রাজশাহীর ১০টি সেরা দর্শনীয় স্থান
রাজশাহী, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ শহর, যা তার ম্যাঙ্গো বাগান, পদ্মা নদী এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের জন্য বিখ্যাত। এই শহরটি শুধুমাত্র আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত নয়, বরং এখানে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান যা ইতিহাস, প্রকৃতি এবং ধর্মীয় স্থাপত্যের এক অনন্য মিশ্রণ। যদি আপনি রাজশাহী ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাহলে এই ব্লগ পোস্টটি আপনার জন্য একটি পরিপূর্ণ গাইড। এখানে আমরা রাজশাহীর ১০টি সেরা দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা করবো।
রাজশাহী ডিভিশনের অংশ হিসেবে এই অঞ্চলে প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার থেকে শুরু করে ঔপনিবেশিক যুগের স্থাপত্য পর্যন্ত সবকিছু রয়েছে। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলো না শুধুমাত্র ইতিহাস প্রেমীদের আকর্ষণ করে, বরং প্রকৃতিপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চার সিকারদের জন্যও আদর্শ। বছরের সেরা সময় হলো শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি), যখন আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং ম্যাঙ্গো সিজন (মে-জুন) যখন ফলের উৎসব চলে। এখানে যাওয়ার জন্য ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা ফ্লাইট উপলব্ধ, এবং স্থানীয়ভাবে রিকশা, অটোরিকশা বা সিএনজি ব্যবহার করা যায়। এখন চলুন বিস্তারিত জেনে নেই রাজশাহীর ১০টি শীর্ষ দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে।
১. বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম (Varendra Research Museum) বাংলাদেশের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম রাজশাহীর অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন মিউজিয়াম হিসেবে পরিচিত। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে অবস্থিত এবং ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত। এখানে আপনি প্রাচীন শিল্পকর্ম, মুদ্রা, ভাস্কর্য এবং পান্ডুলিপি দেখতে পাবেন যা প্রাচীন বাংলার ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলে। মিউজিয়ামটিতে বৌদ্ধ, হিন্দু এবং ইসলামী যুগের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে, যা গবেষক এবং পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয়। এছাড়া, এখানকার গ্যালারিতে প্রদর্শিত টেরাকোটা শিল্পকর্মগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটায়। যদি আপনি ইতিহাসপ্রেমী হন, তাহলে এখানে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে আপনি প্রাচীন বরেন্দ্রভূমির গল্প শুনতে পাবেন। মিউজিয়ামটি সপ্তাহে ৬ দিন খোলা থাকে, এবং প্রবেশমূল্য খুবই সাশ্রয়ী। এটি রাজশাহী ভ্রমণের শুরুতে দেখার জন্য আদর্শ, কারণ এখান থেকে অন্যান্য স্থানে যাওয়া সহজ।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম (Varendra Research Museum বা VRM) রাজশাহী শহরের হাতেমখাঁ এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রাচীন জাদুঘর, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহশালা। এই জাদুঘরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয় এবং বরেন্দ্রভূমি (প্রাচীন উত্তরবঙ্গ অঞ্চল) এর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শিল্পের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে। এখানে প্রায় ১৯,০০০ এরও বেশি নিদর্শন রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে মহেনজোদারো সভ্যতার প্রত্নতত্ত্ব, পাল-সেন যুগের টেরাকোটা প্লেক, বৌদ্ধ-হিন্দু মূর্তি, মুদ্রা, পান্ডুলিপি এবং ইসলামী শিলালিপি। জাদুঘরটি শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, গবেষক, ইতিহাসপ্রেমী এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্যও একটি অমূল্য সম্পদ। রাজশাহী ভ্রমণে এটি অবশ্যদর্শনীয় স্থান, কারণ এখান থেকে শুরু করে অন্যান্য স্থান যেমন পদ্মা গার্ডেন, বড় কুঠি বা রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস সহজেই পৌঁছানো যায়। ২০২৫ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সহযোগিতায় মিউজিয়াম ট্রেনিং প্রোগ্রাম হয়েছে, যা এর আধুনিকীকরণের প্রমাণ।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের ইতিহাস
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের যাত্রা শুরু হয় ১৯১০ সালে, যখন নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজপরিবারের জমিদার কুমার শরৎকুমার রায়, খ্যাতনামা আইনজীবী ও ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রামপ্রসাদ চন্দ্র বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি গঠন করেন। তারা বরেন্দ্রভূমির (প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন) পুরাকীর্তি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেন। প্রথমে বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহীতে খনন করে তারা গাঙ্গামূর্তি, টেরাকোটা প্লেকসহ ৩২টি দুর্লভ নিদর্শন সংগ্রহ করেন। ১৯১৩ সালে জাদুঘরটি আনুষ্ঠানিকভাবে খোলা হয় এবং ১৯১৯ সালে বর্তমান নাম পায়।
১৯১১ সালে কলকাতা জাদুঘর এর সংগ্রহ দাবি করে, কিন্তু তৎকালীন রাজশাহী কমিশনার জে.এ. মোনাহান এবং বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের সহায়তায় এটি রক্ষা পায়। ১৯৩০-১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠাতাদের মৃত্যুর পর জাদুঘর সংকটে পড়ে, এমনকি ১৯৪৯ সালে মেডিকেল স্কুলে রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এটি অধিগ্রহণ করে এবং বর্তমানে ইতিহাস বিভাগের অধীনে পরিচালিত। ২০১০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৯৪,৯৩৩ ডলার অনুদানে আধুনিকীকরণ হয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগ্রহ বেড়ে ১৫,০০০-১৯,০০০ এ পৌঁছেছে, যার মধ্যে পাহাড়পুর থেকে ২৫৬টি নিদর্শন রয়েছে। এটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস, মহাত্মা গান্ধীর মতো ব্যক্তিদের দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছে।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে
জাদুঘরটি ৭টি প্রধান গ্যালারিতে বিভক্ত, যা মহেনজোদারো থেকে মুঘল যুগ পর্যন্ত ইতিহাস কভার করে। সংগ্রহের মধ্যে রয়েছে পাথর-ধাতুর ভাস্কর্য, টেরাকোটা প্লেক, মুদ্রা, শিলালিপি, পান্ডুলিপি, অস্ত্র, পোশাক এবং উপজাতীয় জিনিসপত্র। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- প্রথম গ্যালারি: পাহাড়পুর (সোমপুর মহাবিহার) থেকে ২৫৬টি নিদর্শন – টেরাকোটা প্লেকে বৌদ্ধ জীবনকাহিনী খোদাই।
- দ্বিতীয় গ্যালারি: হিন্দু-বৌদ্ধ ভাস্কর্য – কাঠ-পাথরের মূর্তি, ১১শ শতাব্দীর বুদ্ধমূর্তি, ভৈরব ও গঙ্গামূর্তি।
- তৃতীয়-চতুর্থ গ্যালারি: দেব-দেবীর মূর্তি – সূর্য, বিষ্ণু, শিব-পার্বতী, গণেশ।
- পঞ্চম গ্যালারি (আবহমান বাংলা): বাঙালি জীবনযাত্রা – প্রাচীন গহনা, বাদ্যযন্ত্র, মৃৎপাত্র, উপজাতীয় সামগ্রী, নৌকার মডেল।
- ষষ্ঠ-সপ্তম গ্যালারি: মুঘল রৌপ্য-স্বর্ণ মুদ্রা (গুপ্ত সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রা), ইসলামী শিলালিপি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, পান্ডুলিপি এবং সংস্কৃত-বাংলা গ্রন্থ।
- লাইব্রেরি: হাজারো বই, পত্রিকা এবং গবেষণাপত্র – ছাত্র-গবেষকদের জন্য ফ্রি।
- বাইরের পরিবেশ: সবুজ বাগান এবং ঐতিহ্যবাহী ভবন (লোড-বিয়ারিং ইটের দেওয়াল)। ফটোগ্রাফি অনুমোদিত (ফ্ল্যাশ ছাড়া)। ২০২৫ সালে ডিজিটাল ট্যুর এবং ওয়ার্কশপ চলছে। একবার ঘুরতে ২-৩ ঘণ্টা লাগে।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে কীভাবে যাওয়া যায়
জাদুঘরটি রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে, হাতেমখাঁ, মিউজিয়াম রোড (রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উত্তরে, জিরো পয়েন্ট থেকে ৮০০ মিটার পশ্চিম)। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে ৫ কিমি দূরে।
ঢাকা থেকে রাজশাহী:
- বাস: গাবতলী/আব্দুল্লাহপুর থেকে শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন, একতা, সোহাগ (৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা এসি/নন-এসি)।
- ট্রেন: পদ্মা এক্সপ্রেস/সিল্কসিটি (৫-৭ ঘণ্টা, ৪০০-১৪০০ টাকা)।
- বিমান: শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট (১ ঘণ্টা ফ্লাইট, ভাড়া ৩৫০০-৪৫০০ টাকা), তারপর ট্যাক্সি ১৫ মিনিট।
- শহর থেকে জাদুঘর: জিরো পয়েন্ট/সাহেব বাজার/রেলস্টেশন থেকে রিকশা/অটো/সিএনজি (৫-১৫ মিনিট, ভাড়া ২০-৫০ টাকা)। রাজশাহী কলেজ থেকে পায়ে হেঁটে ৫-১০ মিনিট। প্রাইভেট কার পার্কিং আছে।
যোগাযোগ:
- ফোন: +88 02588853455
- ইমেইল: vrm1910.ru@gmail.com
- ওয়েবসাইট: vrmbd.ru.ac.bd
- গুগল ম্যাপে "Varendra Research Museum" সার্চ করুন।
প্রবেশ ফি, সময়সূচী ও টিপস (২০২৬ আপডেট)
প্রবেশ ফি: জনপ্রতি ২০ টাকা (ছাত্র-গবেষকদের লাইব্রেরি ফ্রি; গ্রুপ >১২ জনের জন্য অগ্রিম যোগাযোগ করুন)। টিকিট কাউন্টারে পাওয়া যায়।
সময়সূচী (২০২৬ অনুযায়ী):
দিনসময়শনি-বুধি ১০:০০ এএম - ৪:৩০ পিএম
বৃহস্পতি সপ্তাহিক ছুটি
শুক্রবার ১০:০০ এএম - ৪:৩০ পিএম (নামাজ বিরতি ১:০০-২:০০ পিএম)
রমজান ৯:০০ এএম - ৩:০০ পিএম
সরকারি ছুটি বন্ধ
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), সকালে যান ভিড় এড়াতে।
টিপস:
- আরামদায়ক জুতা পরুন, ২-৩ ঘণ্টা ঘুরতে হবে।
- ফ্ল্যাশ ছাড়া ছবি তুলুন; ভিতরে ফটোগ্রাফি সীমিত।
- গাইড নিন (অফিসিয়াল গাইড আছে)।
- কোভিড প্রটোকল মানুন (স্যানিটাইজার আছে)।
- নিকটে: পদ্মা গার্ডেন (৫ মিনিট), বড় কুঠি, শাহ মখদুম মাজার।
থাকার জায়গা: রাজশাহীতে হোটেল রয়্যাল, সোনার বাংলো (কাছে)।
খাবার: সাহেব বাজারে ইলিশ ভাপা, মিষ্টি।
বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়াম শুধু জাদুঘর নয়, এটি বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যের জীবন্ত যাদুঘর। রাজশাহীতে থাকলে অবশ্যই যান – এখানকার টেরাকোটা এবং মূর্তিগুলো আপনাকে হাজার বছর পিছিয়ে নিয়ে যাবে। আরও তথ্যের জন্য অফিসিয়াল সাইট চেক করুন।
২. পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স (Puthia Temple Complex) বাংলার টেরাকোটা শিল্পের অনন্য নিদর্শন
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স রাজশাহীর কাছে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক হিন্দু মন্দির সমূহের সংগ্রহ, যা ১৭শ শতাব্দীর। এটি রাজশাহী থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে পুঠিয়া শহরে অবস্থিত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মন্দির কমপ্লেক্সগুলোর একটি। এখানে গোবিন্দ মন্দির, শিব মন্দির এবং জগন্নাথ মন্দিরসহ কয়েকটি মন্দির রয়েছে, যা টেরাকোটা শিল্পকর্ম দিয়ে সজ্জিত। এই মন্দিরগুলো রাজশাহীর রাজবাড়ির সাথে যুক্ত এবং হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। পর্যটকরা এখানে এসে প্রাচীন স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং ফটোগ্রাফি করেন। এটি ইউনেস্কোর সম্ভাব্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় রয়েছে। যদি আপনি সাংস্কৃতিক ভ্রমণ পছন্দ করেন, তাহলে এটি অবশ্যই দেখুন। মন্দিরগুলো সারা বছর খোলা থাকে, তবে পূজা উৎসবে আরও জমজমাট হয়।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর হিন্দু মন্দির সমূহের সংগ্রহ। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২৩-২৫ কিলোমিটার দূরে এই কমপ্লেক্সটি প্রায় ১০ একর জমির উপর বিস্তৃত এবং ১৭শ থেকে ১৯শ শতাব্দীর মধ্যে পুঠিয়ার জমিদাররা (ভূষণ বংশ) নির্মাণ করেন। এখানে মোট ১৪টি মন্দির রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো টেরাকোটা শিল্পকর্ম দিয়ে সজ্জিত। মন্দিরগুলোর পাশে রয়েছে পুঠিয়া রাজবাড়ি (প্যালেস), দোল মঞ্চ, পুকুর এবং শিব তালাও। এই কমপ্লেক্সটি বাংলার হিন্দু স্থাপত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। পর্যটকরা এখানে এসে টেরাকোটা কারুকাজ, শান্ত পরিবেশ এবং ঐতিহাসিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন। এটি ইউনেস্কোর সম্ভাব্য ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় রয়েছে এবং রাজশাহী ভ্রমণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্সের ইতিহাস
পুঠিয়ার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন রাজা নীলাম্বর ১৭শ শতাব্দীর শুরুতে। তার বংশধররা (পঞ্চানন, হেমনাথ, রাণী ভুবনেশ্বরী ইত্যাদি) বিভিন্ন মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরগুলোর স্থাপত্যে রয়েছে রত্ন, দো-চালা, পঞ্চরত্ন এবং নবরত্ন শৈলী। টেরাকোটা প্লেকগুলোতে খোদাই করা রয়েছে রামায়ণ-মহাভারতের দৃশ্য, কৃষ্ণলীলা, রাধা-কৃষ্ণ, শিব-পার্বতী, ফুল-লতা এবং ঔপনিবেশিক যুগের প্রভাব (ইংরেজ সৈন্য, ইউরোপীয় নারী ইত্যাদি)। ১৯শ শতাব্দীতে রাণী ভুবনেশ্বরী রাজবাড়ি এবং অনেক মন্দির নির্মাণ করেন। ব্রিটিশ আমলে জমিদারি প্রথা উঠে যাওয়ার পর মন্দিরগুলো সংরক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু বর্তমানে সরকারি তত্ত্বাবধানে সংস্কার চলছে। এটি বাংলার হিন্দু ঐতিহ্য এবং জমিদার যুগের সাক্ষ্য বহন করে।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্সে যা দেখতে পাবেন
পুঠিয়া কমপ্লেক্সে একদিনে সব দেখা সম্ভব। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির (Govinda Temple): ১৮২৩ সালে নির্মিত, সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর। পাঁচটি শিখর (রত্ন) বিশিষ্ট এবং টেরাকোটা কারুকাজে ভরা। রামায়ণের দৃশ্য এবং কৃষ্ণলীলা খোদাই করা।
- ভুবনেশ্বর শিব মন্দির (Bhubaneswar Shiva Temple): সবচেয়ে উঁচু (প্রায় ২০ মিটার), চারচালা শৈলীতে। পুকুরের পাশে অবস্থিত, যা প্রতিফলিত হয়ে অসাধারণ দৃশ্য তৈরি করে।
- গোপাল মন্দির এবং দোল মঞ্চ: দোল উৎসবের জন্য বিশেষ।
- জগন্নাথ মন্দির এবং অন্যান্য ছোট মন্দির: বিভিন্ন দেবতার মন্দির।
- পুঠিয়া রাজবাড়ি (Puthia Palace): ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্য, এখন স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত।
- শিব তালাও এবং পুকুর: শান্ত পরিবেশে বিশ্রামের জন্য।
কমপ্লেক্সটি সারা বছর খোলা, প্রবেশ ফি ফ্রি বা নামমাত্র। ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্সে কীভাবে যাওয়া যায়
পুঠিয়া যাওয়া খুব সহজ এবং রাস্তা ভালো।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- রাজশাহী থেকে পুঠিয়া: শিরইল বাস স্ট্যান্ড বা নতুন বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাস (ভাড়া ৪০-৬০ টাকা, সময় ৪৫-৬০ মিনিট)। সিএনজি বা অটো রিজার্ভ করে যাওয়া সুবিধাজনক (ভাড়া ৫০০-৮০০ টাকা)। প্রাইভেট কারে ৩০-৪০ মিনিট।
- সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), আবহাওয়া মনোরম। সকালে গেলে ভিড় কম।
ভ্রমণ টিপস
- গাইড নিলে ইতিহাস ভালো বুঝতে পারবেন।
- শালীন পোশাক পরুন, কারণ এটি ধর্মীয় স্থান।
- পানি এবং সান প্রটেকশন সাথে নিন।
- নিকটবর্তী স্থান: বাঘা মসজিদ, পদ্মা গার্ডেন।
- পুঠিয়ায় হোটেল কম, রাজশাহী থেকে ডে ট্রিপ করুন।
পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স বাংলার প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্য এবং শিল্পের এক জীবন্ত যাদুঘর। টেরাকোটা কারুকাজ দেখে মুগ্ধ হবেন এবং শান্ত পরিবেশে সময় কাটাবেন। রাজশাহী ঘুরতে গেলে এটি অবশ্যই দেখুন – ইতিহাসের সাথে মিলবে অপরূপ সৌন্দর্য!
৩. সোমপুর মহাবিহার (Somapura Mahavihara) প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার এক অপরূপ নিদর্শন
সোমপুর মহাবিহার, যা পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার নামেও পরিচিত, রাজশাহীর কাছে পাহাড়পুরে অবস্থিত একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এটি ৮ম শতাব্দীতে নির্মিত এবং দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ বিহারগুলোর একটি। এখানে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় স্তূপ রয়েছে, যা চারপাশে ১৭৭টি কক্ষ দিয়ে ঘেরা। বিহারের দেওয়ালে টেরাকোটা প্লেকগুলোতে বৌদ্ধ ধর্মীয় দৃশ্য খোদাই করা, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এটি প্রাচীন পাল রাজবংশের শাসনকালের সাক্ষ্য বহন করে এবং গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রাজশাহী ভ্রমণে এটি অবশ্যই দেখার মতো, বিশেষ করে যারা প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট পছন্দ করেন। বিহারটি সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী সাইট (১৯৮৫ সাল থেকে)। এটি নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত, রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। ৮ম শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজা ধর্মপাল (৭৮১-৮২১ খ্রি.) নির্মিত এই বিহার দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মহাবিহারগুলোর একটি। প্রায় ২৭ একর (৮৫,০০০ বর্গমিটার) জুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সে রয়েছে কেন্দ্রীয় স্তূপ, ১৭৭টি সন্ন্যাসী কক্ষ এবং অসংখ্য টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এটি মহায়ান বৌদ্ধধর্মের উত্থানের সাক্ষ্য বহন করে এবং প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। তিব্বতি ভিক্ষুরা এখানে পড়তে আসতেন, এবং এর স্থাপত্য কম্বোডিয়া পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছে। রাজশাহী ভ্রমণে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বপ্রেমীদের জন্য এটি অবশ্যদর্শনীয়।
সোমপুর মহাবিহারের ইতিহাস
সোমপুর মহাবিহারের নির্মাণকাল ৮ম শতাব্দীর শেষভাগ, পাল রাজা ধর্মপালের আমলে। খননকালে পাওয়া শিলালিপি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। এটি প্রাচীনকালে একটি বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কাজ করত, যেখানে হাজারো ভিক্ষু পড়াশোনা করতেন। ৯ম থেকে ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত এটি সমৃদ্ধ ছিল, এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের প্রচারক আতীশ দীপঙ্কর এখানে অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায়। ১২শ শতাব্দীতে সেন রাজত্বকালে এর পতন শুরু হয়, এবং ধীরে ধীরে এটি মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়। ১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা এটি পুনরাবিষ্কার করেন, এবং ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর স্থাপত্য জাভা এবং কম্বোডিয়ার মন্দিরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক প্রভাবের প্রমাণ।
সোমপুর মহাবিহারে যা দেখতে পাবেন
সোমপুর মহাবিহারের স্থাপত্য চতুর্ভুজাকার, যার মাঝে রয়েছে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় স্তূপ (ক্রুশাকার বেসমেন্ট সহ টেরাসড পিরামিড)। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- কেন্দ্রীয় স্তূপ: প্রায় ২১ মিটার উঁচু, চারপাশে টেরাস এবং খিলানযুক্ত কক্ষ। এটি বিহারের প্রধান মন্দির।
- সন্ন্যাসী কক্ষ: চারদিকে ১৭৭টি কক্ষের সারি, যা ভিক্ষুদের থাকার জায়গা ছিল।
- টেরাকোটা প্লেক: দেওয়ালে হাজারো পোড়ামাটির ফলক – বৌদ্ধ দেবতা, মানুষ, প্রাণী, ফুল-লতা এবং দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য খোদাই করা। এগুলো ৮ম শতাব্দীর শিল্পকর্মের অসাধারণ নমুনা।
- মিউজিয়াম: সাইটের মিউজিয়ামে পাওয়া মূর্তি, মুদ্রা, শিলালিপি এবং অন্যান্য নিদর্শন প্রদর্শিত।
- খননকৃত এলাকা: চারপাশে প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং সবুজ প্রান্তর।
খোলা থাকে: সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে। ফটোগ্রাফি অনুমোদিত।
প্রবেশ ফি: পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারে প্রবেশের ফি বাংলাদেশি পর্যটকদের জন্য ৩০ টাকা এবং সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা, আর অন্যান্য বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা (কিছু তথ্যে ভিন্নতা আছে, তবে সাম্প্রতিক মূল্য এটি)। জাদুঘরের প্রবেশ মূল্য সাধারণত বিহারের টিকিটের সাথে অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে কিছু উৎস অনুযায়ী জাদুঘরের জন্য আলাদা ১০০ টাকা লাগতে পারে, তাই প্রবেশদ্বারে নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো, তবে মূল সাইটে প্রবেশের জন্য এই ফি প্রযোজ্য।
সোমপুর মহাবিহারে কীভাবে যাওয়া যায়
পাহাড়পুরে যাওয়া সহজ, রাস্তা ভালো।
- ঢাকা থেকে: বাসে (গাবতলী বা সায়েদাবাদ থেকে জয়পুরহাট বা নওগাঁগামী বাস, ৬-৮ ঘণ্টা, ভাড়া ৫০০-১০০০ টাকা)। জয়পুরহাট থেকে লোকাল বাস বা অটোতে ২৩ কিলোমিটার (১ ঘণ্টা)। অথবা ট্রেনে সান্তাহার বা জয়পুরহাট স্টেশনে নেমে লোকাল ট্রান্সপোর্ট। বিমানে রাজশাহী বা সৈয়দপুর এয়ারপোর্টে এসে গাড়ি ভাড়া করুন। মোট দূরত্ব প্রায় ২৫০-৩০০ কিলোমিটার।
- রাজশাহী থেকে: বাসে নওগাঁ হয়ে বদলগাছী (২-৩ ঘণ্টা), তারপর পাহাড়পুরে লোকাল বাস বা সিএনজি। প্রাইভেট কার বা ট্যুর অপারেটর নিলে সুবিধাজনক।
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), আবহাওয়া মনোরম। গাইড নিলে ভালো।
সোমপুর মহাবিহার প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধ সভ্যতা, শিল্প এবং শিক্ষার এক জীবন্ত সাক্ষ্য। এখানে এসে টেরাকোটা শিল্পকর্ম এবং বিশাল স্তূপ দেখে মুগ্ধ হবেন। নিকটবর্তী স্থান যেমন মহাস্থানগড় বা বাঘা মসজিদের সাথে একদিনে ঘুরে দেখতে পারেন। রাজশাহী অঞ্চলের ভ্রমণে এটি অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করুন – ইতিহাসের পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে উঠবে প্রাচীনকাল!
৪. বাঘা মসজিদ (Bagha Mosque) ঐতিহাসিক স্থাপত্যের এক অপরূপ নিদর্শন
বাঘা মসজিদ রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, যা ১৬শ শতাব্দীর সুলতানি যুগের। এটি টেরাকোটা কারুকাজের জন্য বিখ্যাত এবং বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ইসলামী স্থাপত্য। মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ রয়েছে এবং দেওয়ালে ফুল, লতাপাতা এবং জ্যামিতিক নকশা খোদাই করা। এটি সুলতান নাসিরুদ্দিন নাসরাত শাহের আমলে নির্মিত এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক। পর্যটকরা এখানে এসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ উপভোগ করেন এবং ফটোগ্রাফি করেন। এটি রাজশাহী দর্শনীয় স্থানের তালিকায় শীর্ষে থাকে কারণ এর সৌন্দর্য অতুলনীয়।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও সুন্দর মসজিদ, যা সুলতানি যুগের স্থাপত্যশৈলীর এক অসাধারণ উদাহরণ। এটি রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ৪০-৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এবং টেরাকোটা কারুকাজের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশের ৫০ টাকার নোট এবং ১০ টাকার স্মারক ডাকটিকিটে এই মসজিদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, যা এর গুরুত্বের প্রমাণ। মসজিদের পাশে বিশাল একটি দীঘি, মাজার শরীফ এবং কবরস্থান রয়েছে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং রাজশাহী ভ্রমণে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অবশ্যদর্শনীয় স্থান।
বাঘা মসজিদের ইতিহাস
বাঘা মসজিদ ১৫২৩-১৫২৪ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরী ৯৩০ সাল) বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ (হোসেন শাহী বংশের শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র) নির্মাণ করেন। শিলালিপি থেকে এ তথ্য নিশ্চিত হয়। মসজিদটি গৌড়ের সুলতানি স্থাপত্যের প্রতিনিধিত্ব করে এবং ইসলাম প্রচারের সাথে যুক্ত। জনশ্রুতি আছে যে, হযরত শাহ দৌলা দানেশ মন্দ (রহ.) এবং তার সঙ্গীরা এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের গম্বুজসমূহ ধ্বংস হয়, কিন্তু বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ পুনর্নির্মাণ করে। মসজিদের পাশে সুলতান নুসরত শাহ খনন করান বিশাল দীঘি (প্রায় ২৫৬ বিঘা জমির উপর), যা এখনো পর্যটকদের আকর্ষণ করে। মসজিদ কমপ্লেক্সে রয়েছে আউলিয়াদের মাজার এবং জাদুঘর।
বাঘা মসজিদে যা দেখতে পাবেন
বাঘা মসজিদের স্থাপত্যশৈলী বাংলার সুলতানি যুগের অন্যতম সেরা উদাহরণ। মসজিদটি ইট দিয়ে নির্মিত, দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩.১৬ মিটার (৭৫ ফুট), প্রস্থ ১২.৮০ মিটার (৪২ ফুট) এবং দেওয়ালের পুরুত্ব ৮ ফুট। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- ১০টি গম্বুজ: চার কোণে ৪টি এবং মাঝে দুই সারিতে ৫টি করে মোট ১০টি গম্বুজ, যা ইনভার্টেড কাপ আকৃতির।
- টেরাকোটা কারুকাজ: অভ্যন্তরে ও বাইরে অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক – আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতা, চেইন-বেল মোটিফ এবং জ্যামিতিক নকশা। মেহরাব এবং স্তম্ভগুলোতে ফারসি খোদাই শিল্প।
- প্রবেশপথ: পূর্ব দিকে ৫টি খিলানযুক্ত দরজা (প্রধান), উত্তর-দক্ষিণে কয়েকটি (কিছু বন্ধ)।
- অভ্যন্তর: ৪টি অষ্টভুজাকার স্তম্ভ দিয়ে দুই আইল এবং পাঁচ বে-তে বিভক্ত। উত্তর-পশ্চিম কোণে উঁচু গ্যালারিতে রয়েছে রাজকীয় প্রার্থনা কক্ষ (মাকসুরা)।
- দীঘি ও পরিবেশ: মসজিদের সামনে বিশাল দীঘি, চারপাশে নারিকেল গাছ এবং শান্ত পরিবেশ। পাশে কবরস্থান এবং মাজার শরীফ।
- অন্যান্য: ঈদুল ফিতরের পর তিনদিনের ‘বাঘার মেলা’ হয়, যা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভরপুর।
মসজিদটি সারা বছর খোলা, প্রবেশ ফি ফ্রি (দান স্বাগত)।
কীভাবে যাওয়া যায় বাঘা মসজিদে
বাঘা মসজিদে যাওয়া খুবই সহজ, রাস্তা পাকা এবং যানবাহন উপলব্ধ।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন, দেশ ট্রাভেলস – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট, ভাড়া ৩৫০০-৪৫০০ টাকা)।
- রাজশাহী থেকে বাঘা: শিরইল বাস স্ট্যান্ড থেকে লোকাল বাস (ভাড়া ৩৫-৫০ টাকা, সময় ১-১.৫ ঘণ্টা)। সিএনজি বা অটোরিকশা রিজার্ভ করে যাওয়া যায় (ভাড়া ৫০০-১০০০ টাকা)। পথে বানেশ্বর আমের হাট দেখে আসতে পারেন। প্রাইভেট কারে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), আবহাওয়া মনোরম।
বাঘা মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি বাংলার সুলতানি যুগের স্থাপত্য, শিল্প এবং ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। টেরাকোটা কারুকাজ এবং শান্ত পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। নিকটবর্তী স্থান যেমন পুঠিয়া মন্দির কমপ্লেক্স বা পদ্মা গার্ডেনের সাথে একদিনে ঘুরে দেখতে পারেন। রাজশাহী ভ্রমণে এটি মিস করবেন না – ঐতিহ্যের সাথে মিলবে আধ্যাত্মিক শান্তি!
৫. পদ্মা গার্ডেন (Padma Garden) পদ্মার তীরে শান্তির এক অনন্য ঠিকানা
পদ্মা গার্ডেন রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থান। এটি টি-বাঁধ এবং আই-বাঁধ নামে পরিচিত এলাকায়, যেখানে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এখানে সূর্যাস্তের দৃশ্য অসাধারণ এবং বোটিং সুবিধা রয়েছে। পদ্মা নদী রাজশাহীর জীবনরেখা, এবং এই গার্ডেনটি পিকনিক এবং রিল্যাক্সেশনের জন্য আদর্শ। গ্রীষ্মকালে নদীতে সাঁতার কাটা যায়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করুন। এটি রাজশাহী tourist places এর মধ্যে প্রকৃতিপ্রেমীদের প্রিয়।
পদ্মা গার্ডেন রাজশাহী শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মনোরম বিনোদন কেন্দ্র, যা পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। আনুষ্ঠানিক নাম ওডভার মুনক্সগার্ড পার্ক (Oddvar Munksgaard Park) হলেও পদ্মা নদীর পাশে হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এবং পর্যটকদের কাছে এটি পদ্মা গার্ডেন নামেই বেশি পরিচিত। এটি ফুতকিপাড়া থেকে দরগাপাড়া পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার বিস্তৃত একটি উন্মুক্ত পার্ক, যা রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। পদ্মার বিশাল জলরাশি, সবুজ গাছপালা, ফুলের বাগান এবং শান্ত পরিবেশের কারণে এটি রাজশাহীর পর্যটকদের প্রথম পছন্দের স্থান। বিশেষ করে বিকেলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে লাখো মানুষ এখানে ভিড় করেন। এটি পিকনিক, হাঁটা, ফটোগ্রাফি এবং পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য আদর্শ। রাজশাহী ভ্রমণে এলে পদ্মা গার্ডেন না দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়!
পদ্মা গার্ডেনের ইতিহাস ও গুরুত্ব
পদ্মা গার্ডেনের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাকাল না থাকলেও এটি রাজশাহী শহরের উন্নয়নের সাথে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। পদ্মা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের পর এলাকাটি বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এখানে গাছ লাগানো, ওয়াকিং পাথ তৈরি এবং অন্যান্য সুবিধা যোগ করা হয়েছে। পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে নরওয়েজিয়ান নাগরিক ওডভার মুনক্সগার্ডের নামে, যিনি রাজশাহীর উন্নয়নে সহায়তা করেছিলেন। বর্তমানে এটি প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মার পাড়ের অংশ (বুলনপুর থেকে সাতবাড়িয়া পর্যন্ত), যা রাজশাহীবাসীর জন্য বিনোদনের সেরা ঠিকানা। এখানে ফ্রি ওয়াইফাই, মুক্তমঞ্চ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রয়েছে, যা রাজশাহীকে ‘পরিচ্ছন্ন শহর’ হিসেবে আরও সমৃদ্ধ করে।
পদ্মা গার্ডেনে যা দেখতে পাবেন
পদ্মা গার্ডেনে প্রকৃতি এবং বিনোদনের এক অসাধারণ মিশ্রণ রয়েছে। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- পদ্মা নদীর দৃশ্য: বিশাল পদ্মার জলরাশি, চর এবং সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য। বিকেলে সূর্য ডোবার সময় পদ্মার পানিতে আলোর প্রতিফলন মুগ্ধ করে।
- ওয়াকিং পাথ এবং বাগান: সবুজ গাছপালা, ফুলের বাগান এবং লম্বা ওয়াকিং পথ। হাঁটা, জগিং বা সাইকেল চালানোর জন্য উপযুক্ত।
- মুক্তমঞ্চ: রবীন্দ্র মুক্তমঞ্চে প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট বা নাটক হয়।
- বোটিং এবং চরে যাওয়া: নৌকা ভাড়া করে পদ্মার মাঝে জেগে ওঠা চরে যাওয়া যায়। গ্রীষ্মে চরে পিকনিক করা যায়।
- স্ট্রিট ফুড এবং রেস্টুরেন্ট: পার্কের চারপাশে অসংখ্য স্ট্রিট ফুড স্টল – ফুচকা, চটপটি, আচার, কফি, চাইনিজ খাবার। বিকেলে এখানকার খাবার উপভোগ করা অবশ্য করণীয়।
- অন্যান্য: বেঞ্চে বসে বিশ্রাম, পাখি দেখা এবং ফটোগ্রাফি। নিকটে বড় কুঠি এবং শাহ মখদুম মাজার।
পার্কটি সারা বছর উন্মুক্ত এবং প্রবেশ ফি ফ্রি।
কীভাবে যাওয়া যায় পদ্মা গার্ডেনে
পদ্মা গার্ডেন রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে, দরগাপাড়া এলাকায় অবস্থিত – জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দক্ষিণে।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন, দেশ ট্রাভেলস – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- শহরের ভিতরে: জিরো পয়েন্ট বা সাহেব বাজার থেকে পায়ে হেঁটে ৫-১০ মিনিট বা রিকশা/অটোরিকশায় (ভাড়া ১০-৫০ টাকা)। রেলস্টেশন থেকে ১৫ মিনিট।
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) এবং বিকেল-সন্ধ্যা, যখন সূর্যাস্ত দেখা যায়।
ভ্রমণ টিপস
- বিকেলে যান, সূর্যাস্ত দেখে আসুন।
- সান প্রটেকশন এবং পানি সাথে নিন।
- পার্ক পরিষ্কার রাখুন।
- নৌকা ভাড়া করে চরে যাওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।
- নিকটবর্তী স্থান: বড় কুঠি, শাহ মখদুম মাজার, শহীদ কামারুজ্জামান পার্ক।
পদ্মা গার্ডেন রাজশাহীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং শান্তির প্রতীক। এখানে এসে পদ্মার হাওয়া আর সূর্যাস্তের মায়ায় হারিয়ে যান – রাজশাহী ভ্রমণের সেরা স্মৃতি হবে এটি!
৬. শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড জু (Shaheed A.H.M. Kamaruzzaman Central Park & Zoo)
শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড জু (Shaheed A.H.M. Kamaruzzaman Central Park & Zoo) রাজশাহী মহানগরের অন্যতম জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র এবং চিড়িয়াখানা। এটি রাজশাহী সেন্ট্রাল জু (Zoo) নামে পরিচিত, শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি পার্ক এবং চিড়িয়াখানা। এখানে অসংখ্য প্রাণী যেমন সিংহ, বাঘ, হাতি, পাখি এবং সরীসৃপ দেখতে পাবেন। পার্কটিতে লেক, খেলার মাঠ এবং পিকনিক স্পট রয়েছে। এটি পরিবারের সাথে ঘুরতে আদর্শ এবং শহীদ কামারুজ্জামানের স্মৃতিতে নির্মিত। এটি প্রায় ৩৩ একর (৩২.৭৬ একর) জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এবং পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। পার্কটি শুধু চিড়িয়াখানা নয়, বরং সবুজ উদ্যান, পিকনিক স্পট, শিশুদের খেলার জায়গা এবং রাইডসের সমন্বয়ে গড়া একটি পরিবারিক বিনোদন স্থান। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং জাতীয় চার নেতার একজন শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। রাজশাহী শহরের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পার্কটি শহরবাসী এবং পর্যটকদের জন্য আদর্শ বিশ্রামস্থল।
পার্ক ও চিড়িয়াখানার ইতিহাস
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এই জায়গাটি পদ্মা নদীর বাঁকে অবস্থিত একটি ঘোড়দৌড়ের মাঠ (রেসকোর্স) ছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন মন্ত্রী এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদ শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামানের উদ্যোগে এবং জেলা প্রশাসক আব্দুর রউফের সহযোগিতায় এখানে উদ্যান নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১৯৭২ সালে পার্কটি উদ্বোধন করা হয়। ১৯৮৩ সালে জেলা প্রশাসক আবদুস সালাম এক জোড়া ঘড়িয়ালের বাচ্চা ছেড়ে দিয়ে চিড়িয়াখানার পত্তন করেন। পরবর্তীতে রাজশাহী জেলা পরিষদ এবং সরকারি অনুদানে এর উন্নয়ন হয়। ১৯৯৬ সালে এটি রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। ২০২৩ সালে দীর্ঘ সংস্কারের পর নতুন রূপে উন্মুক্ত করা হয়েছে, যেখানে নতুন রাইডস এবং সুবিধা যোগ করা হয়েছে।
পার্কে যা দেখতে পাবেন
পার্কটি প্রকৃতি এবং বিনোদনের এক অনন্য মিশ্রণ। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- চিড়িয়াখানা: বিভিন্ন প্রাণী যেমন সিংহ, বাঘ, হরিণ, ভাল্লুক, ময়ূর, বিভিন্ন পাখি এবং সরীসৃপ দেখতে পাবেন। যদিও এটি ঢাকার চিড়িয়াখানার মতো বড় নয়, তবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং শিক্ষামূলক।
- রাইডস ও অ্যামিউজমেন্ট: নাগরদোলা, প্যাডেল বোটিং, শিশুদের খেলার জায়গা, কৃত্রিম পাহাড় থেকে পদ্মা নদীর দৃশ্য উপভোগ।
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: সবুজ গাছপালা, ইউক্যালিপটাস বন, ফলের গাছ, কৃত্রিম লেক, ভাস্কর্য (যেমন ভেনাসের মূর্তি, জিরাফের ভাস্কর্য), ফোয়ারা এবং ওয়াকিং পাথ।
- পিকনিক স্পট: ছায়াযুক্ত পিকনিক এরিয়া, যেখানে পরিবার নিয়ে দিন কাটানো যায়।
- অন্যান্য: প্রধান ফটকে জিরাফ এবং মারমেইড ফোয়ারা, সিজনাল ফুলের প্রদর্শনী। ছুটির দিনে এখানে মেলা এবং ভিড় হয়।
কীভাবে যাওয়া যায়
পার্কটি রাজশাহী শহরের কেন্দ্রে, রাজশাহী শহর থেকে কোর্ট সড়কের পাশে (রাজপাড়া এলাকায়, পর্যটন মোটেলের পশ্চিমে, পুলিশ লাইনের পূর্বে) অবস্থিত।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- শহর থেকে পার্ক: সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট বা কোর্ট এলাকা থেকে রিকশা, অটোরিকশা বা সিএনজিতে ১০-১৫ মিনিট (ভাড়া ২০-৫০ টাকা)। দূরত্ব মাত্র ৩-৪ কিলোমিটার।
প্রবেশ ফি, সময়সূচী ও টিপস
- প্রবেশ ফি: প্রতি ব্যক্তি ২৫ টাকা (সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে; রাইডস বা পিকনিক স্পটের জন্য আলাদা চার্জ হতে পারে)।
- খোলা থাকে: প্রতিদিন সকাল ৮টা/১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত (শনিবার বন্ধ থাকতে পারে কিছু সূত্রে, চেক করুন)।
- সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), যখন আবহাওয়া মনোরম এবং পিকনিকের জন্য আদর্শ।
- টিপস: পরিবার নিয়ে যান, পানি ও সান প্রটেকশন সাথে নিন। পার্ক পরিষ্কার রাখুন। নিকটবর্তী বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটারও দেখে আসতে পারেন।
শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান সেন্ট্রাল পার্ক অ্যান্ড জু রাজশাহীর সবুজ শহরের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। এখানে এসে প্রকৃতি, প্রাণী এবং ইতিহাসের মিশ্রণ উপভোগ করুন – পরিবারের সাথে একটি অসাধারণ দিন কাটানোর জন্য আদর্শ স্থান!
৭. হজরত শাহ মখদুমের মাজার (Shrine of Hazrat Shah Makhdum) একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থানের সম্পূর্ণ গাইড
হজরত শাহ মখদুমের মাজার রাজশাহী শহরের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। এটি বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর সমাধিস্থল, যিনি ১৩শ শতাব্দীতে বরেন্দ্রভূমি (রাজশাহী অঞ্চল) এ ইসলামের প্রচারক হিসেবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মাজারটি রাজশাহী শহরের দরগাপাড়ায় অবস্থিত, পদ্মা নদীর তীরে এবং রাজশাহী কলেজের কাছে। এখানে প্রতি বছর হিজরী রজব মাসের ২৭ তারিখে ওরস মোবারক পালিত হয়, যখন দেশ-বিদেশ থেকে লাখো ভক্ত জিয়ারত করতে আসেন। মাজার কমপ্লেক্সে রয়েছে প্রধান সমাধি, মসজিদ, পুকুর এবং অন্যান্য স্থাপত্য। এটি শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, রাজশাহীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতীক। রাজশাহী ভ্রমণে এটি অবশ্য দেখার মতো স্থান, বিশেষ করে যারা ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতা পছন্দ করেন।
হজরত শাহ মখদুমের ইতিহাস
হজরত শাহ মখদুম রূপোশ (রহ.) এর প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ আব্দুল কুদ্দুস জালালুদ্দীন। তিনি বড়পীর হজরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.) এর পৌত্র এবং হজরত আজাল্লাহ শাহের পুত্র। জন্ম হয় বাগদাদে প্রায় ১২১৬ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরী ৬১৫ সালের ২ রজব)। ‘রূপোশ’ উপাধি পান তার অলৌকিক ক্ষমতা ও সাধনার কারণে, যার অর্থ ‘রূপ আচ্ছাদিত’।
১২৮৬-১২৮৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে তিনি তার বড় ভাই সৈয়দ আহমদ (মীরন শাহ) সহ বাংলায় আগমন করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। প্রথমে নোয়াখালীর শ্যামপুরে খানকাহ স্থাপন করেন। পরে সঙ্গীদের নিয়ে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় যান, যেখানে স্থানীয় তান্ত্রিক রাজা অংশু দেও চন্দবর্মীকে পরাজিত করে ইসলাম প্রচার করেন। কথিত আছে, তিনি কুমিরের পিঠে চড়ে নদী পার হতেন এবং অলৌকিক ক্ষমতায় মানুষকে আকৃষ্ট করতেন।
প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করে ১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরী ৭১৩ সালের ২৭ রজব) তিনি ইন্তেকাল করেন। তার ইচ্ছানুসারে রামপুর বোয়ালিয়া (বর্তমান রাজশাহী) তে সমাহিত করা হয়। তার নামে রাজশাহীর বিমানবন্দরের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট’।
মাজারে যা দেখতে পাবেন
মাজার কমপ্লেক্সটি সুন্দর স্থাপত্যশৈলীতে গড়া, যা মুঘল যুগের প্রভাব বহন করে। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- প্রধান সমাধি (দরগাহ): একগম্বুজ বিশিষ্ট ছোট সমাধি ভবন, যা ১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে আলীকুলী বেগ নির্মাণ করেন। ভিতরে হজরতের কবর, যেখানে ভক্তরা ফাতেহা পড়েন এবং মানত করেন।
- মসজিদ: মাজারের পাশে সুন্দর মসজিদ, যেখানে নিয়মিত নামাজ ও মিলাদ পড়া হয়।
- পুকুর ও বাগান: মাজারের চারপাশে পুকুর (কথিত আছে কুমির থাকতো) এবং সবুজ বাগান, যা শান্তির অনুভূতি দেয়।
- প্রবেশদ্বার ও স্থাপত্য: দক্ষিণমুখী প্রধান ফটক এবং অন্যান্য গেটগুলো দৃষ্টিনন্দন। দেওয়ালে ফারসি শিলালিপি রয়েছে।
- ওরস মেলা: রজবের ২৭ তারিখে বড় মেলা হয়, যেখানে তাজিয়া মিছিল, লাঠি খেলা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়।
মাজারে চাঁদি (মোমবাতি), ফুল, চিনি ইত্যাদি শিরনি দেওয়ার প্রথা আছে। পরিবেশ শান্তিপূর্ণ এবং নিরাপদ।
কীভাবে যাওয়া যায় হজরত শাহ মখদুমের মাজারে
মাজারটি রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে, দরগাপাড়ায় অবস্থিত – পদ্মা গার্ডেন এবং রাজশাহী কলেজের খুব কাছে।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- শহরের ভিতরে: রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্ট, সাহেব বাজার বা তালাইমারী থেকে রিকশা, অটোরিকশা বা সিএনজিতে ৫-১০ মিনিট (ভাড়া ২০-৫০ টাকা)। পদ্মা গার্ডেনে গেলেই মাজার দেখতে পাবেন।
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) অথবা ওরসের সময়। সকাল বা সন্ধ্যায় জিয়ারত করলে ভালো।
প্রবেশ ফি: ফ্রি। তবে ধর্মীয় স্থান হওয়ায় শালীন পোশাক পরুন এবং নিয়ম মানুন।
হজরত শাহ মখদুমের মাজার শুধু একটি সমাধিস্থল নয়, এটি বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষ্য। এখানে এসে আধ্যাত্মিক শান্তি পাওয়া যায় এবং রাজশাহীর প্রাচীন ঐতিহ্য অনুভব করা যায়। নিকটবর্তী স্থান যেমন পদ্মা গার্ডেন, বড় কুঠি বা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সাথে একদিনে ঘুরে দেখতে পারেন। রাজশাহী ভ্রমণে এটি মিস করবেন না – এখানকার আধ্যাত্মিকতা আপনাকে মুগ্ধ করবে!
৮. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস (Rajshahi University Campus)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (Rajshahi University বা RU) বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাস এবং উত্তরাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি প্রায় ৭৫৩ একর (৩০৫ হেক্টর) জুড়ে বিস্তৃত এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ও সবুজ ক্যাম্পাস হিসেবে পরিচিত। সবুজ প্রান্তর, পুকুর, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ঐতিহাসিক ভবন এবং শান্ত পরিবেশের কারণে এটি শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, পর্যটকদের জন্যও একটি আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। রাজশাহী শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে মতিহারে অবস্থিত এই ক্যাম্পাসকে অনেকে "মতিহারের সবুজ চত্বর" বলে ডাকেন। প্রকৃতিপ্রেমী, ফটোগ্রাফার এবং শান্তি খুঁজতে আসা ভ্রমণকারীদের জন্য এটি আদর্শ। ক্যাম্পাসে রয়েছে বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামের মতো ঐতিহাসিক স্থানও, যা এর আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ইতিহাস
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৩ সালে, মাত্র ১৬১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে। প্রথমে শহরের ভূবন মোহন পার্কে কার্যক্রম শুরু হলেও ১৯৫৮ সালে বর্তমান মতিহার ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। অস্ট্রেলিয়ান স্থপতির ডিজাইনে গড়ে ওঠা এই ক্যাম্পাসে রয়েছে ঔপনিবেশিক ও আধুনিক স্থাপত্যের মিশ্রণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় এটি পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি ছিল এবং অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী শহীদ হন। ক্যাম্পাসে শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা এই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। বর্তমানে ১২টি অনুষদ, ৫৯টি বিভাগ এবং ৩৮,০০০+ শিক্ষার্থী নিয়ে এটি দেশের অন্যতম শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসের সৌন্দর্যের জন্য এটি প্রায়ই "বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ক্যাম্পাস" বলে প্রশংসিত হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যা দেখতে পাবেন
ক্যাম্পাসটি বিশাল হওয়ায় পুরোটা ঘুরতে একদিন লাগতে পারে। প্রধান আকর্ষণগুলো:
- প্যারিস রোড (Paris Road): ক্যাম্পাসের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থান। কাজলা গেট থেকে পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই রাস্তা দু'পাশে সারি সারি গাছ দিয়ে ঘেরা, যা প্যারিসের চ্যাম্পস-এলিসের মতো দেখতে। সন্ধ্যায় হাঁটা বা সাইকেল চালানোর জন্য আদর্শ। অনেকে বলেন, রাজশাহী এলে প্যারিস রোড না দেখলে ভ্রমণ অসম্পূর্ণ।
- শহীদ মিনার (Central Shaheed Minar): ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত এটি সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ দিয়ে ঘেরা।
- বোটানিক্যাল গার্ডেন: বিরল গাছপালা ও ঔষধি উদ্ভিদের সংগ্রহ। শান্ত পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য উপযুক্ত।
- শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা: মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন ও ছবি প্রদর্শিত। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অবশ্য দেখার।
- চারুকলা অনুষদ ও জয়নুল আবেদীন একাডেমিক ভবন: শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের নামে নামকরণ। সুন্দর স্থাপত্য ও আর্ট গ্যালারি।
- কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি ও একাডেমিক ভবন: প্রথম বিজ্ঞান ভবনসহ বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি ভবনের স্থাপত্য দেখার মতো।
- পুকুর ও সবুজ প্রান্তর: ক্যাম্পাসে একাধিক পুকুর, যেমন শহীদুল্লাহ কলাভবনের পাশে। পাখি দেখা ও ফটোগ্রাফির জন্য ভালো।
জুবেরী গেস্ট হাউস ও অন্যান্য: ক্যাম্পাসে স্ট্রিট ফুড (ফুচকা, আচার, চটপটি) পাওয়া যায়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কীভাবে যাওয়া যায়
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৫০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- শহর থেকে ক্যাম্পাস: রাজশাহী শহরের বিনোদপুর জিরো পয়েন্ট বা তালাইমারী থেকে অটোরিকশা, সিএনজি বা রিকশায় ১০-১৫ মিনিট (ভাড়া ২০-৫০ টাকা)। মেইন গেট কাজলা গেট বা বিনোদপুর গেট দিয়ে প্রবেশ। ক্যাম্পাসে রেলস্টেশনও আছে (রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্টেশন)।
ক্যাম্পাসের ভিতরে: পায়ে হেঁটে বা সাইকেল/রিকশা ভাড়া করে ঘুরুন। প্রাইভেট কার নিয়ে প্রবেশের অনুমতি লাগতে পারে।
প্রবেশ ফি: সাধারণত ফ্রি, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় শ্রেণীকক্ষে বা হলে প্রবেশে সতর্কতা অবলম্বন করুন। সময়সূচী: সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উন্মুক্ত। সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), যখন আবহাওয়া মনোরম।
ভ্রমণ টিপস
- ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখুন এবং শিক্ষার্থীদের অসুবিধা না করুন।
- সান প্রটেকশন ও পানি সাথে নিন।
- সন্ধ্যায় প্যারিস রোডে হাঁটুন, সূর্যাস্ত দেখুন।
- ক্যাম্পাসে স্ট্রিট ফুড উপভোগ করুন।
- নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান: বরেন্দ্র মিউজিয়াম (ক্যাম্পাসের মধ্যে), পদ্মা গার্ডেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও শান্তির এক অনন্য মিলনস্থল। রাজশাহী ভ্রমণে এটি অবশ্যই দেখুন – আপনার মন ভরে উঠবে সবুজের সৌন্দর্যে!
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি সবুজ এবং শান্তিপূর্ণ, যা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। এখানে পুকুর, বাগান এবং ভবনগুলো দেখার মতো।
৯. বড় কুঠি (Boro Kuthi), রাজশাহী: ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন
বড় কুঠি রাজশাহীতে পদ্মা তীরে অবস্থিত একটি ঔপনিবেশিক ভবন, যা ডাচদের আমলে নির্মিত। এটি এখন সরকারি অফিস, কিন্তু ঐতিহাসিক মূল্যবান। বড় কুঠি রাজশাহী শহরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনা, যা পদ্মা নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন ইমারত হিসেবে পরিচিত এবং ঔপনিবেশিক যুগের বাণিজ্যিক ইতিহাসের সাক্ষী। ১৮শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (সম্ভবত ১৭২৫ সালের আগে) ওলন্দাজ (ডাচ) রেশম ব্যবসায়ীরা এটি নির্মাণ করেন রেশম ও অন্যান্য পণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে। পরবর্তীতে এটি ইংরেজদের দখলে আসে এবং নীল চাষের সাথে যুক্ত হয়ে কৃষক নির্যাতনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে রয়েছে এবং জাদুঘরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। রাজশাহী ভ্রমণে ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এটি অবশ্যদর্শনীয় স্থান। পদ্মা গার্ডেনের পাশে অবস্থিত হওয়ায় প্রকৃতি ও ইতিহাসের মিশ্রণ উপভোগ করা যায়।
বড় কুঠির ইতিহাস ও গুরুত্ব
বড় কুঠির সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল নির্ধারণ করা না গেলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায় যে, এটি ১৮শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ওলন্দাজরা নির্মাণ করেন। রাজশাহী তখন রেশম উৎপাদনের কেন্দ্র ছিল, এবং পদ্মা নদীর সুবিধা নিয়ে ওলন্দাজরা এখানে রেশম বাণিজ্যের জন্য কুঠি স্থাপন করেন। ভবনটি দুর্গের মতো নির্মিত হয়েছিল, যাতে জরুরি সময়ে প্রতিরক্ষার জন্য কামান রাখা যায়। ছাদে ও নিচে কয়েকটি কামান ছিল, যার তিনটি এখনো রাজশাহী পুলিশ লাইনে সংরক্ষিত।
১৮১৪ সালে ওলন্দাজরা তাদের সকল ব্যবসাকেন্দ্র ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে। ১৮৩৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা এটিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। এ সময় নীল চাষের জন্য এখানে কৃষকদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়, যা বাংলার নীল বিদ্রোহের সাথে যুক্ত। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বর্তমানে ভবনটি জরাজীর্ণ হলেও ২০১৮ সালে সরকার এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করে। ২০২১ সাল থেকে সংস্কার কাজ চলছে, এবং এটিকে পূর্ণাঙ্গ জাদুঘরে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। জাদুঘরে ওলন্দাজ যুগের জিনিসপত্র, ছবি ও পেইন্টিং প্রদর্শিত হবে। এটি রাজশাহীর ঔপনিবেশিক ইতিহাস, রেশম শিল্প ও নীলকরদের নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করে।
বড় কুঠিতে যা দেখতে পাবেন
বড় কুঠি একটি দোতলা ইষ্টকনির্মিত ভবন, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪ মিটার এবং প্রস্থ ১৭.৩৭ মিটার। মোট ১২টি কক্ষ রয়েছে – নিচে ও উপরে ৬টি করে। কেন্দ্রীয় হলরুমটি ৯.৬ মিটার লম্বা এবং ৬.৩ মিটার চওড়া, উত্তর-দক্ষিণে দুটি বারান্দা সহ। সমতল ছাদ এবং ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী এর প্রধান আকর্ষণ।
- স্থাপত্যের সৌন্দর্য: পুরনো ইটের কারুকাজ, বারান্দা এবং কক্ষগুলোর নকশা।
- পদ্মা নদীর দৃশ্য: ভবনের পাশ দিয়ে পদ্মা বয়ে যাওয়ায় সূর্যাস্ত বা নদীর শান্ত দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
- ঐতিহাসিক নিদর্শন: কামানের অবশেষ (পুলিশ লাইনে), নীলকর যুগের স্মৃতি।
- আশেপাশে: পদ্মা গার্ডেন, যেখানে বিশ্রাম নেওয়া যায়।
ভবনটি বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্য সীমিতভাবে উন্মুক্ত, তবে সংস্কারের কারণে কিছু অংশ বন্ধ থাকতে পারে। ফটোগ্রাফির জন্য অনুমতি নিন।
কীভাবে যাওয়া যায় বড় কুঠিতে
বড় কুঠি রাজশাহী শহরের কেন্দ্রস্থলে, সাহেব বাজার ও রাজশাহী কলেজের দক্ষিণে, পদ্মা গার্ডেনের পাশে অবস্থিত।
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, গ্রীন লাইন – ৫-৬ ঘণ্টা, ভাড়া ৭০০-১৪০০ টাকা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ৫-৭ ঘণ্টা) বা বিমান (শাহ মখদুম এয়ারপোর্ট)।
- শহরের ভিতরে: রাজশাহী শহরের জিরো পয়েন্ট বা সাহেব বাজার থেকে রিকশা, অটোরিকশা বা সিএনজিতে ১০-১৫ মিনিট (ভাড়া ২০-৫০ টাকা)। পদ্মা গার্ডেনে গেলেই দেখতে পাবেন।
সেরা সময়: শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি), সকাল বা সন্ধ্যায় নদীর দৃশ্য উপভোগের জন্য।
প্রবেশ ফি সাধারণত ফ্রি বা নামমাত্র, তবে সংস্কারের কারণে চেক করুন।
বড় কুঠি শুধু একটি ভবন নয়, এটি রাজশাহীর ঔপনিবেশিক বাণিজ্য, রেশম শিল্প এবং কৃষক আন্দোলনের জীবন্ত সাক্ষ্য। পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে এর ইতিহাস অনুভব করলে মনে হবে যেন সময় পিছিয়ে গেছে। রাজশাহী ঘুরতে গেলে এটি মিস করবেন না – ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অসাধারণ মিলনস্থল।
১০. সাফিনা পার্ক (Safina Park)
সাফিনা পার্ক ও রিসোর্ট (Safina Park & Resort) রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলায় অবস্থিত একটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় পারিবারিক পার্ক, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধুনিক রাইডস এবং পিকনিক সুবিধার জন্য বিখ্যাত। ২০১২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রায় ৪০-৯০ বিঘা জমির উপর গড়ে তোলা এই পার্কটি গোদাগাড়ী থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূরে দিগরাম খেঁজুরতলায় অবস্থিত। পার্কে যাওয়ার পথে রাস্তার দু'পাশে সবুজ ফসলের মাঠ পর্যটকদের মন কাড়ে। এটি শুধুমাত্র একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক নয়, বরং রিসোর্ট, পিকনিক স্পট এবং ইভেন্ট ভেন্যু হিসেবেও পরিচিত। রাজশাহী ভ্রমণে যারা প্রকৃতি ও বিনোদনের মিশ্রণ খুঁজছেন, তাদের জন্য সাফিনা পার্ক আদর্শ স্থান। এখানে পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা স্কুল-কলেজের স্টাডি ট্যুরের জন্য উপযুক্ত সুবিধা রয়েছে।
সাফিনা পার্কের ইতিহাস ও অবস্থান
সাফিনা পার্ক ২০১২ সালে দুই সহোদর ফজলুর রহমান ও সাইফুল ইসলামের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। মালিকানা নিয়ে কিছু বিরোধের কারণে একসময় প্রায় ২ বছর বন্ধ থাকলেও ২০১৮ সালে পুনরায় চালু হয়েছে এবং এখন এটি গোদাগাড়ীর সর্ববৃহৎ পারিবারিক বিনোদন কেন্দ্র। পার্কটি গোদাগাড়ী-আমনুরা সড়কের পাশে অবস্থিত, যা রাজশাহী শহর থেকে প্রায় ২৫-৩০ কিলোমিটার দূরে। প্রধান গেটটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন, যা দূর থেকেই দর্শকদের আকর্ষণ করে।
সাফিনা পার্কে যা দেখতে পাবেন
সাফিনা পার্কে বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের জন্য নানা আকর্ষণ রয়েছে। পার্কের ভিতরে ফুলের বাগান, ফল ও ঔষধি গাছ দিয়ে সাজানো পরিবেশ মনোরম। আর্ন্তজাতিক মানের প্রবেশ গেইট, ডাইনোশর জগৎ, মানব গাছ, পাহার, দোলনা এরিয়া, অ্যামিউজমেন্ট রাইডস, স্পিডবোর্ড, শিশু কর্নার, ভুতের বাড়ি, ঝরর্ণা এবং পার্ক এরিয়া । প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
- রাইডস ও অ্যামিউজমেন্ট: নাগরদোলা (Ferris Wheel), রোলার কোস্টার, ট্রেন রাইড, দোলনা, কিডস জোন এবং থ্রিডি/৯ডি সিনেমা। শিশুদের জন্য বিশেষ খেলার এলাকা রয়েছে।
- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: দুটি পুকুর বা লেক, যেখানে প্যাডেল বোটিং করা যায়। অনুমতি নিয়ে মাছ ধরাও সম্ভব। চারদিকে বিভিন্ন পশু-পাখির কৃত্রিম ভাস্কর্য এবং দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারা।
- পিকনিক ও ইভেন্ট সুবিধা: ২টি পিকনিক স্পট, আন্তর্জাতিক মানের স্টেজ (কনসার্ট, সভা-সমাবেশের জন্য), শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স রুম।
- রিসোর্ট ও থাকার ব্যবস্থা: ১৩টি আধুনিক কক্ষ, যার মধ্যে ৩টি সম্পূর্ণ এসি। রাত্রীযাপনের জন্য উপযুক্ত।
- খাবারের সুবিধা: নিজস্ব রেস্টুরেন্টে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী খাবার, চাইনিজ, ইন্ডিয়ান, সামুদ্রিক খাবার এবং ফাস্টফুড পাওয়া যায়। কনফেকশনারি ও মার্কেটে খেলনা ও অন্যান্য জিনিস কেনা যায়।
পার্কের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপদ, যা পরিবারের সাথে ঘুরতে আদর্শ।
কীভাবে যাওয়া যায় সাফিনা পার্কে
সাফিনা পার্কে যাওয়া খুবই সহজ। প্রথমে রাজশাহী শহরে পৌঁছাতে হবে:
- ঢাকা থেকে রাজশাহী: বাস (শ্যামলী, হানিফ, এভার গ্রীন, গ্রামীন, ন্যাশনাল সহ রাজশাহী গামী বাসে – ভাড়া ৭০০-১৪০০ টাকা, সময় ৫-৬ ঘণ্টা), ট্রেন (সিল্কসিটি, পদ্মা এক্সপ্রেস – ভাড়া ৪০০-১৪০০ টাকা) অথবা বিমান (শাহ মখদুম বিমানবন্দর)।
- রাজশাহী শহর থেকে পার্ক: গোদাগাড়ীগামী লোকাল বাস, সিএনজি বা অটোরিকশা নিন। গোদাগাড়ী জিরো পয়েন্ট থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে গোদাগাড়ী-আমনুরা রোডে পার্কটি। সময় লাগবে ৪৫-৬০ মিনিট, ভাড়া ৩০-৫০ টাকা per person। প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস ভাড়া করলে আরও সুবিধাজনক। পার্কিং সুবিধা রয়েছে (মোটরসাইকেল ২০ টাকা, কার ১০০ টাকা ইত্যাদি)।
অন্যভাবে, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, বনপাড়া, নাটোর, বানেশ্বর ও রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ঢাকা বাসে অথবা লোকাল বাসে গোদাগাড়ী নামতে হবে তারপর অটো অথবা লেগুনাতে অথবা অটো রিক্সাতে সরাসরি সাফিনা পার্কে যেতে পারবেন আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী। রাজশাহী শহর থেকে গেলে লোকাল বাসে অথবা অটো রিজার্ভ পাওয়া যায় সরাসরি সাফিনা পার্কে যেতে পারবেন।
প্রবেশ ফি, সময়সূচী ও টিপস
- প্রবেশ ফি: প্রতি দর্শনার্থী ২০-৫০ টাকা (সাম্প্রতিক তথ্য অনুসারে, রাইডসের জন্য আলাদা চার্জ)।
- খোলা থাকে: সাধারণত সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, সারা বছর।
- সেরা সময়: নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (শীতকাল), আবহাওয়া মনোরম।
- টিপস: পার্ক পরিষ্কার রাখুন, সান প্রটেকশন নিন, পিকনিকের জন্য অগ্রিম বুকিং করুন। পদ্মা নদীর কাছে হলে সূর্যাস্ত দেখে আসুন।
- মোবাইল – ০১৩৩০-০০২৩৩৩ / ০১৩৩০-০০২৫৫৫
- ইমেইল – info@safinapark.com
- ওয়েবসাইট – safinapark.com
- ফেসবুক – Safina Park & Resort
সাফিনা পার্ক রাজশাহীর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি অনন্য সংযোজন, যা বিনোদন ও বিশ্রামের নিখুঁত সমন্বয়। যদি আপনি রাজশাহী ঘুরতে যান, তাহলে এটি মিস করবেন না!
পরিশেষে, রাজশাহীর এই ১০টি দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করে আপনি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্য উপভোগ করতে পারবেন। এই গাইডটি আপনার রাজশাহী ভ্রমণকে সহজ করে তুলবে। যাওয়ার আগে আবহাওয়া চেক করুন এবং স্থানীয় গাইড নিন।









