Breaking News

ভালোবাসার ফুল । পর্ব-০২

মনে মনে ভাবছি,
আজ শিশির না এলে যে মরণ ছাড়া আমার আর কোন পথই থাকবেনা।
আমি যে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে এসেছি।
এ মুখ আমি কাউকে দেখাতে পারবোনা।

শিশির আমার ফোনই রিসিভ করছেনা।
এদিকে অনেক টা সময় হয়ে গেছে আমি দাঁড়িয়ে।
কিছু ক্ষণ পর আবার ট্রাই করতেই দেখি,
নাম্বার বন্ধ।
তাহলে কি শিশির আমার কল দেখে মোবাইল অফ করে দিলো?

না না,এসব আমি কি ভাবছি?
ও কেন আসবেনা?ও তো আমকে খুব ভালবাসে।আসবেনা কেন?
অবশ্যই আসবে।

পৌনে দুই ঘন্টা হয়ে গেছে,শিশিরের কোন খবর নেই।
মোবাইল অফ।
আমি বুঝতে পারলাম,শিশির আর আসবেনা।

কিন্তু আমি কি করবো এখন?

আমিতো বাসায়ও ফিরে যেতে পারবোনা।
তাহলে কি করবো আমি?

আমার যে এখন একটাই পথ খোলা।

আমি বাস স্ট্যান্ড থেকে সরে সোজা রাস্তার মাঝ খানে এসে দাঁড়িয়ে গেলাম।

আর একটা গাড়ী এসে কোন রকম ব্রেক করে আমার পায়ের কাছে থামলো।

-এই মেয়ে তোমার মাথা খারাপ হয়েছে?
দেখে চলতে পারোনা?

কথা টা বলেই গাড়ী থেকে একজন নেমে এলো।

আমি তখনো শিশিরের ধ্যানে।

-তিতিশ্মা?তুমি এখানে?
তুমি এখানে কি করছো?
একা একা কি করছো তুমি এখানে?

-আমি এবার ভালো করে মানুষটার দিকে তাকিয়ে দেখি,
এ যে মিহাদ।

-কথা বলছোনা কেন তিতিশ্মা?
একটু পরেই আমাদের বিয়ে।আর তুমি এখানে কি করছো?

-না মানে আমি।
-চলো,এক্ষুণি চলো,গাড়ীতে উঠো।

মিহাদ আমার হাত ধরে গাড়ীতে তুলে।

-ভাবী,রাস্তায় এসে আমার বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছিলেন নাকি?(মিহাদের বন্ধু)

ওই তিতিশ্মা,
বরকে পেয়ে আমাকে রেখেই চলে যাচ্ছিস?

হঠাৎ ই আমার বান্ধবী প্রিয়া এসে আমাকে ডাকলো।

একটু আগে ওকে আমি একটা টেক্সট করেছিলাম যে আমি বাস স্ট্যান্ডের এখানে আছি।আর সবাইকে ছেড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছি।
তুই আমার বাবা মাকে একটু দেখিস।ভালো থাকিস।

যদিও বান্ধবীরা সবাই আমাকে এত ক্ষণ ফোন দিচ্ছিলো,মা ও দিয়েছে বেশ কয়েক বার।কিন্তু আমি কারো ফোনই রিসিভ করিনি।

হয়তো আমার টেক্সট দেখে প্রিয়া আমাকে খুঁজতে এখানে চলে এসেছে।

প্রিয়া,মিহাদ আর ওর বন্ধুদের বুঝালো ও আর আমি পার্লারে এসেছিলাম।
সাজ শেষে আমি রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি।
ও টাকা পরিশোধ করে আসতে আসতে লেইট হচ্ছিলো।
আর ততক্ষণেই মিহাদের সাথে আমার দেখা।

-আপু আসুন আসুন গাড়ীতে বসুন।

-আপনার আর আপনার বন্ধুর এত দেরি হলো কেন ভাইয়া?

আপনার আত্মীয় স্বজন সবাই তো তিতিশ্মাদের বাসায় পৌছে গেছে।

-আপনি কি করে জানলেন?
-না মানে,আন্টি এখন ফোন করেছিলো।
বল্লো তিতিশ্মাকে নিয়ে তাড়াতাড়ি আয়,বর যাত্রী চলে এসেছে।

– তিতিশ্মাকে যেই গাড়ী করে আনতে যাচ্ছিলাম।সেটা রাস্তায় নষ্ট হয়ে যায়।গাড়ীতে সমস্যা দেখা দেয়।
তাই আমি আর রাহুল পরে রওনা দেই অন্য গাড়ীতে।
আর সবাইকে বলি,আপনারা গিয়ে খাওয়া দাওয়া শুরু করুন হা হা হা।

-ভালোই হয়েছে আর রাস্তায় বউ এর সাথে দেখা।

-হা হা হা হুম।

-আপনাদের এত দেরি কেন?
-আর বলবেন না ভাইয়া,পার্লারের লোক জন বলেছিলো বাসায় এসে সাজিয়ে দিয়ে যাবে।পরে ফোন দিয়ে বল্লো,
আসতে পারবেনা।অনেক কাজ পড়ে গেছে।
তাই ওকে নিয়ে পার্লারে আসতে হলো।

-ওহ আচ্ছা।পার্লারে আনার কি দরকার ছিলো,ও তো এমনিতেই সুন্দর।

-দেখতে হবেনা বান্ধবীটা কার।
-উঁহু,দেখতে হবেনা বউ টা কার।
-হি হি হি।

-ওই তো চলে এসেছি।নামো তিতিশ্মা।

আমি গাড়ী থেকে নামতে পারছিনা।
পা যেন আমার অবস হয়ে আসছে।

প্রিয়া আমার হাত ধরে গাড়ী থেকে নামালো।

নামিয়ে আমার রুমের দিকে নিয়ে গেলো।

-কি করছিলি তুই?জানিস আংকেলের প্রেশার বেড়ে গেছে?তোকে না পেলে হয়তো একটা অঘটন ঘটে যেতো।আমি স্নেহাকে টেক্সট করে বলে দিয়েছি তোকে পেয়েছি,আন্টি আংকেল কে জানাতে।

জানিস,সবাই জিজ্ঞেস করছিলো বউ কই।
পরে আমি আন্টিকে বলতে বলেছি,বলুন সাজার জন্য পার্লারে গেছে।

ভাগ্যিস নিজেরা নিজেরা সাজিয়েছিলাম বলে।কেউ দেখেনি সাজাতে বাসায়।নয়তো আজ তো রক্ষা ছিলোনা।পরে স্নেহা রাহি ওরা এদিক টা সামলিয়েছে।

আর আমি তোকে খুঁজতে বেড়িয়েছি।
কত গুলো কল দিয়েছি আমরা সবাই মিলে দেখেছিস?

আন্টি কিভাবে কাঁদছিলো জানিস?শুধু আংকেলের জন্য নিজেকে শক্ত রেখেছে।
নইলে যে আংকেল আরো চিন্তিত হয়ে কিছু একটা হয়ে যেতে পারে সেই ভয়ে।

কেন করলি এমন?
কেন নিলি এমন পদক্ষেপ?
-শিশিরের জন্য।
-কই?এলো তোর শিশির?

আমি প্রিয়াকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।

-আমি আংকেল আন্টিকে এখানে নিয়ে আসছি।
তুই বস।স্নেহা আর রাহি উনাদের সামলাচ্ছে।
-হুম।

বাবা মা দুজনই আমার রুমে আসলেন।

-কই গিয়েছিলি মা?
দেখ তোর বাবার কি অবস্থা।

বাবাকে সবাই ধরে ধরে আমার রুমে নিয়ে এসেছে।
বাবার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে বাবা কতটা কষ্ট পেয়েছেন।
আর তার কতটা কষ্ট হচ্ছে।

আমি দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।

-আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দাও মা,আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দাও বাবা।
আমার ভুল হয়ে গেছে।

-হয়েছে থাম এবার,যা হবার হয়েছে।
এখন এসব কথা থাক।
বিয়েটা আগে হোক।(প্রিয়া)

বাবা কোন কথাই বলতে পারছেনা।
শুধু চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে।

সবাই ভেবেছে হয়তো তার কলিজার টুকরো মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বলে সে এতটা ভেঙে পড়েছে।

আমি যখন পালিয়ে গিয়েছিলাম,তখন একটা বারের জন্যও আমার মনে হয়নি আমার বাবা মায়ের কি হবে আমি চলে যাবার পর।
অথচ সন্তান হিসেবে আমার প্রথমে এই কথাটাই মাথায় রাখা উচিৎ ছিলো।

নইলে বাবাকে আজ এতটা অসুস্থ হতে হতোনা।
আজ যদি বাবার কিছু হয়ে যেতো তাহলে কি পারতাম আমি নিজেকে ক্ষমা করতে?
কখনোই পারতাম না।
যেই মা বাবা আমাকে জন্ম দিলো,তাদের কথা চিন্তা না করে দুই দিনের পরিচয়ের এক ছেলের জন্য আমি ঘর ছেড়ে পালিয়েছিলাম।
অথচ যারা জন্ম দিলো,এত বড় করলো,আদর যত্ন করে মানুষ করলো।তাদের কথা একটা বারও ভাবলাম না।
আর যার জন্য ঘর ছেড়েছিলাম,সেই কিনা আমাকে ছেড়ে দিলো।

আসলে পৃথিবীতে বাবা মায়ের মত আপন কেউ হয়না।
যে কেউ আমাদের হাত ছেড়ে দিতে পারে মাঝ পথে।কিন্তু বাবা মা তাদের প্রাণ থাকতে আমাদের হাত ছাড়েন না।

এত বড় একটা ভুল করার পরও তারা আমাকে ক্ষমা করে দিলেন।
আর আমি কিনা এত বড় একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলাম।

আমাদের যেকোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বাবা মায়ের সাথে সেটা শেয়ার করা উচিৎ তাহলে কখনোই আমাদের জীবন আশংকায় পড়বেনা।
আজ যদি আমার এই পালিয়ে যাবার কথা জানাজানি হয়ে যেতো তাহলে আমার আর মিহাদের পরিবার কলংকিত হতো।দুটো পরিবারেরই মান সম্মান ধুলোয় মিশে যেতো।

আমার বাবা মা হয়তো সবার কটু কথা সইতে না পেরে মরেই যেতো।
এখনি বাবার যে অবস্থা হয়েছে।

না না আমি আর এসব কিছু ভাবতে পারছিনা।

কেউ একজন রুমে এসে বললেন,
কনের মা বাবাকে সবাই ডাকছে।
বাবা আমার মাথায় হাত রাখলেন।
মা আমাকে বললেন,
মা,এমন কিছু করিস না যাতে আমরা মরার আগেই মরে যাই।

আমি চুপচাপ কাঁদতে লাগলাম।
স্নেহা প্রিয়া আমাকে সান্ত্বনা দিলো।

কিছু ক্ষণ পর আমার আর মিহাদের বিয়েটা হয়ে গেলো।
কেউ কোন কিছু জানতে বা বুঝতে পারেনি বলে বিয়েতে কোন সমস্যাও হলোনা।

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি মিহাদের বাড়ীতে চলে এলাম।

মিহাদের ভাবী আমাকে মিহাদের রুমে এনে বসিয়ে দিয়ে গেছেন।
বসে আছি আমি।
আর হঠাৎ ই আমার ফোন টা বেজে উঠলো।

আমি মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখি My love লিখা নামটা মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠছে।

চলবে…

No comments