Breaking News

বিরহ মিছিল । পর্ব - ২৪



কবজিতে বাদামী রঙের ঘড়িটাতে একবার চোখ বুলালো মুগ্ধতা। ঘড়ির ঘন্টার কাটা এখন একটার দিকে স্থির হয়ে আছে। মাত্র এক মিনিটের কমবেশ। পূর্ব দিকের সপ্তম শ্রেণির দুই তলা ভুবনে মুগ্ধতার এখন ক্লাস আছে।

মুগ্ধতা হ্যান্ড ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে অফিস কক্ষ হতে সমাজ বই নিয়ে অফিসকক্ষ প্রস্থান করলো। চারটা সিঁড়ি ভেঙে পূর্ব দিকের ভুবনের নিচ তলায় পৌছাল। ক্লাসের বাহিরে বের হওয়া ছাত্র-ছাত্রী ঝাঁক বেঁধে মুগ্ধতার যাওয়া রোধ করে সালাম দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করছে, "কেমন আছে।"
মুগ্ধতা ও হেসে উত্তর দিচ্ছে, পাল্টা প্রশ্ন করছে।
দ্বিতীয় তলায় উঠার সিঁড়ি ধরলো মুগ্ধতা। অতঃপর সকল সিঁড়ি অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত কাল রুমে প্রবেশ করলো। আরেক দফা একত্রিত ছাত্রছাত্রীর সালামের প্রতিধ্বনি কানের ছিদ্রপথে শ্রবল হলো।
"আসসালামু আলাইকুম মুগ্ধতা ম্যাম।"
ভরা ক্লাস রুমের ছাত্র-ছাত্রী দাঁড়িয়ে গেছে মুগ্ধতা রুমে প্রবেশ করা মাত্রই। মুগ্ধতা টেবিলে হ্যান্ড ব্যাগ রাখতে রাখতে সালামের প্রতিত্তোর করলো,
" ওয়ালাইকুম আসসালাম।"
এটুকু বলতে বলতে মুগ্ধতা হাত উঠিয়ে ইশারায় সবাইকে সিটে বসতে বললো। তৎপর বলল,
"সবাই কেমন আছো?"
একত্রিত কন্ঠে উত্তর এলো, "ভালো ম্যাম।"
মুগ্ধতা চেয়ার টেনে বসলো সবার সম্মুখে। সমাজ বইয়ের সপ্তম অধ্যায় খুলে সবাই কে সপ্তম অধ্যায় খোলার নির্দেশ দিলো। সবাই ব্যাগ খুলে বই বের করে বড় বেঞ্চের উপরে রাখলো। মুগ্ধতা বই হাতে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠলো। বলল,
"আমি রিডিং পড়ছি। আমায় অনুসরণ করো সবাই। আমি যে কোন মুহূর্তে থেমে সেখান থেকে রিডিং ধরতে পারি। "
কথাটুকু বলে মুগ্ধতা রিডিং পড়তে শুরু করল। দশ মিনিটে দুইটি পাঠ পড়ল। মাঝেমধ্যে থেমে বইয়ের কিছু কিছু জায়গায় কলম দিয়ে দাগ দিতে বলল। অতঃপর দুই পাঠ থেকে প্রশ্ন বানাতে আদেশ জারি করলো।
মুগ্ধতা ক্লাসের চারদিকে ঘুরছে। দেখছে কে লিখছে বা কে লিখছে না। কোথা থেকে যেন স্কুলের দপ্তরি নাজমা খালা ক্লাসে হাজির হলো। নাজমা খালা ক্লাসের অভ্যন্তরে এলেন। মুগ্ধতার দিকে একটি ব্যাংকের চেক এগিয়ে দিয়ে বললেন,
"আপা আপনার বেতনের চেক।"
মুগ্ধতা চেক টি হাতে নিলো। গত একমাস আগে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে
জয়দেবপুরের কাছাকাছি স্কুলে পোস্টিং হয় মুগ্ধতার। অনার্স কমপ্লিট এক বছর আগে।
চাকরিবাকরি করার ইচ্ছে তখন ছিল না। জমিয়ে সংসার করবে আদিলের সঙ্গে এই ভাবনা ছিল।
তারপর হঠাৎ চাকরি করার ঝোঁক উঠল।
প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকার হওয়ার জন্য চাকরি পরিক্ষা দিলো।
রিটার্নে টিকে গেল,ভাইবা তেও পাশ করে গেল।
অকস্মাৎ মুগ্ধতার ফোনের মেসেজ টোন বেজে উঠলো।
মুগ্ধতা টেবিলের দিকে এগিয়ে এলো।
হ্যান্ড ব্যাগের অভ্যন্তরের ফোন বের করে পাওয়ার বাটন অন করল৷ মুহূর্তে আদিলের নাম
ফোনের স্কিনে দেখা গেল। তৎক্ষনাৎ আদিলের নাম্বারের মেসেজ ইনবক্সে চলে গেল।
আদিল লিখেছে,
"লাঞ্চ টাইম শুরু হবে কখন?"
মেসেজ টি পড়তে পড়তে মুগ্ধতার ঠোঁট কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো। মুগ্ধতা ফোনের ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলো, এখন ১টা বিশ পিএম! মুগ্ধতা দ্রুত টাইপিং করে ইংরেজি হরফে লিখলো,
" আর দশ মিনিট পর।"

মুগ্ধতার লাঞ্চ টাইম সম্পর্কে অবগত আদিল।
তবে এই মেসেজটা দেওয়ার কারণ মুগ্ধতা বেশ ভালো করেই জানে।
এটার ইঙ্গিত সে এখন তার স্কুলের ভিতর রয়েছে এবং তার জন্য অপেক্ষারত।
মুগ্ধতা ক্লাসের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
"যে যতটুকু প্রশ্ন করেছ খাতা নিয়ে আসো। ক্লাস প্রায় শেষ। বেল বেজে উঠবে।"
কলম থেমে গেল মুহূর্তেই। যে যার মতো দৌড়ে মুগ্ধতার দিকে এগোলো।
কে কার আগে খাতা দেখাতে পারবে এইটাই যেন মূখ্য বিষয়।
এক এক করে মুগ্ধতা কে খাতা দেখাতে লাগলো সবাই।
ভিড় শেষে একটা মেয়ে এলো খাতা দেখাতে। গোলগাল চেহারা মেয়েটার। স্কিন ফর্সা।
মেয়েটা কিছু বলার জন্য আকুপাকু করছে অনেকক্ষণ ধরে৷ মুগ্ধতা খাতায় চোখ রাখা সত্ত্বেও বুঝলো।
মুগ্ধতা অতি নমনীয় কন্ঠে বলল,
" তুলতুল কিছু বলবে কী মিস কে?"
তুলতুল ভয়ে মাথা দুলাল। মুগ্ধতা তুলতুলের মাথায় হাত রাখলো। বলল,
"ভয় পাচ্ছো কেন? আমায় নির্বিঘ্নে বলো কি বলতে চাও।"
তুলতুল কাঁপা কন্ঠে দোনোমোনো করে বলল,
" ম্যাম আপনার একটা বন্ধু আছে না? মাঝেমধ্যে আসে এখানে আপনার সাথে দেখা করতে ।"
তুলতুল কার কথা বলছে মুগ্ধতা বুঝতে পারছে না। মুগ্ধতা খাতায় সাইন করা থামিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে আওড়াল,
"ম্যাম বুঝতে পারছে না তুলতুল। তুমি কোন বন্ধুর কথা বলছো।"
তুলতুল ভাবুক হলো। ছেলেটার নাম সে এখনো জানে না। এক সপ্তাহ আগেই দেখেছিল স্কুলে ম্যামের সঙ্গে। ছাই রঙের এক রঙের শার্ট, সফেদ রঙের জিন্স ছিল পরণে। তুলতুল ম্যামকে বোঝাতে আওড়াল,
" এক সপ্তাহ আগে এসেছিল ম্যাম। স্কুল গেটে দাঁড়িয়ে আপনি কথা বলছিলেন। আপনার বন্ধুর পরনে ছাই রঙের শার্ট ছিল।"
গত একসপ্তাহ আগের স্মৃতি ঘাঁটে মুগ্ধতা। যতদূর বুঝলো তুলতুল আদিলের কথা বলছে। মুগ্ধতা আওড়াল,
"চিনেছি। এবার বলো তোমার পুরো কথাটা।"
তুলতুল এতে যেন খুশি হলো । শুধালো,
"আমি একটা কাগজ দিবো উনাকে, আপনি হাতে দিবেন ম্যাম?"

লাঞ্চ টাইম শুরু হয়েছে। স্কুল মাঠ গিজগিজ করছে। বাহিরে যাওয়ার গেট ঘেঁষে বৃহদায়তন
জলপাই গাছ। গাছটির মধ্যিখানে চারপাশে সিমেন্টের তৈরি করা স্থানে আদিল বসে রয়েছে। মুগ্ধতা হ্যান্ড ব্যাগ কাঁধে করে হেঁটে সেখানে উপস্থিত হলো। আদিল বসা থেকে উঠে আওড়াল, " চলো আমার সঙ্গে।"
মুগ্ধতা দ্বিমত না করে পায়ে পায়ে আদিলের দিকে ঘেঁষে এলো। মৃদু আওয়াজে আওড়াল,
"চলো।"
ডেবডেব চোখ চারদিকের তাদের দিকে স্থির।
ফিসফিস চলছে কারো কারো তাদের কে নিয়ে। তন্মধ্যে মুগ্ধতা, আদিল স্কুল গেট অতিক্রম করলো।

কস্তুরির এতো এতো টেবিলের মধ্যে মাঝখানের প্রান্তে আদিল ও মুগ্ধতা একটি টেবিল দখল করে বসলো।
মেনু কার্ড দেখে আদিল অর্ডার করলো হাফ প্লেট করে দুই প্লেট কাচ্চি। সঙ্গে স্প্রাইট।
পিঠ টান টান করে চেয়ারে বসলো আদিল।
মেনুকার্ড টেবিলে রেখে প্রতিবারের মতো কমন প্রশ্ন শুধালো,
" কেমন কেটেছে আজ?"
ত্রিশ দিন ধরে এই কথা শুনছে মুগ্ধতা। প্রতিদিন একবার করে হলেও আদিল রাতে বা দিনে জিজ্ঞেস করবে কেমন কাটলো আজ। মুগ্ধতা তেতো কন্ঠে বলল,
"এই প্রশ্ন ছাড়া জীবনে তোমার কিছু নেই? "
মুগ্ধতার টেবিলে রাখা হাত দুটো আদিল চট করে নিজের হাতের আঁজলায় মুঠোবন্দি করল।
মুগ্ধতার নেত্র প্রশ্নবিদ্ধ! আদিল মুগ্ধতার হাতে ওষ্ঠ ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে মুগ্ধতার দিকে তাকিয়ে বলল,
" অনেক কিছু আছে আমার জীবনে, তুমি কোনটা শুনতে চাও মুগ্ধ।
আমায় জিজ্ঞেস করো। আমি বলবো।"
সহসা মুগ্ধতা কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। আদিল শব্দছাড়া মুগ্ধতার কাঁপুনি দেখে হাসলো।
মুগ্ধতা তার দুহাত সরিয়ে নিতে চাইলে আদিল আরও শক্ত হাতে ধরে রাখলো।
চোখে হেসে আদিল আওড়াল,
"আমার সংস্পর্শে এলে তুমি এখনো কাঁপো মুগ্ধ।"
আদিল আরেকবার অতল স্পর্শ করলো হাতে।
তারপর মুগ্ধতার হাত শিথিল করলো। মুগ্ধতা দ্রুত হাত গুটিয়ে নিল।

বিকাল চারটা ত্রিশে মুগ্ধতা বাড়ির ত্রিসীমায়
এলো। তিন তলা সিঁড়ি উঠার সময় মায়ের দুইতলা ফ্লাটের দিকে চোখ যায় বিনা দন্ডে।
বিয়ের পাঁচ বছর আসাআসি প্রায়। মা এখনো তাদের মানে নি।
কিন্তু যাদের নিয়ে সবচেয়ে ভয় ছিল মুগ্ধতা।
সেই আদিলের পরিবার প্রথম দিন তাকে সাদরে গ্রহণ করে।
কাজী অফিসে বাহিরেই চাচ্চু, চাচিমা আদিব মিষ্টি মুখ করলো।
মুগ্ধতার হাত ধরে আদিল। মুগ্ধতার মন , ভয়ে কু’ডাকছে।
নানা প্রশ্নে জর্জরিত মুগ্ধতার মস্তিষ্ক, প্রাণ। আদিলের পরিবার তাকে মানবে তো!
নাকি মায়ের মতো তাদের দূরছাই করবে। জেঠিমা এই খবর শোনার পর কি খুব কষ্ট পাবেন!
আদিব হাঁক ছাড়লো,
"আদিল রাত হয়ে গেছে। মুগ্ধতা কে নিয়ে এবার রওনা হ। আমাদের সঙ্গে দুটো গাড়ি৷ একটা নিয়ে যা। "
আদিল দ্বিমত না করে সহমত পোষণ করলো৷ কেননা রাতে এখানে সিএনজি পাওয়া দুষ্কর। আদিল বলল,
" ওকে ভাইয়া।"
জেঠিমার ফ্লাটের সদর দরজা মুখ বরাবর দাঁড়িয়ে মুগ্ধতা।
ভয়ে তটস্থ সে৷ ভিতর কুড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে ভ°য়। কি হবে না হবে ভাবতে পারছে না আর।
আদিল মুগ্ধতা কে আশ্বস্ত করছে হাত ধরে। তবুও টেনশনে মুগ্ধতা ঘামছে।
আদিল আশ্বস্ত করে মুগ্ধতাকে শুধালো,
" কিছু হবে না৷ আমি আছি তোমার সঙ্গে। প্লিজ ভয় পায় না লক্ষী।"
আদিল অনেকভাবে মুগ্ধতাকে বুঝিয়ে দরজায় নক করলো।
জেঠিমা সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুললেন।
আই ডোরে চোখ রেখে পরিক্ষা করলেন না কে এসেছে।
হয়ত তিনি জানতেন ওরা আসবে৷ হয়তবা অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘ মুহূর্ত তাদের আগমনের।
মুগ্ধতা কে আদিলের সঙ্গে পারভিন এই সময় এখানে দেখে ছিটেফোঁটা আশ্চর্য,
বিষ্ময় কোন কিছু পরিদৃষ্ট হতে দেখা গেল না।
বরং পারভিন বক্ষের এক পাশে মুগ্ধতা কে টেনে নিলেন অপর বক্ষে আদিল কে।
দুজনের ললাটে পর পর অধর ছুঁইয়ে পরম আবেশে শুধালেন,
" আজ আমার দুইটা সন্তান।"

চলবে...

No comments