খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থানসমূহ
খুলনা জেলা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি বিস্তীর্ণ ও বৈচিত্র্যময় অঞ্চল। এটি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম জেলা হিসেবে পরিচিত, যেখানে শিল্প-বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটেছে। রূপসা, ভৈরব, পশুর নদীসহ অসংখ্য নদ-নদী এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন এই জেলাকে বিশেষ করে তুলেছে। খুলনা শহরকে বলা হয় ‘শিল্প নগরী’, কিন্তু এর আশেপাশে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান যা প্রকৃতিপ্রেমী, ইতিহাসপ্রেমী এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের আকর্ষণ করে। ২০২৫ সালেও খুলনা জেলার পর্যটন সম্ভাবনা অপার—সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ষাট গম্বুজ মসজিদ পর্যন্ত। এই ব্লগ পোস্টে আমরা খুলনা জেলার সকল প্রধান দর্শনীয় স্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের প্ল্যানিং সহজ হয়।
১. সুন্দরবন: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন
খুলনা জেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই সুন্দরবন। এটি বিশ্বের বৃহত্তম উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন, যার একটি বড় অংশ খুলনা জেলায় পড়ে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃত এই বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। সুন্দরবনের গহীন জঙ্গল, খাল-বিল, সুন্দরী গাছের ঘন ছায়া এবং বন্যপ্রাণীর কলরব মুগ্ধ করে সবাইকে।
সুন্দরবনের প্রধান পর্যটন স্পটগুলো:
- করমজল: মংলা থেকে কাছে অবস্থিত এই স্পটে রয়েছে ওয়াইল্ডলাইফ ব্রিডিং সেন্টার। হরিণ, কুমির, বানর দেখা যায়। বোটিং করে ঘুরে দেখা যায়।
- কটকা: সমুদ্র সৈকত এবং ওয়াচ টাওয়ার। টাইগার এবং হরিণ দেখার সম্ভাবনা বেশি।
- হিরণ পয়েন্ট (নীলকমল): টাইগার, হরিণ, কুমির এবং পাখির জন্য বিখ্যাত। সমুদ্রের কাছে অবস্থিত।
- দুবলার চর: শীতকালে মাছ ধরার মেলা হয়। হরিণের দল দেখা যায়।
- কচিখালী: টাইগার ট্র্যাক এবং শান্ত পরিবেশ।
সুন্দরবনে যাওয়ার সেরা সময় অক্টোবর-মার্চ। খুলনা বা মংলা থেকে লঞ্চ বা ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে যাওয়া যায়। পরিবেশ রক্ষার জন্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ।
২. ষাট গম্বুজ মসজিদ: ঐতিহাসিক স্থাপত্যের রত্ন
বাগেরহাটে অবস্থিত ষাট গম্বুজ মসজিদ (প্রকৃতপক্ষে ৭৭ গম্বুজ বিশিষ্ট) খুলনা জেলার অন্যতম গর্ব। ১৫শ শতাব্দীতে খান জাহান আলী নির্মিত এই মসজিদ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। এর বিশাল আকার, টেরাকোটা শিল্পকর্ম এবং ৬০টি স্তম্ভ মুগ্ধ করে। কাছে রয়েছে খান জাহান আলীর মাজার এবং ঘোড়াদিঘি। খুলনা থেকে বাসে সহজে যাওয়া যায়।
৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি (দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগ)
রূপসা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে রয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি। এখানে কবির স্মৃতি বিজড়িত কুঠিবাড়ি এবং জমিদার বাড়ি দেখা যায়। পিঠাভোগে রবীন্দ্রের পূর্বপুরুষের বসতভিটা। সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য অবশ্যদর্শনীয়।
৪. খান জাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু)
রূপসা নদীর উপর নির্মিত এই সেতু খুলনার আইকন। দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৬ কিলোমিটার। সেতু থেকে নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। সন্ধ্যায় লাইটিং দেখার জন্য জনপ্রিয়।
৫. শহীদ হাদিস পার্ক এবং অন্যান্য পার্ক
খুলনা শহরের শহীদ হাদিস পার্ক একটি জনপ্রিয় বিনোদন কেন্দ্র। ওয়াচ টাওয়ার থেকে শহরের ভিউ দেখা যায়। এছাড়া বনবিলাস চিড়িয়াখানা (গিলাতলা), জাতীয় শিশু পার্ক ইত্যাদি পরিবারের সাথে ঘুরে দেখার জন্য আদর্শ।
৬. গল্লামারী ও চুকনগর বধ্যভূমি
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানগুলো ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। গল্লামারীতে শহীদ স্মৃতিসৌধ রয়েছে।
৭. অন্যান্য আকর্ষণ: পুটনী দ্বীপ, ভূতিয়ার পদ্মবিল ইত্যাদি
খুলনায় রয়েছে পুটনী দ্বীপ (সুন্দরবনের কাছে), ভূতিয়ার পদ্মবিল (পদ্ম ফুলের জন্য বিখ্যাত) এবং মংলা বন্দর।
ভ্রমণ টিপস
খুলনা যাওয়ার সেরা সময় শীতকাল। ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানে যাওয়া যায়। থাকার জন্য খুলনা শহরে অনেক হোটেল-রিসোর্ট। খাবারে তাজা মাছ, চিংড়ি চেখে দেখুন। পরিবেশ রক্ষা করে ঘুরুন।
খুলনা জেলা প্রকৃতি ও ইতিহাসের এক অপরূপ সমন্বয়। এখানে এসে আপনি হারিয়ে যাবেন সুন্দরবনের গহীনে বা ষাট গম্বুজের ছায়ায়। পরবর্তী ছুটিতে খুলনা ঘুরে আসুন!
