। আর আল্লাহর দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।"

রোদ মুনিমদের টিউশন করিয়ে মেসে ফিরছিল। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে, সে আলোর জন্য
কাজল আর কালো কাঁচের চুড়ি কিনলো। কালো রংটা রোদের খুব পছন্দের।
আলোর ফর্সা হাতে কালো রংয়ের চুড়ি বেশ মানাবে। রোদ কাজলটা হাতে নিয়ে
বিরবির করে উচ্চারণ করে ফেলল,
-"আমাকে বেতাল করার জন্য তোমার কাজল কালো চোখ দু'টিই যথেষ্ট প্রেয়সী।"
হাঁটতে হাঁটতেই রোদের ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠল, 'আলো দেখা করতে বলেছে।'
এখন বাজে বিকাল চারটা সাতাশ। রোদ সময় দেখে রিকশা নিয়ে লেকের পাড়ে গেল।
আলো নিরিবিলি এক স্থানে বসে রোদের অপেক্ষা করছে।
আলোকে দেখে রোদ মৃদু হেসে পাশে বসতেই, আলো মুখ গোমড়া করে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আমার শরীরে কোনো ছোঁয়াচে রোগ নেই। নিষ্ঠুরের মতো দূরে সরে বসলে কেন?"
-"তাহলে লেপ্টে বসব?"
আলো মুখ ভেংচি দিয়ে বলল, "ফাজিল একটা।"
রোদ আলোর হাত টেনে নিয়ে নিজে আলোকে চুড়ি গুলো পরিয়ে দিলো।
আলোর ছলছল চোখ আর ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি।
রোদ অন্য দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, -"পছন্দ হয়েছে?"
আলো হাত নাড়িয়ে চুড়ির শব্দ করে বলল, "খুব পছন্দ হয়েছে।"
আলো টিফিন বক্সটা বের করে মিষ্টি হেসে রোদের দিকে বাড়িয়ে দিলো।
রোদ বক্সে পিঠা দেখে বিরক্ত হয়ে বলল,
-"এসব আনতে নিষেধ করি তাও শুনো না কেন তুমি?"
-"তুমি বললেই আমাকে শুনতে হবে নাকি?"
.
আলোর গোমড়া মুখ দেখে রোদ তিনটা পিঠা খেয়ে আলোকে দুইটা দিলো।
তারপর দু'জনে কিছুক্ষণ গল্প করে, রোদ আলোকে রিকশায় তুলে দিলো।
আলো বাসায় পৌঁছে রোদকে মেসেজ করে জানিয়ে দিলো, 'আমি বাসায়।'
সেদিন সারারাত আলো চুড়িগুলো দেখেছে আর মিটিমিটি হেসেছে।
পরেরদিন দুপুরে মিশু আলোদের বাসায় বেড়াতে আসল।
যদিও সে একা আসেনি সঙ্গে একজন অতিথিকেও এনেছে।
সেই অতিথি ততক্ষণে পুরো বাসা মাতিয়ে ফেলেছে।বিকালে রোদ রুম থেকে
বের হতেই ফারহানের সঙ্গে ওর দেখা হলো। ফারহান হলো এই মেস মালিকের
ছেলে, সে রাজনীতিবিদ। রোদ উনার মুখোমুখি পড়াতে মুচকি হেসে সালাম দিলো।
ফারহান প্রতিবারের মতো সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
-"রোদ তোমার মতো ইয়াং ছেলের উচিত রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া আর একটাবার ভেবে দেখো।"
-"ভাই, রাজনীতি জিনিসটা আমি ঠিক বুঝি না তাই এসবের মাঝে নিজেকে জড়াতেও চাচ্ছি না।"
-"ওহ।"
ফারহান আর কথা না বাড়িয়ে স্থান ত্যাগ করল আর রোদ বের হলো ওর গন্তব্যে।
আলো তাকে তলব করছে তার নাকি জরুরি কথা আছে। আজকে না বললেই নয়।
এজন্য রোদও আর না করতে পারে নি, সে মুনিমদের পড়িয়ে শিশু পার্কের ঘাসের উপর বসল।
ওরা এখানে প্রায় দেখা করে।
বিকেলের মৃদু বাতাস এসে শরীরে লাগছে তাতে শরীর ও মন জুড়িয়ে যাচ্ছে।
পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে বসে দু'টো পাখি থেমে থেমে ডেকে উঠছে।
কয়েকজন কপোত-কপোতীরা হাত ধরে হাঁটছে। কেউ বা নিজেদের গল্পে মশগুল।
রোদ দোলনায় বসে থাকা একটা বাচ্চার দিকে তাকিয়ে আছে। এই বাচ্চাটা মেঘের বয়সীই হবে।
রোদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।
তখন আচমকা দু'টো ছোট ছোট হাত দিয়ে কেউ ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল।
রোদ চমকে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল।
মেঘ ততোক্ষণে সামনে এসে রোদের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
মেঘকে এখানে দেখে রোদ হতভম্ব।দুই ভাই ততক্ষণে দু'জনাকে জড়িয়েও নিয়েছে।
কতশত কথা এবং আদর বিনিময় হচ্ছে তাদের মধ্যে।
তখন আলো আর মিশু এসে ঠিক ওদের সামনে বসল।
রোদ হেসে মিশুর সাথে কুশল বিনিময় করল।
আজকে অনেকদিন পর আলো রোদকে এভাবে হাসতে দেখছে।
রোদের হাসি দেখে সেও মৃদু হাসল। মেঘ মিশুর সাথে ঢাকায় এসেছে।
রোদকে জানায়নি হঠাৎ করে তাকে চমকে দেবে বলে।
মেঘ হঠাৎ রোদের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে বলল,
"দাভাই কতদিন পর তোমাকে দেখলাম। এখন থেকে আমি তোমার কাছে থাকব।"

রোদ মুচকি হেসে মেঘকে কাছে টেনে ওর কপালে উষ্ণ স্পর্শ দিলো।
রোদ মেঘের হাত ধরে শান্ত কন্ঠে বোঝাল, সে এখন বাসায় নেই।
আব্বু-আম্মুর খেয়াল রাখতে হবে। দু'জনেই যদি বাইরে থাকে তাহলে উনাদের কে দেখবে?
উনারা তো খুব কষ্ট পাবেন। আর আব্বু-আম্মু কষ্ট পেলে আল্লাহও কষ্ট পাবে।
সে খুব শীঘ্রই বাসায় ফিরবে তারপর আবার সবাই মিলে একসঙ্গে থাকবে।'
রোদের কথা শুনে মেঘ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল।
রোদ মৃদু হেসে আলতো করে মেঘের মুখের ঘাম মুছে দিলো।
মেঘ তখন দুষ্টু হেসে উঠে দাঁড়িয়ে রোদকে কাতুকুতু দিতে লাগল।
কাতুকুতু রোদের দূর্বল পয়েন্ট। মেঘ রোদকে কাতুকুতু দিয়ে নিজেই খিলখিল করে হাসছে।
রোদ ওকে থামাতে হাসতে হাসতে মেঘকে শক্ত করে জাপটে ধরে উঠে দাঁড়াল।
নয়তো দুষ্টুটা কিছুতেই থামত না।

To be continue.... ""

No comments