ভালোবাসি তাই । পর্ব -০৭

আমি বিচে দাঁড়িয়ে আছি। সূর্যাস্ত দেখার জন্য অনেকেই ফ্রেশ হয়ে বিচে এসেছে।
আমি আর সারাও এসেছি। আমি চুপচাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছি।
সমুদ্রের বিশালতা দেখে মনটা কেমন হু হু করছে।
আমি যদি সমুদ্রের এই বিশালতায় হারিয়ে যেতে পারতাম তাহলে কতই না ভালো হতো।
সায়ন ভাইয়াকে কখনো বোধহয় আপুর হাজবেন্ড হিসেবে মেনে নিতে পারবো না।
যতই মেনে নেওয়ার চেষ্টা করি না কেন?
যাকে আমি সেই ছোটবেলা থেকে ভালোবেসে এসেছি।
যেই মানুষটাকে নিয়ে এতদিন ধরে সুখের স্বপ্ন সাজিয়েছি।
সেই মানুষটাই আজ আমার বড় বোনের হাজবেন্ড হতে চলেছে।
আমি কি চোখের সামনে ওনাকে আপুর সাথে সহ্য করতে পারবো? জানি না পারবো কি না।
তবে সবার খুশীর জন্য চুপ থাকতে পারবো। আপুর আর ওনার বিয়ে কখনো আমার জন্য আটকাবে না।
আমি ওরকম কিছুই করবো না। যার জন্য ওনাদের বিয়েটা ভেঙ্গে যায়।
কেন সায়ন ভাইয়া কেন আপনি আমার ভালোবাসাটাকে আবেগ ভেবে উড়িয়ে দিলেন?
আপনি আপনার কাজ করেছেন আমি এবার আমার কাজ করবো।
আপনাকে কখনো জ্বালাবো না। আপনার কাছে ভালোবাসার কথাও বলব না।
কারণ বলে তো আর কোনো লাভ নেই।
আপনার মার্ষ্টাস ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার পরই আপুর আর আপনার এংগেজমেন্ট।
আমার আর কিছুই করার নেই। অনেক তো চেষ্টা করেছি আপনাকে আমার ভালোবাসাটা বুঝাতে।
কিন্তু আপনি বুঝলেন না। আমি আর কিছু করবও না।
শুধু শুধু আপনার মায়ায় জড়িয়ে আমি নিজেই কষ্ট পাই।
আপনার তো কখনো কষ্ট হয় না আমাকে নিয়ে। যাক গে এসব আর ভেবে কাজ নেই।
যা হচ্ছে তা হতে দেওয়াই ভালো। ট্যুরে এসেছি আনন্দ করতে আনন্দ করে তবেই ফিরবো।।
সারাকে বিচে কখন থেকে খুঁজছি কোথায় যে আছে কি জানি?
সায়ন ভাইয়ার অন্য বন্ধুরা সমুদ্রে নেমে মজা করছে।
কিন্তু সায়ন ভাইয়াকে কোথাও দেখতে পেলাম না।
ইরাম ভাইয়াও হাঁটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে মজা করছে।
মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। ওনার হাসি দেখে আমার গা জ্বলে যায়।
ওনি ইচ্ছে করে আমার সাথে এরকম করেন।
আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য। সারার ডান – বাম নিয়ে যে লজ্জায় আমি
পড়েছি তার জন্য ইরাম ভাইয়ার দিকে আমি লজ্জায় তাকাতেই পারি না।
এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল কিন্তু ইরাম ভাইয়া এতে কিছুই মনে করেননি।
উল্টো আমার দিকে ওনি ইজিলি তাকাতে পারেন যেটা আমি পারি না।
আমার ওনাকে দেখলেই মাটির নিচে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করে।
কিন্তু ওনি বারবারই আমার সামনে এসে পড়ছেন।
আমি যেখানেই যাই সেখানেই ওনি থাকেন। ওনি ইচ্ছে করেই আমাকে লজ্জায়
ফেলার জন্য এমন করছেন সেটা আমি বুঝতে পারছি।
আমি এবার অন্যদিকে হাঁটা ধরলাম। যাতে ওনার মুখ আর না দেখতে হয়।
হাঁটতে হাঁটতেই চোখ পরলো সায়ন ভাইয়া একটা গাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
তার দৃষ্টি সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে। ওনাকে দেখেই আমি ওনার কাছে গেলাম।
আমি নিঃশব্দে ওনার পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওনার দিকে তাকালাম।
ওনি সমুদ্রের ঢেউ দেখতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে আমাকে খেয়ালই করেন নি।
আমি এবার ওনাকে বললাম,
– আপনি এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
ওনি আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন,
– সেটা তোকে বলতে হবে?
আমি ভেবেছিলাম ওনি আমাকে দেখতে পাননি। কিন্তু এখন দেখছি আমার ধারণা ভুল। ওনি আমাকে এতটাই অপছন্দ করেন যে আমার উপস্থিতি, অনুপস্থিতি ওনাকে একটুও বিচলিত করে না।
– না বলতে হবে না। সবাই ওখানে মজা করছে তাই বলছিলাম আরকি।
– সবার মজা সবাই করছে। আমি এখন কি করবো? তুই হঠাৎ আমার খোঁজ নিতে আসলি যে?
– নাহ বিশেষ কোনো কারণে না। এমনিই আপনাকে ওখানে দেখতে পেলাম না তাই।
আমার এ কথা শুনে ওনি হঠাৎ রেগে গেলেন। আমার দিকে তেড়ে এসে আমার গালদুটো চেপে ধরলেন। ব্যথায় আমার চোখে পানি চলে আসলো। ওনার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। ওনি আমাকে এভাবে ধরে রেখেই বলতে লাগলেন,
– হুমম এখন তো আমাকে তোর বিশেষ কোনো দরকার নেই। কারণ এখন তোর অন্য বিশেষ মানুষ আছে। যে তোর কাছে বেশী ইমফরটেন্ট। তাকেই তো তোর বিশেষ দরকার তাই না?
– মানে কি? এসব কি বলছেন আপনি?
– এখন তো বুঝেও তুই না বুঝার ভান করবি। তুই কি মনে করেছিস আমি কিছুই জানতে পারবো না? তুই কি আমাকে বোকা পেয়েছিস নাকি? আমি তোর ছয় বছরের বড় কি এমনি এমনি নাকি?
– আপনার কথার আগা – গোড়া আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অন্য বিশেষ মানুষ বলতে আপনি ঠিক কাকে বুঝাচ্ছেন?
– শোন তোকে এতকিছু বলতে আমি বাধ্য নই। আমার সামনে থেকে যা তো। আমার এত খোঁজ নেওয়ারও তোর দরকার নেই।
– হুমম জানি। আপনার খোঁজ নেওয়ার জন্য তো আপু আছে। আসলে আমার খোঁজ নেওয়ার তো কেউ নেই তাই আমি বারবার আপনার খোঁজ নিতে চলে আসি। বেহায়া তো তাই।
ওনি এবার আমার গালটা ছেড়ে দিলেন। আমি ওনার দিকে আর তাকালাম না। পেছন ফিরে চলে এলাম ওখান থেকে। চোখে আসা পানিটা মুছে নিলাম। আর যাই হোক আমি ওনার জন্য আর কাঁদবো না।।
হাঁটতে হাঁটতেই সারাকে খুঁজে পেলাম। ও তখন ছোট বাচ্ছাদের মত ঝিনুক কুড়াচ্ছিল।
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।
যেখানে সবাই পানিতে নেমে মজা করছে সেখানে সারা ছোট বাচ্ছাদের মত ঝিনুক কুড়াচ্ছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় সারা এখনো ছোট বাচ্ছাই রয়ে গেল আর বড় হলো না।
তবে ওর ছেলেমানুষি গুলো আমার কাছে খুব ভালো লাগে।
ও একদিন আমাকে বলেছিল সমুদ্রে এসে ওর ভালোবাসার মানুষের সাথে ও ঝিনুক কুড়োবে।
আজ ওর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। তবে ওর ভালোবাসার মানুষটা এখনো ওর কাছে এসে পৌঁছালো না।
আমি গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালাম। আমার পা দেখে সারা আমার দিকে তাকালো ।
আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
– ঝিনুক কুড়াবি আয়?
– নাহ তুই তোর কাজ কর।
– আচ্ছা পরে কুড়াবো। চল দুজনে ঐদিকে হেঁটে আসি।
– হুমম চল।
আমি আর সারা পাশাপাশি হাঁটছি। সারা কেমন গম্ভীর হয়ে আছে। যেন রাজ্যের সব চিন্তা ওর মাথায় ভর করেছে। এতটা মনোযোগ দিয়ে কি ভাবছে কি জানি? এত মনোযোগ যদি ও ফিজিক্স ক্লাসে দিত তাহলে বোধহয় আজ ও ফিজিক্সের সেরা স্টুডেন্ট হতো। দুজনে চুপচাপ হাঁটছি। হঠাৎ করে সারা বলে উঠলো,
-পারবি না। কিছুতেই পারবি না।
আমি ওর কথায় অবাক হয়ে গেলাম। কথা নেই বার্তা নেই। হঠাৎ কি না পারার কথা বলছে ও? আমি বললাম,
– কি না পারার কথা বলছিস তুই?
সারা এবার আমার দিকে অদ্ভুদ চোখে তাকালো। তারপর বলল,
– তুই কিছুতেই সায়ন ভাইয়াকে ছাড়তে পারবি না।
কারণ সায়ন ভাইয়া তোর অভ্যেস হয়ে গেছে।
এখন যতই তুই ওনার থেকে দূরে থাকতে চাস না কেন তুই সেটা পারবি না।
তুই ওনাকে ছাড়তে পারবি না। তুই হঠাৎ এসব বলছিস কেন?
– তুই কি ভাবছিস আমি কিছু দেখিনি। তুই সায়ন ভাইয়ার সামনে গেছিলি না?
ঐ গাছের নিচে কথা বলছিলি আমি দেখেছি। আর তোর গালে এখনো সায়ন ভাইয়ার হাতে ছাপ আছে। তোর গালটা পুরো লাল হয়ে আছে। আমি সব দেখেছি। আমি সব জানি।
আমি চুপ করে সারার দিকে তাকিয়ে আছি। সারা যেন আজ হঠাৎ করেই অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক পরিণত কণ্ঠে কথা বলছে।।
চলবে,,,,