Breaking News

আমি সেই চারুলতা । পর্ব - ০২

পুলিশ অফিসার সাজিদ ও সীমা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো এই ভয়ংকরী চারুলতার দিকে। তার হাসিটাও কেমন যেনো নির্মম। সীমা আর বসতে পারলো না সেখানে।

সাজিদকে ইশারা করে বেড়িয়ে আসলো সেখান থেকে। সাজিদও সেখানে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলো না। যে মেয়ে এত সহজে একজন মানুষের ফুসফুস ভক্ষণ করতে পারে সে আর যাই হোক সাধারণ কোনো মানুষ নয়।

- মেয়েকে কিন্তু আমার সুবিধার লাগছে না।
- স্বাভাবিক। হিমেল কোথায়?
হিমেলকে ডেকে পাঠানো হলো সাজিদ আর সীমার সামনে।
- খুন গুলো কবে হয়েছিলো হিমেল?

- স্যার, তার স্বামী এবং তার বন্ধুকে খুন করা হয়েছিলো আজ থেকে আট মাস আগে। তার সৎ মা কে খুন করা হয়েছিলো পাঁচ মাস আগে। পুলিশ অফিসার হোসেন কে খুন করা হয়েছিলো প্রায় সাড়ে চার মাস আগে আর মেয়েটির বাবাকে খুন করা হয়েছিলো ৭ দিন আগে। এতদিন যাবত কেসগুলো ভিন্ন ভিন্ন থানায় আলাদাভাবে ছিলো তাই এর কোনো সুরহা করা যায়নি কিন্তু মেয়েটা সব স্বীকার করার পর আমরা কেসগুলো একসাথে মিলিয়েছি। আর আজই থানা থেকে সবার পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে।
- সবার কেস আলাদা থানায় দায়ের করা হয়েছিলো?

- জ্বি স্যার। মেয়েটির সৎ মাকে খুন করা হয় তার বাবার বাড়িতে। জামাল হোসেন আর সবুজ আলীর কেস দায়ের করা হয় সুজয়নগরে। আর পুলিশ অফিসার হোসেনের কেস তদন্ত হয় করিমপুর থানায়।
- মেয়েটি কোন গ্রামের?

- মেয়েটি করিমপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলো বিয়ের আগে। সবাই একনামে চেনে।
আর বিয়ে হয় সুজয়নগরে।
চারুলতা ছোট কুঠুরির ফাকা থেকে দেখে এইসব কাহিনি।
তাকে মোটেও ভীত হতে দেখা যায় না বরং মুখে আবারো ফুটে ওঠে রহস্যময়ী হাসি।
চোখ বন্ধ করে চারুলতা মনে করে তার জীবনের অভিশপ্ত অতিত কে।
হাতে বানানো বরশি দিয়ে নদীতে মাছ ধরার চেষ্টা করছে চারু।
তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারছেনা সে।
অপরদিকে হামিদ খুব দ্রুত একেরপর এক মাছ ধরে চলেছে।
তার বরশিটাও এক টাকা দিয়ে বাজার থেকে কিনে আনা
কিন্তু চারুর কাছে পয়সা ছিলো না বিধায় সে বরশি কিনতে পারেনি।
চারুর অবস্থা দেখে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো হামিদ,
- কি রে তুই নাকি আমার চেয়ে বেশি মাছ ধরবি? কই একটাও তো ধরতে পারলি না। বাসায় গিয়া মারে বলমু সব মাছ যেনো আমারে ভাইজা দেয়। তোরে যেন এক টুকরাও না দেয়।
- তুমি তো বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসছো বরশি। আমার থাকলে আমিও পারতাম।
- মাছ ধরা বুঝি এত সহজ? এইসব মেয়েছেলের কাজ না। যা যা বাসায় যা। মা রে গিয়া মাছ ভাজার ব্যাবস্থা করতে বল।
- আমি কেনো বলবো? তুমি কি আমাকে মাছ খেতে দিবে?
চারুর কথা অবিকল নকল করে তাকে ভেঙালো হামিদ।
- তুমি এমন করলা কেনো?
- এহ শুদ্ধ ভাষায় কথা কইতে আইছে। লেখাপড়া একমাত্র তুই ই করস নাকি?
আমরা করি না? কই আঞ্চলিক ভাষায় কথা কইতে তো আমাদের আত্মসম্মানে লাগে না।
- আমি তো তোমার মতো ফাকি বাজি করি না। আমি ভালো করে লেখাপড়া করি।
মাস্টারমশাই বলছে সবার শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা উচিত।

- রাখ তোর মাস্টারমশাই। মা রে গিয়া বল সব ব্যাবস্থা করতে।
- আমি কি পাবো?
- তোরে একটা রুই ভাজা দিমু নে। এহন যা।
অনেকদিন পরে মাছ ধরতে এসেছিলো চারু তাই সে যেতে চাইলো না কিন্তু
রুইয়ের লোভে পরে আর সেখানে থাকা সম্ভব হলো না। নবম শ্রেণিতে পড়া কিশোরী
চারুলতা ছুটে চললো বাড়ির দিকে। এতবড় মেয়েকে রাস্তাঘাটে দৌড়াতে দেখে নাক মুখ ছিটকালেন অনেকেই। চারু এসবে পাত্তা দিলো না। বাড়ির উঠোনেই গিয়ে পৌঁছাতেই কান্নার
আওয়াজ পাওয়া গেলো। চারু মূহুর্তেই থেমে গেলো। কি ব্যাপার?
ওর মা কাদছে কেনো? বাবা কি আবার ওর মা কে মারছে? চারু আবার দৌড়ে ঘরের
ভিতর প্রবেশ করলো। নাজিমুদ্দিন নামক তার তথাকথিত পিতা ইচ্ছেমতো
মেরে চলেছেন তার মা মনোরমাকে। চারু দ্রুত গিয়ে থামাতে চাইলো তাকে।
- বাবা কি করো? মাকে মারছো কেনো?

- দূরে যা অপয়া। অলক্ষী তুই! এক অলক্ষী হইয়া তুই আরেক অলক্ষীরে বাচাইবার আসছস?
- কি বলো এসব?
নিজামুদ্দিন চারুকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলেন না। আবারও মারতে শুরু করলেন মনোরমাকে।
বাধা দিয়ে গিয়ে চারুরও বেশ আঘাত লাগলো।
অতঃপর ক্লান্ত হয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলেন নিজামুদ্দিন। চারু মা কে ধরে উঠালো।
মনোরমা কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেলো। এমন একটা ভাব যেন কিছুই হয় নি।
চুপচাপ উঠে রান্নাঘরে চলে গেলেন। চারু অবাক বিষ্ময়ে তার মা কে দেখলো।
কেমন পাথরের মতো আচরণ। এমন একটা ভাব যেনো কিছুই হয়নি।
- মা তুমি এখনো পড়ে আছো কেনো এইখানে?
মাস্টারমশাই বলেন অন্যায় করা আর অন্যায় সহ্য করা সমান অপরাধ।
তুমি কেনো চলে যাও না এই নরক থেকে।
মনোরমা জোরে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন চারুর গালে।
চারু হতভম্ব হয়ে গেল মায়ের এরূপ আচরণে।
- মায়ের সংসার ভাঙতে চাস তুই? বিয়ার পর জামাইয়ের বাড়িই মাইয়াদের আসল পরিবার।
আর কখনো এসব মুখে আনবি না।

- কিন্তু মা প্রতিদিন বাবা তোমার গায়ে হাত তোলে। এটা তো ঠিক না।
- আমার গায়ে তোলে তাতে তোর কি? যা হাতমুখ ধুইয়া আয়।
খাবার দিতেছি। হামিদ কই গেলো?
- নদীতে মাছ ধরে। বলছে সব ব্যাবস্থা করে রাখতে। এসে মাছ ভাজা দিয়ে ভাত খাবে।
মনোরমা কিছু না বলে রান্নাঘরে চলে গেলো। চারুও কলঘরে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিলো।
কিছুক্ষণের মাঝেই হামিদ চলে এলো।
মনোরমা কিছু না বলে সেগুলো নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেলো।
হামিদ বেশ অবাক হলো মায়ের এই আচরণে।
সেও কলঘর থেকে হাতমুখ ধুয়ে চারুর পাশে এসে বসে পড়লো,
- মায়ের কি হইছে রে? বাপ জান আবারও মা রে মারছে?
চারু কিছু না বলে চুপচাপ মাথা নাড়লো।
হামিদের প্রচন্ড রাগ হলো নিজের বাবার উপরে কিন্তু এ বিষয়ে কোনো
কিছু বলার সাহস তার নেই। ছেলে বলে শুধু হামিদ কেই কিছুটা
ভালোবাসে নাজিমুদ্দিন কিন্তু স্ত্রী বা কন্যার প্রতি বিন্দুমাত্র ভালোবাসা কাজ করে না তার ভিতর।
মাছ ভেজে দুই ছেলে মেয়েকে ভাত বেড়ে দিলেন মনোরমা। চারু বলে উঠলো,

- তুমি খাবে না মা?
- তোরা খা। আমি পরে খামু,তোদের বাপ জান আসুক।
চারু আর কিছু বললো না।
এই লোক যতোই মনোরমার উপর অত্যাচার করুক না কেনো মনোরমা তাকে ছেড়ে
এক বেলাও খায় না। এই কাহিনি ছোট থেকে দেখে আসছে চারু।
এতে নাকি স্বামীর অকল্যাণ হয়। খাওয়া শেষে চুপচাপ উঠে গেলো চারু। হামিদ
গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। চারু মায়ের সাথে হাত লাগিয়ে দু একটা কাজ করলো।
তবে মনোরমা চারুকে বেশি কাজ করতে দিলেন না। কিছুক্ষণ বাদেই পড়তে বসতে বললেন।
এই গ্রামে চারু সহ মোট চারজন মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে।
বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। অনেকের তো বাচ্চাও আছে।

দুপুর থেকে বিকেল অবধি পড়লো চারু। আজ অবধি কেউ ওকে প্রথম রেখে দ্বিতীয় করতে পারেনি।
বিকেল হতেই হাটতে বের হলো চারু। বিকেলে ঘরে বসে থাকা যায় না।
হাটতে হাটতে কখন সোনাদীঘির পাড়ে চলে এসেছে খেয়ালই করেনি সে।
খেয়াল হতেই একটা শুকনা ঢোক গিললো।
এখনো সন্ধ্যা হয়নি তাও চারদিক কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। অদ্ভুত নির্জন এ জায়গা।
সবাই বলে ওই দীঘিতে নাকি একটা মেয়ের আত্মা থাকে।
কেউ একা এখানে আসলে পানির মধ্যখানে নিয়ে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আশেপাশে একজন মানুষও দেখা যাচ্ছে না।
কিভাবে চারু এখানে এসেছে সে নিজেও বলতে পারেনা।
মনে মনে দোয়া দুরুদ পড়ছে আর মাস্টারমশাই র কথা মনে করছে।
"পেতাত্মা বলতে কিছুই হয় না।" হঠাৎই কারোর গলার আওয়াজে চমকে উঠলো চারু।
বুকে তিনবার থুতু ছেটালো,
- কি রে চারু ভয় পাইলি নাকি রে?

- ভয় পাবো কেনো? তুমি কি বাঘ না ভাল্লুক তোমাকে ভয় পেতে হবে?
- তাইলে বুকে থুতু ছিটাইলি কেনো?
- আমি চমকে গিয়েছিলাম। তুমি এখানে কি করো?
- তুই এইহানে কি করস? ভয় ডর কিছু নাই নাকি?
- কিসের ভয়?
- দীঘিতে থাকা মেয়ের ভয়।
- মাস্টারমশাই বলছে পেতাত্মা বলতে কিছুই নেই।
- তুই এত সুন্দর কইরা ক্যামনে কথা বলস রে চারু? আমারও এমনে কথা বলতে ইচ্ছা করে।
- তো বলো না কেনো? এইটাই তো আসল বাংলা ভাষা।
- আমি তো পারি না। তুই আমারে শিখাবি চারু?
- তুমি শিখবে?
- হ শিখমু। আমাদের বিয়ার পর তুই আমারে শিখাবি।
- কি বলো এইগুলা?
- ঠিকই তো বলছি। দেখিস আমি ঠিকই তোরে বিয়া করবো।
- দেখা যাবে। বাসায় যাচ্ছি আমি। তুমিও এই দীঘির পাড়ে বেশিক্ষণ একা থেকো না শাওন ভাই। যেখানে যাচ্ছিলে তাড়াতাড়ি চলে যাও।
- সাবধানে যাইস চারু। সন্ধ্যা হয়ে এলো।
এই সময় বেশি বাইরে থাকিস না। তেনারা এই সময় খুব পছন্দ করে।
- কারা?

- আরে তেনাদের চিনিস না? তেনাদের নাম মুখে আনতে নেই।
- এইসব মিথ্যা কথা।
- সত্য মিথ্যা তোরে যাচাই করতে হইবো না। তুই বাসায় যা। তাছাড়া সুন্দর মাইয়া সন্ধ্যা রাইতে বাইরে থাকলে তেনাদের নজর লাগে।
চারু আর কথা বাড়ালো না। চুপচাপ দৌড়ে গেলো বাড়ির দিকে। বাড়িতে ঢুকতেই রুবেলের মা কে দেখা গেলো মনোরমার সাথে।
- কি রে চারু এই সন্ধ্যা রাইতে কই গেছিলি?
- এমনিই হাটতে গিয়েছিলাম। হাটাহাটি করলে শরীর ভালো থাকে।
- শরীর তো তোর এমনিই ভালো। বড়ও কম হইলি না। বিয়া সাদি কি করবি না? বেশি বয়স হয়ে গেলে তো আর কেউ নিবো না।
চারুর মেজাজ গরম হয়ে গেলো। এই মহিলা ওকে দেখলেই শুধু বিয়ের কথা বলে।
- আগে লেখাপড়া করি। নিজের পায়ে দাঁড়াই তারপর বিয়ে করবো।
- এত লেহাপড়া কইরা কি হইবো? ওই তো পরের বাসায় গিয়া কাম করতে হইবো।
মনোরমাকে নিরুত্তর দেখে রুবেলের মা নিজের সপক্ষে যুক্তি দিতে বললেন,
- কি গো ভাবি, মাইয়া তো বড় হইছে। বিয়া দাও না ক্যান? পরে দেখবা কহন কোন পোলার লগে চইল্যা গেছে। বয়স থাকতে থাকতে বিয়া দিয়া দাও।

চারুর এইবার মেজাজ চটে গেলো। বহুকষ্টেও আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
- হ্যাঁ কাকি ঠিকই বলছো। অতিরিক্ত পাকনা মেয়ে গুলো বাসায় কিছু না জানিয়ে পালিয়ে যায়। তোমার মেয়েও না পাশের গ্রামের সুরুজের সাথে পালাইলো। তোমরা নেহাৎ ভালো বাপ মা তাই মেনে নিছো।
রুবেলের মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। সে ভাবেনি চারুলতা এমন একটা উত্তর দেবে তাকে। ওপাশ থেকে মনোরমা গর্জে উঠলো,
- চারু! কি হইতাছে? বড়দের মুখে মুখে কথা কইস না। যা হাত মুখ ধুইয়া ঘরে যা।
চারু আর কিছু বললো না। মা সবসময় লোকলজ্জার ভয়ে থাকে তাই সব বুঝেও উচিত কথা বলার সাহস তার নেই কিন্তু চারু তো এসব মানতে পারে না।

চলবে...

No comments