Breaking News

অনুভূতিহীন । পর্ব - ২২



এভাবে ৩ দিন পেরিয়ে যায়। প্রতিদিন তিথির বাসায় ফিরতে রাত ৯,১০ টা বেজে যায়।

আজকে লাঞ্চের সময়
তিথি অরশকে বলেঃ স্যার আমাকে আজ বিকালে ছুটি দিবেন বাসায় যাওয়াটা খুব জরুরি।
অরশঃ তোমাকে বলেছি আমার আন্ডারে কাজ করতে হলে আমার নিয়মে করতে হবে, অথবা এই প্রজেক্ট ক্যান্সেল করে দেবো।

তিথিঃ স্যার এভাবে রাত করে বাসায় ফিরলে এই জব টা আমার পক্ষে নিয়মিত করা সম্ভব না।
অরশঃ তা হলে এই জব ছেড়ে অন্য যায়াগা চলে যাও।
তিথিঃ স্যার আপনি আমাকে এই জব ছেড়ে দিতে বলছেন?
অরশঃ হ্যাঁ আমি চাইনা তোমার মুখ দেখতে।
তিথিঃ স্যার প্লিজ এমন কিছু করবেন না। এই জবটা আমার খুব দরকার এই জব চলে গেলে অনেক সমস্যায় পড়ে যাবো। এইরকম আরেকটা জব পাওয়া খুব কষ্টকর। প্লিজ স্যার একটু রহম করুন বিকালে আমাকে ছুটি দেন প্লিজ।
অরশঃ ছুটি চাই তাইনা? তা হলে দুপুরের সেমিনার টা শেষ করো তখন দেখা যাবে।
তিথিঃ স্যার প্লিজ সেমিনার শেষ করে ছুটিটা দিয়েন
অরশঃ আচ্ছা যাও এতো করে যখন বলছ তখন ছুটি দিবো তোমার কথাটা শুনে খুব ইমোশনাল লাগছে। মন দিয়ে সেমিনার করো এখন।

লাঞ্চের পর মিটিংয়ে সময়।
অরশঃ সকলের উদ্দেশ্যে বলেঃ আজকে আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং হতে চলেছে সুতরাং সবাইকে ফোন বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি এবং যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলি মিটিং শেষ করে সবাই আমার সাথে দেখা করবেন কিছু কাজ আছে আজকে আমি আপনাদের সবাইকে ডিনার করাতে চাই সুতরাং রাতের আগে কেউ বাসায় ফিরতে পারবেন না।
অরশের প্রস্তাবে সকলে অনেক খুশি হলো শুধু তিথি খুশি না কারন তিথির বিকালে বাসায় ফিরতে হবে।
তিথি সবার উদ্দেশ্যে বলেঃ আমাদের এই প্রজেক্ট দারিদ্র্য মানুষের কল্যানে আমাদের যা প্রফিট হবে তার ৬০ শতাংশ আমরা গরিব দুক্ষিদের মাঝে বিলিয়ে দেব।

আসিফঃ ইয়েস, মানুষ হয়ে আমাদের সব সময় মানুষের পাশে থাকা উচিত। আমি একজন ম্যানেজার হয়ে সকল এম,ডি স্যার দের বিশেষ ভাবে অনুরোধ জানাচ্ছি আপনারা একটু সহনুভূতির হাত বাড়িয়ে দিবেন।
তিথিঃ মিঃ আসিফ আপনি সবাইকে অনুরোধ না জানিয়ে শুধু মাত্র আপনার স্যার শেখ অরশ সাহেবকে পরিবর্তন করুন তা হলেই হবে।

মির্জাঃ তিথি তুমি কি বলছো তুমি কি শেখ অরশের সম্পর্কে ভালোভাবে কিছু জানো? তুমি কি জানো শেখ অরশ চাইলে এই প্রজেক্ট বাতিল করে দিতে পারেন। আর তুমি উনাকে পরিবর্তন হওয়ার কথা বলছ?
তিথিঃ সরি স্যার আমাকে মাফ করবেন। উনার মত মানুষের দ্বারা মানুষের সেবা সম্ভব না। কারন উনার মাঝে ইমোশন বলে কিছুই নেই। ইমোশন না থাকলে কখনোই মানুষের সেবা করা যায়না।
অরশ তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেঃ স্টপ ননসেন্স। তুমি সাধারণ একজন কর্মচারী হয়ে আমার নামে এইসব বলার সাহস কোথায় পাও? মিঃ মির্জা আপনার এইসব ননসেন্স ইম্পোয়িকে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করলে আমি এই প্রজেক্ট ব্যন করে দেব।
মির্জাঃ অরশ প্লিজ শান্ত হন, কাউকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে যথাযথ অভিযোগ থাকা চাই। আর তিথির ক্ষেত্রে এমন কিছু হওয়ার প্রশ্নই আসেনা। তিথি অনেক ভালো একজন মানুষ সে খুব শত এবং আদর্শবান কর্মী। আপনার সাথে বেয়াদবি করার জন্য আমি তার হয়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

অরশঃ মি. মির্জা আমাদের এই প্রজেক্টে শত থাকা অবশ্যই বাধ্যতামূলক? কারন অশত ব্যক্তি কখনো মানুষের সেবা করতে পারেনা।
মির্জাঃ অবশ্যই শত এবং আদর্শবান হতে হবে। কিন্তু মি. অরশ আপনি হঠাৎ এই কথা বলছেন কেন?
অরশঃ আপনার এখানে অনেক চোর কর্মকর্তা রয়েছে তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি।
মির্জাঃ মুখ সামলে কথা বলুন মি. অরশ। আমার প্রতিজন কর্মচারী শত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে। আপনি তাদের নামে মিথ্যা অপবাদ দিলে আমি বদ্দাস্থ করবনা। দরকার হলে এই প্রজেক্ট থেকে সরে আসব।
অরশঃ কুল মি. মির্জা কুল। আপনার সবচাইতে ভালো শত ও আদর্শবান কর্মী হলেন মিসেস তিথি তাইনা?
মির্জাঃ অবশ্যই
অরশঃ তা হলে মিসেস তিথিকেই জিজ্ঞাসা করুন উনি আমার থেকে ২০ লাখ টাকা চুরি করেছে কি না।
মির্জাঃ অরশ ...
তিথিঃ মির্জা স্যার, অরশ স্যার যা বলেছে তা সত্য। আমি উনার থেকে ২০ লাখ টাকা চুরি করেছি (ছলছল নয়নে)
তখন অন্যান্য এম,ডি রা এক সাথে বলে ওঠেন মি. মির্জা আপনার এই কর্মীকে চাকরি থেকে বহিস্কৃত করা না হলে আমরা কেউ আপনার সাথে থাকবনা। আমরা কোন চোরকে সাথে রেখে কাজ করতে চাইনা।
চারিদিক থেকে একটাই প্রতিদ্ধনি ভেষে আসে তিথি চোর তিথি চোর তাকে বহিষ্কার করা হোক।
তিথি মাথা নিচু করে বাইরে বেরিয়ে যায়।
তিথি ভেবেছিলো আজ একটু তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবে কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে সেটা কল্পনা করা ছিলোনা।

তিথির পিছে অরশ আসে।
অরশঃ মিসেস তিথি কেমন দিলাম? (হেসে হেসে)
তিথিঃ আপনি এটাই চেয়েছিলেন যে আমি চাকরি ছেড়ে চলে যায় তাইনা? (মাথা নিচু করে)
অরশঃ না মিসেস তিথি, আমি চেয়েছিলাম তোমাকে সবার সামনে অপমান করে চাকরি থেকে তাড়িয়ে দিতে এবং সফল হয়েছি। বলেছিলাম না অরশের ২০ লাখ টাকা চুরি করে এতো শান্তিতে থাকা যায়না।
তিথিঃ ওহ বিশ লাখ বিশ লাখ বিশ লাখ কথাটা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন আমি ৫ মিনিটে আসছি।

৫ মিনিট পর তিথি অরশের সামনে একটা ব্যাগ এনে রাখে।
তিথিঃ এই নেন মি. অরশ।
অরশঃ কি আছে এতে?
তিথিঃ ২০ লাখ, আপনার কাছে অনেক দিন যাবত ঋনি ছিলাম আজ পরিশোধ করে দিলাম।
অরশঃ বাহ তোমার দেখছি অনেক টাকা হয়েছে ৫ মিনিটে ২০ লাখ নিয়ে আসছো।

তিথিঃ মি. অরশ আমি চাইলে এই মুহুর্তে আপনার অহংকার ভেংগে চুরমার করে দিতে পারি।
কিন্তু সম্ভব না কারন আপনার মাঝে বিবেক বলে কিছু নেই।
যাদের মাঝে বিবেক থাকেনা তারা কখনোই সুদ্রাতে পারেনা।
আপনি আজ আমার থেকে কি কেড়ে নিলেন সেটা আপনি কখনোই বুঝতে পারবেন না।
আপনার কাছে হয়তো এটা ছিলো সামান্য একটা চাকরি। কিন্তু আমার কাছে এটা ছিলো জীবন।
আপনি আমার সাথে যা যা করলেন তা কোন মানুষ করতে পারেনা সব কিছু ভুলে আজ আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।
যদিও আপনার কাছে প্রাইজ মানে শুধুই টাকা।
তবুও আপনার হৃদয় জাগ্রত করতে আরেকটিবার চেষ্টা করতে চেয়ে ছিলাম
কারনঃ আসিফের কাছ থেকে লাবণ্যের ব্যাপারে সব কিছু জেনেছি ।
আপনি লাবন্যের জন্য এই রুপ ধারন করেছেন।
আপনাকে একটা কথা বলিঃ আপনাকে দেওয়া প্রতিটি আঘাতের তিব্র প্রতিশোধ নেন।
তাই বলে কখনো জানোয়ার হয়ে যেওনা।
আপনাকে আজ জানোয়ারের সাথে তুলনা করতেও ঘৃনা হচ্ছে।
আপনার ফ্যামিলির প্রতিটি মানুষ আপনাকে অনুভূতিহীন বললেও আমি কখনো বলিনি
কারন আমার পূর্ণ বিশ্বাস ছিলো আমি আপনার অনুভূতি জাগাতে পারবো কিন্তু পারিনি।
আজ আমিও বলছি আপনি একটা অনুভুতিহীন মানব।

তিথি কান্না করতে করতে কথা গুলি বলছে। চোখের জল মুছে আবার বলতে লাগলোঃ যার কাছে চোখের জলের কোন মুল্য থাকেনা। তাকে চোখের জল দেখাতে নাই।
আপনাকে অনেক কিছু বলার ছিলো কিন্তু বলতে পারছিনা, নিজেই এখন অনুভূতিহীন হয়ে গেলাম।
আপনি আজ বিকালে আমায় ছুটি দিতে চেয়েছিলেন ধন্যবাদ এমন সুন্দর ছুটি উপহার দেওয়ার জন্য। আমার ছেলে বাসায় অপেক্ষা করছে আমি যায় তার কাছে। ভালো থাকুন। (তিথি চলে গেলো)

আসিফঃ স্যার আপনি কাজটা মনে হয় ঠিক করেননি।
অরশঃ আমি যা করেছি সবটা ঠিক করেছি। তবুও কেন জানি মনে হচ্ছে তিথি আমায় কিছু বলতে চাচ্ছিলো তবে বাদায় বলতে পারেনি। এই প্রথম বার আমি তিথির চোখের ভাষা বুঝতে পেরেছিলাম। অনেক কথা লুকিয়ে ছিলো সে চোখে। আসিফ আমি কি অনেক খারাপ? তিথি আমাকে জানোয়ারের সাথেও তুলনা করতে ঘৃনা করে। আজ কেন জানি মনে হচ্ছিলো নিজেকে তিথির মায়ায় জড়িয়ে ফেলি কিন্তু কেন পারিনি জানো? কারন তিথি এখন কারো স্ত্রী সন্তানের জননী। সে যদি আমাদের বৈবাহিক জীবন ভুলে নতুন করে স্বামী সন্তান নিয়ে বাচতে পারে তা হলে আমি কেন পারবনা?
আসিফঃ স্যার কি বলতে চাচ্ছেন?
অরশঃ আসিফ আজকেই বাংলাদেশ ব্যক করার ব্যবস্থা করো। আমি বিয়ে করতে চাই ধুমধাম করে বিয়ে হবে আমার তোমরা সবাই অনেক আনন্দ করবা।
আসিফঃ সত্যি বলছেন স্যার, ইয়াহুউউউ কি মজা হবে আপনার বিয়ে বলে কথা স্যার আগের দুইটা মিস করেছি এইটা মিস হবেনা।
অরশ ৩য় বিয়ে করতে ৬ বছর পর বাংলাদেশে রওনা হলো।

অপরদিকে তিথিও রওনা হয়েছে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।
গত কয় বছরে তিথি বাংলাদেশে গিয়েছে কয়েকবার। প্রতিবারে বাংলাদেশে যাওয়ার পিছনে তিথির একটাই কারন ছিলো, এবারো সেই কারনেই যাওয়া।
তিথি এখন দাঁড়িয়ে আছে কদমতলী এতিমখানার গেইটে। এর আগে অনেক বার এখানে এসেছে তিথি কিন্তু আজ কেন জানি ভিতরে প্রবেশ করতে ভয় লাগছে। এক বুক কষ্টা আর তিব্র হতাশা নিয়ে ভিতরে এসেছে তিথি। সাথে তার ছেলে ৫ বছরের অভ্র।
তিথিকে দেখে এতিমখানার খাদেম সাহেব এগিয়ে এলেন।
তিথিঃ আসসালামু আলাইকুম খাদেম সাহেব, কেমন আছেন।
খাদেমঃ ওয়ালাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো মা?
তিথিঃ ভালো আছি, বাচ্চাদের সবাইকে ডাক দেন ওদের জন্য কিছু খাবার এনেছি, কোথায় বাচ্চারা?
খাদেমঃ বাচ্চারা রহিমের সাথে খেলা করছে।
তিথিঃ রহিম ভাই কখন এসেছে।
খাদেমঃ রহিম সকালে এসেছে, তুমি ভিতরে আসো মা।
তিথিঃ জি চলেন। রহিম ভাইয়ে এসেছে ভালো হয়েছে উনি থাকলে কথা গুলি বলতে সহজ হবে।
খাদেমঃ তুমি কি বলবে মা?
(ভিতরে চলে এসেছে)

তিথিঃ রহিম ভাইকে ডাক দেন সব বলছি।
রহিম এসেঃ তিথি কেমন আছো তুমি
তিথিঃ আমি ভালো আছি আপনি কেমন আছেন।
রহিমঃ এইসব এতিম বাচ্চাদের কাছে এসে ভালো না থেকে উপায় আছে বলো? এই যে তোমার ছেলে অভ্র না?
তিথিঃ হ্যা ও আমার ছেলে অভ্র।
রহিমঃ কত বড় আর মিষ্টি হয়েছে । অভ্রের আব্বু আসেনি? তুমি হঠাৎ এই সময়ে এতিম খানায় এলে।
তিথিঃ রহিম ভাই আমি কিছু কথা বলতে এই অসময়ে এসেছি। আপনি থাকাতে সুবিদা হল।
রহিমঃ বলো কি কথা?
তিথিঃ রহিম ভাই আমি এতো দিন যা পেরেছি তা দিয়ে এই এতিম খানার সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছি।
রহিমঃ তোমার জন্যইতো বাচ্চারা এতো ভালো খাবার খেতে পারছে তুমি ওই নতুন ভবন টা করে দিয়েছো। তুমি ওদের জন্য অনেক করেছো।
তিথিঃ কিন্তু আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব না
রহিম, ও খাদেম এক সাথে বলে ওঠেনঃ তিথি তুমি একবার এই এতিম বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে কথা গুলো বলো। তুমি ওদের পাশে না থাকলে বাচ্চা গুলোর কি হবে?
তিথিঃ রহিম এবং খাদেম সাহেবকে সব কিছু খুলে বললেন।।।।।

চলবে......

No comments