Breaking News

বিয়ে করা বউকে একটাবার “আই লাভ ইউ" বলবো এটাই বলতে পারছিনা

 
বিয়ে করা বউকে একটাবার “আই লাভ ইউ” বলবো এটাই বলতে পারছিনা ৷ অনেক চেষ্টা করছি, পারছিনা কিছুতেই ৷ দুনিয়ার সব কথা তার সাথে শেয়ার করি কিন্তু তিনটা শব্দের এই মধুর বাক্যটিই বলতে পারছিনা ৷ বুকটা ছটফট করে তাকে কথাটি বলার জন্য ৷ দুটা বছর ধরে কথাটি মনের ভেতর চেপে রেখে আছি ৷ চোখের ভাষাতে তাকে বুঝাতে পারলেও মুখের ভাষাতে বোঝানোর সাহস ও ক্ষমতাটা হচ্ছেনা ৷ স্ত্রীকে চোখের ভাষায় বুঝিয়ে কি লাভ ? যদি মুখে বলতে না পারি! বউও হয়তো এটা শোনার জন্য প্রতিটা প্রহর গুনছে! আর আমি তাকে এটা বলতে গিয়ে এক পা এগিয়ে দিই তো দু-পা পিছিয়ে আনি ৷ বউয়ের সাথে সেদিন নিজেদের অতীত নিয়ে কথা বলছিলাম ৷ এতে আমার অতীত তাকে খুলে বললাম, আমার অতীতে একটা মেয়ে ছিল এটা বলে দিলাম অকপটে ৷ সে এরজন্য কষ্টই পেয়েছিল যা তার মুখের ফ্যাকাসে ভাব দেখে বুঝতে পেরেছিলাম ৷ কিন্তু বউয়ের লাইফে কেউ ছিলনা ৷ এমনকি তার সহজ সরল কথা– স্বামী বাদে তার জীবনে আর কেউ আসবেওনা ৷ স্বামীকে প্রেমিকের দৃষ্টিতেই ভালবেসে যাবে ৷ কথাটি শুনে ভেতরটা খুশিতে নাচতেছিল!
.
বউয়ের মন জয় করতে সবকিছুই করছি ৷ এই যেমনঃ ২ মাস পর নতুন শাড়ি কিনে দেওয়া, প্রতি সপ্তাহে ঘুরতে যাওয়া, শপিং করা একসাথে, বউয়ের কাজে সাহায্য করা, তার কথামত সঠিক সময়ে অফিস থেকে ফেরা, বউয়ের মাথার চুল বেঁধে দেওয়া ৷ যতকিছু রয়েছে বউকে পটিয়ে ফেলার ট্রিকস সবই করছি শুধু “আই লাভ ইউ” কথাটি বলার মত সাহস হচ্ছেনা!
.
শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বউয়ের সাথে ঝগড়া করেছি, রাগে বউয়ের গালে দুটা থাপ্পরও মেরেছিলাম ৷ প্রতিবাদে সে শুধু বলেছিল কাজটা ভাল করলেন না ৷ তারপরই হাউমাউ করে কান্না করতে করতে অন্যরুমে চলে যায়!
.
জুম’আর নামাজ পড়ে এসে বউয়ের প্রতি রাগ বিলিন হয়ে গেল ৷ মনে হল আমিই ভুল করেছি ৷ তাকে সরি বলতে গেলাম রুমে, পেলাম না ৷ গেলাম কিচেনে ৷ সে দেখি এখনো কান্না করছে ৷ কান্নায় চোখ দুটো ফুলিয়ে ফেলছে ৷ বউয়ের পাশে বসলাম ,সে আমার পাশ থেকে সরে বসলো ৷ হাত দিলাম তার গায়ে, সে আমার হাত সরিয়ে দিতে থাকে ৷ একটু জোর করে তার মুখটা ধরে দেখলাম বউ কেঁদে চোখ লাল করে ফেলছে ৷ মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম “আমি খুব কষ্ট দিছি তোমায় ?” “সরি” মাফ করো লক্ষ্মী বউ আমার! সে আমার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল ৷ বুঝলাম বউ আজ ব্যাপক রাগ করছে আমার উপর ৷ তার অভিমান কখন ভাঙবে কে জানে?
.
সন্ধ্যায় ঝুম বৃষ্টি নামলো ৷ একদম আকাশ জুড়ে কালো মেঘ ,মনে হচ্ছিল দু-দিনের মধ্যে বৃষ্টি থামবেনা ৷ বৃষ্টি হচ্ছে জন্য বউ খিঁচুরি রান্না করতে লাগলো ৷ ভাবলাম তার রাগ মিটে গেছে আমার ওপর থেকে! নাহলে রান্না করায় মন দিবে কেন ?
.
বউয়ের মতগতি লক্ষ্য করতে গেলাম কিচেন রুমে ৷ তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম ৷ মনে হলো সে মিটমিট করে হাসছে তার পিছে দাঁড়িয়ে আছি বলে ৷ কিন্তু যেই তার মুখের দিকে দৃষ্টি দিলাম মনে হলো সে এখনো আকাশ ভরা অভিমান নিয়ে আছে ৷ কিছুই বললাম না, চুপ করে থেকে তার রান্না করা দেখতে লাগলাম ৷ রান্নার প্রয়োজনে বউ নড়ছিল এদিক ওদিক, যেকারণে তার গায়ের সাথে আমার দেহের ছোঁয়া লাগছিল ৷ কিছুক্ষণ নিরব থেকে বউকে বললাম,
___খিঁচুরি রান্না শেষ হলে দুজনে ভিজবো একসাথে, এরপর ভেজা শরীরে একত্রে খিঁজুরি মজা করে খাবো ৷ কি বলো?
.
বউ চুপ করে আছে ৷
আবারো একই কথা রিপিট করলে সে শুধু দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলল আর আমার দিকে কেমন এক অভিমানী ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলো ৷ বউয়ের গালে এখনো থাপ্পরের দাগটা আছেই ৷ সেখানে হাত বুলিয়ে দিলাম আর বললাম,
___ইশ! কত নিষ্ঠুর আমি ৷ বউটাকে কিভাবে মেরেছি, ফর্সা গালটা কেমন হয়ে গেছে দাগ পড়ে!
বউ বলে উঠলো,
___হয়েছে, এতো দরদ দেখাতে হবেনা আপনার ৷ সরেন একটু ,রান্না করতে দেন!
.
বউকে আলতো করে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম ,আর বললাম,
___তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করো, তোমার জন্য অপেক্ষা করছি বেলকনিতে!
বউ চুপ থাকলো তবে মাথা নাড়িয়ে বুঝালো হুম, আসছি!
.
বৃষ্টি আরো ঝড়ের গতিতে ঝুমঝুম করে নামছিল, অবিরাম বৃষ্টিধারা ৷ বড় বড় বৃষ্টির ফোটা পড়ে পাশের টিনের চালের ঘরে টনটন শব্দ হচ্ছিল! মধুর এই মুহূর্তে বউকে খুব করে কাছে পেতে মন চাচ্ছিল ৷ তার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজবো আর সেই মধুর তিনটা শব্দ বলে দিবো! বৃষ্টির দিনকেই আমি সঠিক সময় মনে করি!
.
হঠাৎ, বউ পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ৷ বুঝতে পারলাম আমার প্রতি তার মনে সমস্ত রাগ, অভিমান শেষ! এত লক্ষ্মী একটা বউ পেয়েছি আমি? সকাল থেকে ঝগড়া করলাম তার গায়ে হাতও তুললাম এরপরও সে বেশিক্ষণ আমার ওপর অভিমান করে থাকতে পারলোনা!
বাহ কি চমৎকার বউ আমার.
.
নিশি আমাকে জড়িয়ে ধরেই আছে ৷ সে বলল,
____আপনি, এত নিষ্ঠুর কেন বলেন তো? বউকে কেউ এভাবে মারে ? আর মারবেন না,নাহলে কিন্তু রাগ করে অনেক দূর চলে যাবো.
.
বউকে আর কিছু বলতে দিলাম না ৷ আমার বাহুতে জড়িয়ে নিয়ে হেঁটে চললাম ছাদে গিয়ে ভেজার উদ্দেশ্যে ৷ হালকা বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল ৷ একারণে বউটা ছাদে যেতে ভয় করছিল ৷ শক্ত করে আমাকে ধরে আছে সে ৷ আর বলছে,
____আজ, না ভিজলে হয়না? বাজ পড়া দেখে ভয় লাগে জানেনই তো?
____আমি আছি তো ,ভয় করোনা ৷ আজকের এমন বৃষ্টির দিনে তোমাকে না নিয়ে ভিজলে ফিলিংসটাই নষ্ট হয়ে যাবে!
.
বউকে বাহু থেকে নামিয়ে ফের বললাম,
____তুমি বৃষ্টি পতনের রিমঝিম ছন্দের তালতালে নাচবে আর আমি মুগ্ধ হয়ে দেখবো!
____ছিঃ কি যে বলেন না, আমার তো লজ্জা করবে!
____স্বামীর সামনে কিসের লজ্জা, হুম ? কেউ তো নেই; শুধু তুমি আমি!
____তবুও!
____লজ্জা করলেও নাচতে হবে, আমি তোমার লজ্জা ভাঙ্গাবো ৷
.
বউ নাচতেছিল, সুন্দর করে রবীন্দ্র সংগীতের গানের তালে তালে যেসব নৃত্যশিল্পীরা নাচে সেভাবে চমৎকার ভাবে নাচছিল ৷ আমি তার নাচে মুগ্ধ, বিমুগ্ধ নয়নে মন্ত্রমুগ্ধের মত অপলকে দেখছিলাম তাকে ৷ বৃষ্টিতে বউয়ের শাড়িটা ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে ছিল ৷ এমনিতেই সে অপরুপা ,তার ওপর ভেজা শরীরে তাকে লাস্যময়ী সুন্দরী মনে হচ্ছিল! বউয়ের দিকে অপলকে তাকিয়ে আছি , নাচ উপভোগ করছি আর মুগ্ধ হচ্ছি ৷ ভাবছিলাম এখনি তাকে জড়িয়ে ধরে মনের কথাটা বলবো ৷ কিন্তু এবারও সাহস হারিয়ে গেল ৷ আমি বুঝিনা কেন বউকে এই কথাটা বলতে আমি এলোমেলো হয়ে যাই, সাহস হারিয়ে ফেলি?
.
বউয়ের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে মিটমিট করে মিষ্টি হাসছিল! ভুবন ভুলানো হাসি ভেতরটাতে ভাললাগার পরশ বুলিয়ে দিয়ে গেল! এমন একজনকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে সত্যিই আমি ধন্য!
.
বৃষ্টিতে ভেজা শেষ হলে বউ দুটা প্লেটে খিঁচুরি নিয়ে এলো ৷ গরম ধোঁয়া ওঠা খিঁচুরির স্বাদে মুগ্ধকর গন্ধ উড়ছিল!
বউ লম্বা কালো রেশমী চুল ছেড়ে দিয়ে ভেজা শরীরে প্রেমময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে খিঁচুরি খাচ্ছিল ৷ হঠাৎ, সে আমাকে খাইয়ে দিতে হা করতে বললো, বউয়ের হাত দিয়ে তুলে দেওয়া খিঁচুরি খাচ্ছিলাম ৷ তাকেও তুলে খাওয়ালাম!
খুশিতে বউয়ের চোখে অশ্রুজল ৷ সে কাঁদছিল ৷ খুশির কান্না ৷ নিশি বলল,
____তোমার ভালবাসা পেয়ে যদি সারাজীবন বাঁচতে পারতাম?
___তুমি সারাজীবন আমারই থাকবে আমারই ভালবাসা পাবে!
বউকে দেখতে দেখতে আর তার ভালবাসায় নিজেকে হারিয়ে ফেলে সেই মধুর তিনটা শব্দ তাকে বলতেই ভুলে গেলাম!
আর বলা হলোনা.
.
রাত তখন ১০টা ৷ আমার গা-টা ভারভার লাগছিল ৷ ব্যাথা অনুভব হলো ৷ ধীরে ধীরে শরীরটা গরম হয়ে যাচ্ছিল, ম্যাজম্যাজও করছিল শরীরটা ৷ ভাবলাম জ্বর হলো কিনা ৷ নিশি আমার কপালে চুমু দিয়ে প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ে ৷ আজ সে চুমু দিতে গিয়ে চমকে উঠলো ৷ আৎকে উঠে বলল,
____আপনার গায়ে তো অনেক জ্বর, আগে বলবেন না ?
____সত্যিই কি জ্বর?
____হুম, বৃষ্টিতে ভিজে সর্বনাশটা হলো ৷ বাসায় তো ঔষুধও নেই ৷ কি যে করি?
.
বউটা এত অল্পসময়ের মধ্যে অস্থির হয়ে গেল আমার জ্বর বলে! ছটফট করা শুরু করলো সে ৷ রুমের ড্রয়ারে জ্বরের ট্যাবলেট খুঁজলো, পেলনা ৷ উপায় না পেয়ে বালতি ভর্তি পানি এনে মগ দিয়ে মাথায় পানি ঢালতে লাগলো ৷ বউয়ের এত যত্ন আগে থেকেই ছিল ৷ তার মত স্ত্রী পেয়ে সত্যিই ধন্য ৷ জ্বর তবুও কমছিলনা ৷ এরপর জলপট্টি দিলো ৷ রাত ১১টা পর্যন্ত এসবই চলছিল ৷ জ্বরের মাত্রা কমলোনা ৷ আমার খুব বেশি শীতে লাগছিল ৷ সে আমার কাথার ভেতর ঢুকে শক্ত করে জড়িয়ে শুয়ে রইলো ৷ আর সারারাত সে আমার মাথা বুলাতে বুলাতে ঘুম চলে আসলো ৷ সকালে ঘুম থেকে জেগে দেখি সে এখনো মাথায় হাত বুলিয়েই দিচ্ছে ৷ বুঝলাম সে একটাবারও ঘুমায়নি!
জ্বর অনেকটা কমেছে মনে হলো ৷ বউকে ধীরস্বরে বললাম,
____নিশি, তুমি কি ঘুমাওনি ?
____ঘুমিয়েছিলাম কিছুক্ষণ কিন্তু জেগে উঠছি তোমার জন্য ৷ তুমি কি একটু ভাল অনুভব করছো ?
.
বউ এই প্রথমবার আমাকে তুমি করে বললো ৷ শুনতে খুব ভাললাগছিল ৷ মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল!
বউকে বললাম,
___আজ আমি খুব খুশি তুমি আমাকে তুমি করে ডাকলে!
.
বউ এটা শুনে লজ্জা পেলে এবং নিজেকে সামলে নিয়ে আমার কপালে হাত দিয়ে বললো,
____জ্বর অনেকটা কমেছে!
____থ্যাংকস তোমাকে সোনা বউটা!
.
এভাবেই চলছিল ৷ বিয়ের তিন বছর চলে গেল ৷ কিন্তু আমাদের সন্তান হচ্ছিল না ৷ ডাক্তার দেখিয়ে আমাদের দুজনের কারোই সমস্যা পাইনি ৷ কেন যে নিশির পেটে বাচ্চা হচ্ছেনা আল্লাহ ভাল জানেন!
.
বাসা ভাড়া নিয়ে ২টি রুমে বাস করছি ২ বছরের বেশি হয়ে গেল ৷ বউকে পাশের রুমের ভাবিরা সন্তান কেন হয়না, কার সমস্যা এসব বলে অতিষ্ট করে তুলছিল ৷ বউ সবকিছুই আমাকে শেয়ার করতো ৷ টিকতে পারলাম না ৷ বাধ্য হয়ে গ্রামে গেলাম ৷ সেখানে গিয়েও শান্তি নেই ৷ বউকে নানান কথা শুনতে হয় ৷ পাড়ার ভাবি, চাচিরা নিশিকে নিয়ে যা তা বলতে থাকে ৷ আম্মা সেসব সহ্য করতে না পেরে নিশিকে অনেক কথা শুনিয়ে দেয় ৷ আমি নিশিকে ধৈর্য্য ধরতে বলি!
.
আরো ১বছর কেটে গেল ৷ আম্মা সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিশিকে আমার থেকে ছাড়িয়ে নিবে ৷ বাধ্য হয়ে ফের শহরে চলে এলাম ৷ এখানে এসে আরো অকথ্য কথা শুনতে হয় আমাকে ৷ বন্ধু মহলে আড্ডা দিতে গেলেই বলে নানারকম কুশ্রী কথাবার্তা!
.
বউয়ের প্রতি আমারও দিনদিন বিরক্তি চলে আসছিল ৷ কিন্তু দিনদিন সে আমার প্রতি আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল এবং আগের চেয়ে বেশি ভালবাসতে শুরু করলো!
বউয়ের প্রতি মায়া হলেও লোকের নানা কথা আমাকে তার প্রতি বিদ্ধেষ মনোভাবাপন্ন করতে বাধ্য করছিল!
.
বিষন্ন মন ও তার প্রতি অনীহা টের পেয়ে গেছিল নিশি ৷ তাই, হঠাৎ একদিন সে বলে,
____আপনি একটা বিয়ে করে ফেলেন ৷
.
তার এমন কথা শুনে মনে হলো আকাশ ফেটে আমার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ছে ৷ বউয়ের প্রতি রাগ হলো খুব ৷ তার এমন ছেলে মানুষিমার্কা কথা মাথায় বাজে ভাবে লাগলো!
.
আমি বললাম,
___ইয়ার্কি ভাললাগেনা, তবুও কেন এমন সব উদ্ভট কথা বলছো?
বউ আগের চেয়ে সিরিয়াস হয়ে গম্ভির্যভাবে বলল,
____ইয়ার্কি করছিনা, আপনি আরেকটা বিয়ে করেন ৷ দোষটা হয়তো আমার তাইতো বাচ্চা হচ্ছেনা” ৷
.
বউয়ের আর কোন কথা শুনলাম না ৷ তার কাছে থেকে উঠে চলে গেলাম!
নিশির কথাটা ভাবছিলাম কয়েকদিন ধরে!
এদিকে মায়ের কথার যন্ত্রণা আমাকে বিষিয়ে তুলছিল ৷ কয়েক মাস পর সিদ্ধান্ত নিলাম যেভাবেই হোক বিয়ে করবো ৷ বিয়ে করলে তো নিশিকে হারিয়ে ফেলছিনা ,শুধু মানুষের মুখ বন্ধ করতেই আমাকে বিয়েটা করতে হবে ৷ নিশিকে শর্ত দিলাম এই যে,
___যদি আমি দ্বিতীয় বিয়ে করি, তবে তুমি আমাকে ছেড়ে যাবার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করবেনা! আমার জন্য কষ্ট পাবেনা! আমাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবেনা! এগুলো মানতে যদি পারো তবে আমি বিয়েতে সম্মতি দিব!
নিশি হাস্যজ্বল মুখে বলল,
____তোমার সব শর্তে রাজি, তবুও তুমি বিয়েটা করো!
.
বিয়ে করলাম তানিয়া নামের একটি মেয়েকে ৷ আগেই জানতাম, তাকে বিয়ে করে আনার পর এমনিতেই নিশিকে কম সময় দিতে হবে, বর্তমানে সেটাই ফলে গেল; তার ওপর তানিয়া আমাকে তার কাছ থেকে ছাড়তেই চায়না!
.
দিনদিন নিশি শুকিয়ে যাচ্ছিল আমাকে হারানোর চিন্তায় ৷ তার চোখ, মুখ দেখে সহজেই বুঝতে পারতাম রাত্রে সে নিরবে কষ্টে বুক ফাঁটিয়ে কান্না করে ৷ সপ্তাহে দুটা দিন তাকে পাশে পেতাম ৷ সেই দুটা দিন তাকে কিছুটা হাসিখুশি দেখতে পেতাম ৷ তাকে যে মধুর তিনটা শব্দ বলবো সেটা বলা ভুলেই গেছিলাম তানিয়াকে বিয়ে করার পর!
.
তানিয়াকে বিয়ের ১বছর পার হয়ে গেল ৷ তানিয়ার পেটে ৯ মাসের বাচ্চা ৷
এবার প্রমাণিত হয়ে গেল নিশিরই দোষ ছিল হয়তো পরীক্ষায় ধরা পড়েনি ৷ পুনরায় নিশিকে হাসপাতালে চেকআপের জন্য নিয়ে গেলাম, এবারও নিশি বা আমার কারোই সমস্যা ধরা পড়লোনা ৷ বুঝতে পারলাম তাকদিরের লিখন এটা!
.
আমি প্রথমবার ছেলে সন্তানের বাবা হলাম ৷ খুশিতে আমি আত্মহারা ৷ আমার খুশি দেখে নিশি আরো বেশি খুশি হলো ৷ সে তানিয়াকে থ্যাংকস জানাতে ভুললোনা ৷ এবার থেকে নিশিকে আমি বেশি বেশি সময় দিতে লাগলাম ৷ এটা তানিয়ার সহ্য হচ্ছিলনা ৷ মুখে কিছু না বললেও তার অভিব্যক্তিতে ঠিকই টের পেলাম ৷ নিশির প্রতি আমার যে টান ও অনুভূতি সেটা তানিয়ার প্রতি চার-আনাও নেই ৷ মন চাইতো নিশিকে নিয়ে সারাক্ষণ ভালবাসায় ডুবে থাকতে!
.
ছয়মাস কেটে গেল ৷
হঠাৎ একদিন তানিয়া বাসা থেকে উধাও, তাকে কোথাও পেলাম না ৷ একটা চিরকুট পেলাম সেখানে লেখা ছিল,
____আপনার সাথে আমি সুখী হবোনা আগেই বুঝতে পেরেছিলাম ,তাছাড়া আমার বয়ফ্রেন্ডও ছিল ৷ তার সাথে ব্রেকআপ চলছিল বিধায় বিয়েতে রাজি হই কিন্তু বিয়ের পরই সে আমাকে পাবার জন্য পাগল হয়ে গেছিল ,তবুও আমি আপনার সাথে সংসারটা চালিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম ৷ কিন্তু আপনি যেভাবে আপনার প্রথম স্ত্রীর সাথে লেগে থাকেন এটা আমার সহ্য কিছুতেই হচ্ছিলনা ৷ তাই বাধ্য হয়ে বয়ফ্রেন্ডের কাছেই চলে গেলাম ৷ নয়ন কে দেখে রাখবেন ৷ হয়তো নিশি তাকে নিজের ছেলের মত করে মানুষ করবে!
.
তানিয়ার চিরকুটটা পড়ে খুশি হবো নাকি বেজার হবো বুঝলাম না ৷ কেন যেন মনে একটু সস্তির নিশ্বাস খুঁজে পাচ্ছিলাম!
.
নিশি এটা জানতে পেরে তাকে কষ্ট পেয়েছে বলে মনে হলো!
.
এরপর থেকে সে নয়নকে কোলে পিঠে করে মানুষ করতে থাকে ৷ সে নয়নকে এতটাই ভালবাসায়, আদরে ও স্নেহ-যত্নে লালন পালন করা শুরু করে যে দেখে মনেই হয়না সে সৎ মা!
.
নয়নের বয়স ৩ বছর পূর্ণ হল!
.
হঠাৎ একদিন নিশি অসুস্থ্য হয়ে পড়ে ৷ ডাক্তার বলে নিশি প্রেগনেন্ট!
আমি বিষয়টাকে পজেটিভ ভাবে কেন যেনো নিতে পারছিলাম না ৷ নিশির প্রতি কেন যেন রাগ হচ্ছিল ,অনেকটা ঘৃণাও ৷ তার কাছে যাওয়া বন্ধ করলাম ৷ আলাদা বেডে দুজন রাত কাটাতে লাগলাম!
.
একদিন সে আমার কাছে এসে আমার পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
___আপনি তো সৃষ্টিকর্তাকে খুব বিশ্বাস করেন! সেই সৃষ্টিকর্তার কসম করে বলছি এটা আমাদের সন্তান, আপনি বাদে এই নিশিকে কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করেনি! বিশ্বাস করুন! এভাবে আর আমাকে কষ্ট দিয়েন না!
নিশির চোখের পানি আমাকে বিশ্বাস করাতে বাধ্য করলো! আমি তাকে ভালবেসে বুকে জড়িয়ে নিলাম!
.
নিশির পেটের দশ মাস চলছে ৷ আমরা গ্রামে চলে এসেছি ৷ নিশির মাও আমাদের বাড়িতে ৷ হঠাৎ একদিন নিশির প্রচন্ড প্রসব ব্যাথা শুরু হয়!
.
স্বাভাবিক ডেলিভারিতে সে বাচ্চা প্রসব করে!
ফুটফুটে একটা মেয়ে সন্তান হয়েছে, চেহারাটা আমাদের দুজনের মিশ্রণেরই দেখে মনে হলে!
আমার মেয়েটা ভূমিষ্ট হয়ে জোরে কান্না করলেও তার মা বোবার মত হয়ে আছে, চোখ দুটোই বন্ধ!
.
বুঝতে পারলাম না কি হলো?৷
ডেলিভারির সময় নিশি আমাকে তার পাশ থেকে একটা সেকেন্ডও সরতে দেয়নি!
সারাক্ষণই যা মন চাচ্ছিল আবল তাবল কথা বলছিল!
বেশির ভাগ সময় বলছিল যে,
___আমাদের মেয়ে হলে তাকে নিয়ে মক্কায় হজ্ব করে আসবো!
কিন্তু বউতো আর কথা বলেনা ৷ কি হয়েছে তার?
আমার আম্মা নিশির দিকে চেয়ে কাঁদছে!
শ্বাশুরি আম্মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছে ৷ তাদের কান্নার কারণ বুঝতে পারলাম না!
বউয়ের প্রসব ব্যাথা ওঠার পর থেকেই মন খুব করে চাইছিল আজ তাকে বলতে, “তোমাকে ভালবাসি আই লাভ ইউ” কিন্তু আরেক মন বলছিল না, এখন না; বাচ্চা ভূমিষ্ট হবার পর সারপ্রাইজ হিসেবে বললেই বেটার হবে!
.
কিন্তু আমার আম্মার কান্না শুনে তো মনে হচ্ছে নিশির কিছু একটা হয়েছে!
মাকে বললাম,
___কি হয়েছে, কাঁদছো কেন ?
মা সহজে বলে দিল,
___নিশি আর নেই!
.
আমি কথাটা শুনে নিজেকে জীবিত হিসেবে মনে করতে পারলাম না ৷ আমার নিকট পৃথিবীটা ওলটপালট মনে হলো! বুঝতে পারলাম পায়ের নিচে মাটি নেই, সব সরে গেছে ৷ আমি চলছি কষ্টের সাগরের অতল গহ্বরে!
.
আমি কিছুক্ষণ আগেই ছোট ভাইটাকে দিয়ে ডাক্তারকে আনতে পাঠিয়েছিলাম ৷ নিজেকে বোকা এবং কঠিন অপরাধী মনে হলো ৷ কেন শুরুতে ডাক্তার ডাকলাম না?
.
এখন আমার মনটা কেন যেন চাইছে এখনই বউকে বলে দিতে, “বউ আই লাভ ইউ”
.
নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে বউয়ের হাতটা ধরে, কান্না মাখা স্বরে বলতে লাগলাম,
____কই গেলে তুমি? কথা বলছোনা কেন ? আমার ওপর এতো রাগ করে চলে গেলে? আমি তোমাকে সরি বলছি চলে আসো,প্লিজ! কথা বলো একটাবার! তোমাকে নিয়ে মনের ভেতরে জমিয়ে রেখেছি এতদিনের সেই মধুর কথাটি! সেটা আজ বলবো তোমাকে প্লিজ কথা বলো?
বউ কথা বলছেনা নিশ্চুপ! তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললাম,
“আই লাভ ইউ বউ”!
অনেকবার বললাম কথাটি তাকে!
সে কোন উত্তর দিচ্ছেনা ৷ চুপ সে!
ভাবলাম- হারিয়ে গেলে কেউ আর কথা বলেনা; যাক সে উড়ে; একদিন তো সে আমার নাগালে আসবেই ৷ হোক দুদিন পরে; এপারে নাহয় ওপারে!
.
নিরাশ হয়ে একরাশ কষ্ট বুকে নিয়ে চোখের অজস্র অশ্রুজল ঝরিয়ে বউয়ের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে রুম ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছিলাম ৷ হাত পুরোটাি নিশির হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছি; তবে দুটা আঙ্গুল এখনো ছাড়িনি!
.
হঠাৎ মনে হলো একটা আঙ্গুল শক্ত করে ধরে আছে কেউ!
নিশি ছাড়া কে হবে?
নিজের আঙ্গুলটা পুরোপুরি ছাড়িয়ে নিতে আরো শক্তি প্রয়োগ করলাম ৷ কিন্তু না আঙ্গুলটা শক্ত করে ধরে আছে!
নিশির মুখের দিকে নজর দিলে দেখলাম সে চোখের পানি ফেলছে অঝোরে!
আমি তার দিকে ফিরে তাকিয়েছি দেখে সে খুশিতে চোখের পানি ফেলছে!
নিশি বলতে লাগলো,
___এতোদিন নিলে এই কথাটি বলতে? আমি তো তোমার বউ’ই হই, অন্য কেউ তো নই যে বললে মেরে ফেলবো!
আমি খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম নিশির কন্ঠে কথা শুনে ৷ আনন্দে অশ্রু বিয়োগ করে বউকে বললাম,
___তুমি আমাকে রেখে কখনোই কোথাও যেতে পারোনা ৷
তাকে চুমুই চুমুই ভরিয়ে দিচ্ছিলাম!
নিশি বলতে লাগল,
___হয়েছে, এবার সেই কথাটি আবার বলো তো, আমি ভাল করে শুনিনি; নিজেকে মরা হিসেবে অভিনয় করছিলাম তাই তোমার কথায় সেভাবে কান দিইনি!
___কি? এতক্ষণ তাহলে নাটক করছিলে?
___তো কি করবো ? যে স্বামী এতবছর ধরে একটি কথা বলার জন্য চেষ্টা করে
যাচ্ছে পারছেনা, তার মুখ থেকে কথাটা বের করার এরচেয়ে সঠিক উপায় আছে কিনা জানা ছিলনা!
____তবে রে!
নিশি বললো,
___আস্তে জড়িয়ে ধরো আমি কিন্তু সদ্য প্রসূতী মা!
.
তাকে আলতো ভাবে জড়িয়ে ধরে চুলের ঘ্রাণ নিয়ে তার একটা হাত আমার এক হাতের তালুতে আকড়ে নিয়ে আরেক হাত দিয়ে তার কোমল ফর্সা গালে পরশ বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বললাম,
___I Love You my Sweet Wife

No comments