Breaking News

মাকসুদা কে বিয়ে বাড়িতে ফিরলাম

ঘন্টাখানেক আগে আমি মাকসুদা কে বিয়ে করে নিজ বাড়িতে ফিরলাম। তাকে নিয়ে এই মুহুর্তে আমার সাজানো বাসর ঘরে থাকার কথা। কিন্তু আমি আর মাকসুদা জামাই বউয়ের পোশাক পরিধান অবস্থাতেই পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে, সবার চোখে ফাকি দিয়ে,  মাদবর বাড়ির পুকুর ঘাটা পেড়িয়ে, উত্তরের দিকে হেটে চলছি। আমাদের দুজনের গন্তব্য হচ্ছে চুন্নু বেপারীর বাড়ির পুর্ব দিকে যে নদীটি বয়ে গেছে সেখানে যাওয়া। লাল শাড়ি পড়া মাকসুদাকে চাদের আলোয় যেন মায়াবী পরী লাগছে। গায়ের রঙ শ্যাম হলেও মুখেতে নুরের ঝলকানি রয়েছে। দুই হাতে লাল নীল সবুজের নানান চুড়ি। ধানক্ষেতের বাকা আইল দিয়ে যাবার সময় মাকসুদা কয়েকবার পড়ে যাচ্ছিলো  কিন্তু সে খুব যত্ন করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে সাবলীল ভাবেই হেটে গিয়েছে। এক সময় আমরা নদীর পাড়ে এসে পড়লাম। গোলাকার চাদটি যেন নদীর বুকে নেমে এসেছে, আজ আর চাঁদ দেখতে আকাশে ঘাড় বাকিয়ে তাকাতে হবেনা। আমার কাছে আজ দুটি চাঁদ রয়েছে, একটি ভাসমান চাঁদ, যাকে সবাই দেখতে পায়। আর এক মাকসুদা নামক চাঁদ, যে স্ত্রীর রুপে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

মাকসুদার সাথে আমার পরিচয় হয় মাদারীপুর জেলখানাতে।  মাকসুদা মাদারীপুর জেলখানার একজন কন্সটেবল ছিলো। আর আমি একজন মার্ডার কেইসের আসামী। আমি যে মানুষটাকে খুন করেছিলাম। তার নাম জোবায়ের খাঁ। আর সেই খুনের শাস্তিভোগ করেছি পুরো ১৪ বছর।
মাকসুদা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কারো মুখে কোন শব্দ নেই, কেউ কারো সাথে কথা বলছিনা। সে খুব গভীর হয়ে নদীতে কি যেন দেখছে। তাকে বিরক্ত করতে ইচ্ছে হচ্ছেনা। তার মুখখানা চান্দেরবাতিতে দেখতে মোটেও আমার খারাপ লাগছে না। আমি তার পানে তাকিয়ে আমার হাজতে থাকার কথাগুলো ভাবতে লাগলাম। প্রথম যখন আমি আসামী হয়ে হাজতে যাই, তখন আমার বয়স আঠারো-উনিশ হবে। আমার মত আরো শতশত আসামী ছিলো। সবাই কোন না কোন অপরাধ করেই এখানে আসছে। নতুন আসামীদের একটু আধটু কষ্ট দিবেই এই পুরান আসামীগুলো। কখনো খাবার কেড়ে নিবে, কখনো মাথার নিচের বালিশ, আবার কখনো বলবে তাদের মাথা বানিয়ে দিতে। এরা পুরাতন বলে এদের কেউ কিছু ভয়ে বলেনা। তাদের কথা চুপচাপ মেনে নিতো হতো, তানা হলে এরা গায়ে হাত দিতেও একবার ভাববে না।

আমি সব সময় একা বসে থাকতাম, চুপচাপ থাকতাম। আমি যা করিনি তাই আমার নামে জোর করে চাপিয়ে দিয়ে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে দিলো। সবাই যখন আমার থেকে দূরে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো তখনি বুঝি গিয়েছিলাম সামনে কষ্ট আছে, অনেক কষ্ট আছে।

সাতবছর জেলহাজতে আমার তেমন কোন বন্ধু হয়ে উঠেনাই।  যার সাথে প্রানখুলে কথা বলবো। এই সাত বছরের মধ্যে বাবাও কিছু ভালোমন্দ না বলে চলে গেলেন। বাবা চলে যাবার পর যেন আমি আরও নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। কিন্তু জীবন কখন যে মোড় নিবে তা কেউ জানেনা। মাদারীপুর জেলে আসলো  মাকসুদা নামক লেডি কন্সটেবল।  আমি জেলের বিভিন্ন কাজ করতাম, তারজন্য টাকাও পেতাম। একদিন তেমনি এক কাজের জন্য আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জ এ। তখন আমার সাথে মাকসুদা সহ আরও কিছু পুলিশ ছিলো।  গাড়িতে বসে মাকসুদা আমাকে জিজ্ঞেস করলো “জেলে আইছোস কেন? কি করছিলি?” আমি কোন উত্তর দিলাম না, বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাকসুদা এবার ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো “কিরে উত্তর দেস না কেন?” আমি তার দিকে তাকিয়ে শুধু বললাম “খুন করেছি” আমি খুন করেছি শুনেই চমকে উঠলো। আমাকে বাদ দিয়ে পাশের কন্সটেবল কে বলতে লাগলো “খুন করেছে এমন এক আসামী নিয়ে আমরা খোলা ময়দানে কাজ করতে যাচ্ছি, যদি পালিয়ে যায়। কন্সটেবল মৃদু হাসি দিয়ে “ভয় নেই ইকবাল পালাবে না। সাত বছর ধরে তাকে দেখতেছি, আজ পর্যন্ত না কারো সাথে ঝগড়া করেছে, নাইবা কোন কথার খেলাপ কিছু করেছে। সারাদিন কাজ নিয়ে পড়ে থাকে, কথাবার্তাও খুব স্বাভাবিক বলে  কিন্তু এমন ছেলে খুন যে কেন করলো আল্লাহ মাবুদ জানে।” মাকসুদা সালাউদ্দিন ভাইয়ের কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর আমাকে মাকসুদা জিজ্ঞেস করলো “কেন খুন করেছিলি”। গম্ভীর মনোভাব নিয়ে “এমনি করছি” বলে চুপ করে রইলাম। পাশ থেকে সালাউদ্দিন ভাই মাকসুদাকে লক্ষ করে বলে উঠলো “ওহ কাউকে কিছু বলবে না। আমিও অনেকবার জানার চেষ্টা করেছি লাভ হয়নি।” তারপর গাড়িতে আমাকে নিয়ে আর কোন কথা হয়নি।

আমার গোপালগঞ্জ এর কাজ শেষ করতে সপ্তাহ লেগে গেলো। মাকসুদা এর মধ্যে নানান ভাবে জানতে চেয়েছিলো কিন্তু আমি কিছুই বলিনি। জেলে ফিরে এসেও সে তার চেষ্টা থামায়নি। কিন্তু আমার মুখ থেকে একটি কথাও বের করতে পারেনি। তিন বছর ধরে মাকসুদার সাথে আমার টুকিটাকি কথা হয়, কিন্তু আমি কেন খুন করেছি তা বের করতে পারেনি। অবশেষে একদিন বুঝি তার ধৈর্য্যের বাধ ভাংলো। আমি ফুল গাছের তলা থেকে ময়লা পরিষ্কার করছিলাম। মাকসুদা বাগানের সামনে এসে আমাকে নরম কন্ঠেই জিজ্ঞেস করতে লাগলো “ইকবাল তোকে যে আমি এতদিন ধরে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছি তুই আমাকে তোর কথা কেন বলিস না? আমি মুখ না ঘুড়িয়েই বললাম “এমনি” মাকসুদা অনেক ক্ষেপে গেলো আমার কলার ধরে টেনে দাড় করালো। কলার চেপে ধরেই বলতে লাগলো “ভাবিস কি তুই নিজেকে? ভালো করে কথা বলি গায়ে লাগেনা তাইনা? পুলিশের লাঠি পড়লে এমনি বলে দিতি। আমি ঝাটকা মেরে মাকসুদার হাত সরিয়ে দিলাম। দুহাতে ঝাটকা মারতে গিয়ে আমার এক আংগুল তার চোখে লেগে যায়, সে চোখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কর্কশভাবে বলতে লাগলাম “খুন করেছি খুনের শাস্তিভোগ করতেছি তাহলে আপনি কেন বার বার জানতে চাচ্ছেন কেন খুন করেছি” মাকসুদা কিছু বললো না চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আমি তাকে আবার বলতে লাগলাম “চলে যান, আর আমাকে এই কথা জিজ্ঞেস করবেন না”। মাকসুদা কিছুক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে থেকে চলে গেলো, যাবার পুর্ব মুহুর্তে তার চোখের পানি ঝরে পরেছিলো, তা আমার নজর কাটিয়ে যেতে পারেনি। মাকসুদার চোখে পানি দেখে আমার কষ্ট লাগলো। কিন্তু তাকে আটকালাম না। সে চলে গেলো, আমার দৃষ্টিসীমা পেড়িয়ে।

বছর পেড়িয়ে গেলো সেদিনের পর মাকসুদা আমার সাথে কথা বলেনি। তাকে প্রায় দেখতাম। কিন্তু আমার কাছে আসতো না। আসলে জেলে আসার পর থেকে কমবেশি কথা যাই বলছি মাকসুদার সাথেই বলেছি। তার সাথে কথা বলতে খুবই ইচ্ছে করতো। কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো আর সব হয়না। একদিন মনকে আর বেধে রাখতে পারিনি মাকসুদা কে দেখে সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম “মেডাম কেমন আছেন” সে আমার দিকে একবার তাকিয়ে কথা না বলেই চলে যেতে লাগলো। আমি পেছন থেকে আবার বললাম “একটু কথা বললে ক্ষতি কি বেশি হইতো? মাকসুদা কিছুদূর গিয়ে থেমে পড়লো। আমার দিকে ঘুরে বলতে লাগলো “কি কথা বলবি বল” আমি কিছু বললাম না, শুধু তাকিয়ে রইলাম মাকসুদার দিকে। সে আরো কাছে এসে বলতে লাগলো “তোরে আমি বন্ধুর মত দেখতাম তাই তোর সাথে এত কথা বলি, আমার সব সময় মনে হতো, তুই অনেক চাপা স্বভাবের। আসলে তাই সত্যি। কিন্তু তিনবছর তোর সাথে বন্ধুর মত থেকেও তোর বন্ধু হতে পারিনাই। কি আর কথা বলমু তোর সাথে?” আমি শুধু এটুকু বললাম “দেখুন মেডাম আমি এই কথা শুধু আমার প্রিয় মানুষরে বলমু, আপনি আমারে বন্ধু কইতাছেন তাইলে এই কথা ছাড়া অন্য কথা কন। আমি সব বলমু।
— কেমন প্রিয় মানুষ?
০- যে আমার লগে সারাজীবন থাকবো মরার আগ পর্যন্ত পাশে থাকবো। আমি জেল থেকে চলে গেলে তো আপনিও চলে যাবেন তাই বলিনাই।
মাকসুদা “ঠিক আছে বলে চলে গেলো। আমি আর বাধাও দেইনি ডাক ও দেইনি। তারপর থেকে মাকসুদার সাথে আমার অল্পস্বল্প কথা হতো প্রতিদিন। দেখতে দেখতে আমার শাস্তির শেষ দিন এসে গেলো। আমি মুক্তি পেলাম জেল হাজত থেকে।

মায়ের খোকা মায়ের বুকেই ফিরে আসলাম। কিন্তু ১৪ বছরে আমাদের গ্রাম অনেক উন্নতি করে ফেলেছে। সব জায়গায় কারেন্ট আছে, কাচা রাস্তা সব পাকা হয়ে গেছে। মাদ্রাতে নতুন বাজার নামে বড় করে বাজার হয়েছে।  আর আমাদের বাজার এর নাম মাদ্রা পুরাণ বাজার হয়ে গেছে। মাদ্রা উচ্চবিদ্যালয়টি টিনের ঘরের নেই এখন সম্পুর্ন দালান হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিটি জায়গায় জড়িয়ে আছে আমার শৈশব এর স্মৃতি, স্কুল জীবনের স্মৃতি, সুমি, জোবায়ের খা, বাবা মা, সবাই আছে এই স্মৃতির বাক্সতে।

একদিন ভোর বেলা মাকসুদা আমাদের বাড়িতে এলো, কোন পুলিশের পোশাক পড়ে নয়। লাল আর হলুদ রংয়ের মিশ্রনে তৈরি থ্রিপিস পড়েছে।  চোখে হালকা করে কাজল দিয়েছে হাতে রয়েছে কিছু চুড়ি। একদম গ্রামের সাধাসিধে এক কিশোর বালিকা যেন আমার সামনে দাঁড়ানো। আমি যত্রতত্র করে বললাম “মেডাম আপনি এসেছেন, বসুন বসুন” আমাকে মাকসুদা হাত দিয়ে  থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলো, “আমি তোমাকে কিছু কথা বলতে এসেছি” মাকসুদার মুখে আপনি শুনে অবাক হলাম অনেক। তার দিকে তাকিয়ে বললাম “মেডাম আপনি আমাকে আপনি বলতেছেন কেন?”
মাকসুদা বলতে লাগলো, কারন তুমি এখন আর জেলখানার আসামী না। আমার কথা মন দিয়ে শুনো কোন কথা বলিও না।  আমি তোমার জীবনের প্রিয় মানুষ হতে আজ এখানে এসেছি। আমার বাবা মা কেউ নেই, বছর সাত আগে মা চলে গেলেন, তার অনেক আগে বাবা চলে গিয়েছিলেন। চাকুরীটা পাবার পিছনে আরেকটি কারন ছিলো আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তাই চাকুরী পেতে খুব কষ্ট হয়নি। তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগতো, তোমার একাকীত্ব কে ভাগ করে নিতে ভালো লাগতো। কথার মাঝে কখন যে তোমার মায়াতে জড়িয়ে গিয়েছি বলতে পারবোনা। তোমার মুখে যেদিন শুনলাম তুমি তোমার প্রিয় মানুষকেই তোমার সব কথা বলবে সেদিন থেকে যেন তোমার প্রেমডোরে বাধা পরে গিয়েছি। এখন তুমি যা চাইবে তাই হবে।

মাকসুদার কথা শুনে বলার মত কিছু খুজে পেলাম না। এমন সময় একটি পুরুষের কি বলা উচিত তা আমার জানা নেই। তবে মনেতে আনন্দের বাতাস বয়ে যাচ্ছিলো, এমন আনন্দ আমি বিগত ১৪ বছরে একবারো পাইনি। কোন কিছু না বুঝেই চোখ তার জল বের করে দিলো। এই চোখ আরেক আজব প্রানী, সুখেও পানি বের করে দুঃখেও পানি বের করে। আমার চোখে পানি দেখে মাকসুদা আরও কাছে এগিয়ে আসলো, “তুমি কাদছো কেন? আমি চোখে কিছু পড়েছে বলে কাটিয়ে যেতে চাইলেও মাকসুদা কাটাতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে বলতে হয়েছে “সুখের অশ্রু এটা। আজ ১৪ বছর পর সুখের জল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো। এই পানিকে ঝরে যেতে বাধা দিয়েন না।

আমার পরিবারে আমার মা আর ছোটবোন ছাড়া কেউনেই। ছোট বোনের বিয়ে হয়েছে বছর খানেক আগে। মা কে গিয়ে মাকসুদার সব কথা বললাম, মা সেদিন এতই আনন্দিত হয়েছিলো যে শুধু বলেছে “সবাইকে ডাক, বিয়ের দিন ফাইনাল করতে হইবো”

মাকসুদা জীবনের কিছুটা সুখ নিয়ে চলে যাচ্ছিলো যাবার সময় আবার জিজ্ঞেস করলো “এখনো কি বলবে না” আমি মৃদু হাসি নিয়ে বললাম “হ্যা বাসর রাতে বলবো” বাসর রাতের কথা শুনে মাকসুদা লজ্জায় মাথা হারালো  বুকের ওড়না মুখে চেপে মিটি মিটি হাসিতে চলে গেলো। আমিও অপেক্ষা করতে লাগলাম আমাদের বিয়ের দিনের।

মাকসুদা এখনো তাকিয়ে আছে নদীর দিকে, হয়ত আকাশের চাঁদ কি করে নদীর বুকে ভেসে রয়েছে, এর উত্তর খোজার চেষ্টা করছে। আসলে মেয়েরা একটু বেশি লজ্জাবতী হয়ে যায় বিয়ের দিন। সেই লজ্জা ছাড়েনি মাকসুদাকেও। তাই আমিই বলতে লাগলাম “যে কথাটি তুমি জানতে চেয়েছিলে এতটি বছর ধরে। আমি কেন জোবায়ের খাঁ কে খুন করেছিলাম। সেই গল্প টি শুরু হয়েছি যখন আমি নতুন নতুন যৌবনে পা দিয়েছি তখন থেকে।” আমার কথা শুনে মাকসুদা তার ধ্যান নদী থেকে সরিয়ে আমার দিকে নিলো।



বাবা মায়ের বড় আদরের সন্তান ছিলাম আমি। বাবার কলিজার টুকরো, আর মায়ের নয়নের মণি। তারা আমাকে কখনো বিন্দু পরিমান কষ্ট দেয়নি। রোজ সকালে শিউলি ফুল কুড়িয়ে আনা যেমনি ছিলো আমার সখ তেমনি ছিলো আমার নেশা। রোজ ভোরের কিরনের সাথে দৌড়পাল্লায় ছুটে যেতাম চুন্নু বেপারীর বাড়ির দিকে। সেই বাড়ির পুর্বদিকেই নদী থেকে একটু দুরেই ছিলো শিউলি ফুল গাছ। সকালের মৃদু কম্পিত হাওয়া, আর সুর্যের পুর্বদিক থেকে উঠার দৃশ্য দেখেই মুগ্ধ হতাম, আর শিউলি ফুল কুড়াতাম। সেই ফুল বাড়িতে এনে সবাইকে ভাগ ভাগ করে দিতাম, আমার ছোট বোন সেই ফুল দিয়ে কখনো হাতের মালা, কখনো গলার মালা বানাতো।  আর আমি সেই মালা নিয়ে স্কুলে যেতাম। যতক্ষন পর্যন্ত সুমি না আসতো আমি ভেতরে ঢুকতাম না, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম স্কুল গেইটের সামনে। সুমি আসলে তার হাতে শিউলি ফুলের মালা দিয়ে দুজন এক সাথে স্কুলে যেতাম।

সুমির বাড়ি ছিলো, মাদ্রা হাইস্কুল থেকে বের হয়ে পশ্চিমদিকে যে টুইব্বা নামক রাস্তাটি চলে গিয়েছি, সেই রাস্তা দিয়ে ২০-২৫ মিনিট ভেতরে হেটে গেলেই তার বাসা। তার সাথে প্রতিদিন আমার স্কুলেই দেখা হতো। কিন্তু পরিচয়টা অনেক আগে থেকে, মাদ্রা প্রাইমারি স্কুলেও দুজন এক সাথে পড়েছি, আর একই সাথে দুজন মাদ্রা হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। প্রাইমারি তে থাকতে তার সাথে আমার তেমন কথাও হয়নি, সারাদিন রায়হান, আর দেলোয়ার এর সাথে খেলতে খেলতে সময় পেড়িয়ে যেতো।

উচ্চবিদ্যালয় এ আসার পর আমার নজর সুমির দিকে পড়ে। আগের মত মেয়েটা এখন হাফপ্যান্ট পড়ে স্কুলে আসেনা। হাতে কোন ললিপপ ও থাকেনা। নিজের দিকে তাকালাম, আজকাল মাও আমাকে হাফপ্যান্ট পরে কোথাও যেতে দেয়না। রায়হান দেলোয়ার সবাই এখন ফুলপ্যান্ট আর হাতাওয়ালা শার্ট পড়ে। তখন ক্লাস সিক্সে আমি রায়হান কে একদিন বললাম “আরে রায়হান আগে তো প্রাইমারী তে হাফপ্যান্ট পড়ে যেতাম, এখন মা আমাকে ফুলপ্যান্ট ছাড়া স্কুলে আসতে দেয়না কেন রে”।  রায়হান গভীর হয়ে কি যেন ভাবলো, তারপর বললো “স্কুল ছুটি হলে বাবার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে”। আমি একটু উদাসীন হয়ে গেলাম, ভেবেছিলাম, রায়হান আমার উত্তর টা দিতে পারবে। উদাসীন মনোভাব নিয়ে স্কুল গেইটের দিকে তাকিয়ে রইলাম, সুমি আসছে মাথায় লাল ফিতা দিয়ে বেলী বেধেছে। কপালে রয়েছে কালো টিপ, হাতে কয়েকদিন আগেই হয়ত মেহেদি দিয়েছিলো সেই মেহেদির লাল রঙ যেন তাকে আরো অপরুপ করে তুলছে। সুমি যখন আমাদের সামনে দিয়ে হেটে যাচ্ছিলো, আমি সুমিকে ডেকে বললাম “আরে সুমি একটা কথা বলতো?” সুমি নয়ন বাকা করে তাকিয়ে বলতে লাগলো “কি বলমু?”  আমি স্বাভাবিক ভাবে সুমিকে জিজ্ঞেস করলাম “তুই প্রাইমারি স্কুলে হাফপ্যান্ট পইড়া আসতি, এখন হাফপ্যান্ট পড়োস না কেন?”

আমার কথা শুনতেই সুমি যেন রেগে আগুন হয়ে উঠলো, চোখ দুটো বড় বড় করে বললো “তখন ছোট ছিলাম, এখন কি ছোট আছি নাকি। আর মেয়ে মানুষকে এসব কথা জিজ্ঞেস কর‍তে তোর লজ্জা লাগেনা। আর আমাকে এমন কথা বলবি না কখনো” কথাগুলো বলে হনহনিয়ে হেটে গেলো স্কুলের ভেতরে। রায়হান কি মনে করে জানি হুহু করে হেসে উঠলো, তার হাসির কারন না জানলেও মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিলো, মাথার উপর একটা চড় মেরে “ঐ সালা বান্দরের মত হু হা করোস ক্যান”। তারপর পর আরো দুইটা থাপ্পড় মেরে রায়হান এর কথার অপেক্ষা না করে চলে গেলাম ভেতরে।

সারাদিন আমার ভাবতে ভাবতে চলে গেলো। কি এমন জিজ্ঞেস করলাম যে আমার লজ্জা থাকতে হবে। যাইহোক এর ব্যাখ্যা আমার মা দিতে পারবে। স্কুল থেকে সোজা বাসায় এসে মাকে জিজ্ঞেস করলাম তখন মা শুধু একটাই কথা বলেছিলো “তুই এখন বড় হইতেছিস আস্তে আস্তে সব জানতে পারবি” আর কোন কিছু বললোনা। কিন্তু মায়ের কথাতে এটুকু বুঝতে পারছিলাম, সুমি যদি বড় হয় তাহলে আমিও বড় গেছি। আর দিন দিন আমরা আরোও বড় হবো।



ক্লাস নাইনে উঠেছি, এরমধ্যে মাঝেমাঝে সুমির সাথে আমার কথা হতো। কিন্তু আজকাল সুমির সাথে অল্পকথাতে মন ভরেনা। তার সাথে যেন আমার হাজারো কথা রয়েছে যা আমি বলতে পারিনি। কিন্তু এটাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না এই হাজারো কথা কোনগুলো। আমি স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথাগুলো ভাবছিলাম। তখনি আমার নজর পড়লো সুমির উপর। টিন দিয়ে বানানো আমাদের স্কুলের একদম কর্নারে গিয়ে টিনের সাথে হেলান দিয়ে উদাস মনে কি যেন ভেবে যাচ্ছে। আমি সুমির দিকে এগিয়ে গেলাম, তার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম “আরে সুমি কি হইছে তোর, কি ভাবতাছোস?” সুমি আমার দিকে তাকালো, তার চোখদুটো ঝলঝল করছে, আমার দিকে তাকিয়েই রইলো কোনোকথা বললোনা। তার চুপ করে থাকা দেখে আমি আবার বলে উঠলাম “কথা কস না কেন?” সুমি এবার দীর্ঘ এক নিশ্বাস নিয়ে বলতে লাগলো “আমাদের বাড়িতে একটি শিউলি গাছ ছিলো, আমি রোজ ভোরে সেই ফুল টোকাইয়া মালা বানাইতাম। আইজ বাবায় গাছটাকে কেটে ফেলছে উঠান বড় করে ধান শুকানোর জন্য। তাই মনটা ভালোনাই, তুই জানিস ইকবাল, আমার না শিউলিফুল অনেক পছন্দের” তার কথা শুনে আমি খিলখিলিয়ে হেসে উঠলাম। সুমি রাগ হয়ে গেলো, ঝাঁঝালো কন্ঠে বললো, “আমার মন খারাপ আর তুই হাসোস। কোনদিন তোর প্রিয় কিছু হারিয়ে গেলে তখন বুঝবি কেমন লাগে।” কথাগুলো বলে সুমি আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করলোনা। হনহনিয়ে চলে গেলো ক্লাসের ভেতরে।

স্কুল ছুটি হবার পর আমি ভাবতে লাগলাম, প্রিয় জিনিস হারালে কষ্ট লাগবে কেন। আর প্রিয় জিনিস বলতে কি বুঝি। আমি তো মাকে ছাড়া থাকতে পারিনা। মা হারিয়ে গেলে আমার কি হবে তখন তো আমার খারাপ লাগবে, তাহলে প্রিয় জিনিস, মা বাবা, ভাইবোন আত্মীয় স্বজন হয়। অন্য কিছু কি প্রিয় হতে পারে। যেমন আমার হাতের কলম, বই, খাতা, কোন ফল গাছ, কোন ফুল গাছ কি প্রিয় হতে পারে? আমাদের পুকুর কানায় যে ফজলি আম গাছ রয়েছে  আমি তো সারাবছর অপেক্ষা করি সে গাছের আম খাবার জন্য। কাল যদি আমার বাবা আম গাছটি কেটে ফেলে তাহলে কি আমার মন খারাপ হবে। হ্যা মন খারাপ তো হবে, তখন আমি ফজলি আম তো পাবোনা। তাহলে মানুষ তো মরে যায়, বাবা মা সবাই একদিন মরে যাবে। আমি বেচে থাকলে তাদের জন্য তো কষ্ট হবে। তাহলে তো প্রিয় জিনিসকে একদিন না একদিন হারাতেই হবে। আমার তো এখন মনে হচ্ছে প্রিয় জিনিস তৈরি হয় হারিয়ে যাবার জন্য। একদিন স্যার ক্লাসে বলেছিলো, সুখ দুঃখ, হাসিকান্না নিয়েই জীবন।  তাহলে সবকিছু মিলিয়ে যা বুঝতে পারলাম, তা হচ্ছে প্রিয় জিনিস হারানোটা বাধ্যতামূলক,  তানা হলে কষ্ট হবেনা, কষ্ট না হলে কান্না আসবে না। আর দুঃখ জীবনে না আসলে জীবনের পরিপুর্নতা পায়না। কিছু সুখ কিছু দুঃখ মিলিয়ে মানবজীবন। তাইতো সুমিরও কষ্ট হচ্ছে প্রিয় জিনিস হারিয়ে। কিন্তু সুমির কষ্ট দেখে আমার কেন কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা কারো কষ্টে কষ্ট পেলে কি সে প্রিয় মানুষ হয়? হ্যা মনে পড়েছে সেদিন বাবা মাকে গালাগালি করেছিলো, তখন মা কেঁদেছিলো, তখন আমারও খুব খারাপ লেগেছে। আজ সুমির জন্য খারাপ লাগছে,  তাহলে সুমিও আমার প্রিয় মানুষ।

সেদিন সুমির একটি প্রিয় শব্দে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, জীবন চক্রের অনেক জটিল ইতিহাস। প্রিয় মানুষের কষ্টে যখন কষ্ট হয় তখনি সে তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করে। সুমিকে ভালো রাখার সিদ্ধান্ত আমার মন নিয়ে নিলো। সেদিন থেকে শুধুমাত্র সুমিকে ভালো রাখার জন্য রোজ ভোরে চুন্নু বেপারীর বাড়ির ঘাটা থেকে ফুল কুড়িয়ে ,  তা দিয়ে মালা বানিয়ে সুমিকে দিতে লাগলাম। তারপর থেকে সুমি আমার সামনে মন খারাপ করে দাঁড়ায় নি। সর্বদা এক মায়াবী হাসি মুখে রেখেই দিতো, আর এ হাসি শুধুই আমার জন্য। এই হাসির গভীরতা কেউ বুঝবে না আমি ছাড়া।

দেখতে দেখতে আমরা সবাই স্কুলের চৌকাঠ পাড়ি দিয়েছি। সবাই এখন রেজাল্ট এর অপেক্ষায় আছি। রেজাল্ট পেলেই ছুটবে কলেজ জীবনের পথে। কিন্তু আমার ভাবনার সাথে তো আর জীবন চলেনা। জীবনের নিজ এক গতি আছে, নিজ এক নিয়ম আছে তারা নিয়মের বাহিরে যাবেনা, তারা তাদের গতিরোধ করবে না। মানুষের ভাবনা এক সেকেন্ড এর মধ্যে পালটে দিয়ে, যা অকল্পনীয় ছিলো মানুষের ভাবার বাহিরে জীবন তাই করে দিবে। আর মানুষ সেই পরিস্থিতির নাম দেয় ভাগ্য। নয়ত বলে নিয়তির লিখন খণ্ডানো যায়না।



ঋতুকাল গ্রীষ্ম ছিলো। জমিতে চাষ করা ধানগুলো সবে ফুটে উঠতে শুরু করেছে সোনালী রঙ নয়, গাড়ো সবুজরং ধারন করে মাথা উচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে একটি একটি ধানগাছ। আমগাছে নতুন মুকুল ধরেছে।  সবুজরং এর আমগাছ এখন কিছুটা সবুজ কিছুটা হলুদের মিশ্রণে সেজেছে। এই প্রকৃতিরঞ্জন সৌন্দর্য একমাত্র মন থেকে উপভোগ করা যায়। মাঝে মাঝে বর্ষার আবির্ভাব দেখা যায়। প্রায় সময় আকাশ কালো মেঘে ঢেকে থাকে মাঝে মাঝে টুপটাপ বৃষ্টি ঝরিয়ে গ্রাম অঞ্চলের কাচা রাস্তাগুলো কাদাকাদা করে দেয়। সেই কাদার রাস্তায় খালি পায়ে দৌড়ে পুকুর ঢোপাস করে লাফ দেওয়ায় যে শান্তি পেতাম, সে শান্তি যেন পৃথিবীর কোথাও নেই।  সুমির কথা মনে আসলে আমি ফুলের মালা নিয়ে চলে যেতাম টূইব্বা। তাদের বাসায় না গিয়ে তার কাকার বাসায় যেতাম। সুমির কাকার ছেলে আমাদের সাথে পড়ালেখা করে, তার নাম জোবায়ের খাঁ। অবশ্য জুবায়ের সব সময় আমার পাশে ছিলো। এবং সুমির সাথে কথা বলিয়ে দিতে সব সময় আমার আগেই সে ছিলো।

দেখতে দেখতে গ্রীষ্মঋতু চলে গিয়ে বর্ষাকাল শুরু হলো। ইতিমধ্যে আমগাছে আম অনেক বড় হয়ে গেছে। আমাদের রেজাল্ট ও চলে এসেছে ফাস্ট ডিভিশন এ পাস করেছিলাম। সবাই ব্যস্ত হয়ে গেলাম কোন কলেজে ভর্তি হবো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম নাজিমুদ্দিন সরকারী কলেজে ভর্তি হবো। আমাদের বাড়ি থেকে ১০ টাকা রিক্স ভাড়া দিয়ে মাদারীপুর সদরে নাজিমুদ্দিন কলেজ অবস্থিত। একদিন বিকেল বেলা আমি সুমির জন্য মালা নিয়ে জোবায়ের এর বাসায় গেলাম। মালা দেবার পর জোবায়ের আমাকে বললো “ইকবাল আম চুরি করতে যাবি। কাজী বাড়ির আম গাছে ব্যাপক আম ধরছে। তুই সন্ধ্যা পর্যন্ত থেকে যা, আমি তুই আম আনতে যামু।” জোবায়ের এর কথায় আমি রাজী না হলেও, তার জোরাজোরি তে রাজি হতে হলো।

আমরা দুজন সন্ধ্যা বেলা অন্ধকারের রাস্তা দিয়ে কাজী বাড়ির দিকে হেটে যাচ্ছিলাম। জোবায়ের আমের ডাল কাটার জন্য একটি ছুড়ি নিয়েছিলো সাথে। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট যেমন কাদাকাদা হয়েছিলো, তেমনি আকাশে চাঁদ না থাকার কারনে অন্ধকারও অনেক ছিলো। হাতের টর্চ লাইট দিয়েই আমরা কাজী বাড়ির আমগাছ তলাতে গেলাম। আমি গাছে উঠতে পারতাম না বলে জোবায়ের গাছে উঠেছিলো, কিন্তু বৃষ্টি হবার কারনে গাছের ডালপালা সব পিছল হয়ে ছিলো। জোবায়ের যখন গাছে উঠতে যায় ছুড়িটা আমার কাছে দিয়ে যায়।  সে গাছে কিছুদুর উঠার পর পিছলে মাটিতে পড়ে যায়। যার শব্দ কাজী বাড়ির মানুষরা পেয়ে যায়। এবং ঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠে  “কোন জানোয়ার রা আম গাছতলায় আসছে রে।” গালাগালি করতে করতে কাজী বাড়ির লোকজন বের হতে লাগলো। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে জোবায়ের কে ডাক দিলাম। হাতের টর্চ ছিলো বন্ধ, অন্ধকারে কিছু দেখা যায়না।  জোবায়ের ভয় পেয়ে পাগলের মতো ছুটে দৌড় দিলো, আর ধাক্কা লাগলো আমার সাথে, তখন আমার হাতে জোবায়ের এর ছুড়ি ছিলো, যা আমি সোজা তাক করে দাঁড়িয়ে জোবায়ের কে ডাকতেছিলাম। আমার সাথে জোবায়ের এর ধাক্কা লাগতেই জোবায়ের “ও মা গো” বলে সমস্ত বাক শক্তি দিয়ে চিৎকার দিলো। ততক্ষনে কাজী বাড়ির লোকেরা লাইট নিয়ে চলে আসছে আমাদের দিকে লাইট মারতেই আমার নজর পড়লো আমার হাতে। আমার হাতে রক্তের ছোড়াছুড়ি।  জোবায়ের যে ছুড়িটা আমাকে দিয়েছিলো, তা সম্পুর্ন ঢুকে গেছে জোবায়ের এর পেটে। আমি ছুড়ি ছেড়ে দিলাম ভয় পেয়ে। চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম জোবায়ের এর দিকে। মুহুর্তের মধ্যেই জোবায়ের মাটিতে ঢলে পড়লো। কাজী বাড়ির লোকেরা সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করে অন্যান্য বাড়ির মানুষ জড়ো করলো। আমাকে বন্ধি করে দুজন ছুটলো জোবায়ের দেহ নিয়ে হাসপাতালের পথে। কিন্তু জোবায়ের হাসপাতালে যাবার পথেই মারা যায়, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং ছুড়ি পুরো পেট আড়পার করে দিয়েছিলো বলে সে বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি।

তারপর আমাকে সবাই মিলে প্রচুর মারলো, আমার কথা কেউ বিশ্বাস করলো না। এমনি কি সুমিও আমার কথা বিশ্বাস করেনি। সেদিন সুমি আমাকে জুতা দিয়ে পিটিয়েছিলো। আমি একা আমার নিজের সাফাই যতই দিচ্ছি ততই মার খাচ্ছি। তারপর জোবায়েরের বাবা পুলিশ কে ফোন দিয়ে আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়েন। যখন আমাকে আদালত এ নিয়ে গেলো তখন স্বাক্ষী দিলেন পুরো কাজী বাড়ির মানুষ। তারা স্বচক্ষে দেখেছিলো আমি নাকি জুবায়ের এর পেটে ছুড়ি ঢুকিয়েছি।  আদালত তো প্রমাণে বিশ্বাস করে, আর আমার কাছে নিজেকে মুক্ত করার কোন প্রমাণ ছিলোনা। তারপর আদালত এর জজ সাহেব আমাকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে দিলো। সেদিন এর পর থেকে কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করতো, আমি থানায় কেন এসেছি, সবাইকে এক কথাই বললাম “খুন করেছি”। কারন আমি জানি আমি কোন অপরাধ করিনি, অপরাধ না করেও যখন আমাকে শাস্তিভোগ করতে হচ্ছে তখন আর নিজের সাফাই দিয়েই কি লাভ।

জীবনের ১৪ টি বসন্ত মাকসুদা। ১৪ বসন্ত অপরাধ না করেও পার করেছি জেলখানা নামক কারাগার এ। কিন্তু মাকসুদা একটা কথাকি জানো, সুমি আমার অনেক প্রিয় মানুষ ছিলো, তখন হয়ত বুঝিনি ভালোবাসা কি। কিন্তু যখন আমি জেলখানায় একা একা রাত জেগে থাকতাম। আমার চোখের সামনে তার ছবি ভেসে উঠতো, তার দুষ্টামি, তার কথা, তারজন্য মালা নিয়ে যাওয়া, তার অভিমান সবকিছু আমাকে কুড়ে কুড়ে খেতো। কিন্তু তাকে ভালোবাসার কথা কোনদিন বলা হয়নি। কিন্তু আজো আমার মনের এক জায়গায় সুমি নামের মেয়েটির অস্তিত্ব খুজে পাই। ঐ যে বাড়িটি দেখছো ঐটা হচ্ছে চুন্নু বেপারীর বাড়ি। ওখানেই সেই শিউলি গাছখানা ছিলো। আজ গাছও নেই আর আমার শৈশব ও নেই।

কথাগুলো বলে আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মাকসুদা আমাকে আলতো করে জরিয়ে আমার বুকের ভেতর ঢুকে রইলো। দুজনে মিলে আকাশের জ্যোৎস্না উপভোগ করতেছি।  বাম পকেট থেকে শিউলি ফুলের একটি মালা বের করে আমি মাকসুদার সামনে ধরলাম। আমাকে ছেড়ে দিয়ে সে আমার হাতের মালাটি নিয়ে আমাকে বলতে লাগলো “আমার জন্য এনেছো ” আমি মৃদু হাসি নিয়ে বললাম “আমার প্রিয় মানুষের জন্য এনেছি।” মাকসুদা আবেগী হয়ে চোখের জল ছেড়ে দিলো। জ্যোৎস্নার আলোতে তার চোখের পানি ঝিলিক মেরে উঠছে বার বার। আমাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে আমার গালে কপালে চুমু দিতে লাগলো। যদিও আমি এটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না এই মুহুর্তে। কিন্তু তার চুমু পেয়ে একটি কথাই মনে হয়েছিলো “মেয়েরা অল্পতেই সুখ খুজে পায়, কেউ ফুল গাছের মাঝে সুখ পায়, কেউ গানের মাঝে, কেউ গল্পকথার মাঝে সুখ খুজে পায়। আর কেউ প্রিয় মানুষকে কাছে পেয়ে সুখ খুঁজে পায়।

আমি মাকসুদার কপালে একটি চুমু দিয়ে, এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে নদীর কিনারা দিয়ে আবার বাড়ির পথে চলতে লাগলাম। মাঝপথে মাকসুদাকে বলতে লাগলাম, “জীবন কথাতো অনেক হলো, বাসর রাত করা তো বাকি আছে, এবার চলো বাসায় গিয়ে বাসর রাত পালন করি। শত হলেও বাসর রাতটাও জীবনের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ।” মাকসুদা লজ্জা পেয়ে আমার বুকে মাথা গুজে হাতে একটি চিমটি দিয়ে বললো “যাহ দুষ্টু লজ্জা বলতে কি কিছু আছে তোমার” আমি আরেকটু রোমান্টিক হয়ে মাকসুদা কে জরিয়ে ধরে বললাম, “বেশি লজ্জা রাখলে বাসর রাত আর করা হইবো না” কথাটি বলে উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। মাকসুদা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে সামনের দিকে দৌড় দিলো। আমিও তাকে ধরতে ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে দৌড় দিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিলো “মানব সুখ বুঝি এখানেই, প্রিয় মানুষের সাথে খুনসুটি করা”

No comments