Breaking News

ভালোবাসি প্রিয় । পর্ব - ০১



আমাদের মাঝে এখন গান নিয়ে আসছে নূর নাফিসা।

শিক্ষক বলার সাথে সাথে নাফিসা মঞ্চে উঠলো আর সবাই সিটি বাজিয়ে চিৎকার করে অভিনন্দন জানালো। আজ নবীন বরন প্রোগ্রাম ভার্সিটিতে। মেয়েটি তার সুরেলা কন্ঠে গান গেয়ে মুগ্ধ করে দিলো সবাইকে। শিক্ষকবৃন্দ পুরস্কারের ব্যবস্থাও করেছেন। সবশেষে গান গাইলো মেহেদী।

ভার্সিটির সব প্রোগ্রামে গানের জগতে চ্যাম্পিয়ন সে। ভার্সিটি থেকে বাইরের বিভিন্ন প্রোগ্রামেও অংশগ্রহণ করেছে সে। এই ভার্সিটি থেকেই অনার্স কমপ্লিট করে বর্তমানে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। শিক্ষকগণ সহ ভার্সিটির প্রায় সবাই চিনে তাকে। কিন্তু অবশেষে ফলাফল কি হলো! নাফিসা ফার্স্ট হলো কিভাবে! মেহেদী সেকেন্ড! বন্ধুরা পাশে দাড়িয়ে বলাবলি করছে নানান কথপোকথন! তাদের বিশ্বাস ছিলো প্রতিবারের মতো আজও মেহেদী ফার্স্ট হবে। আর এদিকে মেহেদী রাগে ফাটছে!

-এই মেয়ে উড়ে এসে জুড়ে বসলো কোথা থেকে! আগে তো দেখিনি তাকে। এতো বছরের চ্যাম্পিয়নকে অতিক্রম করে চলে গেলো সে! কে এই মেয়ে!
মেহেদীর বন্ধু আবিদ বলে উঠে,
- স্যারদের কোন আত্মিয় টাত্মিয় নয় তো আবার!
প্রত্যুত্তরে রিসাদ বললো,

- কি বলছিস! স্যার দের আত্মিয় ভার্সিটির প্রোগ্রামে পার্টিসিপ্যান্ট করবে কেন! আর পার্টিসিপ্যান্ট করলেই বা পুরস্কারের অধিকারী হবে কেন!
- আহ! নিজেরা এতো কথা না বলে ওই মেয়েকে বা স্যারদের জিজ্ঞেস কর না কোথা থেকে ধরে আনছে!
মেহেদী খুব বিরক্তি নিয়ে বন্ধুদের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে সেখান থেকে চলে গেলো সে। কিছু ভালো লাগছে না! এটা কিভাবে সম্ভব! লাগবে না তার এই পুরস্কার। গেইটের কাছাকাছি আসতেই সাউন্ড বক্সে মেহেদীর ডাক পড়লো পুরস্কার নেয়ার জন্য। সামনে আবার পড়লো এক স্যার!
- কোথায় যাচ্ছো মেহেদী? ওদিকে তোমাকে ডাকছে।
- এদিকটায়ই যাচ্ছিলাম স্যার।

- চলো স্টেজে।
অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পুরস্কার হাতে নিতে হলো। কষ্ট করে আর কাউকে খোঁজ নিতে হয়নি মেয়েটির। পরিচালক স্যার নিজেই পরিচয় করিয়ে দিলেন সবার সাথে।
- প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, নাফিসা হচ্ছে অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্রী। আমাদের ভার্সিটিতে নতুন। কোনো রকম প্রিপারেশন ছাড়াই আজ সে গান গেয়ে ১ম স্থান দখল করেছে। করতালির মাধ্যমে আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই....

সবাই করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানালো নাফিসাকে। অত:পর এককভাবে স্যার নাফিসাকে মেহেদীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
- নাফিসা, ও হচ্ছে মেহেদী। মাস্টার্স স্টুডেন্ট অর্থাৎ তোমাদের বড় ভাই। খুবই মেধাবী স্টুডেন্ট। আর ভার্সিটি প্রোগ্রামে গানের জগতে চ্যাম্পিয়ন!
- হ্যালো
পরাজয়ের অভিমান ও কষ্ট চাপা রেখে মুখে হাসি নিয়ে মেহেদীও প্রত্যুত্তরে হ্যালো জানালো।
সেদিন আর বেশিক্ষণ থাকেনি ভার্সিটিতে। দু-তিনদিন পর ভার্সিটি যাওয়ার পর শুধু নাফিসার গুনগান শুনছে সবার মুখে।

- দোস্ত মেয়ে তো এক গানেই চারিদিকে নাম ছড়িয়ে নিয়েছে!
- তো যা গিয়ে তোরাও পুরস্কার দিয়ে আয়।
- দূর...! আমি সেটা বলছি নাকি! এভাবে যদি সব প্রোগ্রামে গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করে তাহলে এমনও হতে পারে এক্সটার্নাল প্রোগ্রামে স্যার তোকে বাদ দিয়ে ওই মেয়েকে নিয়ে যাবে।
- ভার্সিটিতে তো নতুন তাই না?
- হুম
- এবার দেখ আমিও কি করি!
- কি করবি তুই?
- এতোদিন তোরা যা করতি আর আমি নিষেধ করতাম। এখন আমিও সেটা করবো।
- রেগিং!!!

- ইয়েস ব্রো....
- হাউ ইন্টারেস্টিং!
- আবিদ কইরে?
- ব্যাটা চাকরির পিছনে দৌড়ায়!
- এমন করে বলছিস কেন? তোর বা-*পের মতো তো আর সবার বাপ কোটিপতি না।
- সরি, আমি সেটা মিন করিনি। চাকরির জন্য এপ্লাই করছিলো না, আজ ইন্টারভিউ।
- ভালোই ভালোই টিকলেই হয়! আংকেল তো অসুস্থ। একটা চাকরি খুব দরকার ওর।
- তোর ও তো একটা দরকার। কোচিং এ আর কতো বেতন দেয়!
- আলহামদুলিল্লাহ, মাকে নিয়ে আমার এতেই দিন চলছে। তাছাড়া গান গাওয়া নিয়ে বড় একটা স্বপ্ন আছে। দেখি কি হয়...
- হুম।

এতোক্ষণ মেহেদী গেইটের পাশে আম গাছটার নিচে রিসাদের সাথে রিসাদের বাইকে বসে কথা বলছিলো। ৩য় ক্লাসের ঘন্টা পড়লে হঠাৎ দেখলো ব্যাগ কাধে নিয়ে নাফিসা একা একা গেইটের দিকে আসছে। চলে যাবে বোধহয়!
- রিসাদ, ওই মেয়েটা না? কি যেন নাম!
- হ্যাঁ, নাফিসা। আজকে আবার চশমা লাগিয়েছে! সেদিন তো ছিলো না!
- মেবি ব-*লদি টাইপ। হাহাহা....

- হাহাহা....
- ডাক এদিকে
- এই যে চশমাওয়ালী.... দোস্ত মেয়ে তো ফিরেও তাকায় না!
- এই মেয়ে! এই তোমাকে ডাকছি কানে যায় না কথা!
- আযব মেয়ে! কানে কালা নাকি!
নাফিসা কোন ভ্রুক্ষেপ না করে গেইটের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিলো।
- এই নাফিসা....
এবার নাফিসা তাদের দিকে তাকিয়ে তাদের কাছে এলো। রিসাদ ও মেহেদী পূর্বের ন্যায় একসাথে বাইকেই বসে আছে।
- জ্বি, বলুন

- কতোক্ষন ধরে ডাকছি! কানে শুনতে পাও না?
- এতোক্ষণ তো চশমাওয়ালী, এই মেয়ে এভাবে ডাকছিলেন। আমার নাম ধরে তো মাত্র ডাকলেন।
- ওহ! তোমাকে বারবার নাম ধরে ডাকলে তারপর সারা দিবে, তাই তো?
- অবশ্যই। মানুষের নাম রাখা হয় ডাকার জন্য।
রিসাদকে থামিয়ে এবার মেহেদী বলতে লাগলো,
- ভার্সিটিতে নতুন তুমি। তোমার নাম তো আমরা না ও জানতে পারি। এটা মাথায় নেই তোমার?
- হ্যাঁ এটা মাথায় আছে। আর এটাও মাথায় আছে, স্যার সেদিন আপনার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো। দুদিনের ব্যবধানে একটা নাম ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক নয়। এতো বেশি কথা না বলে ডেকেছেন কেন সেটা বলুন।

- অনেক তাড়া দেখাও আমাদের! চশমা পড়েছো কেন? এখনি চোখে দেখো না, বাকি দিন তো পড়েই আছে!
মেহেদী ও রিসাদ দুজনেই হাহাহোহো করে হেসে উঠলো।
- চশমা পড়বো কি পড়বো না এটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছে। এতে আপনাদেরকে নাক গলাতে হবে না। এসব ফা-*লতু কথা বলার জন্য আমাকে ডেকেছেন?

- বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলে জানো না সেটা! বে-*য়াদ-*ব মেয়ে।
- হ্যাঁ খুব ভালো করেই জানি। তাইতো আপনাদের এখনো আপনি বলে সম্বোধন করছি।
- খুব বেশি কথা বলতে জানো দেখছি! প্রথম তো ভেবেছিলাম ব-*লদি টাইপের মেয়ে! হাহাহা.... যাক আর সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না। আমার জু-*তোটা ধুলোয় মাখামাখি হয়ে গেছে। একটু পরিষ্কার করে দাও দেখি কেমন পারো! তোমার ওড়না দিয়ে করো, নাহলে আবার জু-*তো নষ্ট হয়ে যাবে। গান তো ভালোই গাইতে পারো দেখতে চাই বাকি কাজে কেমন পারদর্শী।

নাফিসা এবার কাছে এসে তার এক পা বাইকের চাকার উপর রেখে দাড়ালো। রিসাদ ও মেহেদী দুজনেই তাকে এভাবে দাড়াতে দেখে অবাক হয়ে নাফিসার দিকে তাকালো।
- আল্লাহ তায়ালা জু-*তো পড়ার জন্য আপনাকে যেমন দুটি পা দিয়েছেন আর ঠিক তেমনি তা পরিষ্কার করার জন্য দুটি হাতও দিয়েছেন। সো ডু ইট বাই ইউর হ্যান্ডস। গুড বাই....
কথাটা বলেই নাফিসা চাকার উপর থেকে পা সরানোর সময় পা দিয়ে বাইক ধাক্কা দিলো। এমনিতেই বাইকে দুজন বসে ছিলো। তারউপর অপজিট পাশে ঢাল হয়ে বাইক দাড়িয়ে ছিলো বিধায় নাফিসার পায়ের হালকা ধাক্কাতেই বাইকসহ দুজনেই উল্টে পড়ে গেলো। এরকম কাজে দুইবন্ধু হতম্বর!

- কি, এবার আমি হাসি! হিহিহিহি.... ভার্সিটির বড় ভাই হওয়ায় যদি ভেবে থাকেন ছোটদের রেগিং এ রাখবেন। তাহলে ভুলে যান ভাবনা। অন্তত নাফিসার ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হবে না। মাইন্ড ইট...
নাফিসা গেইটের বাইরে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে চলে গেলো। দুজনেই আস্তে আস্তে উঠে দাড়ালো। পেছনে ইট থাকায় মেহেদী কোমড়ে ব্যাথা পেয়েছে। রিসাদ ব্যাথা পায়নি। বালি ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিলো দুজনে।
- এএএ! আমার বাইক! আজ সকালে মাত্র ওয়াশ করে আনলাম!
- তোর বাইকের গুল্লি মারি। আমার কোমড় গেছে! ওই মেয়েরে তো ইচ্ছামত ওয়াশ করতে ইচ্ছা করতাছে!
- প্রায় ৫ বছর ধরে ভার্সিটিতে আছি। এমন মেয়ে চোখে একটাও পড়েনি।
- অতিরিক্ত সাহসী তাইনা! ভার্সিটি তো আসবেই, সাহসী গিরি বের করবো।
- এখন দয়া করে আমার বাইক তোল।

দুজনেই বাইক তুলে সোজা করলো। রিসাদ বাইক স্টার্ট করে দেখে নিলো ঠিক আছে কি না! মেহেদী পেছনে বসলো। রিসাদ মেহেদীকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। মেহেদী আস্তে আস্তে হেটে ঘরে প্রবেশ করলো। মেহেদীর মা বারান্দায় বসে সেলাই কাজ করছিলো। ছেলেকে আস্তে আস্তে খুড়িয়ে হাটতে দেখে মা জিজ্ঞেস করলো,
- কিরে এভাবে হাটছিস কেন? কি হইছে পায়ে?
- কিছু না।
- আমি তো দেখছি কিছু হইছে। পায়ে ব্যাথা পাইছস?
- না।
- তাহলে?
- কোমড়ে ব্যাথা পাইছি।

মেহেদী আর দাঁড়িয়ে না থেকে তার রুমে চলে গেলো। এখানে দাড়ালেই নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। জুতো খুলে ফ্যান ছেড়ে হাত পা ছড়িয়ে উল্টো হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। মেহেরুন্নেছা বেগম সেলাই কাজ ছেড়ে ব্যাথার মালিশ নিয়ে ছেলের রুমে এলো।
- কোনদিকে ব্যাথা, দেখা...
- মা, যাও তো। কিছু হয়নি, একটু পর ঠিক হয়ে যাবে।
- (ধমকের সুরে) কোনদিকে ব্যাথা?
- এদিকটায়...
মেহেরুন্নেছা মালিশ করতে করতে আবার বললো,
- কেমনে ব্যাথা পাইলি? মা-*রামা-*রি করছস?
- কি বলো এসব! মা-*রামা-*রি করবো কেন!
- ফুটবল খেলছস?
- না।

- ব্যাথা কি আর এমনি এমনি আইছে?
- পড়ে গেছি বাইক থেকে।
- কিহ! চলন্ত বাইক থেকে পড়ছস?
- না, রিসাদের সাথে স্থির বাইকে বসে ছিলাম। বাইক উল্টে পড়ে গেছি।
- কতোবার না করি বাইকের ধারে কাছে যাবি না। কতো এক্সিডেন্ট হয় এই বাইক থেকে। একটা কথাও শুনাতে পারিনা।
- মা, শুধু শুধু এতো টেনশন করো না তো। যাও তুমি, আমি ঘুমাবো।
মা চলে গেলে মেহেদী ভাবতে থাকলো কিভাবে নাফিসাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া যায়!

চলবে...

No comments

info.kroyhouse24@gmail.com