Breaking News

অ্যাডভেঞ্চার । পর্ব -১২

সিড়ি বেয়ে অর্ধেক নামতেই সাকিবের টর্চটা নিভে গেল। সুইচ টিপাটিপি করে সেটাকে জ্বালানোর চেষ্টা করতে করতে নিচে নামতে লাগলো সাকিব। ওর পিছনে লুক। সে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে সাকিব?”
“বুঝতেছিনা।” টর্চটাকে ঝাঁকি দিতে দিতে বলল সাকিব।
“আরেকটা আনবো না কি?”
“না থাক। এটাই জ্বলবে।”
“দাঁড়াও, নিয়ে আসি আরেকটা।” বলেই ঘুরে উপর দিকে উঠতে গেল লুক।
কিন্তু নিচে, সদর দরজার দিকে তার চোখ পড়তেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
দ্রুত এক ধাপ নিচে নেমে সাকিবের কাধ খামচে ধরল। অবাক হয়ে লুকের দিকে ঘুরে তাকাল সাকিব।
যদিও অন্ধকারের জন্য একে অপরের মুখ দেখতে পারছেনা ওরা।
দেখতে পেলে লুকের মুখে স্পষ্ট আতংকের ছাপ দেখতে পেত সাকিব।
“দাঁড়াও।” ফিসফিস করে বলল লুক।
কিছু বুঝতে না পেরে সাকিব বলল, “কী হলো?”
“সামনে দরজার দিকে তাকাও।” আবারও ফিসফিসিয়ে বলল লুক।
.
লুকের কথামতো সদর দরজার দিকে তাকাল সাকিব। আর তাকাতেই সেও স্তব্ধ হয়ে গেল।
স্বপ্নে দেখা সেই চোখগুলো। জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। কয়েক জোড়া।
ওগুলো যে দানব তাতে কোন সন্দেহই নেই। এমন সময় সাকিবের হাতের টর্চটা জ্বলে উঠলো।
আলো গিয়ে পড়ল দানবদের উপরে।
সেই আলোয় দেখা গেল, প্রায় দশ থেকে বারোটা দানব রয়েছে ওখানে।
তিনটে দানব ভেতরে ঢুকে পড়েছে। বাকিগুলো বাইরে।
ভেতরে ঢোকার অপেক্ষায় আছে সেগুলো।
হঠাৎ এরকম একটা বিপদের সামনে পড়েও এতটুকু বিচলিত হলো না ওরা।
দ্রুত সময়ের মধ্যে নিজেদের সামলে নিল। পকেট থেকে পিস্তলটা বের করেই গুলি করল সাকিব।
একেবারে মোক্ষম টার্গেট। পরপর তিনটে গুলিতে ভেতরে ঢোকা তিনটে দানবেরই খুলি উড়ে গেল।
এদিকে লুক লাফ দিয়ে সিড়ির রেলিং টপকে নিচে গিয়ে পড়ল।
ওখানে আলমারির সামনে একটা বেসবল ব্যাট রয়েছে। ধুলো পড়ে সেটা প্রায় দেখাই যায় না।
কিন্তু এই অন্ধকারে কোন এক অলৌকিক শক্তিতে লুকের নজরে পড়ল সেটা।
বেসবল ব্যাটটা তুলে নিয়েই ভেতরে ঢুকতে থাকা দানবগুলোকে বাড়ি মারতে শুরু করল সে।
স্কুলে থাকাকালীন বেসবল প্লেয়ার ছিল লুক। এখন সেটার সদ্ব্যবহার করতে লাগলো।
কিন্তু ওর কপাল খারাপ। বেসবল ব্যাটটা অনেক পুরোনো হওয়াতে কয়েকটা বাড়ি মারতেই ভেঙে গেল।
তাতেও দমলো না লুক। পকেট থেকে ছুরি বের করে কোপাতে শুরু করল।
সাহস আছে বটে ছেলেটার।
এদিকে শব্দ শুনে অন্যরাও নিচে নেমে এসেছে।
যার কাছে যে অস্ত্র ছিল সেটা দিয়েই দানবদের মোকাবেলা করতে শুরু করল।
কিন্তু দানবরা সংখ্যায় অনেক বেশি।
প্রথমে দশ-বারোটা দেখা গেলেও আস্তে আস্তে তাদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো।
এখন সেটা বিশে গিয়ে ঠেকেছে। আশপাশ থেকে আরও দানব আসছে।
এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই পর্যদুস্ত হবে ওরা।
সবাই দানবদের মধ্যে গিয়ে মারামারি করলেও আর্চি ভয়ে সিড়িতেই দাঁড়িয়ে আছে।
ভয়ে রীতিমতো কাঁপছে সে। হঠাৎ এম্মা তার কাছে দৌড়ে এল।
হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “লাইটারটা তোমার কাছে না?”
জবাব দিতে গিয়ে তোতলাতে শুরু করল আর্চি। বলল, “লাই…লাইটার। হ্যাঁ…হ্যাঁ…আ..আমার…”
.
আর্চির এই অবস্থা দেখে রাগের চোটে গাল দিয়ে উঠলো এম্মা।
সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে লাইটারটা বের করে ওর হাতে দিল আর্চি।
এম্মা লাইটারটা নিয়ে দৌড়ে গিয়ে সোফা থেকে একটুকরো কাপড় ছিড়ে নিল।
বহুদিনের পুরোনো হওয়াতে কাপড়টা সহজেই ছিড়ে গেল।
তারপর লাইটার দিয়ে আগুন ধরালো তাতে। আগুনের কুণ্ডলীটা ছুড়ে মারলো দানবদের মধ্যে।
একটা দানবের উপর সেটা পড়তেই দাহ্য পদার্থের মত জ্বলে উঠলো সেটা।
যেন দানবটার শরীরে কোন দাহ্য পদার্থ লাগানো ছিল। এবারে দেখার মত প্রতিক্রিয়া হলো।
আগুন দেখে দিগবিদিক শূণ্য হয়ে ছুটে পালাতে শুরু করল দানবরা।
মুহুর্তের মধ্যে সবগুলো একেবারে উধাও হয়ে গেল। যেগুলো মারা গিয়েছে সেগুলো শুধু ইতস্তত পড়ে থাকলো।
এই দানবদের শরীরের বেজায় গন্ধ। তাই ওরা সবাই নাকেমুখে কাপড় বেধে নিল।
তারপর ভেতরে এবং বাইরে পড়ে থাকা দানবগুলোকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে খোলা চত্বরে নিয়ে এল।
টর্চের আলোতে সেগুলোকে পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো।
দানবগুলোর পুরো শরীরই মানুষের মত। শুধুমাত্র চোখ,
গাল আর নাকের মত ছোটছোট অঙ্গগুলো কিছুটা অন্যরকম।
বুঝাই যায় এরা একসময় ওদের মতই স্বাভাবিক মানুষ ছিল।
তারপরে কোন কারণে বিকৃতি ঘটে এরকম হয়ে গেছে।
তারমানে সেই গুজবটা মিথ্যে নয়। সত্যি সত্যিই তখন রেডিয়েশনের ফলে কিছু মানুষের বিকৃতি ঘটেছিল।
হঠাৎ ওরা লক্ষ্য করল একটা ছোটখাটো দানবও আছে ওগুলোর মধ্যে।
বুঝাই যাচ্ছে এই দানবটা বাচ্চা। এটার বয়স বড়জোর দশ কি বারো।
তারমানে এরা প্রজননেও সক্ষম। এতবছরে অবাধে বংশবৃদ্ধি করেছে।
কয়েকটা থেকে হয়েছে শত শত, কিংবা হাজার হাজার।
পুরো শহরে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে এরা।
আগুন ধরিয়ে মৃতদেহগুলোকে পুড়িয়ে দিল ওরা।
দানবগুলোর শরীরে থাকা তেলতেলে পদার্থগুলো যেন কোন দাহ্য পধার্থ।
আগুনের সংস্পর্শে আসামাত্রই সেগুলো জ্বলে উঠলো।
দরজাটা ভালো ভাবে বন্ধ করল ওরা।
অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য পুরোনো আলমারি আর সোফা এনে রাখলো দরজার উপর।
তারপর আবার উপর তলায় উঠে গেল।
পরবর্তী একঘন্টার মধ্যে ঝেড়ে পুছে থাকার উপযোগী করে ফেলল।
খুঁজতে খুঁজতে এম্মা কিচেন রুমটা পেয়ে গেল।
রান্নাবান্না করার যাবতীয় সরঞ্জামাদি রয়েছে সেখানে।
এমনকি কিছু মশলা আর খাবারও আছে। যদিও ওগুলো অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
খুঁজতে খুঁজতে তাকের মধ্যে একটা কাচের বয়াম পেল সাকিব। ভেতরে মধু রয়েছে।
জানা আছে, মধু কখনো নষ্ট হয় না, সুতরাং এটা খাওয়া চলে।
ওই অবস্থাতেই বয়ামের মুখ খুলে মধু খাওয়া শুরু করল সে।
রান্নাঘরে একটা গ্যাসের সিলিন্ডারও আছে। এবং সেটা এতদিনেও বহাল তবিয়তেই আছে।
নষ্ট হয়নি। তবে চুলায় আগুন জ্বলছে না। তারমানে চুলাতে কোন সমস্যা হয়েছে।
সেটা ঠিক করতে বসে গেল লুক। মাত্র দু’মিনিটের মাথায় সে আসল সমস্যাটা ধরতে পারলো।
যে লাইনটা দিয়ে গ্যাস আসতো মরচে পড়ে সেই লাইনটা বন্ধ হয়ে গেছে।
ছুরির মাথা দিয়ে সেটা পরিষ্কার করে দিতেই জ্বলে উঠলো চুলা।
চুলার আগুনেই ডিনার তৈরি করে নিল ওরা। তারপর খাওয়া সারলো ওখানে বসেই।
খাওয়া শেষে ভেতরের রুমে এসে আলোচনায় বসলো।
প্রথমে সাকিব বলল, “একটা ব্যাপার কিন্তু বুঝা গেছে, সেটা হলো দানবগুলো আগুনকে প্রচণ্ড ভয় পায়।”
“আর ওদের শরীরে যে পদার্থটা আছে, ওটা পেট্রোলের চেয়ে কম কিছু না।” যোগ করল এম্মা।
“এইজন্যই তখন তুমি আগুনের চিন্তাটা মাথায় এনেছিলে তাই না?”
“হুম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছিল ওদের শরীরের ওই পদার্থটা দাহ্য।”
“তুমি সাকিব রাফিমদের চেয়ে কম কিছু নও।” হেসে বলল ল্যারি।
.
“মাঝেমধ্যে আমাদের থেকেও ওর মাথা বেশি চলে।” যোগ করল রাফিম।
“সাহসটাও কম না। তথাকথিত কিছু ছেলেদের থেকে অনেক বেশি।
” বলে আড়চোখে আর্চির দিকে তাকাল সে।
খোঁচাটাকে যে তাকে মারা হয়েছে সেটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলো আর্চি।
কিছু না বলে চুপচাপ বসে থাকলো সে।
ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বাকি সবাই মুখ টিপে হাসতে লাগলো।
এমনকি লুক আর ল্যারির মত নির্বিকার মানুষদু’টোও নিজেদেরকে আঁটকে রাখতে পারলো না।
অবশ্য খুব দ্রুতই আবার সামলে নিল।
এদিকে এতজনের প্রশংসায় লজ্জায় লাল হয়ে গেল এম্মার মুখ। মৃদু হেসে নিচের দিকে তাকাল সে।
“যা বলছিলাম,” আগের কথার খেই ধরল সাকিব।
“ওই বাচ্চাটাকে দেখে বুঝা যাচ্ছে দানবগুলো বংশবৃদ্ধি করেছে।
অবাধে বংশবৃদ্ধির ফলে ওদের সংখ্যাটা যে ঠিক কত হয়েছে সেটা আমাদের অজানা।
পুরো শহরটাই এখন ওদের দখলে।
এই বাড়ির ভেতরে হয়তো আমরা নিরাপদ কিন্তু এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব না।
আমাদের রশদ খুব কমই আছে।
আর অল্প কয়েকদিন চলতে পারে।
রশদ ফুরিয়ে গেলে আমরা না খেয়েই মরব। সুতরাং আমাদের উদ্ধার পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে কেউ আমাদের উদ্ধার করতে আসবে সে আশায় বসে থাকলে
এই জীবনে আর উদ্ধার পাওয়ার সম্ভবনা নেই৷ কোন প্লেনই এই শহরের আশপাশ দিয়েও যায় না।
সুতরাং উদ্ধার পাবার ব্যাপারটা আমাদের নিজেদেরই দেখতে হবে।”
এটুটু বলে থামলো সাকিব। লম্বা একটা দম নিল। সেই সঙ্গে সবার দিকে তাকিয়ে বুঝে নিল, সবাই ওর কথা মন দিয়ে শুনছে কিনা। এক্ষেত্রে অবশ্য ও শতভাগ সফল। ওরা সবাই-ই আগ্রহভরে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মন দিয়ে শুনছে ওর কথা।
.
সাকিব আবার শুরু করল, “আমার জানামতে বেলারুশ সীমান্ত সবচেয়ে কাছে।” কথাটা বলে লুক, ল্যারি আর সিয়ারার দিকে তাকাল ও। ওরা তিনজনেই একসঙ্গে বসে আছে। সাকিবের চাহনিতে থাকা প্রশ্নটা বুঝতে পেরে মাথা ঝাঁকাল সিয়ারা। যার মানে, ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ।’
“ওটা রয়েছে উত্তর-পশ্চিমে।” আবার বলতে শুরু করল সাকিব। “ওটাকেই আমাদের লক্ষ্য করা উচিৎ। এখন থেকে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে বেলারুশ সীমান্তে পৌঁছানো।”
এরপরে আর কোন কথা থাকে না। তারপরেও ল্যারি বলল, “তুমি একেবারে ঠিকই বলেছ। বেলারুশ সীমান্তকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদিও বুঝতে পারছি, কাজটা মোটেও সহজ হবে না। হয়তো পথেই আমরা সবাই মারা পড়ব। তবে বাঁচার শেষ চেষ্টাটা করে যেতে হবে।”
ল্যারি আসলে ঠিকই বলেছে। এখান থেকে বেঁচে ফেরাটা ওদের জন্য মোটেও সহজ হবে না। বরঞ্চ সেটা প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার হবে। কিন্তু বেঁচে ফিরতে হলে সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করতে হবে ওদের।
পানি ছাড়া, খাবার ছাড়া, অস্ত্র ছাড়া সেটা কি করতে পারবে ওরা?
চলবে…

No comments