Breaking News

অনুভূতিহীন । পর্ব - ২৫



মায়ের সাথে কথা শেষ করে রহিম আসে অরশের ঘরে। অরশ জেনো উন্মাদ হয়ে গেছে। রহিমকে দেখে অরশের দেহে প্রান ফিরে। রহিমকে জড়িয়ে ধরে অরশ পাগলের মত বলতে থাকেঃ

ভাই তুই কোথায় ছিলি?? ভাই তুই আমাকে রেখে কোথায় গেছিলি?
আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ভাই। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, খুব খুব খুব কষ্ট হচ্ছে।
রহিমঃ অরশ প্লিজ শান্ত হ। আমি একটু বাহিরে গিয়েছিলাম।
অরশঃ ভাই তিথি, আমার তিথি কোথায়? তিথি কোথায়?
রহিম চুপ করে আছে।
বাকি সবাই অরশের দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছে।
অরশের মুখে তিথির নাম বড্ড বেমানান।
অরশঃ রহিম বলনা ভাই, আমার তিথি কোথায়? আমাকে আমার তিথির কাছে নিয়ে চল ভাই।
ভাই আমি তিথির কাছে যাব।
রহিমঃ ওহ অরশ তুই আগে শান্ত হ ভাই, তিথি আছে। রিলাক্স
অরশের মা রহিম কে ডাক দিলেন।
রহিমঃ জি মা বলো।
মাঃ অরশ হঠাৎ তিথির কথা বলছে কেন, কি হয়েছেরে?
রহিমঃ মা আপনাকে সব বলব, তার আগে তিথির বাসায় যেতে হবে। তিথির বাসার ঠিকানাটা আমায় দিন।
এই মুহুর্তে তিথিকে উপস্থিত করতে না পারলে খুব বড় সমস্যা হয়ে যাবে।
আরশ আপনার ছেলে হলে কিন্তু আমিও অরশকে কম চিনি।
এই মুহুর্তে তিথিকে না পেলে অরশকে শান্ত করা যাবেনা।
মাঃ তুমি এক্ষুনি আমার সাথে আসো। আমি তোমাকে তিথিদের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি।
অরশঃ মা আমিও যাবো, আমার তিথির বাসায় যাব।
তিথি আমাকে অনেক বার যেতে বলেছে, কিন্তু আমি কখনো যায়নি। তিথির কথা রাখিনি।
কিন্তু আজ যাবো। আমার তিথিকে ফিরিয়ে আনতে যাবো।
অরশের ভাবিঃ তিথিকে ফিরিয়ে আনতে যাব মানে!!?
যে মেয়ে আমাদের মান সম্মানের কথা না ভেবে মাত্র ২০ লাখ টাকার জন্য পালিয়ে গেছে,
তাকে ফিরিয়ে আনতে যাওয়ার কোন মানে হয়না।
রহিমঃ ভাবি আপনি ভুল বলছেন।
ভাবিঃ আমি ভুল বলিনি। অরশ ভুল করছে, সাথে মা ও ভুল করছেন।
তিথিকে এবাড়ির বউ করে আনাটাই অনেক বড় ভুল ছিলো।
আমি তিথিকে বোন ডেকে আরো ভুল করেছিলাম।
তিথিকে ফিরিয়ে এনে সেই ভুল ২য় বার করার কোন মানে হয়না।
মাঃ বৌমা তুমি আমার সাথে যাবে আর কোন কথা শুনতে চাইনা।
তিথির বাড়িতে যাবার কথা শুনে অরশের পাগলামো কিছুটা কমে।
অরশ, রহিম, মা, ভাবি, আসিফ সবাই মিলে তিথির বাবার বাড়িতে গেলেন।
সেখানে গিয়ে জানতে পারলেন অনেক আগেই তিথির ফ্যামিলি ওই বাসা ছেড়ে চলে গেছে।
কোথায় গিয়েছে কেউ বলতে পারেনা। তার মানে তিথিকে পাওয়া অসম্ভব।
অরশের পাগলামো আবারো শুরু হয়ে গেছে।
সবাই মিলে অরশকে সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে।
অরশের মা খুব দুশ্চিন্তায় আছেন, অরশের আবার কি হয়ে গেলো।
কেন এমন করছে, এতো বছর পর রহিম কোথা থেকে এলো! যে তিথি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে
তাকে রহিম কিভাবে চেনে। যেদিন তিথি চলে যায় সেদিন অরশ তিথিকে খুজেনি,
তা হলে এতো বছর পর আজ কেন সেই তিথিকে খুজতে অরশ পাগল হয়ে উঠেছে। জানতে হবে সবকিছু।
অনেক কষ্টে অরশকে নিয়ে বাসায় ফিরে আসা হয়েছে।
সবাই অরশের পাশে বসে শান্তনা দিচ্ছে। অরশ কিছুতেই শান্তনা নিচ্ছেনা, সকলের মুখের হাসি হাওয়া হয়ে গেছে। গতকাল বিয়ে বাড়ির সবার মুখ ছিলো হাস্য উজ্জল। অরশের বিলাপ কার্জকলাপে তা এখন গম্ভীর। আসিফের ফোনে রিং বেজে উঠলো।
গম্ভীরতা দুর করে আসিফ কল রিসিভ করে কথা বললো।
আসিফের ফোনে তার মা কল দিয়েছেন।

অরশের বিয়ে উপলক্ষে আসিফের মা এবং স্ত্রী আজকে এই বাড়িতে আসবেন।
কিন্তু উনারা তো আর জানেন না যে বিয়ে বাড়ির বর্তমান করুন অবস্থা।
বাড়ি চিনেনা তাই আসিফকে কল দিয়ে এগিয়ে যাবার কথা বলেছেন।
অরশের মাকে বলে, আসিফ বাইরে গেলো তার মা ও স্ত্রীকে এগিয়ে আনতে।
কিছুক্ষন পর আসিফ বাসায় ভিতরে প্রবেশ করলো, আসিফ কে দেখে বাসার সবাই চমকে যায়।
সবার চমকানো দেখে মনে হচ্ছে আসিফের সাথে কোন এলিয়েন এসেছে।
শুধু মাত্র রহিম স্বাভাবিক আছে।
সবাই একসাথে বলে উঠে সাথীইইইইইই
আসিফ কিছুটা ঘাবড়ে যায়। এবাড়ীর সবাই উত্তেজিত হয়ে তার স্ত্রীর নাম এক সাথে উচ্চারণ করে কেন? আসিফ আড় চোখে নিজের বউয়ের দিকে তাকিয়ে দেখতে পাই, সাথী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাকি সবাই তার বউয়ের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে।

অরশের মাঃ আসিফ তুমি সাথীকে কোথায় পেলে?
আসিফঃ আন্টি ও আমার স্ত্রী এবং পাশে মা। অরশ স্যারের বিয়ে উপলক্ষে এই বাড়িতে এসেছে কিন্তু হঠাৎ স্যার এমন করবেন সেটা জানা ছিলোনা তাই ওরা না জেনেই চলে এসেছে। কিন্তু আন্টি আমি তো এটাই বুঝলাম না আপনি আমার স্ত্রীর নাম আপনি কিভাবে জানেন?
অরশের মাঃ তিথির ছোটবোন সাথী। সাথীকে না চিনলে কাকে চিনবো।
এই কথা শোনার সাথে সাথে আসিফ ও তার মা সাথীর দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন।
সাথীর চোখ ঢালুমালু করছে। সাথীর মাঝে অস্থিরতা বিরাজমান।
আসিফের মাঃ বৌমা, ইনি কি বলছেন? তুমি তিথির ছোট বোন মানে কি?
আমরা জানি তোমার কোন ভাইবোন নেই।
একমাত্র সন্তান হিসাবে তোমাকে আমার পুত্র বঁধু করে ঘরে তুলেছিলাম।
তা হলে আজ তোমার বড় বোন কোথা থেকে এলো? এইসব কি শুনছি?
সাথীঃ তিথি আমার আব্বু আম্মুর পালিত মেয়ে পালিত মেয়ে পালিত মেয়ে............
সাথীর কথা দেওয়ালে বার বার প্রতিদ্ধনি হচ্ছে।
অরশের মা যেনো আকাশ থেকে পড়েছেন। তিথি পালক মেয়ে!!! তা হলে তিথির বাবা মা কে??
সাথীঃ তিথি এতিম তার কোন পরিবার নেই।
তিথি এতিম এতিম এতিম..... আমার আব্বু আম্মুর আশ্রিতা ছিলো তিথি।

অরশের মাঃ এই মেয়ে তুমি কেমন বোন? নিজের আপন বোনকে এতিম বলতে লজ্জা করেনা তোমার??
রহিমঃ মা প্লিজ তুমি উত্তেজিত হইয়োনা।
অরশের মাঃ আমার পুত্র বঁধুকে এতিম বলবে আর আমি উত্তেজিত হবনা??
এক মেহমান অরশের মায়ের উদ্দেশ্যে বলে ওঠেনঃ যে মেয়ে আপনাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, যাবার সময় ২০ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে গিয়েছে
আপনি সেই চুন্নিকে এখনো পুত্রবধূ বলছেন? বড্ড হাস্যকর
অরশের মাঃ জানিনা তিথি কেন আমাদের মায়ার বাধন ছিন্ন করে চলে গিয়েছে। কিন্তু আমার পূর্ণ বিস্বাস তিথি কখনোই খারাপ কিছু করতে পারেনা। আমি তিথির চোখ দেখে বুঝেছি সে মেয়ে যা করুক না কেন। কখনো কারো সাথে অভিনয় করতে পারেনা।
অরশের ভাবিঃ আম্মা আপনি যদি তিথিকে এতোটাই ভালোবাসেন তা হলে অরশকে আবার বিয়ে করাচ্ছিলেন কেন?
অরশের মাঃ বড় বৌমা তুমিও এক সন্তানের মা হয়েছো সুতরাং তোমার মুখে এ কথা বেমানান। পৃথীবির কোন মা তার সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারেনা। আমি অরশকে বিয়ে দিচ্ছি অরশের সুখের কথা ভেবে। জানি তোমরা সকলেই তিথিকে প্রচন্ড ঘৃনা করো কিন্তু মনে রাখবা তিথি খাটি সোনা ছিলো। আমি নিজে তিথিকে এবাড়িতে পুত্রবধূ করে এনেছিলাম। তিথি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ৬ বছর হলো। সে যেখানেই থাকুক তার জন্য জন্য আমার স্নেহ অমরন থাকবে। কোন ভাবেই তিথির অপমান আমি বদ্দাস্থ করবনা সুতরাং তিথিকে এতিম বললে আমি সহ্য করবনা।

রহিমঃ মা সত্য বললে কখনো অপমান করা হয়না। এই কথা সত্য যে তিথি এতিম। ছোট বেলায় তিথি এবং আমি একই এতিমখানায় বড় হয়েছি। তিথি আমায় ভাইয়া বলে ডেকেছিলো.......
তারপর রহিম সবার সামনে তিথির পুরো ঘটনা খুলে বললো।
তিথির ঘটনা শুনে সকলে থ মেরে দাড়িয়ে আছে।
কারো মুখে কোন ভাষা নেই।
কি বলা উচিৎ এই মুহুর্তে! সে জ্ঞান টুকু কারো হচ্ছেনা।
নির্বাক সময় অতিবাহিত হচ্ছে।
অরশের ভাবি নিজে খুব লজ্জা পাচ্ছে যে তিথিকে সে আপন বোন করে এবাড়িতে এনেছিলো সে কিভাবে তিথিকে খারাপ ভাবতে পারলো। অরশের পরিবার সবাই লজ্জিত সে দিন যদি তিথির সত্যি ইতিহাস জানতে পারতো তা হলে তাকে কখনোই দুরে যেতে দিতোনা।

নিরবতা কাটিয়ে আসিফ বলেঃ সাথী,,,,
সাথীঃ জি বলেন।
আসিফঃ তিথি ম্যাম তোমার পালক বোন ছিলো। একবার কল্পনা করে দেখোতো তিথি ম্যাম কোন দিন তোমার সাথে খারাপ আচরন করেছিলো কি না, কোন দিন তোমার ক্ষতি চেয়েছিলো কি না, ভেবে দেখো তিথি মেম তোমার থেকে কি কি নিয়েছেন, আর কি কি দিয়েছেন।
সাথী কিছুক্ষন চুপচাপ থাকার পর বলেঃ তিথি আপু কোন দিন আমার গায়ে হাত তুলেনি। কোন দিন আমার থেকে খাবার কেড়ে নেইনি। সব সময় নিজের খাবার আমার মুখে তুলে দিতেন। আমার সকল কাজ আপু নিজের মত করে করে দিতো। আমি কোন অন্যায় করলে তার দায়ভার আপু নিতো। আমাকে সব সময় বুকের মাঝে রেখে ঘুম পাড়ানি গান শুনাতো। আমি যা চাইতাম আপু তাই এনে দিতো। নিজের সকল ভালোলাগা আমায় দিয়েছিলেন। আমি কখনো আপু বলে ডাকিনি তাকে। আমি তার সাথে সব সময় খারাপ আচরণ করতাম, ভাবতাম সে আমার কেউনা। আপুর নামে আব্বুর কাছে নালিশ দিতাম। কিন্তু আপু কখনো আমার উপর রাগ অভিমান অভিযোগ কিছুই করতনা। অনেক অনেক ভালোবাসতো আমাকে।

আসিফঃ হা হা হা হা। সত্যি পৃথিবী খুব আজবঘর এখানে কার মাঝে কি থাকে কেউ বুঝতে পারেনা। যেই তিথি ম্যাম সারা জীবন তোমার অপমান সহ্য করে তোমাকে বড় বোনের ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করেছেন। আজ তুমি তাকে এতিম বলছো? মনে রাখবা রক্তের সম্পর্ক দিয়ে আপন হওয়া যায়না। আপন হতে হলে আত্তার সম্পর্ক লাগে। এখন মনে হচ্ছে তিথি ম্যাম সবার থেকে আড়ালে গিয়ে ঠিকি করেছেন কতটা অবহেলা নিয়ে বেচে থাকা যায় তা শুধু তিথি ম্যামই বুঝেছেন।
সাথীঃ আমি আমার ভুলের প্রাশ্চিস্ত করতে চাই। আপু কে আপুর অধিকার ফিরিয়ে আমার আপন বোন করতে চাই।
আসিফঃ কোথায় পাবে তুমি তোমার বোন কে??? সময় থাকতে সাধন করতে হয় তা না হলে সারা জীবন আফসোস বয়ে বেড়াতে হয়।
অরশঃ আমি আমার তিথির কাছে যেতে চাই তোমরা কে কোথায় আছো আমার তিথিকে এনে দাও। আমি আমার ছেলের মুখে আব্বু ডাক শুনতে চাই।

অরশের মাঃ অরশ পাগলামি অনেক করেছো আর না। তোমার অপরাধে তিথিকে তুমি হারিয়েছো সুতরাং তিথিকে তোমার খুজে আনতে হবে।
অরশঃ মা মাগো মা আমি কোথায় পাবো আমার স্ত্রী সন্তান কে? ও মা বলনা মা, আমি কি ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ টুকু পাবোনা? তিথি কি আমাকে আমার সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনার অধিকার দিবেনা।
মাঃ অরশ আমি তোমাকে শান্ত হতে বলেছি। পাগলামো না করে, চিন্তা করো তিথিকে তুমি কোথায় পাবে। তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো সৃষ্টি কর্তা চান তিথি তোমারি হোক, তাই এতো বছর পর বিদেশের বাড়িতে তিথির সাথে তোমার দেখা হয়েছে। নিজেকে স্থীর রেখে ধৈর্য ধারণ করো। আল্লাহ তোমার মনের আশা পূর্ণ করবেন।
অরশঃ মা আমি যে পারছিনা। কিভাবে ধৈর্য ধরতে বলছ।
রহিমঃ অরশ, মা ঠিক বলছেন। তিথিকে তুই পাবি আমার মন বলছে। তিথি আসবে খুব শিগ্রহি আসবে। জানিনা সে কোথায় আছে তবে এতিম খানার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে অবস্থাই আসবে। বিদেশে থাকাকালীন সময়ে সে বাংলাদেশে এসেছে শুধুমাত্র এতিমখানার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে।

তিথির মা তার নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন।
অরশ এবং আসিফ আগে ছিলো বস এবং পি,এ এখন হয়েছে ভাইরা ভাই।
রহিম অরশের অফিসে চাকরি নিয়েছে।
অরশ তার অফিসের দায়িত্ব বড় ভাই সিহাবের হাতে তুলে দিয়েছে।
সব কিছু একটা স্বাভাবিকতা পেয়েছে। শুধু নেই তিথি যে অভাব কোন কিছুর বিনিময়ে পূর্ন হবেনা।
মাসের উপর মাস পেরিয়ে যাচ্ছে এক গম্ভীরতার মধ্য দিয়ে।
অরশ প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে তিথি কবে আসবে।
সকলের অপেক্ষা শুধু তিথিকে ঘিরে এ গম্ভির পরিবেশ আবার কোলাহল ময় হবে।
চলবে.....

No comments