Breaking News

ভালো লাগার মত একটা গল্প

আমার ছাদ থেকে বেশ কয়েকটা বিল্ডিং দেখা যায়।
বেশ কয়েকটা বারান্দাও দেখা যায়। জানালাও চোখে পড়ে কিছু কিছু।
আমি আমার বিল্ডিং এর কেয়ারটেকার বা শুদ্ধ বাংলায় দারোয়ানের সপ্তদশবর্ষীয় ছেলে।
বাবা থাকে নিচে আর আমি থাকি ছাদের চিলেকোঠায়। অন্যান্য ফ্ল্যাটগুলোর কথা জানি না,
কিন্তু আমাকে যদি মাসে লাখ টাকা দেয়ার ব্যবস্থাও করা হয়,
তবুও আমি আমার চিলেকোঠার এই ছোট্ট স্বর্গ থেকে নড়ব না।
আমি সারাদিন ছাদেই ঘুরি, এখান থেকে চারিদিকটা যেন একটা সিনেমা হলের মত মনে হয়।
সবদিকে ভিন্ন ভিন্ন মেজাজের সিনেমা চলছে। আমি শুধু দেখি, আর দেখি, আর দেখি।
এইতো সেদিন, উত্তর দিকের বিল্ডিংটার চারতলার জানালায় দেখলাম এক নতুন অতিথির আগমন হয়েছে।
সে খুব ছোট্ট, হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছে মাত্র।
সারাক্ষণ একটা ছোট্ট মশারির ভেতর শুয়ে শুয়ে গুটুর গুটুর চোখে এদিক ওদিক তাকায়।
তার মা সম্ভবত বাইরে কোথাও চাকরি করে। তাই এই নতুন অতিথিকে দেখভাল
করার জন্যেও নতুন চাকর আনা হল। সে বাচ্চাটাকে দেখার চাইতে টেলিভিশন
দেখাটাকেই বেশি সময়োপযোগী কাজ মনে করে। খুব রাতে যখন বাবা মা দুজনেই ঘরে
ঢোকে, আমি আমার ছাদ থেকে দেখি, একপাশে বাবা, একপাশে মা অঘোরে ঘুমায়,
মধ্যিখানে অতন্দ্র প্রহরীর মত সারা রাত জেগে থাকে আমাদের ছোট্ট নতুন অতিথি।
দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের বিল্ডিংটা আমার ছাদ থেকে একটু বেশিই কাছে।
রোজ রাত সাড়ে বারোটার পরে সে বিল্ডিং এর সবচেয়ে উপরের ফ্ল্যাটের
বারান্দা থেকে ভকভক করে গন্ধ আসে তামাকের। আমার বয়সী অনেকগুলো
ছেলের উল্লাসধ্বনি শোনা যায় তখন। আমি তখন ছাদের ওদিকটায় যাই না।
আর মাঝে মাঝে যখন অনেকগুলো পুরুষ কণ্ঠের মাঝে একটা মেয়ের কাতর স্বর শোনা যায়,
আমি তখনও যাই না সেদিকে। আমার ইচ্ছা করে কোন দৈববলে যদি পুরো বারান্দাটা উঠিয়ে কোন
এক সাগরে ফেলে দিয়ে আসতে পারতাম!
পশ্চিম দিকটায় আসলে বিল্ডিং নেই, সেখানে মাকড়শার জালের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারি সারি বস্তি।
সেখানেও হাঙ্গামার শেষ নাই। আমি ছাদ থেকে দেখি, খুব লুকিয়ে লুকিয়ে একদল মানুষ হাঁটে বস্তির ভেতর।
কিছু স্কুলের ছাত্র, কিছু অফিসের কেরানি ঠিকই তাদের খুঁজে বের করে। তারপর কিসের যেন বিনিময় হয়,
স্কুলের ছাত্র বাসায় চলে যায়, কেরানি চলে যায় অফিসে।
সেই লোকগুলো আবার হারিয়ে যায়। কোন কোন দিন মাঝরাতে বস্তি থেকে ভেসে
আসে অপার্থিব চিৎকার আর অশ্রাব্য গালাগালি।
আমি একবার রেলিং দিয়ে উঁকি মেরে দেখেছি, একজন অর্ধনগ্ন মহিলা
গদাসমান একখানা ঝাড়ু নিয়ে সম্ভবত তার স্বামীকে ঝাঁটাপেটা করছে আর গালাগাল দিচ্ছে।
তার স্বামী তীব্র যন্ত্রণায় নিজের দোষ স্বীকার করছে কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না।
সারা দেশে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চললেও আমার ছাদের পাশের বস্তিতে বোধহয় চিত্রটা একটু ভিন্নই!
আবার উত্তরের বিল্ডিংটার ছয়তলার বারান্দায় আমি মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকি।
যদি সেই মেয়েটাকে দেখা যায়! না, ভুল ভাববেন না, মেয়েটা আমার চেয়ে বয়সে বড়।
বাইশ তেইশ বছর হবে হয়তো। তার চোখের নিচে কালি, চুল উসকোখুসকো, ভালো
করে তাকালে হাতে পায়ে লাল লাল ছোপ ছোপ কিসের যেন দাগ।
বাসা থেকে বের হবার আগে মেয়েটা বোরখা না পরে বের হতেই পারে না।
মেয়েটির নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে। সে বারান্দায় এলেই মিনিট পাঁচেক পর
তার স্বামী এসে তাকে ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। খুব রাতে যখন মেয়েটি আবার
বারান্দায় আসে, দেখি তার চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছে। আর হাতে পায়ে গলায় নতুন ক্ষত থেকে ঝরছে রক্ত।
আমার ছাদের পূর্ব দিকে আছে লম্বা অব্যবহৃত এক বাঁধ।
বাঁধের সাথে লাগোয়া অবস্থায় একটা ক্ষীণ খালের মত গেছে।
আশ্চর্যের বিষয়, সেখানে পুরো এলাকার ময়লা ফেলা হলেও খালের পানি যেন টিমটিম করে
সর্বদা বহমান। সেই পানিতে ভেসে আসতে দেখি ছাগলের খুলি, গরুর পায়ের
হাড়, নাড়িভুঁড়ি এসব। আমি জানি, খাল ধরে কিছুদূর এগোলেই একটা কসাইখানা আছে।
সেখান থেকে এসব জঞ্জাল খালের মাধ্যমে যায়। প্রথম প্রথম এসব নাড়িভুঁড়ি
দেখতে ঘেন্না করত। সেই ঘৃণা পরিণত হল বিস্ময়ে, যখন একদিন দেখলাম, একটা
অন্যরকম কিছু ভেসে যাচ্ছে খাল দিয়ে। খুব ভালো করে তাকালাম, দেখলাম,
একটা মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে ভেসে আসছে সেই খালের পানি বেয়ে।
তারপর থেকে আমি রোজ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি, রোজ রোজ তো কসাইখানায় মানুষ কাটে না!
আমার বিল্ডিংয়েও একটা মেয়ে থাকে। পাঠকরা এবার ভুল শুদ্ধ সবই বুঝতে পারেন।
মেয়েটি আমার সমবয়সী। সে নামকরা ইংলিশ স্কুলে যায়। অনেক বেতন দিয়ে পড়ালেখা করে,
অনেক দামি দামি পোশাক তার। এমনকি একদিন ময়লাওয়ালার ছেলেটা আসেনি বলে
আমিই সব ফ্ল্যাটে ময়লা নিতে গিয়েছিলাম, মেয়েটির ফ্ল্যাটের দরজা খুলতেই আমার
যেন ক্ষণিকের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। মেয়েটির হাজারো বন্ধু। সবাই অপেক্ষায়
থাকে কখন মেয়েটি তাদের একটু সময় দেবে। কিন্তু জানি না কী কারণে, মেয়েটি এসে
আমার চিলেকোঠার ঘরে বসে থাকে। আমি না চাইলেও আমার সাথে আবোলতাবোল গল্প করে।
“তুমি কি জানো, আকাশের রঙ আসলে বেগুনি?”
“আমি জেনে কি করব?”
“না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। তোমার কি খেতে ভালো লাগে?”
“সেটা তুমিই বা জেনে কি করবে?”
“এভাবে কথা বলছ কেন? আমি তো মন্দ করে কথা বলি না তোমার সাথে।”
“তোমাকে কতবার বলেছি ছাদে এলে সোজা ছাদে যাবে, আমার ঘরে ঢুকবে না?”
মেয়েটা মুখ টিপে হাসে,
“কেন, এই ঘরটা কি ‘আমাদের’ হতে পারে না?”
আমার বাবা নিষেধ করে দিয়েছে, এরা বড়লোকের মেয়ে, দেখবি তোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে চোর
নয়তো অন্য কিছু বলে ফাঁসিয়ে দেবে। ভুলেও ওদের চক্করে পড়বি না। আমি বাবার
কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করি। মেয়েটাকে বেশি কথা বলতে দেই না, সবসময় বিরক্ত বিরক্ত মুখ করে থাকি।
মেয়েটার যে তাতে একটু মন খারাপ হয় সেটাও জানি। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে, আমি তো দারোয়ানের ছেলে, তাই না?
এভাবে একদিন মেয়েটার বড় ভাই ছাদে এল, এসে মেয়েটাকে আমার ঘরে দেখে ফেলল। কিছুই বলল না সে। আমি ছাদ থেকে দেখেছি, এই ছেলেটাও বস্তিতে যায় সেই অদৃশ্য লোকগুলো থেকে কি যেন কিনতে। সেখানে তার অনেক বন্ধুও আছে দেখেছি। আমি তাই মেয়েটির সাথে কথা বলা একেবারেই বন্ধ করে দিলাম।
তার কিছুদিন পর, কোন এক রাতে আমি যখন ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চারপাশ দেখছি, আমার কাঁধে কার যেন হাত পড়ল। আমি ঘুরে দেখলাম মেয়েটার ভাইয়া। তার চোখ লাল, নেশায় টলছে। ভাইয়া বিড়বিড় করে কি যেন বলল। আমি কিছু কিছু কথা শুনলাম,
“কাল দুপুরে পুলিশের রেড হবে। তারা তো আমার কাছে কিছুই পাবে না। তোর ওই ছোট্ট ঘরটাতেই পাওয়া যাবে জিনিস………”
তারপর আমাকে ছোট্ট করে একটা ধাক্কা দিল। আমিও ছোট্ট করে একটা শব্দ করে কিছু মুহূর্ত পর সোজা বাঁধের শক্ত জমিতে নিজেকে আবিষ্কার করলাম।
তারপর থেকে আমি ছাদেই থাকি। ছাদে দাঁড়িয়ে সব দেখি, সব বোঝার চেষ্টা করি।

No comments