ভালোবাসি তাই । পর্ব -০৯

সায়ন ভাইয়ার সেই শান্ত দৃষ্টি বলে দিচ্ছে সায়ন ভাইয়া খুব চিন্তিত। কিসের জন্য ওনি এত চিন্তা করছেন? ভালোবাসার মানুষের জন্য মানুষ চিন্তা করে ওনি তো কাউকে ভালোবাসেন না তাহলে?
– কিরে কেমন আছিস তুই?
ওনার কথায় চমকে উঠে বললাম,
– ভালো আছি।
– হাতের কাটা জায়গা থেকে আর ব্লিডিং হইছে?
– নাহহ। কেন বলুন তো? আপনি হঠাৎ আমায় নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করছেন কেন?
– এমনি। আচ্ছা আসি।
আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সায়ন ভাইয়া চলে গেলেন। ওনি কি চলে গেলেন নাকি পালিয়ে গেলেন? এভাবে চলে যাওয়ার কারণটা কি? মনে হলো যেন ওনি আমাকে কোনো কিছু লুকিয়ে যাওয়ার জন্য এভাবে চলে গেলেন। আমার সামনে থাকলে যেন ধরা পড়ে যেতেন।।
.
বিকেল হয়ে গেছে। আকাশের লাল রেখাগুলো বলে দিচ্ছে কিছুক্ষণপর সূর্যটাও সমুদ্রের গভীরতায় লুকিয়ে যাবে। চারিদিকে নেমে আসবে অন্ধকার। বিকেল হলে সূর্য যেন বড়ই ক্লান্ত থাকে। সূর্যের তাপ তখন আর গায়ে লাগে না। মনে তখন কেমন জানি সুড়সুড়ি লাগে। সূর্যের এই তাপহীন আলোতে একা একা হাঁটতে খুব ভালো লাগে। সেটা যদি হয় সমুদ্রের তীর তাহলে তো আর কথাই নেই। সূর্যের মৃদু্ আলো, সমুদ্রের ঢেউ আর উথাল -পাতাল বাতাস সবকিছু মিলিয়ে বিকেলটা বড্ড রহস্যময় লাগছে আমার কাছে। আমি এখন একা একাই সমুদ্রের তীর ধরে হাঁটছি। মাঝে মাঝে সমুদ্রের ঢেউ এসে আমার পা ভিজিয়ে দিচ্ছে। আমার এখন খুব ভালো লাগছে। মনে হয় যেন অনেকদিনপর এই অনুভূতি আবার ফিরে এসেছে আমার মাঝে। এতদিন তো এ অনুভূতি আমি খুঁজেই পাইনি। আজ যেন মনের সকল গ্লানি, অভিযোগ, অভিমান, রাগ সব এই বিশাল সমুদ্রে হারিয়ে গেছে। আজ মন বলছে আমি ভালো আছি। আমি ভালো থাকবো।।
.
সারা আমার সাথেই ছিল। আমরা দুজন একসাথে থাকলে বকবক শুরু করবো ফলে বিকেলের এই সৌন্দর্যটা আর উপভোগ করা হবে না। তাই সারা এক পথে গেছে। আর আমি এ পথে এসেছি। দুজন একা একাই হাঁটছি। প্রথমে আমার ভালো না লাগলেও এখন মনে হচ্ছে সারা ঠিকই বলেছে। এই সৌন্দর্য একা একা ছাড়া উপভোগ করা যাবে না। একা আছি বলেই হয়তো এত ভালো লাগছে। আমি সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে একটু এগিয়ে গেলাম। আমার পা দুটো পানিতে ডুবে আছে। আমি দুদিকে হাত প্রসারিত করে প্রাণভরে শ্বাস নিলাম। মনের সকল কষ্ট বের করে দিতে লাগলাম। তখনি মনে হলো কেউ আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি পেছন ফিরতেই দেখলাম ইরাম ভাইয়া পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
– কেমন আছো মালিহা?
– ভালো আপনি?
.
– হুমম ভালোই আছি। একা একা কি করছো এখানে?
– এমনিই হাঁটছি।
ইরাম ভাইয়া কি ভেবে চুপ করে গেলেন। আমি চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম। ইরাম ভাইয়াও আমার পাশে হাঁটতে লাগলেন। কি মনে করে ওনি বলে উঠলেন,
– মালিহা কিছু মনে না করলে আমি কি তোমার হাতটা ধরে হাঁটতে পারি?
ওনার কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। ওনার দিকে তাকাতেই দেখলাম ওনার মুখটা ছোট হয়ে গেছে। হয়তো আমি কি উত্তর দেবো সেটা ভেবে ওনি চিন্তিত হয়ে গেছেন। ওনি ভুল বললেন নাকি ঠিক বললেন এই দ্বন্ধে ওনি ভুগছেন। আমি যদি ওনাকে না বলি তাহলে হয়তো ওনার মুখটা কালো হয়ে যাবে। আর যদি হ্যাঁ বলি হয়তো ওনি খুব খুশি হবেন। হুমম এটা ঠিক সায়ন ভাইয়ার জায়গায় আমি কখনো ওনাকে বসাতে পারবো না। তবে ওনাকে না বলার তো কোনো কারণ নেই। ওনি তো অন্যায় কিছু দাবি করেননি। ওনি তো শুধু হাতটা ধরে হাঁটতেই চেয়েছেন। বেশি কিছু তো চাননি। আমি ওনার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললাম,
– হুমম হাঁটতে পারেন।
.
ওনি আমার উত্তর শুনে খুব খুশি হয়ে গেলেন। আমার হাতটা আলতো করে ধরে ওনি চুপচাপ হাঁটতে লাগলেন। ওনার মুখে তখন বিশ্বজয়ের হাসি। সমুদ্রের ঢেউ এসে আমাদের পা ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমারও খুব ইচ্ছে ছিল এমন গোধূলীলগ্নে সায়ন ভাইয়ার হাত ধরে সমুদ্রের তীরে হাঁটবো। সেই ইচ্ছে ইচ্ছেই রয়ে গেল। হুমম আজ আমি কারো হাত ধরে হাঁটছি তবে এটা তো সায়ন ভাইয়া না। আমি কি কখনোই সায়ন ভাইয়ার হাত ধরে হাঁটতে পারবো না? হয়তো হ্যাঁ নয়তো না।।
.
আজ আমরা দুই দিনের ট্যুর শেষ করে আবার ফিরে যাচ্ছি। আজ আবার আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। জানি না কেন? এখন মন খারাপের কোনো কারণ লাগে না। কারণ ছাড়াই মন খারাপ হয়ে যায়। তাই এখন আর মন খারাপের কারণ খুঁজতে যাই না। সারা আমার মন খারাপ দেখে আজ আমাকে কোনো ঝামেলা ছাড়াই জানালার পাশেই বসতে দিয়েছে। আজ সায়ন ভাইয়ারা অন্য বাসে আমরা অন্য বাসে। আজ সিনিয়ররা সিনিয়রদের সাথে আর জুনিয়ররা জুনিয়রদের সাথে। তাই আজ সায়ন ভাইয়াকে দেখার কোনো উপায় নেই।কিন্তু আমার বেহায়া মনটা বারবার ওনাকেই দেখতে চাচ্ছে । আমি চুপচাপ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি।
– মালিহা তোর কি হয়েছে বল তো? এত চুপচাপ কেন?
– এমনি ভালো লাগছে না।
– হুমম কিছু হলেও তুই বলবি না আমি জানি।
– বেশি বকবক করিস না তো। বেশি বকলে বড়ইয়ের আচার খাওয়াই দিব।
– ছিঃ বড়ই আচার! ওয়াক। আরকিছু পেলি না?
– নাহহ পেলাম না।
.
– আমার বড়ই আচার খাওয়ার ইচ্ছা নাই। তাই চুপ করলাম।
– হুমম। মুখ খুলেছিস তো তোর মুখে বড়ই আচার ঢুকে যাবে।
সারা মুখ বন্ধ করে রাখলো। আমার খুব হাসি আসছে। কিন্তু হাসতে ইচ্ছা করছে না। আসলে একবার বড়ইয়ের আচারের মধ্যে সারা পোকা পেয়েছিল সেই থেকেই এ আচার দেখলেই ওর ওয়াক ওয়াক শুরু হয়ে যায়। আর আমিও ওর এই দূর্বলতাটাই কাজে লাগাই। পুরো পথ আমি সারার সাথে কোনো কথাই বলিনি। বিকেলবেলা রওনা দেওয়ায় অনেকটাই রাত হয়ে গেছে।।
রাত আটটা বাজতেই আমাদের বাসগুলো ভার্সিটিতে ঢুকলো। সবাই সবার অভিবাবকের সাথে চলে গেল। আমি আর সারা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। সারা তার ভাইয়াকে কল দিয়েছে। ওনি এখনো এসে পৌঁছাননি। আমি ভাইয়াকে কল করেছি কিন্তু ভাইয়া কলই ধরলো না। সারা আর আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি তখনি ইরাম ভাইয়া আমাদের দিকে এগিয়ে আসলেন।
.
– একি তোমরা এখনো বাসায় যাওনি?
– না আসলে ভাইয়াকে কল দিচ্ছি কিন্তু ভাইয়া কল ধরছে না। সারার ভাইয়া আসছে ওকে নিতে।
– অহহ। তোমার কোনো সমস্যা না থাকলে চলো মালিহা তোমাকে আমি বাসায় দিয়ে আসি।
আমি কিছু বলতে যাবো তখনি কোথা থেকে সায়ন ভাইয়া উড়ে আসলেন। এসেই আমার হাত ধরে বললেন,
– না না ইরাম তোকে এত কষ্ট করতে হবে না। আমি তো ওর কাজিন। আমিই ওকে বাসায় দিয়ে আসবো।
– তুই? কিন্তু তোদের বাসা তো মালিহাদের বাসার উল্টো দিকে। তোর যেতে সমস্যা হবে না?
– না না কোনো সমস্যা নেই। একদিন -দুইদিন কষ্ট করলে কি হবে? চল মালিহা।
ইরাম ভাইয়াকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সায়ন ভাইয়া আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে এলেন রাস্তায়। একটা রিক্সা দাঁড় করিয়ে আমাকে রিক্সায় উঠিয়ে ওনিও আমার পাশেই বসে পড়লেন। আমি যতই ওনার থেকে দুরত্ব বজায় রেখে বসতে চাচ্ছি ওনি যেন ততই আমার কাছাকাছি বসতে চাচ্ছেন। বারবার আমার শরীর ওনার শরীরের সাথে লেগে যাচ্ছে কিন্তু ওনি একটুও রাগ করছেন না।
.
বরং ওনাকে দেখে মনে হচ্ছে ওনি এটাই চান। আমার হাতটা এখনো ওনার হাতের মুঠোর মধ্যে। যেন ছেড়ে দিলেই আমি হারিয়ে যাবো। আমি ওনার দিকে তাকিয়ে ভাবছি ওনি হঠাৎ এমন অদ্ভুদ ভিহেব করা শুরু করলেন কেন? এখন আমার মনে হয় আমি যত দূরে যেতে চাই ওনি ততই আমার কাছে এসে পড়েন। কিন্তু কারণটা কি? ওনি তো আগে এটাই চাইতেন যেন আমি ওনার থেকে দূরে দূরে থাকি। তাহলে আজ ওনি এত সহজে আমার গা ঘেঁষে বসে আছেন কেন? সব গুলিয়ে যাচ্ছে আমার। জানি না এসব প্রশ্নের উত্তর আমি কখনো পাবো কি না? খেয়াল করলাম ওনার মুখে আজ একটা তৃপ্তির হাসি। সেই হাসিটা আমার কাছে কেন জানি বড়ই রহস্যময় লাগছে? ওনার এভাবে হাসার কারনটা কি আমি কখনো জানতে পারবো?
একসপ্তাহ হয়ে গেছে আমরা ট্যুর থেকে ফিরেছি। সবকিছু আবার আগের মতই চলছে। কিন্তু আমার মনের ভেতরটা কিছুতেই শান্ত হতে চাইছে না।
.
আমি কি সত্যিই পারবো সায়ন ভাইয়াকে আপুর সাথে মেনে নিতে?
এই একটা প্রশ্নের উত্তর আমি কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। আজ আবার একই প্রশ্ন মনের ভেতর ঘুর ঘুর করছে।
আগেও করেছে তবে আজ একটু বেশি।
কারণ কিছুক্ষণ আগেই শুনতে পেলাম সায়ন ভাইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা নাকি আর দু সপ্তাহ পর।
ওনার পরীক্ষার পরই আপু আর ওনার এংগেজমেন্ট।
আমি আর কিছুই করতে পারবো না। আমার ভেতরটা জ্বলন্ত কাঠের মত জ্বলছে।
কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে কিন্তু কাউকে আমি কিছুই বলতে পারছি না।
এটাই কি আমার কপালে লেখা ছিল?
বিধাতার যদি এই ইচ্ছেই ছিল তবে কেন আমার মনে সায়ন
ভাইয়ার জন্য এত ভালেবাসা ওনি সৃষ্টি করেছেন।
সায়ন ভাইয়াকে আমি কখনোই ঘৃণা করতে পারবো না কারণ ওনি ঘৃণা
করার মত কোনো কাজ আজ পর্যন্ত করেন নি। ঘৃণা করেও ওনার থেকে দূরে যাওয়ার উপায় নেই।
কোনোভাবেই আমি ওনাকে নিজের মন থেকে সরাতে পারছি না।
কেন বিধাতা আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছেন?
আমি তো শুধু ভালোবেসেছি। তবে কি ভালোবাসা মানেই কষ্ট পাওয়া? জানি না কিচ্ছু জানি না।
এতকিছু ভাবতে ভাবতে আমি বোধহয় সত্যিই পাগল হয়ে যাবো।
তবে মরার আগ পর্যন্ত আমি বলতে রাজি, আমি আপনাকে ভালোবাসি সায়ন ভাইয়া।
আপনি না বাসলেও আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।।
চলবে,,,,,,