Breaking News

বিরহ মিছিল । পর্ব - ২৩



মায়ের কার্যতে মুগ্ধতার মনে হলো বিয়ে করে নেওয়া উচিত তাদের। বিষয়টি দৃষ্টিকটু লাগলেও। মা তার ভয়ংকর হয়ে উঠেছে! না হলে বিয়ের দিনক্ষণ হিসেবে আদিলের পরিক্ষার সময় বেছে নেয়!

মুগ্ধতা উদ্বিগ্ন চিত্তে আদিলের হাতের কনুই পরিষ্কার করে দিলো। আপাতত আদিল বেন্ডেজ করতে চাচ্ছে না বিধায় মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। মুগ্ধতা কৌতুহল বসত বললো,
" আর ইউ সিরিয়াস আদিল?"
আদিল চেয়ার থেকে উঠে ভ্রু কুঞ্চন করে আওড়াল,
" কোন বিষয়ে?"
"আমাদের বিয়ের।"
আদিল বুক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস নিংড়ালো। তার উপর দিয়ে কি ঝড় আজ গেছে জানে মেয়েটা!
আদিলের পরণে এখনো কলেজের সাদা শার্ট। যার মধ্যে দুটো বোতাম ইতিমধ্যে গায়েব। বড্ড এলোমেলো লাগছে আদিলকে। আদিল গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
" তোমার মা যেই ভাবে পিছনে লেগেছে, তিনি আবার যে ছল কষবেন না এটার কোন নিশ্চয়তা আছে আদৌও? তুমিই বা কতোবার বিয়ে রুখতে পারবে। এতো এতো ঝামেলার পোহানোর চেয়ে বিয়ে করে নেওয়া ভালো। "
মুগ্ধতা দ্বিমত করতে পারলো না। ভুল কিছু আদিল বলেনি তো। জবাবে শুধু মুগ্ধতা বলল,
" কিভাবে কি? আরেকবার ভেবে দেখা ...!"
মুগ্ধতা শেষোক্ত কথাটি বলার আগ মুহূর্তে
আদিল আদুরে কন্ঠে শুধালো,
"অনেক ভেবেছি মুগ্ধ প্লিজ আর না।"
.
মাকে শেষ বার বোঝানোর তাগিদে আদিল কে সঙ্গে করে দু তলার ফ্লাটের দুয়ারে এলো মুগ্ধতা।
মুগ্ধতা চাচ্ছে শেষ চেষ্টা করে দেখতে।
আদিলের এক হাত মুগ্ধতার প্রতিটি আঙ্গুলে আঙ্গুলে বিচরণ করছে।
সদরদরজা দরজা এখনো মেলে রাখা।
অনায়াসে দুজন পায়ের সমান তালে অভ্যন্তরে ঢুকলো। ঘরে এখনো মায়ের চেচামেচি শোনা যাচ্ছে।
মুগ্ধতা আদিলের হাত আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।
কাঁপা কাঁপা হাতে মায়ের ঘরের দন্ধ দরজা ঠেলে খুললো। ঘরে উপস্থিত কেউ টের পেলেন না।
আরিফ আহমেদ বিছানায় বসে আছেন।
আমেনা মোবাইলে এক প্রকার চেঁচাচ্ছেন কারো সাথে৷ মুগ্ধতা ঢোক গিলে,
দরজায় স্থির পায়ে দাঁড়িয়ে আওড়াল,
"আম্মু!"

আমেনা মোবাইল কান থেকে সরিয়ে, শব্দের উৎপত্তি তে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন।
ঘাড় বেঁকিয়ে তাকালেন৷ আরিফ আহমেদের চোখ আমেনার দিক থেকে সরে গিয়ে দরজার দিকে চলে গেল। আদিল মুগ্ধতার পাশে। দুজনের আঁকড়ে ধরে রাখা হাত আমেনার দৃষ্টিকোণে ধুলো দিতে পারলো না।
পায়ের র°ক্ত মাথায় যেন উঠে গেল আমেনার। সকালের বেই°জ্জতি।
মুগ্ধতার বিয়ে আরম্ভের মুহূর্তে ওয়াশরুমে যাওয়ার কথা বলে পালিয়ে যাওয়া।
এখন আদিলকে নিয়ে হাজির। হাতের সঙ্গে হাত!
কটাক্ষ কন্ঠে আওড়ালেন আমেনা,
" এখনো সময় আছে নিজের ভালো বুঝতে শিখো। ওই ছেলের হাত ছেড়ে মায়ের কাছে আসো।"
আমেনার কথার পিঠে মুগ্ধতা বলল,
" তুমি কি আদিলকে মানবে না মা?"
আমেনার জোড়ালো কন্ঠে শুধালেন,
" অসম্ভব। মানার প্রশ্নই আসে না।"
এই কথার পেক্ষিতে প্রসঙ্গ বাড়ানো উচিত বলে মনে করলো না মুগ্ধতা।
মুগ্ধতা সজলনেত্রে বাবার দিকে চেয়ে শুধু বলল,
"আমায় ক্ষমা করো বাবা।"
মেয়ের অব্যক্ত সকল কথা এই একটি বাক্য দ্বারা বুঝলেন আরিফ আহমেদ। তিনি ভালোমন্দ কিছু বলতে পারছেন না আমেনার কারণে। সকল কিছু বুঝেও আমেনার ছেলেমানুষী আচরণ করছে।
তবে তিনি বিশ্বাস করেন মেয়ে তার ভুল নয়। হতে পারে না।
মুগ্ধতা চোখের ইশারায় আদিলকে ঘুরতে বলে মুগ্ধতা উল্টো দিকে ঘুরলো। আবারো দুজন এক সঙ্গে হেঁটে ঘর ছেড়ে বাহিরে যেতে লাগলো। আরিফ আহমেদের মুখে কথা নেই। আমেনা রাগত্ব কন্ঠে পিছনে থেকে আওড়ালেন,
"ফষ্টি°নষ্টি করে এসে; আমার ঘরে তোমার জায়গা হবে ভেবে থাকো; তাহলে তুমি ভুল। তোমার সুযোগ এটাই এখন।"
মুগ্ধতা বহু কষ্টে কথাটি হজম করে নিলো। আদিল প্রতিবাদ করতে পিছনে রাস্তা মাপলে মুগ্ধতা মাথা দুদিকে ঘুরিয়ে আহ্বান করলো 'না'।
ছোট চাচ্চু, চাচিমা কে নিয়ে গাজীপুরের কাজী অফিসে সামনে এসে দাঁড়াল আদিব।
পকেট থেকে ফোন বের করে, আদিলকে কল করে ফোনটি ধরল কানে।
একবার রিং হতে হতে কল রিসিভ হলো। ওপাশ থেকে আদিল আওড়াল,
" তোমরা পৌঁচ্ছেছে ভাইয়া?"
আদিব বলল,
" হ্যা, তোরা কোথায় ?"
"কাছেই আছি। দশমিনিট অপেক্ষা করো আমরা আসছি।"
আদিলের কন্ঠের আওয়াজের সঙ্গে ভেসে আসছে গাড়ির হন, বাহিরের কোলাহল।
আদিব জবাবে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলো,
"আচ্ছা।"
দশ মিনিটের মধ্যে আদিল ও মুগ্ধতা পৌঁছালো কাজী অফিসের সামনে। বাহিরে দাঁড়িয়ে ছিল চাচ্চু, চাচিমা,আদিব। সিএনজির বিল পরিশোধ করে মুগ্ধতার হাত ধরে সামনে এগোল আদিল।
হেঁটে হেঁটে তাদের ঘেরাও করে থামলো আদিল ও মুগ্ধতা৷
চাচ্চু, চাচিমা হেসে এ কথা, সে কথা জিজ্ঞেস করলো মুগ্ধতা কে। মুগ্ধতা উত্তর দিলো৷ প্রথম আলাপ যদি মুগ্ধতার তাদের সঙ্গে। তবুও কথাবার্তায় মনে হলো কত আগের চেনাজানা।

আদিব বলল,
" সব ঠিক করে রেখেছি আমি, চাচ্চু। ভিতরে চল।"
আদিল হুম বলতেই সবাই এক এক করে কাজী অফিসের দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ি ডিঙিয়ে উঠলো।
মুগ্ধতার এক একটা কদম ফেলতে হৃদপিন্ড বেসামাল হচ্ছে। হৃদযন্ত্র দুরুদুরু শব্দ অবিরত করে যাচ্ছে।
কাজী চেয়ারে বসে টেবিলে রেজিস্ট্রি খাতায় লিখছে। মুগ্ধতা সামনের একটি চেয়ারে বসে।
আদিল তার পাশে বসে৷ তার পর আদিব, চাচ্চু, চাচিমা আরো দুজন।
মুগ্ধতা তাদের চিনে না। হয়তো আত্মীয়, সাক্ষীর জন্য এসেছেন তারা।
অতঃপর খাতায় লেখা কথাগুলো কাজী সাহেব জোড়ালো গলায় পড়লেন। পরমুহূর্তে আওড়ালেন,
"বলো কবুল।"
মুগ্ধতা কবুল না বলে আদিলের দিকে চাইলো।
আদিল আশ্বস্ত করলো মুগ্ধতার হাত নিজের হাতের আঙ্গুলের মধ্যে নিয়ে।
মুগ্ধতা সঙ্গে সঙ্গে আওড়াল, "কবুল।"
মিষ্টি কিনতে গেছে সবাই। বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্কের লগ্নে মিষ্টি মুখ না করলেই নয়।
আদিলের সঙ্গে মুগ্ধতা। তারা দুজন যায় নি।
কাজী অফিসের বাহিরের বেঞ্চে বসেছে দুজন৷ দুজনের মধ্যে মৌনতা বিরাজ করে চলেছে।
মুগ্ধতার শরীরে জড়ানো টিয়া রঙের ওড়না, আদিল চট করে মুগ্ধতার দিকে ঝুঁকে মুগ্ধতার মাথায় দিয়ে দিলো। কানের দিকে এসে আহ্লাদী কন্ঠে ফিসফিস করে আওড়াল,
"আমার বউ! আমার মুগ্ধ। আজ থেকে আমার,শুধু আমার।"

চলবে...

No comments