Breaking News

গল্প- মনোহরণী । পর্ব - ০৪


আজ অনেকদিন পর দুই ভাই দুষ্টুমিতে মেতে উঠেছে।

দুই ভাইয়ের খুনশুটি দেখে আলো আর মিশুও হাসছে।

চারজন বাজি ধরে ফুচকা, বাদাম আর আখের রস খেলো।

পুরোটা সময় মেঘ রোদের হাত ধরে ঘুরাঘুরিও করল।

এখন মেঘের আবদার সে এখন রোদের সাথে মেসে যাবে।

রোদের সিঙ্গেল বেড তাছাড়া রুমমেট বিরক্ত হতে পারে।

কিন্তু রোদ ওকে বুঝালেও সে শুনতে নারাজ তার একই কথা, 'প্লিজ দাভাই নিয়ে চলো।'

তখন আলো ব্যাপারটা বুঝে চনমনে কন্ঠে বলে উঠল,

- "আজ আমার পক্ষ থেকে তোমাদের ট্রিট দিবো। মেঘবাবু আজকে দাভাইয়ের হাতে খাবে, চলো! চলো!"
তারপর চারজন মিলে একটা রেস্টুরেন্টে গেল এবং মেঘ রোদের হাতে তৃপ্তি সহকারে
খেলো যদিও দু'একবার কামড় দিতে ভুলল না। মেঘ যাতে পুনরায় রোদের সঙ্গে যাওয়ার
জেদ না করে, এজন্য আলো মেঘের এক হাত ধরে একটু সামনে এগিয়ে গেল।
এমনভাবে গল্পে মেতে রইল যেন মেঘ ব্যাপারটা ক্ষণিকের জন্য ভুলে যায়,
হলেও তাই।রোদ তখন হাঁটতে হাঁটতে মিশুর উদ্দেশ্যে বলল,
-"মিশু, এখনো আমার উপর রেগে আছো?"
মিশু রোদের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতাসূচক হেসে জবাব দিলো,
-"না ভাইয়া বরং আমি তোমার প্রতি চিরকৃতজ্ঞ।
কারণ তুমি আমাকে ক্ষণিকের কষ্ট দিয়ে সারাজীবনের কষ্টের হাত থেকে বাঁচিয়েছ।"
মিশুর কথা শুনে রোদ নিঃশব্দে হাসল তবে প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না।
মিশু রোদের থেকে বিদায় নিয়ে এগিয়ে গেল। সে
যেন আর না এগোয় আলো হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলো।

নয়তো মেঘ আবার জেদ করবে। একটু দূরত্বে অটোতে বসে মেঘ রোদকে টাটা দিচ্ছে আর হাসছে।
যদিও রোদ জানেনা ওর হাসির কারণ তবুও সেও মুচকি হাসল।
ওর হাসি দেখে ওরা তিনজন খিলখিল করে হেসে উঠল।
অটো ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে রোদও ওদের টাটা দিয়ে বিদায় দিলো।
ল্যাম্প পোস্টের নিয়ন আলোয় রোদকে নাকি ঠিক ভ্যাবলার মতো লাগছে।
আলোর একথা শুনে তিনজন হেসেছে আর রোদ হেসেছে কিছু না শুনে।
ওরা যাওয়ার পর রোদ দুই পকেটে হাত গুঁজে ফুঁতপাত ধরে হাঁটতে লাগল।
ওর ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির রেখা স্পষ্ট।
আলো যে ওকে এমন চমকপ্রদ করবে ভাবতেও পারেনি সে।
তবে সে খুশি, খুব খুশি। কাল সকালে মিশু আর মেঘ ফিরে যাবে।
রোদ গিয়ে ওদের বাসে তুলে দিয়ে আসবে।
আলোরা বাসায় ফিরে আগে ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিতে বসল।
এরইমধ্যে, কথায় কথায় মেঘ
ভুলবশত আলোকে 'বউমণি' ডেকে ফেলল।
একথা আবির শুনে সন্দিহীন দৃষ্টিতে মেঘকে জিজ্ঞাসা করল,
- "মেঘ, তুমি আলোকে কী বলে ডাকলে?"
-"মিষ্টিমণি।"
-"আমি যে শুনলাম 'বউমণি' বলে ডাকলে।"
-"না তো, আমি তো মিষ্টিমণিই ডেকেছি।"
-"ওহ।"

মেঘ বুদ্ধি খাঁটিয়ে অনেক ভেবে উত্তরটা দিলো। আবির ওর মনের ভুল ভেবে রুমে চলে গেল।
মেঘ যেন কলিজায় পানি ফিরে পেলো আজ রোদ
ওকে বার বার বলেছে, " এখানে থাকাকালীন আলোকে বউমণি ডাকবে না।
" মেঘ তখন ভদ্র বাচ্চার মতো 'হুম' বলেছিল। তখনকার কথা মনে করে
মেঘ বুকে হাত দিয়ে বলল, "যাক বাবা, কোনো মতে বাঁচলাম।
এ ঘটনা দাভাই শুনলে নিশ্চয়ই আমাকে ঠ্যাঙ্গাবে।"
মেঘ হাফ ছেড়ে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে আলোর রুমে ঢুকে শুয়ে পড়ল।
মেঘ আর মিশু ছাড়া ওদের দু'জনের সম্পর্কের কথা কেউ
জানে না।সবার আড়ালে মেঘ আলোকে 'বউমণি' ডাকে আর সবার সামনে ডাকে 'মিষ্টিমণি।'
আলো আর মেঘ প্রায় সারারাত গল্প করে ভোরের দিকে ঘুমাল।
সকালে উঠে খেয়ে ওরা সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
আলোও মেঘদের সঙ্গে বাস স্ট্যান্ড অবধি এসেছে। রোদ ওদের কিছু শুকনো খাবার আর
পানি কিনে দিয়ে বাসে তুলে দিলো।মেঘ মন খারাপ করে আছে দেখে রোদও আর কিছু বলল না।
সে এখন কিছু বলা মানেই মেঘকে কাঁদানো।
তবুও বাস ছাড়তে গেলে মেঘ চোখ ডলে কেঁদে উঠে বলল, ' আমার সঙ্গে রোজ কথা বলবা।'
ততক্ষণে বাস ছেড়ে দিয়েছে মেঘ জানালার বাইরে মুখ বের করে বার বার বলেছে,
"দাভাই, জলদি বাসায় ফিরবা আর আর লাভ ইউ দাভাই।"
"হুম, তোমরা সাবধানে যেও।"

রোদ দাঁড়িয়ে দেখছে মেঘ এখনো ওর দিকে দৃষ্টি রেখে চোখ মুছছে, হাত নাড়ছে।
সেও অতি গোপনে অন্য দিকে তাকিয়ে চোখের পানিটুকু মুছে নিলো।
আলো দেখেও না দেখার ভাণ করল।
রোদ আলোকে নিয়ে লেকের পাড়ে গেল, দু'জন চুপ থেকে পাশাপাশি হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতেই রোদ জানাল, 'সে মাহিকে আর পড়াচ্ছে না।'
কেন পড়াচ্ছে না? একথা আলো আগ বাড়িয়ে আর জিজ্ঞাসা করল না।
বলার মতো হলে সে এমনিই বলবে।
তাছাড়া,এই মানুষটার সঙ্গে সে খুবই সীমিত সময় কাটাতে পারে তাই অন্য
কথা না তুলে সামনে দৃষ্টি রেখে বলল,
-"আচ্ছা, তুমি ভুল করেও 'ভালোবাসি' শব্দটা উচ্চারণ করতে পারো না, তাই না?"
রোদ আলোর দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলো,
-"মনের গহীনে যদি শুদ্ধভাবে 'ভালোবাসি' শব্দের প্রতিস্থাপন হয়। তাহলে অকারণে ভুল করে বলাটাও অনর্থক হয়।"
আলো কিছু বলার শব্দ খুঁজে পেলো না তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
" আমি কিছু চাইতে পারি?"
" শুনি?"
"আজকের বাকি দিনটুকু আমায় দিবে?"
রোদ উত্তর না দিয়ে আলোকে নিয়ে রিকশাতে উঠে বসল। আজকে ওরা প্রেমের বাহক
রিকশায় চড়ে বাকি দিনটুকু ঘুরে কাটাবে। আলো
রোদের আঙ্গুল ছুঁয়ে মিষ্টি করে হাসল। রোদ কিছু একটা ভেবে মৃদু স্বরে বলল,
"আজকাল আমাকে খুব বেশিই জ্বালাচ্ছো।"
"বেশ করছি, কাঠখোট্টা একটা।"
"আমি কাঠখোট্টা কীভাবে হলাম?"
"একটু হাত ধরলে কি হয়? রোমান্টিক কথা কী, জানো ?"
রোদ আলোর মুখ পানে চেয়ে এক ভ্রু বাঁকা করে বলল,
-"প্রথমে পাশাপাশি হাঁটব, তারপর হাত ধরব, চিপায় গিয়ে গালে চুম্বন করার আবদার করব, পরেরদিন ওষ্ঠে দেওয়ার অধিকার চাইব, পার্কে বসে হাতাহাতি করব, একদিন ফাঁকা রুমে ডাকব, রুমডেট করব, তারপর প্রেগনেন্ট হয়ে গেলে আমার দোষ?"
আলো চোখ বড় বড় করে রোদের দিকে তাকিয়ে আছে। এই কাঠখোট্টাকে বলল কী আর সে বুঝল কি! আলো লজ্জায় অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। রোদ আলোর লজ্জামিশ্রিত মুখ দেখে বলল,

-"আমার ভালবাসা এবং চাওয়া দু'টোই শুদ্ধ তাই নোংরা কিছু টেনে কোনো টাকেই অশুদ্ধ করতে পারব না।"
আলো আর টু শব্দ করল না। তবে মনে মনে পণ করল, সে ভুলেও আর এ কথা উচ্চারণ করবে না।
এদিকে গালিবের মৃত্যুর রহস্য বের হলো না আজকে আবার রাকিব নামের আরেকটা ছেলে মারা গেল।
এই ছেলেটার মৃত্যুও অক্ষত অবস্থায়। লাশ দেখে মেসের সবার মনে আরেকদফা ভয় ডুকে গেল।
যারা মেসে ছিল, পুলিশ এসে সবাইকে আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করল।
প্রত্যেকের ফোন নাম্বার, কে কখন কোথায় ছিল, সময় উল্লেখ করে তা লিখিত দিতে বলল।
সবার মতো রোদও সারাদিনের রুটিন লিখিত আকারে জমা দিলো।
এসব ঝামেলায় অনেকেরই পড়াশোনার খুব ক্ষতি হচ্ছে।
একথা মেস কতৃপক্ষকে জানালে উনারা মেস ছেড়ে দিতে বললেন।
হঠাৎ মেস খুঁজে পাওয়া সম্ভব না তাই রোদসহ দুইজন মিলে একটা বাসার রুম ভাড়া নিলো।
আর তিনজন মিলে ঠিক করল, তারা এক দিন করে নিজেরাই রান্না করবে।
তাহলে আর রাঁধুনি খোঁজা লাগবেনা।
রোদের রুমমেটের একজনের নাম আলভী আর আরেকজনের নাম হাসিব।
দুই জনেই অনার্স করছে। ওদের সঙ্গে রোদের ভালো একটা সম্পর্ক তৈরী হলো।

অনার্সের শুরু থেকেই রোদ বিসিএসের জন্য নিজেকে একটু একটু করে প্রস্তুত করেছে।
বিসিএসের কথা মাথায় রেখে দিনরাত পড়াশুনা করছে।
এসএসসি ও এইচএসসি’তে স্টার পেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে
মেধাবী ছাত্রদের তালিকায় আছে, তার নাম।
এতদিনের এতো কষ্ট কিছুতেই বিফলে যেতে দেওয়া যাবে না। এজন্য সে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
৩৯ তম ব্যাচের বিসিএস পরীক্ষার জন্য রোদ আবেদন করেছিল।
তিনদিন পর রোদের বিসিএস প্রাথমিক পরীক্ষা। সারাদিন রোদের পড়াশোনা দেখে
ওর রুমমেটরা রান্নার দায়িত্ব নিয়ে ওকে পড়ার সুযোগ করে দিলো।
এজন্য রোদ খুশি হয়ে ওদের কৃতজ্ঞতাও জানাল।

এদিকে আলোর জন্য কয়েকদিন ধরে বেশ কয়েকটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে।
এসব কথা আলো রোদকে জানায়নি। রোদ জানলে, শুধু শুধু টেনশন করবে।
রাতে আলোর আম্মু কথার ছলে বলে গেল বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। আলো
একথা শুনে মন ভার করে জানালার পাশে বসে রইল। এ ভয়টা দিন দিন
ওকে আঁকড়ে ধরছে। মনে হচ্ছে, এই বুঝি রোদকে চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।
এসব ভবনায় ডুবে আলো প্রায় অর্ধেকটা রাত র্নিঘুমে কাটিয়ে দিলো।
ভোরের আজানের ধ্বণি শুনে সে অযু করে নামাজে দাঁড়িয়ে গেল। মোনাজাতে
চোখের অশ্রু ঝরিয়ে রোদের ভালো থাকা, বিপদ মুক্ত আর সফলতার দোয়া করল।
তারপর জায়নামাজটা তুলে উঠে দাঁড়িয়ে বিরবির করে বলল,
-" আল্লাহ, আমার সুখের বিনিময়ে ওর মুখের হাসিটা বজায় রেখো। তুমি সর্বদা
আমার পাগলটার সহায় হইও মাবুদ।"

আজকে রোদের প্রথমিক পরীক্ষা। আলো রোদকে ফোন করে দূর থেকে দেখা করতে চাইল।
রোদ সম্মতি দিয়ে কল কেটে পড়াতে মন দিলো।
আলো রেডি হয়ে ওর আম্মুকে বলে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বের হলো।
মাঝরাস্তা অবধি যেতেই ওর আবিরের সঙ্গে ওর দেখা হয়ে গেল।
আবির বাইক নিয়ে খুব সকালে একটা কাজে বের হয়েছিল।
আবির আলোকে বাইকে উঠতে বলল ওকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
রোদ ওদের থেকে একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। আলো একবার আড়চোখে
রোদের দিকে তাকিয়ে বাইকে উঠে বসল। তখন আবিরের ফোনে কল আসায় সে
কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রোদ আর আলোর দৃষ্টি বিনিময় হলো।
আলো মিষ্টি হেসে ইশারায় রোদকে 'বেস্ট অফ লাক' জানিয়ে 'সাবধানে' যেতে বলল।

রোদ মুচকি হেসে মৃদু মাথা নাড়িয়ে প্রস্থান করল।
কিছু কিছু পরিস্থিতিতে উৎসাহ দিতে বাক্যের প্রয়োজন হয় না।
কয়েক সেকেন্ডর দৃষ্টি বিনিময়ই যথেষ্ট।
ভাইয়ের দৃষ্টি এড়িয়ে এখন সেটা আলো করেও দেখাল।
রোদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আলো মনে মনে বললেই ফেলল,
" হালকা বেগুনি রংয়ের শার্টে মানুষটাকে বেশ লাগছে তো।"

To be continue...... ""

No comments