Breaking News

বিরহ মিছিল । পর্ব - ২১

আমেনা মুগ্ধতা কে ঘরে না পেয়ে বাহিরে বের হলেন। মুগ্ধতা কথার ধ্বনি একতলায় শোনা যাচ্ছে। আমেনা তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি ঘেঁষে অগ্নিশর্মা চোখে নিচে তাকালেন। আদিল মুগ্ধতা কথা বলছে। মুগ্ধতার ওষ্ঠদ্বয়ে হাসি৷ আমেনার মেয়ের উপর বেজার হলো। মেয়েটা তার শেষমেষ বি°গড়ে গেলোই। নিছক যেটাকে আবেগ বলে এতোদিন গন্য করে এসেছেন। সেটা এক মুহুর্তে মুগ্ধতা চূর্ণবিচূর্ণ করে ছাড়লো।

এক মুহূর্ত সিঁড়ি তে রইলেন না তিনি৷ দ্রুত প্রস্থান করলেন। ঘরে গিয়ে মোবাইল হাতড়ে কাউকে কল করলেন। ক্ষণকাল পর রুক্ষ গলায় আওড়ালেন,
" এই মুহূর্তে বাড়ি এসো আরিফ।"

মুগ্ধতা ঘরে ঢোকার পর থেকেই আমেনা অন্যমষ্ক। মুগ্ধতা লক্ষ করলো নিখুঁত ভাবে।
সকালে চোখমুখ ধুয়ে নিচে গিয়েছিল। পেটে কিছু এখনো যায়নি।
সে বেশি কিছু না ভেবে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলো। পাউরুটি তে চামুচ দিয়ে
অরেঞ্জ জেলি লাগিয়ে খেতে শুরু করলো৷ দুটি রুটি পেটে ইতিমধ্যে চালান!
আরেকটি পাউরুটি তে জেলি লাগিয়ে মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসার কলিং বেল বেজে উঠল।
মুগ্ধতা খেতে খেতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে সদর দরজার মুখো হলো৷
ঘরে এখন সে আর মা আছে৷ মাকে দেখতে না পেয়ে সেই গেল।
আই ডোরে এক চোখে বাবার প্রতিচ্ছবি দেখে বিস্মিত হলো মুগ্ধতা।
চটপটে হাতে দরজার ছিটকিনি খুলে বিস্মিত স্বরে আওড়াল,
" বাবা! তুমি এই সময়?"
আরিফ আহমেদ অপ্রতিভ। মেয়ে কে এই সময় এখানে হয়তো প্রত্যাশা করেন নি।
হালকা হেসে বললেন,
" এলাম খুশি হওনি? "
মুগ্ধতা দৌড়ে বাবা কে জড়িয়ে ধরে বলল,
" তুমি তো বাসায় থাকোই না। সারাদিন ব্যবসা, ব্যবসা আর ব্যবসা। তাই জিজ্ঞালাম।"
মুগ্ধতার আওয়াজে উচ্ছ্বাস লেগে। আরিফ আহমেদ মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।
কিছু ভেবে ভারি মন খারাপ হচ্ছে উনার৷

ফ্রেস হওয়ার কথা মুগ্ধতা কে বলে আরিফ আহমেদ ঘরে গিয়েছেন।
এরপরই উনার ঘরে চেচামেচি । বাবা কর্কশ আওয়াজ, মায়ের রাগান্বিত কন্ঠ। ঘরে চলছে তা°ন্ডব৷
মুগ্ধতা কিয়দংশ নিজের ঘরে থেকে আর চুপচাপ থাকতে পেল না।
সে গতিশীল পায়ে মায়ের ঘরের দিকে গেল। মায়ের ঘর দুই ঘর পরেই।
দরজা চাপানো মায়ের ঘরের৷ এখনো ভিতর থেকে আওয়াজ আসছে বাবা-মায়ের।
মুগ্ধতা দরজা ঈষৎ খুলল। মুগ্ধতা হাতের সর্বচ্চ ভর দরজায় দিয়ে,
দরজা ঠেলতে নিলেই আমেনার স্বরে গায়ে কাঁপুনি দিয়ে উঠল।

" তোমার মেয়ে খারাপ পথে চলে গেছে আরিফ। কি আছে আদিলের।
পরিবার ভালো হলেই কি হয়? মাত্র এখন এইচএসসি দিচ্ছে৷ ক্যারিয়ার গড়তে আরো কত বছর।
মূল কথা তোমার মেয়ের থেকে আদিল ছোট।
মানসম্মান থাকবে সমাজে?লোকে ছিছি কার করবে। আজকেই সুবর্ণ সুযোগ মুগ্ধতা কে বিয়ে দেওয়ার।
স্বরণ ভালো ছেলে৷ সরকারি চাকরিজীবী। মুগ্ধতা স্বরণের সঙ্গে খুব ভালো থাকবে৷"

এক মুহূর্ত এই বাড়িতে রইবে না সিদ্ধান্ত নিলো মুগ্ধতা।
চোখের জল মুছে ব্যাগে নিজের কাপড় গোছাচ্ছে।
আঁখি কোটর উপচে নোনা স্রোত বইছে মুখশ্রী তে। কপোল বারংবার ভিজে যাচ্ছে।
মুগ্ধতা চোখ মুদে। তৎক্ষনাৎ কয়েক অশ্রু কণা কপোল এসে ঠেকে।
নাক টানছে৷ নাক দিয়ে পানি বের হচ্ছে। ওড়নার আঁচল দিয়ে মুছচ্ছে।
আমেনা মেয়ের ঘরে এসেছেন খুশিমনে।
দীর্ঘ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে আজ। লাল রঙের দামি একটা শাড়ি সঙ্গে এনেছেন।
এক মাত্র মেয়ের বিয়ে বলে কথা। শাড়িটা কি বলে মুগ্ধতা পড়াবেন সুন্দর ভাবে ভেবে রেখেছেন।
বিয়েটা ভালোয় ভালোয় সাড়লে বাঁচে।
মুগ্ধতা কে ওয়ারড্রবের সামনে ব্যাগে কাপড় ঢুকানো দেখে আমেনা রোষিত নয়নে বললেন,
" গোছগাছ করে, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?"
মায়ের কথা মুগ্ধতা আমলে নিলো না। আগের ন্যায় কাপড়ে হাত চলছে। কর্কশ ভঙ্গিতে আমেনা বললেন,
" উত্তর দিচ্ছো না কেন?"
মুগ্ধতার পিঠ আমেনার দিকে। মুগ্ধতা ঘুরে মায়ের দিকে চাইলো। অত্যাধিক রাগত্ব কন্ঠে আওড়াল,
" আমার জীবন নিয়ে পু°তুল খেলছো। আমি বসে বসে তা দে°খবো।"
আমেনা বিচলিত হলেন অল্প। পরক্ষণে হাসলেন। আয়েশ করে মেয়ের বিছানায় বসে আওড়ালেন,
" যাক জেনে গেছিস সব। আমাকে আর মিথ্যা বলতে হবে না।
কথা টুকু শেষ করে উঠে লাল শাড়ি মুগ্ধতার হাতের উপর রাখলেন আমেনা। মুগ্ধতা ক্ষিপ্ত মেজা°জে লহমায় লাল শাড়ি ছুড়ে ফেলল মাটিতে৷ অবস্থা সুবিধার মনে হলো আমেনার। তিনি দাঁড়িয়ে মেয়ে কে বোঝানোর তাগিদে শুধালেন,

" আদিল তোমার জীবন সঙ্গী হিসেবে ভুল। আদিল অবশ্যই ভালো। বড়লোক পরিবার। আমি মানি! স্বীকার করি। তবে ক্যারিয়ার নেই। হতেও বহুত দেরি। এ কথা বাদই দিলাম। আমার মেয়ের বয়সে ছোট! সেই ছেলের সঙ্গে নিশ্চয়ই আমি বিয়ে দেবো না।"
মুগ্ধতা কান্না করতে করতে বলে উঠলো,
"বিয়ের প্ল্যান আমরা এখনো করিনি মা৷ আদিল তো বেকার থাকবে না চিরকাল। প্লিজ ট্রায় টু আন্ডারস্ট্যান্ড।"
আমেনা বিরক্ত কন্ঠে আওড়ালেন,
" আমায় রাগিও না ঝটপট রেডি হও শাড়ি পরে।"
মুগ্ধতা হাল ছেড়ে দিলো। ধরে আসা কন্ঠে জোড় দিয়ে আওড়াল,
" আমি বিয়ে করবো না।"
"তবে মায়ের লা°শ দেখার জন্য তৈরি হও।"
মুগ্ধতা কঠিন কন্ঠে আওড়াল,
" ভয় দেখাচ্ছ?"
আমেনা অদ্ভুত ভাবে হাসলেন। বললেন,
" তোমার মা কথার হেরফের করে না জানো নিশ্চয়ই।"
শিউরে উঠলো শরীর মুগ্ধতার। অজানা ভয়ে। আমেনা এক কথার মানুষ। মুগ্ধতার স্পষ্ট মনে আছে। যখন ক্লাস নাইনে পড়ে মুগ্ধতা। বাবার সাথে মায়ের তুমুল একদিন
ঝগড়া হয়। সেদিন মা গর্জে রাগে ফোঁসফোঁস করে বলেন "তিনি মুখে ভাত তুলবেন না ততক্ষণ। যতক্ষণ না তার বাবার সঙ্গে ডিভোর্স হয়।"
সংসার ভাঙাভাঙা অবস্থা। তন্মধ্যে আমেনার তিনদিন নাওয়াখাওয়া বাদ। পিপাসা নিবারণের জন্য শুধু এক গ্লাস দু গ্লাস পানি পান করলেন। শরীর খারাপ হতে শুরু করে আমেনার। অচল হয় শরীর। কত কাঠখড় পো°ড়াতে হয় মাকে খাওয়াতে সে বার!
মুগ্ধতা নিজের ভয় গোপনে রেখে আওড়াল,
" মা বোঝার চেষ্টা করো আদি...!"
সম্পূর্ণ কথা শেষ হওয়ার পূর্বে আমেনা বলেন,
" আমার মরা মুখ দেখবে তুমি৷ যদি আমার কথার অবাধ্য হও আজ।"

পরিক্ষার হল থেকে বেরিয়ে গেট দিয়ে বাহিরে বের হলো আদিল। গেটে পুরোদমে ভিড়।
ঠেলাঠেলি করে যাচ্ছে সবাই। বিভিন্ন কলেজের ছাত্র ছাত্র।
কেউ কেউ ঝাঁকে ঝাঁকে যাচ্ছে বাসায়৷ কেউবা একা একাই।
আদিল মেইন রাস্তায় দাঁড়াল রিকশার জন্য। সূর্যের তাপ প্রখর৷ বিচরণ চলছে দিকবিদিক।
পারভিন আজ নিতে আসেনি। দুদিন পর পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র পরিক্ষা।
শিক বাড়ি তে একজন স্যারের কাছে আদিল পদার্থবিজ্ঞান পড়ে।
আজকে প্রাইভেট পড়বে এদিকে দিয়ে গেয়েই।
আদিল হাঁক ছেড়ে রিকশা দাঁড় করালো। সবে রিকশায় উঠে বসলো।
"আদিল ভাই।"
রিকশার পিছন থেকে আওয়াজ এলো। প্রগতি ঘর্মাক্ত মুখশ্রী তে আদিলের সামনে এসে দাঁড়াল। হাঁপিয়ে জড়ানো কন্ঠে বলল,
" বাড়িতে যাও আদিল ভাই। অনেক দেরি করে ফেলেছো তুমি।"
প্রগতির কথার মাপ পেঁচ বুঝলো না আদিল। প্রগতিকে চেনে মুগ্ধতার মাধ্যমেই। দুজনের মধ্যে খুবই খাতির। আদিল বলল,
" কেন কি হয়েছে।"
হাঁপানো কন্ঠে প্রগতি গড়গড় করে বলল,
" আমি তোমার জন্য দুই ঘন্টা হচ্ছে অপেক্ষা করছি আদিল ভাই। মুগ্ধতার বিয়ে।
মুগ্ধতাদের বাড়িতে কাজী এসেছে।"
তবলায় ন্যায় প্রগতির কথা আদিলের বাজছে কানে। শরীর ছেড়ে দিতে চাইলো আদিলের। হৃদয় হোহো করে উঠলো। বক্ষের বা পাশ চিনচিন করছে। চোখের পানি বেরিয়ে আসবে আসবে!

রিকশা বাড়ির কাছাকাছি আসতেই রিকশা থেকে ঝাপ দিলো আদিল।
কনুই ছিলে গেছে। রক্ত বের হচ্ছে চুইয়ে। ফাইল হাত ছাড়া হয়ে দূরে পরে। ভ্রুক্ষেপ নেই তবুও।
রিকশা চালক রিকশা থামিয়ে ভয় ভয় চোখে আদিল কে দেখছেন।
ব্যথা পাওয়া সত্ত্বেও আদিল তাড়াক উঠে দাঁড়াল।
যতক্ষণ রিকশা যাবে ততক্ষণে দৌড়ালে আগে যাওয়া যাবে এই ভাবনা।
রিকশা চালক কে ভাড়া মিটালো না। খুঁড়ে খুঁড়ে দৌড় লাগালো।
ফাইল হাতে নেই, অবলীলায় ধুলোয় পরে। কলেজের সাদা শার্টে রক্তের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোঁটা৷
লাফ দিয়ে দিয়ে তিন সিঁড়ি করো ডেঙালো আদিল।
দুই তলায় আসতেই শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। অজানা ভয়ে তটস্থ আদিল।
চোখের জল বেরিয়ে এসেছে। দুরুদুরু হৃদপিণ্ড নিয়ে মুগ্ধতাদের ফ্লাটে ঢুকলো।
মস্তিষ্কে প্রশ্নের আগমন ঘটছে, "বিয়ে কি হয়ে গেছে তার মুগ্ধতার? "
শরীর শিরশির করে উঠলো আদিলের। চোখের পানি আবার গড়িয়ে পড়লো সাদা ফকফকা টাইলসে।
বসার ঘর ফাঁকা! বিয়ে শেষে বর কনে কে মিষ্টিমুখ করার জন্য, বড় একটা ট্রে বসার ঘরের টেবিলে দেখলো আদিল৷ যা বোঝার মস্তিষ্ক বুঝে গেল।
প্রগতির কথা মস্তিষ্কে হোটচ খেল।
"আমি তোমার জন্য দুই ঘন্টা হচ্ছে অপেক্ষা করছি আদিল ভাই।"
দেরি করে ফেলেছে সে! ধপ করে বসার ঘরে বসে পড়লো আদিল।
চোখ মুদে ঘন শ্বাস ফেললো। চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়লো অপরাধীর ন্যায়।
আদিল দু' হাত মুঠো করে টাইলসে ঘুষি মেরে, গগনবিদারী কন্ঠে আওড়াল,
" এটা কথা ছিল না মুগ্ধ।"

চলবে...

No comments