বাংলাদেশের বর্তমানে সেরা ১০টি দর্শনীয় স্থান


বাংলাদেশ একটি ছোট্ট দেশ হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। নদী, পাহাড়, সমুদ্র সৈকত, চা বাগান, হাওর এবং দ্বীপ—সবকিছু মিলিয়ে এদেশ একটি পর্যটনের স্বর্গ। অনেকে মনে করেন বাংলাদেশ শুধু নদীমাতৃক দেশ, কিন্তু আসলে এখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে যা বিদেশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে। আজকের এই ব্লগ পোস্টে আমি বিস্তারিত আলোচনা করব সেই ১০টি স্থান নিয়ে। যদি আপনি ভ্রমণপিপাসু হন, তাহলে এই পোস্টটি আপনার পরবর্তী ট্রিপের প্ল্যানিংয়ে সাহায্য করবে। চলুন, শুরু করা যাক!

১. সাজেক ভ্যালি (Sajek Valley)

সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর একটি, বিশেষ করে পাহাড়প্রেমীদের কাছে। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত এই উপত্যকা মেঘের রাজ্য হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত সাজেকে গেলে মনে হয় যেন মেঘের মাঝে হাঁটছেন। শীতকালে এখানে মেঘের চাদর বিছিয়ে থাকে, আর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য অবর্ণনীয়।

সাজেকে রয়েছে কংলাক পাহাড়, রুইলুই পাড়া, পাথরের ঝরনা এবং বিভিন্ন আদিবাসী গ্রাম। চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষেরা এখানে বাস করেন, তাদের সংস্কৃতি এবং জীবনযাপন দেখা একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। খাগড়াছড়ি থেকে জিপ গাড়িতে করে সাজেক যাওয়া হয়, রাস্তাটি নিজেই অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ। থাকার জন্য রয়েছে অনেক রিসোর্ট, যেমন সাজেক রিসোর্ট, আলো রিসোর্ট ইত্যাদি। খাবারে বাঁশের ভাত, পাহাড়ি মুরগি এবং বিভিন্ন আদিবাসী খাবার চেখে দেখতে ভুলবেন না। সাজেক এখন বাংলাদেশের টপ ট্যুরিস্ট স্পট, বিশেষ করে যুবকদের কাছে।

২. কক্সবাজার (Cox's Bazar)

বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার—এটি বাংলাদেশের গর্ব। প্রায় ১২০ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতটি বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত। সমুদ্রের নীল জল, বালুকাময় সৈকত এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য মুগ্ধ করে সবাইকে। কক্সবাজারে গেলে হিমছড়ি, ইনানী বিচ, মেরিন ড্রাইভ দেখতে হবে। মেরিন ড্রাইভ রোডটি সমুদ্রের পাশ দিয়ে যাওয়া একটি অপরূপ রাস্তা, যেখানে গাড়ি চালাতে চালাতে সমুদ্র দেখা যায়।

এছাড়া রয়েছে রাধানগর বিচ, লাবণী পয়েন্ট এবং বিভিন্ন হোটেল-রিসোর্ট। সীফুড খাওয়ার জন্য কক্সবাজার স্বর্গ। শুঁটকি, চিংড়ি, ইলিশ—সবকিছু তাজা পাওয়া যায়। পর্যটকদের জন্য ওয়াটার স্পোর্টস, প্যারাসেইলিং ইত্যাদি ব্যবস্থা রয়েছে। কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু, প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক আসেন এখানে।

৩. সেন্ট মার্টিন্স আইল্যান্ড (Saint Martin's Island)

সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড (Saint Martin's Island) বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত একটি ছোট্ট প্রবাল দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবং স্থানীয়ভাবে নারিকেল জিঞ্জিরা নামে পরিচিত—কারণ দ্বীপজুড়ে অসংখ্য নারকেল গাছ রয়েছে। কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপের আয়তন মাত্র ৮ বর্গকিলোমিটার। নীল সমুদ্রের স্বচ্ছ জল, সাদা বালুকাময় সৈকত, প্রবাল পাথর এবং শান্ত পরিবেশের জন্য এটি পর্যটকদের কাছে একটি স্বপ্নের গন্তব্য। ২০২৫ সালেও এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে রোমান্টিক এবং অপ্রত্যাশিত পর্যটন স্থানগুলোর একটি।

সেন্ট মার্টিনের ইতিহাস ও নামকরণ

দ্বীপের ইংরেজি নাম Saint Martin এসেছে ব্রিটিশ আমল থেকে—একজন ব্রিটিশ সার্ভেয়ারের নামানুসারে। আরব বণিকরা এটিকে ‘জাজিরা’ বলতেন। স্থানীয়রা ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ বলেন নারকেল গাছের জন্য। দ্বীপে স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ৪-৫ হাজার, যারা মাছ ধরা এবং পর্যটনের উপর নির্ভরশীল। ১৯৯৯ সালে এটিকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয় এবং প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করা হয় পরিবেশ রক্ষার জন্য।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য

সেন্ট মার্টিনের প্রধান আকর্ষণ তার প্রবাল প্রাচীর (কোরাল রিফ)। দ্বীপের চারপাশে জীবিত প্রবাল, বিভিন্ন রঙিন মাছ, সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী দেখা যায়। স্নরকেলিং করে এই প্রবাল দেখা একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। সৈকতের জল এতটাই স্বচ্ছ যে তলা পর্যন্ত দেখা যায়।

দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তে চেরা দ্বীপ—যা জোয়ারের সময় সমুদ্রে ডুবে যায় এবং ভাটায় উঠে আসে। এখানে পায়ে হেঁটে সমুদ্রের মাঝে যাওয়া যায়, প্রবাল পাথর সংগ্রহ করা যায়। চেরা দ্বীপের দৃশ্য অপূর্ব।

কীভাবে যাবেন সেন্ট মার্টিনে?

কক্সবাজার বা টেকনাফ থেকে: টেকনাফের জেটি থেকে শিপে (কর্ণফুলী, কেয়ারি সিন্দবাদ ইত্যাদি)। সময় ২-৩ ঘণ্টা, ভাড়া ৮০০-১৫০০ টাকা (কেবিন সহ)। অক্টোবর-এপ্রিল মৌসুমে জাহাজ চলাচল করে এবং বর্ষা মৌসুমে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকে।

ঢাকা থেকে: বাস বা ফ্লাইটে কক্সবাজার, তারপর টেকনাফ। দ্বীপে ঘুরতে সাইকেল ভাড়া করুন বা পায়ে হাঁটুন—কোনো যানবাহন নেই।

৪. কুয়াকাটা (Kuakata)

কুয়াকাটা বাংলাদেশের পটুয়াখালী জেলার একটি অপরূপ সমুদ্র সৈকত, যাকে বলা হয় সাগরকন্যা। এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো—একই জায়গা থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। এ কারণে এটি বিশ্বের বিরল সমুদ্র সৈকতগুলোর একটি। কক্সবাজারের মতো ভিড়ভাট্টা না থাকায় কুয়াকাটা শান্তি প্রিয় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য। এখানে রয়েছে লাল কাঁকড়ার দল, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, রাখাইন আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রাম, বৌদ্ধ মন্দির এবং ঝাউ বন। ২০২৫ সালেও কুয়াকাটা বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান, যেখানে প্রকৃতি তার পূর্ণ রূপে উন্মোচিত হয়।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রধান আকর্ষণ

কুয়াকাটার প্রধান আকর্ষণ তার লম্বা সৈকত এবং সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত। পূর্ব দিকে সমুদ্র থেকে সূর্য উঠে, পশ্চিমে ডুবে যায়—এ দৃশ্য অবর্ণনীয়। সৈকতে লাল কাঁকড়ার দল দেখা যায়, যা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।

প্রধান দর্শনীয় স্থান:

  • গঙ্গামতি ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট: সৈকতের কাছে ঘন ম্যানগ্রোভ বন, লাল কাঁকড়া এবং পাখির আবাস।
  • লেবুর চর ও ঝাউ বন: ঝাউ গাছের সারি সৈকতকে আরও সুন্দর করে। শান্ত পরিবেশে হাঁটা আদর্শ।
  • কুয়াকাটা বৌদ্ধ মন্দির: রাখাইনদের বড় বুদ্ধমূর্তি সহ মন্দির।
  • ফাতরার বন ও কেরানীপাড়া: ইকো ট্যুরিজম স্পট।
  • শুঁটকি পল্লী: শুঁটকি তৈরির গ্রাম দেখা যায়।

৫. জাফলং (Jaflong)

জাফলং সিলেট বিভাগের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও মনোরম পর্যটন স্থানগুলোর একটি। এটিকে বলা হয় পাহাড়ের কন্যা বা জিরো পয়েন্টের সৌন্দর্য। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলংয়ে রয়েছে স্বচ্ছ পিয়াইন (দাউকি) নদী, পাথরের স্তূপ, চা বাগান, ঝরনা এবং আদিবাসী খাসিয়া সম্প্রদায়ের গ্রাম। নদীর স্বচ্ছ জলে নৌকা ভাসিয়ে পাহাড়ের সবুজ দেখা, পাথর সংগ্রহের দৃশ্য এবং জিরো পয়েন্ট থেকে ভারতের দাউকি ব্রিজ দেখা—এসব মিলে জাফলং একটি অবিস্মরণীয় গন্তব্য। ২০২৫ সালেও এটি হাজারো পর্যটকের পছন্দের স্থান, বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের কাছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও প্রধান আকর্ষণ

জাফলংয়ের প্রধান আকর্ষণ তার স্বচ্ছ পিয়াইন নদী এবং পাথরের স্তূপ। নদীর জল এতটাই স্বচ্ছ যে তলা পর্যন্ত দেখা যায়, নৌকায় বসে পাথরের তলা দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে হাজারো শ্রমিক পাথর সংগ্রহ করে—এটি জাফলংয়ের একটি জীবন্ত দৃশ্য।

প্রধান দর্শনীয় স্পট:

  • জিরো পয়েন্ট: বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। এখান থেকে ভারতের দাউকি ঝুলন্ত ব্রিজ এবং মেঘালয়ের পাহাড় দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় অপূর্ব।
  • চা বাগান ও পাহাড়: চারদিকে সবুজ চা বাগান এবং খাসিয়া পাহাড়। হাঁটতে হাঁটতে মেঘের কাছাকাছি যাওয়ার অনুভূতি।
  • খাসিয়া পুঞ্জি: আদিবাসী গ্রামে গিয়ে তাদের জীবন দেখুন।
  • কাছে অন্যান্য: বিছনাকান্দি (পাথরের স্তূপ ও ঝরনা), তামাবিল (সীমান্ত)।

৬. শ্রীমঙ্গল (Srimangal)

শ্রীমঙ্গল (Srimangal বা Sreemangal) বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার একটি উপজেলা, যাকে বিশ্বব্যাপী চায়ের রাজধানী (Tea Capital of Bangladesh) বলা হয়। অসংখ্য চা বাগানের সবুজ গালিচা, লেবু বাগান, আনারস ক্ষেত, রেইন ফরেস্ট এবং আদিবাসী সংস্কৃতির মিশ্রণে শ্রীমঙ্গল একটি প্রকৃতির স্বর্গ। এখানে বাতাসে চায়ের সুবাস মিশে থাকে, আর চারদিকে সবুজের সমারোহ। ২০২৫ সালেও এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি, বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমী, চা প্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়দের কাছে। শ্রীমঙ্গলের চা বাগানগুলো বিশ্বের অন্যতম সুন্দর, যেখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যেন সবুজের সমুদ্রে ভাসছেন।

প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ

শ্রীমঙ্গলে অসংখ্য আকর্ষণ, কিন্তু কয়েকটি অবশ্যই দেখবেন:

  • চা বাগানসমূহ: জাফলং, ফিনলে, লাক্কাতুরা, মালনীছড়া ইত্যাদি চা বাগান। চা শ্রমিকদের জীবন দেখা, চা পাতা তোলা এবং সবুজের মাঝে হাঁটা অবিস্মরণীয়। সাইকেল বা রিকশায় ঘুরে দেখুন।
  • লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান (Lawachara National Park): শ্রীমঙ্গলের হৃদয়ে অবস্থিত এই রেইন ফরেস্টে রয়েছে হুলক বানর, বিভিন্ন পাখি (হর্নবিল), গিবন এবং ঔষধি গাছ। ট্রেকিং করে ঘুরুন, কাছাকাছি খাসিয়া পুঞ্জি দেখুন।
  • সাত রঙের চা (Seven Layer Tea): শ্রীমঙ্গলের সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ। নীলমণি টি স্টল বা রংধনু টি হাউসে পাওয়া যায় এই অলৌকিক চা—যেখানে এক গ্লাসে সাতটি লেয়ার (বিভিন্ন মশলা, দুধ, কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে)। আবিষ্কারক অস্ট্রিয়ান রমেশ রমেশের সৃষ্টি।
  • মাধবকুন্ড ঝরনা (Madhabkunda Waterfall): বড়লেখায় অবস্থিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝরনা। পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, চারপাশে ইকো পার্ক। বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর।
  • আনারস ও লেবু বাগান: শ্রীমঙ্গল আনারসের জন্য বিখ্যাত। বিভিন্ন বাগানে গিয়ে তাজা আনারস চেখে দেখুন। লেবু বাগানে খাসিয়া পুঞ্জি দেখা যায়।
  • অন্যান্য: হামহাম ঝরনা, বাইক্কা বিল, মণিপুরী পাড়া, চা গবেষণা ইনস্টিটিউট ইত্যাদি।

৭. তাঙ্গুয়ার হাওর (Tanguar Haor)

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত একটি বিশাল মিঠা পানির জলাভূমি। এটিকে বলা হয় বাংলাদেশের মা-হাওর বা জলের রাজ্য। আয়তন প্রায় ২,৮০০ হেক্টর (বর্ষাকালে আরও বড় হয়), যা এদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হাওর। চারদিকে মেঘালয়ের পাহাড়, নীল জলের বিস্তীর্ণ মাঠ, হিজল-করচের সোয়াম্প ফরেস্ট আর শীতকালে হাজারো অতিথি পাখির কলরব—এসব মিলে টাঙ্গুয়ার হাওর একটি অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার এটিকে ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালে রামসার সাইট (আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি) হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এটি বিশ্বের ১০০১টি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির একটি। ২০২৫ সালেও এটি প্রকৃতিপ্রেমী, পাখিপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্যগুলোর একটি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য

টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রধান আকর্ষণ তার বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি এবং সোয়াম্প ফরেস্ট। হিজল, করচ, বরুণ, পিতালি গাছের ঘন জঙ্গল জলে দাঁড়িয়ে থাকে, যা বর্ষায় এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। উত্তরে শিমুল বাগান, লাউয়াছড়া পাহাড় এবং মেঘালয়ের টিলা থেকে ঝরনা নেমে আসে।

শীতকালে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) হাওর অতিথি পাখির স্বর্গে পরিণত হয়। সাইবেরিয়া, ইউরোপ থেকে আসে হাঁস (রাজহাঁস, পাতি হাঁস, লালশির), বক, মাছরাঙ্গা, শামুকখোল ইত্যাদি। হাজার হাজার পাখির দল আকাশ ঢেকে ফেলে। স্থানীয় পাখির মধ্যে রয়েছে পানকৌড়ি, বালিহাঁস ইত্যাদি।

প্রধান দর্শনীয় স্পট:

  • নীলাদ্রি লেক ও ওয়াচ টাওয়ার: হাওরের সবচেয়ে উঁচু পয়েন্ট। টাওয়ার থেকে পুরো হাওরের প্যানোরামিক ভিউ।
  • জাদুকাটা নদী: মেঘালয় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ নদী।
  • লাউয়াছড়া ও শিমুল বাগান: ফুলের মৌসুমে লাল শিমুল ফুলে ভরা।
  • বড়ছড়া ঝরনা: ট্রেকিং করে যাওয়া যায়।

৮. রাঙামাটি (Rangamati)

বাংলাদেশের লেক সিটি, পাহাড় আর জলের অপরূপ মিলনমেলা। রাঙামাটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগের একটি মনোরম পাহাড়ি জেলা, যাকে বলা হয় লেক সিটি বা হ্রদের শহর। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের তিনটি জেলার মধ্যে একটি (অন্য দুটি বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি), রাঙামাটির আয়তন প্রায় ৬,১১৬ বর্গকিলোমিটার। এখানে প্রধান আকর্ষণ কাপ্তাই লেক—বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ, যা কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে তৈরি। চারদিকে সবুজ পাহাড়, নীল জল, আদিবাসী গ্রাম আর ঝুলন্ত ব্রিজ—এসব মিলে রাঙামাটি একটি স্বপ্নের জায়গা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ইত্যাদি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস এখানে, তাদের রঙিন সংস্কৃতি এবং হস্তশিল্প পর্যটকদের মুগ্ধ করে। ২০২৫ সালেও রাঙামাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলোর একটি, বিশেষ করে শান্তি আর প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে।

প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ

রাঙামাটিতে অসংখ্য স্পট, কিন্তু কয়েকটি অবশ্যদর্শনীয়:

  • কাপ্তাই লেক (Kaptai Lake): রাঙামাটির হৃদয়। বোটে করে ঘুরে দেখুন—চারদিকে পাহাড় আর দ্বীপ। সূর্যাস্তের সময় লেকের জল সোনালি হয়ে যায়।
  • হ্যাঙ্গিং ব্রিজ (Hanging Bridge): লেকের উপর ঝুলন্ত এই ব্রিজটি রাঙামাটির আইকন। হাঁটতে হাঁটতে নীচে লেক দেখা যায়—অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ।
  • রাজবন বিহার (Rajban Vihar): চাকমা রাজার তৈরি এই বৌদ্ধ বিহারটি অপূর্ব স্থাপত্যের। বড় বুদ্ধমূর্তি এবং শান্ত পরিবেশ।
  • শুভলং ঝরনা (Shuvolong Waterfall): লেক থেকে বোটে করে যাওয়া এই ঝরনাটি পাহাড় থেকে সরাসরি লেকে পড়ে। বর্ষায় সবচেয়ে সুন্দর।
  • অন্যান্য: ডিসি পার্ক (ট্যাবলেটন হিল), পলওয়েল পার্ক (হ্যাঙ্গিং ব্রিজের কাছে), ট্রাইবাল কালচারাল ইনস্টিটিউট মিউজিয়াম, তুকতুক ইকো ভিলেজ, কাপ্তাই ন্যাশনাল পার্ক ইত্যাদি। লেকে দ্বীপগুলো (যেমন তুকতুক দ্বীপ) ঘুরে দেখা যায়।

৯. বান্দরবান (Bandarban)

বাংলাদেশের পাহাড়ের রাজ্য, প্রকৃতির অপরূপ স্বর্গ বান্দরবান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রাম বিভাগের একটি পাহাড়ি জেলা, যাকে বলা হয় পাহাড়ের রাজধানী বা বাংলাদেশের ছাদ। চট্টগ্রাম হিল ট্র্যাক্টসের তিনটি জেলার মধ্যে একটি (অন্য দুটি রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি), বান্দরবানের আয়তন প্রায় ৪,৪৭৯ বর্গকিলোমিটার। এখানে রয়েছে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং (বা বিজয়, উচ্চতা প্রায় ১,০০০ মিটারের বেশি), ঘন জঙ্গল, ঝরনা, লেক, নদী এবং ১৫টিরও বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস। মারমা, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, খুমি ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এখানে মিশে গেছে প্রকৃতির সাথে। বান্দরবান শহর থেকে শুরু করে দূরবর্তী থানচি, রুমা, আলীকদম—সবখানেই অ্যাডভেঞ্চার আর শান্তির মিশ্রণ। ২০২৫ সালেও এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি, বিশেষ করে ট্রেকিংপ্রিয় যুবকদের কাছে।

প্রধান দর্শনীয় স্থানসমূহ

বান্দরবানে অসংখ্য স্পট, কিন্তু কয়েকটি অবশ্যই দেখবেন:

  • নীলগিরি (Nilgiri): বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রিসোর্ট এলাকা (প্রায় ৩,৫০০ ফুট)। মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটার অনুভূতি, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত অপূর্ব। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত, থাকার জন্য চমৎকার রিসোর্ট। কাছে ম্রো গ্রাম দেখা যায়।
  • কেওক্রাডং (Keokradong): বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চূড়া। রুমা থেকে ট্রেকিং করে যেতে হয়, ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ি পথ। শীর্ষে পৌঁছে মনে হয় স্বর্গে এসেছেন।
  • বগা লেক (Boga Lake): রুমা উপজেলায় অবস্থিত এই উঁচু লেকটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। নীল জল, চারপাশে পাহাড়। কাছে চিংড়ি ঝরনা। ট্রেকিং করে যাওয়া হয়, রাতে ক্যাম্পিং করা যায়।
  • জাদিপাই ঝরনা (Jadipai Waterfall): বান্দরবানের সবচেয়ে সুন্দর ঝরনাগুলোর একটি। উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আসা জলপ্রপাত, চারপাশে সবুজ জঙ্গল। ট্রেকিং করে যাওয়া।
  • অন্যান্য: চিম্বুক পাহাড়, নীলাচল (টাইগার হিল), মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স, শৈলপ্রপাত, গোল্ডেন টেম্পল (বুদ্ধ ধাতু জাদি), নাফাখুম ঝরনা, সাঙ্গু নদীতে বোটিং ইত্যাদি।

১০. নিঝুম দ্বীপ (Nijhum Island)

বাংলাদেশের নীরব স্বর্গ, প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে ওঠা একটি ছোট্ট দ্বীপ—নিঝুম দ্বীপ। নামটি শুনলেই মনে হয় নীরবতা আর শান্তির এক অপরূপ জায়গা। সত্যিই তাই! নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত এই দ্বীপটি প্রকৃতিপ্রেমী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় এবং শান্তি খোঁজা মানুষদের জন্য একটি আদর্শ গন্তব্য। এখানে নেই কক্সবাজারের মতো ভিড়, নেই বাণিজ্যিক পর্যটনের হৈচৈ—শুধু আছে ম্যানগ্রোভ বন, চিত্রল হরিণের দল, অতিথি পাখির কলরব, নীল সমুদ্রের ঢেউ আর অস্তগামী সূর্যের লালিমা। ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার এটিকে নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করে, যাতে এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়। আয়তন প্রায় ১৬,৩৪৫ হেক্টর—যার মধ্যে ম্যানগ্রোভ ফরেস্টই প্রধান আকর্ষণ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য

নিঝুম দ্বীপের প্রধান আকর্ষণ তার ম্যানগ্রোভ বন। কেওড়া, গেওয়া, বাইন, কাঁকড়া ইত্যাদি গাছের ঘন জঙ্গল সমুদ্রের লবণাক্ততা সহ্য করে দ্বীপকে সুরক্ষিত রাখে। এখানে বাস করে হাজার হাজার চিত্রল হরিণ (স্পটেড ডিয়ার)। ১৯৭০-এর দশকে মাত্র চার জোড়া হরিণ ছাড়া হয়েছিল, আজ তাদের সংখ্যা কয়েক হাজার। বিকেলে চৌধুরীর খাল বা কবিরাজের চরে গেলে হরিণের দল দেখা যায়—যা এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।

শীতকালে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) হাজারো অতিথি পাখি আসে—যা পাখিপ্রেমীদের স্বর্গ। এছাড়া বানর, বন্য শূকর, মাছরাঙ্গা, শামুকখোল ইত্যাদি প্রাণী দেখা যায়। সমুদ্র সৈকত লম্বা ও নির্জন—নামার বাজার বিচ, চৌধুরীর খাল, কবিরাজের চর, ডোমার চর, ভার্জিন বিচ ইত্যাদি জায়গায় সূর্যাস্ত দেখা অপূর্ব। সমুদ্রের নীল জল, সাদা বালু আর ম্যানগ্রোভের সবুজ মিলে এক চিত্রকল্পের মতো দৃশ্য। ২০১৯ সালে দ্বীপের আশেপাশের সমুদ্রকে মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া ঘোষণা করা হয়, যাতে হিলসা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষা পায়।

ভ্রমণের টিপস

বাংলাদেশের এই স্থানগুলো ঘুরতে গেলে সিজন মাথায় রাখুন। শীতকাল সবচেয়ে ভালো। পরিবেশ রক্ষা করুন, প্লাস্টিক ফেলবেন না। স্থানীয় খাবার চেখে দেখুন এবং সংস্কৃতি শ্রদ্ধা করুন।

এই ১০টি স্থান বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতিফলন। এই ব্লগটি পড়ে আরও অনুপ্রাণিত হোন এবং ঘুরে আসুন। বাংলাদেশের সৌন্দর্য উপভোগ করুন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url