Breaking News

ভালবাসার ফুল|| তিতিশ্মা মুসাররাত কুহু

আমি বাবা মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে বর পক্ষের দেয়া শাড়ী,চুড়ি সমস্ত জুয়েলারি গায়ে পরেই বাড়ী থেকে পালিয়েছি আমারই বিয়ের দিন।
বাবা মা তাদের পছন্দ করা পাত্রের সাথে আমাকে বিয়ে দিচ্ছিলো।যেই বিয়ে টা আমার পক্ষে করা একদমই সম্ভব হচ্ছিলোনা।আমি বাস স্ট্যান্ড এর সামনে দাঁড়িয়ে শিশিরের জন্য অপেক্ষা করছি।

শিশির আমার বয়ফ্রেন্ড।ওর সাথে আমার অনেক দিনের সম্পর্ক।শিশির কে আমি খুব ভালবাসি।আমার মনে হয় ওকে পেলে আমার আর দুনিয়ার কাউকে লাগবেনা।
আমি ওকে নিয়েই এ জীবন কাটিয়ে দিতে পারবো।

মা বাবাকে ছেড়েতো এমনিতেও দূরে থাকা লাগবে,
ওকে বিয়ে করি বা অন্য কাউকে।
তাই রিস্ক একটা নিয়েই নিলাম,
যা আছে কপালে যাকে ভালবাসি তাকেই বিয়ে করবো।

শিশিরকে কয়েক বার করে বলেছিলাম আমার বাসায় তোমার পরিবার নিয়ে আসো।এসে আমাদের ব্যাপার টা নিয়ে বলো আমার মা বাবাকে।তাদের বুঝিয়ে বললে হয়তো তারা রাজি হবেন।

শিশিরের একই কথা।আমি না শিক্ষাগত দিক থেকে তোমার যোগ্য।না চাকুরীর দিক থেকে,না পারিবারিক দিক থেকে।

কোন ভাবেই আমি তোমার যোগ্য না।তোমার মা বাবা আমাকে কিছুতেই মানবেন না।
বরং তারা যদি আমাদের সম্পর্কের কথা জানতে পারেন,তবে তোমাকে বিয়ে দিয়ে দিবেন অন্য কোথাও।

-তাহলে আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কি শিশির?
-আমি জানিনা।
-তাহলে কেন আমাকে ভালবেসেছিলে?
-আমার সাথে পালিয়ে যেতে পারবে তুমি?
-কি বলছো তুমি শিশির?
-বলেছি,আমার সাথে তুমি পালিয়ে যেতে পারবে?
-তাতে কি হবে?
-আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নেবো।
-আমি পারবোনা এভাবে আমার মা বাবার মুখে চুনকালি মাখতে।আমাকে ক্ষমা করো।
যদি পারো আমার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব দাও।
আমি তোমার প্রস্তাবের অপেক্ষা করবো।

সেদিন এই বলে চলে এসেছিলাম আমি।

কিন্তু আজ যখন শিশির কে ছেড়ে বউ সেজে অন্যের ঘরে যেতে হবে মনে হচ্ছিলো,তখন যেন আমি পাগল প্রায় হয়ে যাচ্ছিলাম।
বুকের ভেতর অসহ্য ব্যথা অনুভূত হচ্ছিলো।
তাই আর পারলাম না বসে থাকতে,
বেরিয়ে গেলাম বধূর সাজেই শিশিরের হাত ধরে নতুন জীবন শুরু করতে।

শিশিরকে ফোন করে বললাম,আমি বাস স্ট্যান্ডে আসছি,তুমি ওখানেই থেকো।

দাঁড়িয়ে আছি আমি বাস স্ট্যান্ডের সামনে।
আর মনে পড়ছে শিশিরের সাথে ঘটে যাওয়া আমার সব সুখের স্মৃতি।

একদিন আমি আম্মুর সাথে শপিং করতে গিয়েই ওকে প্রথম বারের মত দেখি।

-এই যে ভাইয়া,কয়েকটা নতুন ডিজাইনের ড্রেস দেখান তো।
-ওই শিশির,এই ম্যাডাম কে কয়টা নতুন ডিজাইনের ড্রেস দেখা তো।
-দেখাচ্ছি ভাইয়া।

এই দেখেন,এই গুলো সব নতুন ডিজাইনের ড্রেস।সব গুলাই গত কালই আনা হয়েছে।
সব গুলোই সুন্দর আপনাকে খুব ভালো মানাবে।

-হা হা হা,বিক্রেতারা সব সময় ই এই কথা বলে।
-তা বলে,তবে আপনাকে সত্যিই এই ড্রেস টাতে খুব ভালো লাগবে।

-আম্মু,দেখোতো এটা কেমন।
-হুম ভালোই তো,নিয়ে নে এটাই।
-আচ্ছা এটা প্যাক করে দিন।
-আচ্ছা।

সেদিন শিশিরের পছন্দ করা ড্রেস টাই আমি নেই।
শিশির একটা কাপড়ের দোকানের কর্মচারি।
এই দোকান টাতে ও বসে।

সেদিন শিশিরকে দেখে কেন যেন এক রকম ভালো লাগা কাজ করছিলো।

কিছুদিন পর ফ্রেন্ড দের সাথে আবার যাই শপিং করতে।

সেদিন আমার ফ্রেন্ডরা শিশিরের সাথে অনেক ফাইজলামি করে।
কিন্তু আমি কিছুই বলিনা।চুপচাপ বসে থাকি।
ফ্রেন্ড এর ড্রেস কেনা হলেই আমরা উঠে চলে যাবো,
ঠিক সেই মুহূর্তে শিশির আমাকে একটা ব্যাগ দিয়ে বলে,

-এই ড্রেস টায় আপনাকে দারুণ মানাবে,এটা নিয়ে যান।
-কিন্তু আমি তো কেনার জন্য এত টাকা আনিনি।
-সমস্যা নেই,কাল বা পরশু দিলেও হবে।
-আচ্ছা ঠিকাছে।
-বাহ্ তুই এ কে চিনিস নাকি তিতিশ্মা?
-হুম আম্মুর সাথে এসেছিলাম কয়েক দিন আগে।ড্রেস নিয়ে গেছি।

-আচ্ছা,আমরা তাহলে আসি।
আগামীকাল এসে এটার টাকা দিয়ে যাবো।
-আচ্ছা ঠিক আছে।

বাসায় এসে ব্যাগ টা খুলতেই দেখি ড্রেস টা।
ড্রেস টা খুলতে যাবো আর দেখি এক টুকরো কাগজ,
যেখানে একটা মোবাইল নাম্বার।
আর লিখা,
ফোন দিও।
~শিশির।

যেহেতু ওর জন্য ভালো লাগাটা কাজ করছিলো।
তাই কোন কিছু না ভেবেই ওকে ফোন দিলাম।

-হ্যালো,আসসালামু আলাইকুম।
-ওয়ালাইকুম আসসালাম।
-কে বলছেন?
-জ্বী আমি তিতিশ্মা বলছি।চিনতে পেরেছেন?
ওই যে ড্রেস…
-হ্যাঁ।
তো কি করছেন?
-এইতো ক্লাস শেষ করে এসে ড্রেস টা খুললাম।আর চিরকুট টা পেয়ে আপনাকে ফোন দিলাম।
-আচ্ছা।লাঞ্চ করেছেন?
-জ্বী না,আপনি?
-আমিও করিনি,করবো এখন।
-তাহলে করে নিন।
-আচ্ছা ভালো থাকবেন।
-আপনিও।আর হ্যাঁ কাল তো টাকা টা দিতে আসতে পারবোনা।পরশুদিন এসে ড্রেসের টাকা টা এসে দিয়ে যাবো।
-আচ্ছা ঠিকাছে।
-এখন রাখি।
-আচ্ছা বাই।

তারপর রাতে শিশির আমাকে মেসেজ দেয়।
কি করছি,ডিনার করেছি নাকি।
এই সেই।
আমিও রিপ্লাই করি।
পরের দিনও আমাদের কথা হয়।
তারপরের দিন আমি আর ড্রেসের টাকাটা দিতে যেতে পারিনি।
হঠাৎ আমার জ্বর এসে যায়।আর আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি।৫ দিন পর আমার জ্বর কমে।আর এই ৫ দিন প্রায় সারাদিনই শিশির আমাকে ফোন দিয়ে মেসেজ দিয়ে আমার খবর নিয়েছে।

৬ দিনের দিন কিছুটা সুস্থ হয়ে আমি ড্রেসের টাকাটা দিতে সেই দোকানে যাই।

-এই নিন ড্রেসের টাকা টা।
-দিতে হবেনা।আমি দিয়ে দিয়েছি।
-আপনি দিয়েছেন কেন?আমি না বললাম আমি আজ দিতে আসবো?
-আমি আগেই টাকা টা দিয়ে দিয়েছি।
-তাহলে আগে বললেন না কেন?আমি তাহলে আসতাম না।
আর আমার ড্রেসের টাকা টা আপনিই বা কেন দিবেন?
-ড্রেস টা আমি তোমাকে গিফট করলাম।
-কেন করলেন?
-হয়তো ভালো লাগা থেকে।
-ভালো লাগলে বুঝি ড্রেস দিতে হয়?
-তা জানিনা,তবে আমার মনে হয়েছিলো এই ড্রেস টাতে তোমাকে দারুণ লাগবে।
আর ড্রেস টা তোমার জন্যই তৈরি।
তাই দিয়েছি।
-তাহলে আজ আবার আমাকে শুধু শুধু এখানে আনালেন যে?
-তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো।
-কেন করছিলো?
-ভালবাসি যে।
-কিহ?
-না কিছুনা।
-আবার শুনি?
-জ্বর কমেছে?
-না এটা না।
-তাহলে কোন টা?
-ওই যে,
ভালবাসি যে।
-কিহ?
-না কিছুনা।

সেদিন আমি আর কোন কথা না বলেই বাসায় চলে আসি।
তারপর ও আমাকে ফোন দেয়।
মাঝে মাঝে কথা হয়,
তারপর একটা সময় রেগুলার কথা হতে থাকে।
আর শুরু হয় আমাদের ভালবাসার অধ্যায়।

এসব ভাবতে ভাবতে অপেক্ষা করতে করতে প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে।
শিশিরের আসার কোন খবর নেই।

কিছু ক্ষণ পর শিশিরকে আবার ফোন দিলাম,

রিং বাজছে,বেজেই চলেছে।
কিন্তু ফোন তো কেউ রিসিভ করছেনা।

এদিকে আমি কনে সেজে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।
আর মনে মনে ভাবছি,
আজ শিশির না এলে যে মরণ ছাড়া আমার আর কোন পথই থাকবেনা।
আমি যে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছি।
এ মুখ আমি কাউকে দেখাতে পারবোনা।

চলবে…..

No comments