Breaking News

প্রেয়সী | পার্ট: ৭ | লেখিকা: সুলতানা তমা

সকালে ফোনের রিংটোন এর শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো, ঘুমের ঘোরে ফোন খুঁজতে খুঁজতে কলটা কেটে গেল। ফোন হাতে নিয়ে ঘুম ঘুম চোখে তাকালাম, এগারোটা বাজে? এত বেলা অব্ধি ঘুমিয়েছি আমি? ইশশ ফজরের নামাজ পড়া হয়নি। হঠাৎ রাতের কথা মনে পড়লো, অর্পি কোথায়? আমি বালিশে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছি আর গায়ে বিছানা দেওয়া, এসব কি তাহলে অর্পি করলো? বুঝতেই পারিনি অর্পি কখন উঠে চলে গেছে। আবারো ফোন বেজে উঠলো, হানিফ ফোন করেছে।
আমি: হ্যালো।
হানিফ: ঘুমাচ্ছিলি?
আমি: হ্যাঁ।
হানিফ: এত বেলা অব্ধি তো তুই ঘুমাস না।
আমি: আজ বলতে পারিনি আর অর্পিদের বাড়িতে আছি তাই নামাজের জন্যও কেউ ডাকেনি।
হানিফ: ওহ তুই অর্পিতাদের বাড়ি?
আমি: কেন কিছু বলবি?
হানিফ: না এমনি। ফিরে এসে আমার বাসায় আসিস।
আমি: তুই কিছু একটা বলার জন্য ফোন করেছিলি তাই না?
হানিফ: তেমন কিছুনা। ফ্রেশ হয়ে নাশতা কর পরে কথা হবে।
আমি: শুন।
ফোন কেটে দিলো, কি বলার জন্য ফোন করেছিল ও? পরে ফোন করে জিজ্ঞেস করে নিবো, উঠে গোসল করতে চলে গেলাম।
গোসল করে রুমে ঢুকতেই দেখি অর্পি বিছানা ঠিক করছে, হাসি মুখে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম।
আমি: গুড মর্নিং।
অর্পি: (নিশ্চুপ)
আমি: মন খারাপ?
অর্পি: রাতে আপনি এমন করলেন কেন? (অর্পি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, আমিতো ভেবে পাচ্ছিনা কি করেছিলাম রাতে?)
আমি: কি?
অর্পি: আমিতো মাটিতে বিছানা করে ঘুমিয়ে ছিলাম আপনি আমাকে বিছানায় আনতে গেলেন কেন?
আমি: রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল সাথে ঠান্ডা বাতাস বইছিল, তুমি অসুস্থ হয়ে পড়তে তাই…
অর্পি: অসুস্থ হলে হতাম, দুর্জয় যদি আমাদের দুজনকে এক বিছানায় দেখতো তাহলে কি হতো বলেন তো।
আমি: কি আর হতো আরো কয়েকটা থাপ্পড় দিতো তোমাকে।
অর্পি: বিড়বিড় করে কি বলছেন?
আমি: কিছুনা।
অর্পি: দুর্জয় এভাবে আমাকে দেখলে খুব কষ্ট পেতো।
আমি: দুর্জয় কষ্ট পেতো এইটা মাথায় আসছে আর আমি যে সারারাত বসে কাটিয়েছি আমার কষ্ট হয়নি, একেই বলে কারো উপকার করতে নেই।
অর্পি: তখন থেকে কি বিড়বিড় করছেন বলুন তো।
আমি: না কিছুনা।
অর্পি: নাশতা দিচ্ছি আসুন।
আমি: হুম।
অর্পি: আর নিজে এতোটা কষ্ট না করলেও পারতেন। আমার মাটিতে শুয়ে অভ্যাস আছে, আমাকে বিছানায় দিয়ে নিজে সারারাত বসে কাটিয়েছেন নিশ্চয় খুব কষ্ট হয়েছে। (অর্পি চলে যাচ্ছিল দরজা থেকে ফিরে এসে কথা গুলো বললো, কথা গুলো শুনে মুচকি হাসলাম, অন্তত আমার কষ্টের কথা তো ভেবেছে। আমিতো ভেবেছিলাম ও শুধু দুর্জয়কে নিয়েই বিভোর হয়ে আছে)
অর্পি: আসুন।
আমি: হ্যাঁ আসছি।
অর্পির পিছুপিছু আসলাম, দুর্জয় নাশতা করছে। চেয়ার টেনে বসতে বসতে দুর্জয় এর পিঠে আস্তে একটা থাপ্পড় দিয়ে ফাজলামো করে বললাম…
আমি: এমন ভাবে খাচ্ছ দেখে মনেই হচ্ছে না তুমি গতকাল এক্সিডেন্ট করেছিলে। (কথাগুলো বলে আমি হাসতে শুরু করলাম, অর্পি আমার দিকে রাগি চোখে তাকিয়ে আছে আর দুর্জয় বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে)
অর্পি: আয়াস কি হচ্ছে?
দুর্জয়: তোমার কি কোনো ভাবে মনে হচ্ছে আমি এক্সিডেন্ট এর অভিনয় করেছি?
আমি: যে প্রেমের অভিনয় করতে পারে সেতো সবকিছুই করতে পারে তাই না? আর এক্সিডেন্ট এর অভিনয় তো সাধারণ ব্যাপার। (দুর্জয় এর কানের কাছে ফিসফিস করে কথা গুলো বললাম, বেচারা ভয় পেয়ে মুখটা একদম চুপসে গেছে)
অর্পি: ওর কানেকানে কি কথা বললেন?
আমি: দুর্জয় বলব অর্পিকে?
দুর্জয়: অর্পিতা ও কিন্তু বাড়াবাড়ি করছে। আর আমি এক্সিডেন্ট এর অভিনয় করতে যাবো কেন?
আমি: তাহলে প্রমাণ হয়ে যাক।
দুর্জয়: মানে? (টান দিয়ে ওর কপালে থাকা ব্যান্ডেজ খুলে ফেললাম, আমার মন বলছিল ও অভিনয় করছিল আর এটাই সত্যি হলো। দুর্জয় এর কপালে কোনো কাটা দাগ নেই দেখে অর্পি পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে আর ওর দুচোখ দিয়ে পানি পড়ছে)
দুর্জয়: অর্পি তুই কাঁদিস না আমার কথা শুন, আসলে তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল কিন্তু আমি বললেই তো আর তুই আসবি না তাই এক্সিডেন্ট এর কথা বলেছিলাম যেন তুই আসিস। তোকে এক নজর দেখার জন্য এই মিথ্যেটা বলেছি এক্সিডেন্ট এর অভিনয় করেছি, এইটা যদি অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে তুই আমাকে শাস্তি দিতে পারিস। (বাব্বাহ্ দুর্জয় দেখছি পাক্কা খেলোয়াড়, কতো সুন্দর মিথ্যে বলে দিলো। আর ওদিকে মহারাণী ওর এসব মিথ্যে কথা শুনে মোমের মতো গলতে শুরু করেছেন)
দুর্জয়: কিরে বল আমি কি কোনো অন্যায় করেছি?
অর্পি: না না তুমি কেন অন্যায় করতে যাবে? আসলে সবাই তো আর ভালোবাসেনি জীবনে কাউকে তাই ভালোবাসার মানুষকে না দেখে থাকার যন্ত্রণাটা সবাই বুঝেনা। তবে তুমি মিথ্যে না বলে আমাকে বললেই পারতে আমি চলে আসতাম, আমিতো জানি তুমি আমাকে কতোটা ভালোবাস।
অর্পির কথাগুলো আমার কানে বারবার বাজছে। অর্পি তো আমাকে মিন করে বলেছে আমি কখনো কাউকে ভালোবাসিনি তাই এইটাও জানিনা ভালোবাসার মানুষকে না দেখে থাকার যন্ত্রণা কেমন। হাতের খাবারটা রেখে উঠে চলে আসলাম।
রুমে এসে ফোনটা হাতে নিতেই আজকের তারিখের দিকে চোখ পড়লো, আজ থেকে ঠিক এক মাস চারদিন পর তিনবছর পূর্ণ হবে। হ্যাঁ তিনবছর, তিন তিনটা বছর হয়ে যাচ্ছে আমি তাকে দেখি না। বুকের ভিতরটা মাঝেমাঝে শূন্য শূন্য লাগে, খুব করে ইচ্ছে জাগে মনে তাকে এক নজর দেখার কিন্তু পারিনা কারণ সে যে…
অর্পি: না খেয়ে চলে আসলেন যে? (অর্পির কন্ঠ শুনে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিলাম। অর্পি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো)
অর্পি: একি আপনি কাঁদছেন কেন? কি হয়েছে?
আমি: (নিশ্চুপ)
অর্পি: আমার কথায় কষ্ট পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করে দিন প্লিজ! আসলে দুর্জয় আমাকে সত্যি খুব ভালোবাসে আর ওকে নিয়ে কেউ…
আমি: তো থাকো না ওর ভালোবাসা নিয়ে এখানে কেন এসেছ?
অর্পি: আপনি এভাবে রেগে যাচ্ছেন কেন?
অর্পির কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে আসলাম। বোকা মেয়ে একটা সত্যি ভালোবাসা আর অভিনয় এর মধ্যে তফাৎ বুঝেনা।
পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে আনমনা হয়ে হাটছি আর স্মৃতি গুলো মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। ভুলেই তো যাচ্ছিলাম সবকিছু কিন্তু অর্পি আমার জীবনে এসে সবকিছু কেমন উলটপালট করে দিলো, অর্পি আমার আশেপাশে থাকলেই আমার সবকিছু চোখের সামনে ভাসতে শুরু করে। বুঝতে পারছি না কি করে আবার সব ভুলতে পারবো।
পাশের মসজিদ থেকে জোহরের আযানের সুর ভেসে আসলো, নামাজ পড়ার জন্য মসজিদের দিকে রওনা দিলাম। এই নামাজই একমাত্র আমাকে শান্তি দেয়, আমাকে সব কষ্ট স্মৃতি ভুলতে সাহায্য করে এই নামাজ।
নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখি হানিফের অনেক গুলো মিসড কল, কোনো সমস্যা হয়েছে বোধহয়, তাড়াতাড়ি ফোন দিলাম।
হানিফ: হ্যালো।
আমি: নামাজে ছিলাম ফোন সাইলেন্ট ছিল। সত্যি করে বলতো কি হয়েছে।
হানিফ: বাসায় আসবি কবে?
আমি: কোনো প্রয়োজন হলে বল আজই চলে আসবো। সকালেও ফোন করে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলি কিন্তু বলিসনি এখন বল প্লিজ কি হয়েছে।
হানিফ: বলতে চাইনি কিন্তু এখন মনে হচ্ছে না বললে তুই পরে খুব রাগ করবি।
আমি: তোর বউ এর কিছু হয়েছে নাকি অফিসে কোনো ঝামে…
হানিফ: না, আসলে সাজিদ আসছে। (মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো, পাশে থাকা একটা পাথরে দফ করে বসে পড়লাম)
হানিফ: বিকেল পাঁচটার ফ্লাইটে আসছে।
আমি: (নিশ্চুপ)
হানিফ: তুই কাঁদবি বলেই আমি বলতে চাইনি কিন্তু না বললে পরে আবার বকাবকি করবি তাই বলতে বাধ্য হলাম।
আমি: (নিশ্চুপ)
হানিফ: আয়াস? (চোখের পানি মুছে নিয়ে নিজেকে শান্ত করলাম)
আমি: কোথায় উঠছে ও? বাসায়?
হানিফ: না, জানিস তো সাজিদ ঐ বাসায় ফিরতে চায় না। আপাতত আমার বাসায় উঠবে তারপর কোনো একটা হোটেলে।
আমি: আসছি আমি এয়ারপোর্ট যাবো ওকে রিসিভ করতে।
হানিফ: কিন্তু আয়াস…
আমি: ওকে বলিস না।
হানিফ: ঠিক আছে।
ফোন রেখে টাইম দেখলাম, দুইটা সতেরো বাজে, তারমানে বাসায় গিয়ে এয়ারপোর্ট যাওয়া সম্ভব না, এখান থেকে সোজা এয়ারপোর্ট যেতে হবে। ভাইয়াকে মেসেজ করে গাড়ি পাঠাতে বললাম। কিন্তু অর্পি? ওকে কি রেখে যাবো? আগে অর্পির কাছে যাই, বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
মা: অর্পিতাকে খুঁজছ বাবা? (এ ঘরে ও ঘরে পাগলের মতো অর্পিকে খুঁজছিলাম হঠাৎ মা এসে পিছন থেকে ডাকলেন)
আমি: হ্যাঁ।
মা: কোথায় যে গেলো মেয়েটা আমি তখন থেকে খুঁজছি।
আমি: আসলে মা আমাকে চলে যেতে হবে।
মা: কেন?
আমি: জরুরী কাজ পরে গেছে।
মামি: যেতে হয় যাও অর্পিতাকে খুঁজছ কেন? মেয়েটা আরো কয়েকদিন থাকুক।
মা: হঠাৎ মেয়ের জন্য ভালোবাসা বেড়ে গেল যে?
আমি: না না ওকে রেখেই যাবো কিন্তু বলে তো যেতে হবে।
মামি: বাড়ির পূর্বদিকে ছোট একটা নদী আছে ওখানে গিয়ে দেখো দুর্জয় আর অর্পিতা। খবরদার ওকে নিয়ে যাবে না।
আমি: হুম।
অর্পি দুর্জয় এর সাথে আছে? আমি কি গিয়ে ওদের ডিস্টার্ব করবো? আমি গেলে যদি রাগ করে কিন্তু না বলে গেলেও তো রাগ করবে। আনমনা হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে পূর্বদিকে হাটা শুরু করলাম।
নদী থেকে কিছুটা দূরে অর্পি দাঁড়িয়ে আছে আর দুর্জয় হাটু গেড়ে বসে অর্পির হাতে বকুল ফুলের মালা পেঁচিয়ে দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার ইচ্ছে হচ্ছে অর্পিকে গিয়ে ঠাটিয়ে দুটো থাপ্পড় দেই, কিন্তু এমন হচ্ছে কেন আমার? চোখ বন্ধ করে বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে সামনে তাকালাম, দুর্জয় অর্পির হাতে চুমু দিতে যাচ্ছিল অর্পি হাসতে হাসতে দৌড়ে পালিয়ে যেতে লাগলো, একদম সেই মানবীর মতো যাকে আমি মাঝেমধ্যেই স্বপ্নে দেখি। অর্পির পরনেও সাদা শুভ্র শাড়ি, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কোমর ছুঁয়েছে, একহাতে রেশমি চুড়ি অন্য হাতে বকুল ফুলের মালা আর পায়ে নূপুর। অর্পি দৌড়াচ্ছে আর রাস্তার দুপাশের লতাপাতা গুলোকে আলতো হাতে ছুঁয়ে দিচ্ছে। অর্পির পিছুপিছু দুর্জয়ও দৌড়াচ্ছে। এসব দেখতে মুটেও ভালো লাগছে না আমার, ওদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে। দুর্জয় এর সাথে তো অর্পি খুব ভালো আছে, ওর খুশির মুহূর্তটা নষ্ট করতে চাই না তাই চলে আসার জন্য পিছন ফিরলাম তখনি অর্পি ডাকলো।
অর্পি: আয়াস? (অর্পির ডাকে থমকে দাঁড়ালাম, অর্পি দৌড়ে আমার দিকে আসছে, ওর নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ অসহ্য লাগছে আমার)
অর্পি: আপনি এখানে? আচ্ছা তখন রাগ করে কোথায় চলে গিয়েছিলেন?
আমি: হ্যাঁ রাগ করেছিলাম তাতে তোমার কি? তুমি তো বেশ আছো, শাড়ি পড়েছ, সাজোগুজু করেছ। আমাকে নিয়ে কোনো টেনশন আছে নাকি তোমার?
অর্পি: আপনি এভাবে কেন কথা বলছেন? আর দুর্জয় বলেছিল তাই…
আমি: তাই শাড়ি পড়েছ? ভালো করেছ, থাকো তুমি তোমার দুর্জয় এর সাথে আমি চলে যাচ্ছি।
অর্পি: চলে যাচ্ছেন মানে?
আমি: জরুরী কাজ পড়ে গেছে আমাকে এখনি ঢাকায় ফিরতে হবে।
অর্পি: তাহলে আমি?
আমি: তুমি থাকো যতদিন খুশি। আসছি আমি।
অর্পি: আপনাকে আমি একদম বুঝিনা, অযতা হুটহাট রেগে যান।
অর্পির কথায় পাত্তা না দিয়ে চলে আসার জন্য পা বাড়ালাম। কিন্তু অর্পি তো ভুল কিছু বলেনি, সত্যিই তো আমি ইদানীং হুটহাট রেগে যাচ্ছি। কি হয়েছে আমার কেন করছি এরকম? দুর্জয় এর সাথে অর্পিকে দেখলেই মাথা গরম করে ফেলছি কেন? কেন অর্পিকে দুর্জয় এর সাথে দেখলে কষ্ট হয় আমার? পিছু ফিরে তাকালাম, অর্পি আমার চলে আসার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে আর পাশে দুর্জয় দাঁড়ানো। দুর্জয়কে দেখে আবারো মাথায় রাগ ছড়ে বসলো, নাহ অর্পিকে এখানে রেখে যাবো না সাথে নিয়ে যাবো ওকে। ফিরে যাচ্ছি অর্পির কাছে, অর্পি অবাক হয়ে আমার দিকে এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছে।
অর্পি: ফিরে আসলেন যে?
আমি: চলো।
অর্পি: কোথায়?
আমি: বাসায়।
অর্পি: কিন্তু…
আমি: তোমাকে আমি এখানে রেখে যাবো না।
অর্পি: কিন্তু কেন?
আমি: এত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না, আমার সাথে এসেছ আমার সাথেই ফিরে যাবে ব্যস।
দুর্জয়: তুমি যা বলবে তাই হবে? অর্পিতা যাবে না।
আমি: অর্পির হাজবেন্ড আমি সো আমি যা বলব অর্পিকে তাই করতে হবে।
অর্পি: আয়াস আমার কথা শুনুন।
আমি: আগে বাড়িতে চলো।
অর্পির হাত ধরে টেনে ওকে বাড়ির দিকে নিয়ে আসলাম।
অর্পি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আমি নিজেই ওর কাপড়চোপড় গুছাচ্ছি। অর্পিকে এখানে রেখে যেতে মন একদম সায় দিচ্ছে না, কেন যে এমন করছি আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।
অর্পি: আয়াস আমি থেকে গেলে হয় না?
আমি: না হয় না।
মা: অর্পিতা কি হচ্ছে? ও যখন চাইছে তখন সাথে চলে যা।
অর্পি: কিন্তু মা…
মা: তুই এখানে দুর্জয় এর কাছে থাক এইটা আমিও চাই না।
অর্পি: মা কেন এমন করছ?
মা: কারণ তোর বিয়ে হয়ে গেছে, আয়াসই এখন তোর সবকিছু।
আমি: মামাকে বলবেন, আসছি আমরা।
মা: কিন্তু বাবা যাবে কিভাবে?
আমি: ভাইয়া গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে।
অর্পি: তারমানে আপনি আগেই যাওয়ার প্ল্যান করে রেখেছিলেন?
আমি: না, ভাইয়াকে মেসেজ করে রেখেছিলাম, দেখবে মেসেজ?
অর্পি: প্রয়োজন নেই।
গাড়ির হর্ন শুনে বেরুলাম, যদিও অর্পি যেতে চাচ্ছে না তবুও জোড় করে নিয়ে যাচ্ছি। গাড়িতে উঠে অর্পির দিকে তাকালাম, অর্পি কাঁদতে কাঁদতে গাড়িতে এসে বসলো। দুর্জয় এর দিকে তাকালাম দূরে দাঁড়িয়ে আছে আর রাগে ফুঁসছে। হঠাৎ মায়ের দিকে চোখ পড়লো এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন উনি আমার দিকে, ভিতরটা কেমন করে যেন উঠলো, মনে হচ্ছে কি যেন একটা ফেলে রেখে যাচ্ছি এখানে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিলো, মা আমার দিকে আর আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের গাড়ি দূর আসতেই মা আচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ঘরে চলে গেলেন। উনাকে দেখলে আমার ভিতরটায় এমন হয় কেন? কেন বারবার মনে হয় উনি আমার খুব আপন কেউ?
গাড়ি এসে এয়ারপোর্ট থামলো। গাড়ি থেকে নেমেই হানিফকে দেখতে পেলাম। ঘড়ির দিকে তাকালাম আরো পাঁচ মিনিট বাকি।
আমি: ভিতরে চল।
হানিফ: আয়াস শুন। (হাটতে শুরু করেছিলাম হানিফের ডাকে দাঁড়ালাম আবার)
হানিফ: একটা অনুরোধ সাজিদের সামনে নিজেকে সামলে রাখিস প্লিজ! ও কিন্তু তোর বাসায় যেতে চায়নি।
আমি: চিন্তা করিস না আমি একদম ঠিক আছি।
অর্পি: আচ্ছা আমরা এখানে কেন এসেছি?
হানিফ: আমাদের বন্ধু আসছে।
অর্পি: আয়াস আপনার বন্ধুর জন্য আমাকে আজকেই নিয়ে আসলেন? এটাই আপনার জরুরী কাজ? আপনার বন্ধু বড় হয়ে গেল? আমি যে আসতে চাইনি সেটা কিছুনা? আমার কান্নাটা কিছুই না আপনার কাছে?
অর্পির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে দৌড়ে ভিতরের দিকে গেলাম।
অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সাজিদের জন্য, কবে আসবে ও? কতদিন হয়ে গেছে ওকে দেখিনা, ওকে দেখার জন্য মন একদম ব্যাকুল হয়ে আছে। হঠাৎ সাজিদকে দূরে দেখতে পেলাম, এদিকওদিক তাকাচ্ছে আর সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। সাজিদ যতো এগিয়ে আসছে আমার বুকের ধুকপুকুনিটা ততোই বেড়ে যাচ্ছে। হানিফ হাত নাড়তেই সাজিদের নজর আমার দিকে পড়লো, দাঁড়িয়ে গেছে ও, তবে কি সাজিদ আমার কাছে আসবে না? একটু একটু করে সাজিদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আর স্মৃতি গুলো আমাকে ঘিরে ধরছে, মনে হচ্ছে স্মৃতি গুলো আমাকে উইপোকার মতো কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। বুকটায় বিষণ ব্যথা হচ্ছে তবুও এগিয়ে যাচ্ছি সাজিদের দিকে। সাজিদ কাছে এসে ঝাপটে ধরলো আমাকে, ওর চোখে পানি দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলাম না, হুহু করে কেঁদে উঠলাম। সাজিদ কোনো রকম আমাকে ছাড়িয়ে চোখের পানি মুছে নিয়ে হানিফের কাছে গিয়ে ওকে ধাক্কাতে শুরু করলো।
সাজিদ: কি বলেছিলাম তোকে? কেন নিয়ে এসেছিস ওকে? এমন তো কথা ছিলনা।
হানিফ: আয়াস এসব কি হচ্ছে? তুই কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিলি কাঁদবি না।
ওদের আর কোনো কথা আমার কান অব্ধি এসে পৌঁছাচ্ছে না, সব স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভাসছে। মাথা ঝিমঝিম করছে, চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে। অর্পির দিকে তাকালাম, অর্পি দৌড়ে আমার কাছে আসছে। আর কিছু দেখতে পারছি না চোখ অন্ধকার হয়ে আসছে, লুটিয়ে পড়লাম মাটিতে…
চলবে….

No comments