ভালোবাসি তাই । পর্ব -১০

সময়ের গতিতে সময় চলতে থাকে। আর মানুষের জীবনটা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে গড়াতে থাকে।
সময় যেমন কখনো থেমে থাকে না ঠিক তেমনি জীবনও থেমে থাকে না। আসলে জীবনটা হলো সময়ের সমষ্টি।
সময় নিয়েই জীবন গঠিত হয়েছে।
সবার জীবন খুব ভালোভাবেই এগুচ্ছে কিন্তু আমার জীবনটা
যেন কোনো থমকে যাওয়া পথিকের ন্যায় থেমে আছে।
পথে চলতে চলতে হঠাৎ কোনো রহস্যময় কিছু দেখে যেমন পথিক থমকে যায়
সায়ন ভাইয়াকে ভালোবেসে আমার জীবনটাও হঠাৎ করেই কেমন থমকে গেছে ।
হুমম জীবনের এই অধ্যায় থেকে আমি বেরুনোর অনেক চেষ্টা করেছি তবে প্রতিবারের
মত এর রেজাল্ট শূণ্যই থেকে গেল। পারিনি আজও সায়ন ভাইয়াকে নিজের থেকে আলাদা করতে আর
পারবোও না কখনো। সায়ন ভাইয়া কি আজও বুঝতে পারেননি আমি ওনাকে অনেক ভালোবাসি।
হয়তো আজও বুঝতে পারেননি। না হলে আপুর আর ওনার এংগেজমেন্ট ওনি আটকাতেন।
সায়ন ভাইয়ার ফাইনাল এক্সাম হয়ে গেছে। এরপর কেটে গেছে তিন তিনটা মাস।
সায়ন ভাইয়া এখন তার বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন।
এই তিনটা মাস আমি সায়ন ভাইয়ার সামনে একদমই যায়নি।
খালামণির বাসায় কোনো কাজ থাকলেও আমি না গিয়ে ভাইয়াকে পাঠাতাম।
যতটা সম্ভব ওনাকে এড়িয়ে গিয়েছি। যাতে আর ওনার মায়ায় আবদ্ধ না হই।
কিন্তু পারিনি যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করি ওনি আমার মনেই ছিলেন।
একচুলও আমি ওনাকে সরাতে পারিনি। আর কাল আপু আর ওনার এংগেজমেন্ট।
আমার সামনেই ওনি আপুর হাতে এংগেজমেন্ট রিং পরিয়ে দিবেন।
আমি আরকিছুই করতে পারবো না। সবকিছু আমার হাতের বাইরে চলে গেছে।
অবশ্য কখনো আমার হাতে কিছু ছিলও না।।
কাল আপুর এংগেজমেন্ট তাই অনেক মেহমান এখনি চলে এসেছে।
এংগেজমেন্টেই এত মানুষ না জানি বিয়েতে কত মানুষ হয়। পুরো বাড়ি মানুষে ভর্তি।
কোথাও একটু একা বসার জায়গা নেই। বাইরের কেউ এত মানুষ দেখলে মনে করবে আজ এ বাড়িতে বিয়ে।
যদি শোনে এংগেজমেন্টে এত মানুষ তাহলে পাগল ছাড়া অন্যকিছু বলবে না।
আসলে আত্মীয়ের মধ্যে আত্মীয় হলে মানুষ তো এমনিতেই বেশি থাকে।
সবার খুব আনন্দ লাগলেও আমার খুব কষ্ট লাগছে।
এংগেজমেন্ট তো আমার সাথেও হতে পারতো যদি সায়ন ভাইয়া চাইতেন।
ওনি তো কখনো আমাকে ভালোইবাসতে পারলেন না।
ব্যালকিনিতে দাঁড়িয়ে এসবই ভাবছিলাম। মাগরিবের আযান দিয়ে দিছে চারিদিকে।
আমার ফোনটাও বেজে উঠলো হঠাৎ করে। আমাকে আবার কার মনে পড়লো?
মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখলাম স্কিনে ইরাম ভাইয়া লেখা উঠে আছে। ওনি আবার এখন কেন কল দিলেন?
– হ্যালো!
– হুমম মালিহা বলছো?
– জ্বি ভাইয়া বলুন।
– কাল তো সায়নের এংগেজমেন্ট তোমার আপুর সাথে তাই না?
– জ্বি। আপনি কি আসবেন সায়ন ভাইয়ার সাথে?
– হুমম তা আবার বলতে? আমাদের মধ্যে তো সায়ন সবার আগে বিয়ে করে ফেলতেছে। তার এংগেজমেন্টে আসবো না তা কি হয় নাকি?
– অহহ আচ্ছা। ঠিকাছে আসলে দেখা হবে।
– হুমম আচ্ছা রাখছি।
– জ্বি।
ইরাম ভাইয়া এসব বলার জন্য ফোন দিয়েছেন। সত্যি এটা তো আমিও জানি সায়ন ভাইয়ার সাথে আপুর এংগেজমেন্ট। এটা আবার কল করে বলার কি আছে? আর কাল আসলেই তো কথা বলা যেত।
এরজন্য আবার কল করা লাগে নাকি?
ইরাম ভাইয়া কিজন্য এরকম করেন সেটা আমি কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারি।
কিন্তু আমার পক্ষে তো ওনাকে মেনে নেওয়া সম্ভব না।
যেখানে মন – প্রাণ সবটা জুড়ে সায়ন ভাইয়া আছেন সেখানে আদৌ কি ইরাম ভাইয়া ঢুকতে পারবেন?
জানি না কিচ্ছু জানি না। আর জানতেও চাই না।
একটু ছাদে যেতে ইচ্ছে করছে কিন্তু ছাদও আজ খালি নেই।
হঠাৎ এত মানুষ আসায় আমার সবকিছুই বিরক্ত লাগছে।
ড্রয়িংরুমে সবাই হাসি -ঠাট্টা করছে। আমার খুব বিরক্ত লাগছে। আমার এখন সবকিছুই বিরক্ত লাগে।
সব ঐ সায়ন ভাইয়ার জন্য।
এখানে একা একা থাকলেও সবাই অন্যকিছু ভাববে।
বড়বোনের এংগেজমেন্টে তো ছোটবোনই সবচেয়ে বেশি আনন্দ করে তাহলে আমি পারছি না কেন?
না আমার মনের কথা আমার মনেই থাক। আমি সবার সাথে এমনভাবে থাকবো যেন কেউ কিচ্ছু বুঝতে না পারে।
এটা ভেবেই ড্রয়িংরুমে চলে এলাম।
সবার সাথে যখন মজা করছিলাম তখন মনে হলো আমার বুকের উপর থেকে ভারী কিছু নেমে গেছে।
সবার সাথে থাকলে সত্যি মনটা অনেক ফ্রেশ হয়ে যায়।
আমারও এখন অনেকটা হালকা লাগছে।।
ডিনারের পর আমি আমার রুমে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছি।
আর আমার কাজিন পিয়া আপু, জারা আপু আর নুসরাত আপু রীতিমত ঝগড়া করছেন
কে আমার রুমে থাকবে সেটা নিয়ে। অন্য রুমগুলো মোটামুটি ফুল হয়ে গেছে।
তারপরও একটা খাটে তো চারজন থাকা যাবে না।
সেই নিয়েই ঝগড়া। সবাই অবাক হয়েছে কেন তিন জনই আমার রুমে থাকতে চায় সেটা ভেবে।
আমি অবশ্য কারণটা জানি। তিনজনরই বয়ফ্রেন্ড আছে।
হয়তো আজ সারাদিন কথা হয়নি। এখন কথা
বলার মত একটা ঘর তাদের প্রয়োজন যাতে কেউ ডিস্টার্ভ না করে।
আমি যেহেতু ওনাদের থেকে বয়সে এবং ক্লাসে ছোট তাই আমি ওনাদের
এসব কীর্তিকলাপ দেখেও কিছু বলবো না।
আর এই সুযোগটাই ওনারা ব্যবহার করছেন। আমি এতক্ষণ ধরে ওনাদের ঝগড়া দেখলাম।
এবার দাঁড়িয়ে বললাম,
– দেখো আপুরা তোমরা খাটে থাকবে না সোফায় থাকবে সেটা সম্পূর্ণ তোমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নেই। আমি শান্তিমত ঘুমাতে পারলেই হলো।
আমার একথা শোনার পর তিনজনই খুশি হয়ে গেলেন। পিয়া আপু আর জারা আপু ব্যালকনিতে চলে গেলেন। আমি আর নুসরাত আপু শুয়ে রইলাম। নুসরাত আপুর তামিম ভাইয়ার সাথে কোনো বিষয়ে ঝগড়া চলছে সেটা তাদের কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম। কথা বলার একপর্যায়ে তামিম ভাইয়া ফোন কেটে দেয়। নুসরাত আপু আর কল ব্যাক করেননি। ওনি চুপচাপ শুয়ে রইলেন।আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে তাই আমি সাহস করে নুসরাত আপুকে বললাম,
– কিছু মনে না করলে একটা প্রশ্ন করি আপু?
– হুমম কর না। এত অনুমতি নেওয়ার কি আছে?
– তোমার আর তামিম ভাইয়ার কি নিয়ে ঝগড়া চলছে?
নুসরাত আপু এ প্রশ্নে চুপ করে রইলেন। আমার মনে হচ্ছে ওনি কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন। নাকি আমার প্রশ্নটা করা উচিত হয়নি।
– সরি আপু বলতে না চাইলে বলো না।
– আরে না না। সেরকম কিছু না। আসলে আমার একটা ছেলে ফ্রেন্ডকে তামিম একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আমাকে সবসময় বলবে ছেলেটার সাথে যেন আমি কোনো কথা না বলি। এক সপ্তাহ আগে ছেলেটার সাথে একটা বিষয় নিয়ে আমি কথা বলেছিলাম। আর সেটা তামিম দেখেছিল। ব্যাস এটা নিয়েই আজ একসপ্তাহ ধরে ঝগড়া চলছে।
– অহহ।
নুসরাত আপুর ঝগড়ার কারণ শুনে আমার বড় হাসি পাচ্ছে। এটা ঝগড়া করার কোনো বিষয় হলো? সত্যি মানুষগুলো পারেও। এতো ছোটখাটো বিষয়ে নাকি এক সপ্তাহ ধরে ঝগড়া করতে হয়। আমার চিন্তার মাঝখানেই নুসরাত আপু হেসে উঠলেন। আমি অবাক হলাম এতক্ষণ ওনার মন খারাপ ছিল আর এখন ওনি হাসছেন? সত্যি ওনার মনে কি যে চলছে ওনিই জানেন।
– এভাবে হাসছো কেন আপু?
– আসলে তামিম না আমাকে খুব ভালোবাসে তাই এত ঝগড়া করে।
– ভালোবাসার সাথে ঝগড়ার কি সম্পর্ক?
– তামিম আমাকে ভালোবাসে তাই অন্য একটা ছেলের সাথে কথা বললে এত রেগে যায়। আসলে আমাকে হারিয়ে ফেলবে এ ভয়ে কখনো চায় না আমি অন্য কারো সাথে কথা বলি। বেশি ভালোবাসে তো তাই হারানোর ভয়টা বেশি।
আমি আর কিছু বললাম না। চুপ করে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে রইলাম। ভালোবাসলে মানুষ এরকম ভয় পায় যার কারণে মানুষ রেগে যায়। সায়ন ভাইয়া ও তো এরকম বেশ কয়েকবার রেগে গেছিলেন। আমি অন্য কাউকে ভালোবাসি এটা ভেবে। কিন্তু ওনি তো কখনোই আমাকে ভালোবাসেননি তাহলে কেন রেগে গেলেন? শুধু আমি ওনার খালাতো বোন এজন্য?
সকাল থেকে সবাই খুব ব্যস্ত সন্ধ্যায় এংগেজমেন্ট পার্টি।সবকিছু সেই মত রেডি করা হচ্ছে। আমিও সকাল এ কাজ ঐ কাজ করেই যাচ্ছি। কাজই শেষ হচ্ছে না। এংগেজমেন্টে এত কাজ না জানি বিয়েতে কত কাজ করা লাগে। কাজের মধ্যে থাকার কারণে সায়ন ভাইয়াকে আজ হারিয়ে ফেলবো এ কষ্টটা আমার কাছে পৌঁছুতে পারছে না। আমি যখন সবার সাথে কাজ করা নিয়ে ব্যস্ত তখনি সারা পেছন থেকে বলে উঠলো,
– বাহ বাহ মালিহা তুই যে এত স্ট্রং সেটা তো আমি জানতাম না।
সারা কোন কথার ইঙ্গিতে এ কথা বলেছে সেটা আমি জানি। কিন্তু ও যে সবার সামনে এভাবে বলে ফেলবে সেটা আমি জানতাম না। আমি ওর দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করতেই ও বুঝতে পারলো ও ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। এদিকে ওর কথা ভাইয়াও শুনতে পেয়ে এগিয়ে এসেছে।
– মালিহা স্ট্রং মানে সারা তুমি কি বুঝাতে চাইছো।
সারা এবার তোতলাতে তোতলাতে বলল,
– না ভাইয়া মানে মালিহা যে এত কাজ করতে পারে সেটা আমার ডিকশেনারিতেই ছিল না। ওকে তো আমি সবসময় শুয়ে বসে থাকতেই দেখেছি তাই আরকি।
ভাইয়া এবার হো হো করে হেসে বলে উঠলো,
– তাই বলো সারা। কেউ না জানুক আমি তো জানি মালিহা কতটা অকর্মার ঢেঁকি। আর তুমি ওর সাথেই স্ট্রং কথাটা লাগালে। এ কথাটা একদমই মালিহার সাথে যায় না।
আমি এবার চিৎকার করে বলে উঠলাম,
-ভাইয়য়য়য়া
আমার ডাক শুনে ভাইয়ার হাসি উবে গেল। আমি আর ওখানে না থেকে রুমে চলে এলাম। সারাও আমার পেছন পেছন চোরের মত এল। আমি গোছানো জামাগুলো আবার গুছাতে লাগলাম। আসলে সারাকে বুঝাতে চাইছিলাম আমি খুব রেগে আছি। সারা এবার ভয়ে ভয়ে বলে উঠলো,
– সরি দোস্ত মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছিলো। আমি তোকে এভাবে গোল খাওয়াতে চাইনি।
– তোর মুখ কি লুজ হয়ে গেছে? যে কথা ফসকে বেরিয়ে যায়? কতবড় একটা বিপদে পড়তাম তুই জানিস?
– জানি জানি। তাই তো বিষয়টা আমিই সামাল দিলাম।
– হুমম দিছে দেখছি।
– আচ্ছা এসব বাদ দে। তুই কি সত্যিই সায়ন ভাইয়াকে মন থেকে মুছতে পেরেছিস?
– জানি না। না মুছতে পারলেও মুখে একটা মিথ্যে হাসি এনে অভিনয় তো করতে পারবো এটা কম কি?
– তোর জন্য আমার খুব কষ্ট হয় মালিহা। কিন্তু কি করবি বল যার জন্য তুই এত কষ্ট পাস সে কি তোকে নিয়ে একটুও ভাবে?
– বাদ দে এসব। এসব বললে মনটা আরো খারাপ হয়ে যায়।
– আচ্ছা এসব বাদ। চল দুজনে মিলে রুমটা অগোছালো করি তারপর আবার গোছাই এটা হলো এখন আমাদের কাজ বুঝলি।
সারার কথায় আমি হেসে উঠলাম। এত সিরিয়াস কোনো মুহূর্তে সারাই পারে মজা করতে। ও আছে বলেই আমি আজও মনের ভেতর একটা শক্তি পাই।।
বিকেল হয়ে গেছে। আমিও কেমন জানি দূর্বল হয়ে পড়ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সায়ন ভাইয়ারা চলে আসবে। আমি কি পারবো সকাল থেকে নিজেকে যেরকম শক্ত করে রেখেছি সেরকম শক্ত থাকতে? আমার চারপাশে আমার কাজিনরা অনেক মজা করছে, আড্ডা দিচ্ছে। আমি কেন জানি কিছুই করতে পারছি না। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক ধুকপুক করছে। তার সাথে সাথে আমি যেন হার মেনে নিচ্ছি। আমি পারবো না সায়ন ভাইয়াকে ছাড়া থাকতে। একথাটাই বারবার মাথায় ঘুরছে। তখনি আম্মু বলে উঠলো সায়নরা এসে গেছে। আমার হৃৎস্পন্দন যেন এবার আরো দ্রুত চলতে লাগলো। সায়ন ভাইয়াকে দেখলে নিজেকে সামলাতে পারবো তো আমি? চোখ মুখ খিঁচে বসে রইলাম এক জায়গাতেই। কিন্তু ওনাকে দেখার খুব কৌতূহল হচ্ছিলো। তাই সবার মাঝে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দরজার দিকে তাকালাম।
সায়ন ভাইয়া দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকছেন। আজও তিনি নিজেকে কালো রঙে সাজিয়েছেন। বোধহয় ওনি খুব ভালো করেই জানেন ওনাকে কালো রঙে অপূর্ব সুন্দর লাগে। ওনার সাথে সাথে ইরাম ভাইয়া, মহিন ভাইয়া, সিনান ভাইয়াও ভেতরে ঢুকলেন।ওনার মুখে মুচকি হাসি ঝুলে আছে। আমি সেদিকে তাকিয়েই যেন আবার ওনার প্রেমে পড়ে গেলাম। ওনাকে দেখার তৃষ্ণা বোধহয় এ জনমে আমার মিটবে না। ওনার দিকে তাকিয়েই কেমন ভেঙ্গে পরছিলাম আবার। বারবার ভেতর থেকে এভাবে ভেঙ্গে পরলে আমি কি আদৌ পারবো সায়ন ভাইয়ার সামনে নিজেকে সামলাতে? আমার চোখটা ছলছল করে উঠলো। তখনি দেখলাম সারা আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে বুঝাচ্ছে এতক্ষণ ধরে যতটা শক্ত ছিলি মালিহা এখনও নিজেকে তেমনি শক্ত করে সামলা। এভাবে ভেঙ্গে পড়িস না। আমিও মনের সকল কথা তখনি লুকিয়ে ফেললাম। যা কিছু সায়ন ভাইয়াকে দেখে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল সব আবার বাক্সে বন্দি করে ফেললাম।।
এংগেজমেন্ট পার্টির আগে সায়ন ভাইয়াদের থাকার জন্য গেস্ট রুমটা রেডি ছিল। সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু যখনই সায়ন ভাইয়াকে গেস্ট রুমে নিয়ে যাওয়ার কথা উঠলো তখনি আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আগে তো সায়ন ভাইয়া এ বাড়ির ছেলের মতই যেখানে ইচ্ছে নিজে নিজেই যেতেন। আজ কেন ওনাকে নিয়ে যেতে হবে? অবশ্য তার কারণ আছে আগে ওনি এ বাড়ির ছেলে ছিলেন। এখন জামাই হবেন। তাই বোধহয় সবাই এরকম করছে। আম্মু এবার জারা আপুকে বললেন,
– এই জারা তুই সায়নকে নিয়ে যা না।
আপু ভয় পেয়ে বললেন,
– না চাচী আমি কেন? আমি এখানেই ঠিক আছি। এই মালিহা তুই যেহেতু কনের ছোটবোন তুই এ সায়ন ভাইয়াকে নিয়ে যা।
আমি যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই হলো। ওনার সামনে আমাকে যেতেই হবে। ভেবেছিলাম লুকিয়ে থাকবো সেটা আর হলো না। আম্মুও আপুর সাথে তাল মিলাতে লাগলেন। অগত্যা আমাকেই সায়ন ভাইয়া আর তার বন্ধুদেরকে গেস্ট রুমে নিয়ে যেতে হলো। পুরোটা পথ আমি নিচের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। কারো দিকেই তাকাইনি। ওনাদের রুমে পৌঁছে দিয়ে আমি দরজার কাছে চলে আসতেই ইরাম ভাইয়া বলে উঠলেন,
– মালিহা কেমন আছো,?
– জ্বি ভালো আছি আপনি?
– আমিও ভালো আছি। আমার আম্মু আজকে এখানে এসেছে। তোমাকে দেখতে চেয়েছে। তুমি যদি ফ্রী থাকো চলো তোমাকে দেখা করিয়ে দিয়ে আসি।
– হুমম আমি ফ্রী চলুন।
ইরাম ভাইয়া এবার ওনার আম্মুর সামনে আমাকে নিয়ে এলেন। ভদ্রমহিলা এখনো অনেক সুন্দর। ওনাকে দেখে কেউ বলবে না যে ওনার এতবড় একটা ছেলে আছে। ওনাকে দেখলেই বুঝা যায় যৌবনে ওনি অপরুপ সুন্দরের অধিকারী ছিলেন। আমি ওনার দিকে একবার তাকিয়ে বললাম,
– আসসালামুআলাইকুম আন্টি কেমন আছেন?
– এই তো মা ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
– জ্বি ভালো আছি।
– ইরামের মুখে তোমার অনেক কথা শুনেছি তাই চলে এলাম তোমাকে দেখতে।
– অহহ খুব ভালো করেছেন।
আম্মু ওনার পাশেই ছিলেন। ওনি আমার সামনেই আম্মুকে বলতে লাগলেন,
– সত্যি আপা আপনার দুই মেয়েই খুব সুন্দর। কেউ কারো থেকে কম না।মালিহাকে দেখে তো আমার মনটাই জুড়িয়ে গেল।
আমি অনেকের মুখেই শুনেছি আমি সুন্দর। তবে নিজের প্রসংশা এভাবে শুনতে আমার কেমন জানি লাগলো। তাই আমি ওখান থেকে রুমে চলে এলাম। কিছুক্ষণপর পার্টি শুরু হবে।
একটা মেরুন রঙের গাউন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আয়নার সামনে। রেডি হতেও ভালো লাগছে না। কিছুতেই মানতে পারছি না সায়ন ভাইয়া আপুর হাতে আজ রিং পরিয়ে দিবেন। আর আমি সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হজম করবো। এছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। আমি যে বড্ড নিরুপায়। একতরফা ভালোবাসা যে এতটা যন্ত্রনাদায়ক সেটা আমি আগে জানতাম না। কিভাবে মানুষ তার ভালোবাসার মানুষটাকে এভাবে অন্যের সাথে সহ্য করে? আর সেটা যদি হয় নিজের আপন বড় বোন তাহলে মানুষ কি করে থাকে? আমার জানতে খুব ইচ্ছে করছে। আমার খুব পাগল পাগল লাগছে। আমি বোধহয় পাগলই হয়ে যাবো। আমি যখন এসব ভাবছি তখনই কেউ আমার কাঁধে হাত রাখলো। চোখে জমা পানিটা মুছে নিলাম তাড়াতাড়ি। কষ্ট করে মুখে একটু হাসি এনে পেছনের দিকে তাকালাম। দেখলাম আম্মু দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা কালো শাড়ি।
পরের পর্ব গুলো আইডিতে পোস্ট করা আছে। ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দিয়ে পাশে থাকবেন।
– কিছু বলবে আম্মু?
– হুমম বলতেই তো এসেছি। আগে বল আমি এখন যে কথাটা বলব সেটা তুই ঠান্ডা মাথায় ভেবে উত্তর দিবি।
– আগে তো কথাটা বলো।
– দেখ সব মেয়েদেরকেই তো একদিন পরের বাড়ি যেতে হবে তাই না?
– হুমম তো?
– তুই রেগে যাবি না তো?
– নাহ বলো না কি বলতে এসেছো?
– দেখ মারিয়ার আজ না হয় কাল বিয়ে হয়েই যাবে। তোকেও তো বিয়ে দিতে হবে তাই না?
তোকে ইরামের আম্মু দেখে খুব পছন্দ করেছেন।
তাই ওনি চাচ্ছেন তুই যদি রাজি হোস ইরাম আর তোর এংগেজমেন্টটাও আজকেই সেরে ফেলতে।
আমারও মনে হয় ইরামের থেকে ভালো কাউকে তোর জন্য পাবো না।
আমার ছেলেটাকে খুব ভালোই লাগছে।তাছাড়া সায়নের চেয়ে ইরাম কোনোদিক দিয়ে কম না।
আমি এসব বলছি মানে তোর উপর আমি কিছুই চাপিয়ে দিচ্ছি না।
তুই ঠান্ডা মাথায় ভেবে উত্তরটা দে। আমি তোর উপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেবো না।।
আমি আম্মুর কথায় হা করে তাকিয়ে রইলাম।
ইরাম ভাইয়ার মনে যে আমার জন্য কোনো ফিলিংস আছে সেটা আমি জানি।
কিন্তু আমার মনে তো ওনার জন্য কিছুই নেই।
ওনার আম্মু এত তাড়াতাড়ি এরকম একটা ডিসিশন নিয়ে নিলেন।
আমি যদি এখন আম্মুকে না বলি তাহলে আম্মু খুব কষ্ট পাবেন সেটা আমি জানি।
তবে ওনি যে কষ্ট পেয়েছেন সেটা ওনি কখনোই আমাকে বলবেন না।
সত্যিই তো আজ না হয় কাল আমাকেও পরের বাড়ি যেতে হবে।
সায়ন ভাইয়ার সাথে আজ আপুর এংগেজমেন্ট হয়ে গেলে বিয়েটাও একদিন হয়ে যাবে।
আমি কেন শুধু শুধু ওনার জন্য বসে থাকবো।
ওনি তো কখনোই আমার হবেন না।সকলের খুশির জন্য যখন এতকিছু লুকিয়ে গেছি সকলের খুশির জন্যই
ইরাম ভাইয়াকে আমার বিয়ে করতে হবে। অন্তত আমার পরিবারের মানুষগুলোর খুশির জন্য।
আমি আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললাম,
– তোমার যখন এটাই ইচ্ছে আমি আর কি বলবো? আমি রাজি। তুমি ইরাম ভাইয়ার আম্মুকে গিয়ে বলো।
আমার উত্তরে আম্মুর মুখের চিন্তিত, উদ্ধিগ্ন ভাবটা একেবারে চলে গেল। আম্মু খুব খুশি হয়েছেন সেটা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। আমি তো আমার চিন্তা করে এই বিয়েতে মত দেইনি। আমি আমার পরিবারের কথা ভেবেই মত দিয়েছি। সবাই না জানুক আমি তো জানি আমার কতটা জুড়ে সায়ন ভাইয়া আছেন।
– আমি জানতাম তুই আমার কথাটা রাখবি। এই নে এই শাড়িটা পরে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে ড্রয়িংরুমে আয়। আমি গেলাম।
আম্মু চলে যেতেই আমি আবার ঠিক -ভুলের দন্ধে পড়ে গেলাম।
তবে মত যখন দিয়েছি সবার ইচ্ছেমতই সব করবো। তাই আমি শাড়িটা পরে নিলাম।
ব্রাইডাল মেকআপে নিজেকে সাজালাম। এভাবে আগে আমি কখনোই সাজিনি।
আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই ছিনতে পারলাম না। তারপর ড্রয়িংরুমে আসলাম।
সবাই আমার দিকে হা করে করে তাকিয়ে আছে। হয়তো বুঝতে পারছে না কে আসল কনে।
আপু আর সায়ন ভাইয়া একসাথে দাঁড়িয়ে আছে।
সায়ন ভাইয়াও আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে সেটা আমি খেয়াল করেছি।
ওনার সাথে আমার ম্যাচিং হয়ে গেছে। ওনি কালো শার্ট পরেছেন আমি কালো শাড়ি।
তাই সবার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কে আসল কনে আপু নাকি আমি?
আপু আর সায়ন ভাইয়া এখন একে অপরকে রিং পরাবেন।
আমি সায়ন ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। ওনি কেমন যেন চিন্তিত মুখে রিং হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
খালামণি ওনাকে বললেন আপুর আঙুলে রিংটা পরিয়ে দিতে।
ওনি আপুর হাতে রিংটা পরাতে গেলেন। রিং পরাতে গিয়ে ওনার হাতটা কেমন জানি কাঁপছিলো।
কিন্তু কেন? আপুও ওনার হাতে রিং পরিয়ে দিলেন।
.
ওনাদের রিং পরানো শেষ হলে বাবা মাইকটা নিজের হাতে নিয়ে বলতে লাগলেন,
– আজ কিন্তু শুধু আমার বড় মেয়ের এংগেজমেন্ট না। আজ আমার ছোট মেয়ে মালিহারও এংগেজমেন্ট। আর পাত্র হলো ইরাম। এবার ইরাম আর মালিহার এংগেজমেন্ট হবে।
সবাই একসাথে তালি দিয়ে উঠলো। সায়ন ভাইয়া অদ্ভুদ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।
যেন ওনার বিশ্বাসই হচ্ছে না আজ আমারও এংগেজমেন্ট।
আমি সেদিকে আর তাকালাম না। ইরাম ভাইয়ার হাতে রিং পরিয়ে দিলাম।
ওনিও আমার হাতে রিং পরিয়ে দিলেন। এ পুরোটা সময় আমি আর সায়ন ভাইয়ার দিকে তাকালাম না।
আমাদের ও এংগেজমেন্ট হয়ে গেল।।
এংগেজমেন্ট শেষে আমি একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখনি সারা এলো আমার কাছে।
– আমি খুব খুশি হয়েছি মালিহা তুই এই সিদ্বান্তটা নিয়েছিস বলে।
– হুমম।
..
আমি আর কিছু বললাম না। আমার ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু কাউকে বলতে পারছিলাম না।
ডিনারের পর একে একে সবাই চলে গেলেন। শুধু সায়ন ভাইয়ারা থেকে গেলেন।
এত ভারী মেক আপ নিয়ে আমি আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। তাই রুমের দিকে তাড়াতাড়ি যেতে লাগলাম। গেস্ট রুমের সামনে আসতেই কেউ আমাকে টেনে ভেতরে নিয়ে গেল।
আমি ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে রাখলাম।
চোখ খুলে দেখি সায়ন ভাইয়া আমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে আমার দিকে ঝুঁকে তাকিয়ে আছেন।
এভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই বললেন,
– তুই ইরামকে বিয়ে করতে রাজি হলি কেন?
– এটা আমার পারসোনাল ব্যাপার।
ওনি এবার এক হাত দিয়ে দেয়ালে একটা ঘুষি মারলেন। ওনার ব্যথাটা যেন আমি ফিল করছিলাম। কিন্তু মুখে কিছু বললাম না।
– তুই দেখতে পেলি না আমি দেয়ালে ঘুষি মেরেছি তুই কিছু বলছিস না কেন?
– এটা আপনার পারসোনাল ব্যাপার আমি কি বলবো।
ওনি যেন আমার কথাটা শুনে খুব কষ্ট পেলেন। ওনি এর আগে কখনো আমার এতটা কাছে আসেননি।
তবে কি ওনি আমাকে ভালোবেসে ফেলেছেন। আমি আবার বেহায়ার মতই বলে উঠলাম,
– মাত্র এংগেজমেন্ট হয়েছে। বিয়ে তো এখনো হয়নি।
আমাদের হাতে এখনো সময় আছে চলুন না আমরা বিয়ে করে ফেলি।
ওনি আমার দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বললেন,
– পসিবল না।
এটা বলেই ওনি রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমি হ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে রইলাম।
এবারও আমি নিজেকে বেহায়া আর ছেঁচড়া প্রমাণ করলাম।
বারবার ওনার মায়ায় নিজেকে জড়িয়ে ভুল করে ফেলি।
কিন্তু আর না। এবার এটা থেকে আমায় বেরুতেই হবে। আমার সাথে এখন ইরাম ভাইয়ার জীবন জড়িয়ে গেছে। চোখের পানিটা মুছে আমিও নিজের রুমের দিকে এগিয়ে চললাম।।
চলবে,,,