একটি চালাক খরগোশের গল্প

পুরনো জঙ্গলের সবুজ ঘাসের মাঠে, যেখানে ছোট ছোট ঝোপ আর গর্তের সারি, সেখানে থাকত এক খরগোশ। তার নাম ছিল ছুটন্ত। ছুটন্ত শুধু দ্রুত দৌড়াতে পারত না, সে ছিল অত্যন্ত চালাক, ধৈর্যশীল, পর্যবেক্ষক এবং সুযোগের সদ্ব্যবহারকারী। তার কান দুটো ছিল লম্বা ও সতর্ক, চোখ দুটো ছিল তীক্ষ্ণ। জঙ্গলের বড় বড় প্রাণীরা তাকে দেখে হাসত, কিন্তু গোপনে তার বুদ্ধির প্রশংসা করত। কারণ ছুটন্ত কখনো অকারণে ঝগড়া করত না, কিন্তু নিজেকে ও অন্যদের বাঁচাতে যেকোনো চালাকি করতে পারত।

গল্প শুরু হয় এক শীতের সকালে। জঙ্গলে তখন কুয়াশা ঘন। ছুটন্ত তার গর্ত থেকে বেরিয়ে ঘাস খাচ্ছিল। হঠাৎ দূর থেকে শোনা গেল ভয়ংকর গর্জন। জঙ্গলের নতুন বাঘ — কালো বাঘ এসেছে। কালো বাঘ খুব নিষ্ঠুর। সে বলে দিয়েছে, “প্রতিদিন একটা প্রাণী আমাকে খাবার দিতে হবে, নইলে সবাইকে মেরে ফেলব।” জঙ্গলের প্রাণীরা ভয়ে কাঁপছে।

ছুটন্ত ভাবল, “শক্তি দিয়ে এই বাঘকে হারানো যাবে না। বুদ্ধি লাগবে।” সে তার বন্ধু কাঠবিড়ালি ও খরগোশদের ডেকে একটা পরিকল্পনা করল।

পরদিন সকালে ছুটন্ত কালো বাঘের কাছে গেল। মাথা নিচু করে বলল, “মহারাজ, আমি ছুটন্ত। আপনার জন্য বিশেষ খাবারের খবর এনেছি। কিন্তু সেটা বলার আগে একটা ছোট পরীক্ষা করতে চাই।”

বাঘ হাসল, “কী পরীক্ষা?” ছুটন্ত বলল, “আপনি যদি সত্যিই রাজা হন, তাহলে আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করুন। যদি আমি জিতি, তাহলে আমার কথা শুনবেন।”

বাঘ গর্ব করে রাজি হল। ছুটন্ত বলল, “কিন্তু দৌড় শুরু হবে ওই ঝোপের ওপার থেকে।” বাঘ ঝোপের কাছে গেল। ছুটন্ত আগে থেকে তার অন্য বন্ধু খরগোশদের লুকিয়ে রেখেছিল। বাঘ যখন দৌড় শুরু করল, তখন এক খরগোশ সামনে থেকে দৌড়াতে লাগল। বাঘ ভাবল এটাই ছুটন্ত। ছুটন্ত তখন পাশের ঝোপ দিয়ে অনেক আগে চলে গিয়ে অপেক্ষা করছিল। বাঘ অনেক দূর দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ছুটন্ত সামনে থেকে হেসে বলল, “মহারাজ, আমি জিতেছি। এখন আমার কথা শুনুন।”

বাঘ অবাক হয়ে বলল, “বল।” ছুটন্ত বলল, “জঙ্গলের ওপারে একটা মোটা হরিণ আছে। কিন্তু সেখানে যেতে হলে আমার সাহায্য লাগবে। আমি আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।” বাঘ রাজি হল। ছুটন্ত তাকে নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা গভীর খাদের কাছে নিয়ে গেল। খাদের উপর পাতলা ঘাস ছিল। ছুটন্ত হালকা শরীরে লাফিয়ে পার হয়ে গেল। বাঘ ভারী শরীরে পা দিতেই ধসে পড়ল খাদে। ছুটন্ত উপর থেকে বলল, “মহারাজ, এখানেই আপনার খাবার আছে। চিরকালের জন্য!” জঙ্গল বাঁচল।

এই চালাকির পর ছুটন্তর নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সবাই বলাবলি করতে লাগল, “ছোট খরগোশের বুদ্ধি সিংহের থেকেও বড়।”

কিন্তু ছুটন্তের জীবন শুধু বাঘ মারা নয়। একদিন সে জঙ্গলের পাশের গ্রামে গেল। গ্রামের এক বাগানে ছিল সুস্বাদু গাজর ও শাকসবজি। বাগানের মালিক ছিল এক বুড়ো চাষী, যে খরগোশ তাড়াতে কুকুর রেখেছিল। ছুটন্ত প্রথমে কুকুরের সাথে বন্ধুত্ব করল। সে কুকুরকে বলল, “ভাই কুকুর, তুমি সারারাত জেগে পাহারা দাও। আমি তোমাকে রোজ হাড় এনে দেব। তুমি শুধু ঘুমিয়ে পড়ো।”

কুকুর লোভে রাজি হল। ছুটন্ত প্রথম কয়েকদিন হাড় এনে দিল। কুকুর ঘুমিয়ে পড়লে ছুটন্ত বাগান থেকে গাজর, শাক নিয়ে তার গর্তে জমা করল। একদিন চাষী কুকুরকে মারতে এলে ছুটন্ত কুকুরকে সাহায্য করে পালিয়ে গেল। এভাবে সে অনেকদিন গ্রাম থেকে খাবার জোগাড় করল এবং জঙ্গলের ছোট প্রাণীদের ভাগ করে দিল।

এরপর ছুটন্তের জীবনে প্রেম এল। জঙ্গলের অন্য পাশে থাকত এক সুন্দরী খরগোশী — নাম লাবণ্য। লাবণ্য খুব চটপটে ও বুদ্ধিমতী। ছুটন্ত তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল। লাবণ্যর বাবা ছিলেন এক বুড়ো খরগোশ, যিনি বলেছিলেন, “যে খরগোশ তিনটি কঠিন চ্যালেঞ্জ জিতবে, তাকেই লাবণ্যকে দেব।”

প্রথম চ্যালেঞ্জ: বাঘের গুহা থেকে একটা দাঁত এনে দেওয়া। ছুটন্ত বুড়ো বাঘের (যে আগের রাজা ছিল) গুহার কাছে গেল। সে জোরে জোরে চিৎকার করে বলল, “বাঘ মহারাজ! আপনার গুহায় আগুন লেগেছে!” বাঘ ভয় পেয়ে বেরিয়ে এলে ছুটন্ত তার মুখের সামনে একটা জ্বলন্ত মশাল (গাছের শুকনো ডাল জ্বালিয়ে) দেখাল। বাঘ ভয়ে মুখ হাঁ করলে ছুটন্ত দ্রুত একটা দাঁত ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে গেল।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ: নদীর ওপার থেকে সোনালি মাছ ধরে আনা। নদীতে ছিল কুমির। ছুটন্ত একটা বড় কলাগাছের ভেলা বানাল। ভেলায় করে নদী পার হওয়ার সময় সে কুমিরকে বলল, “কুমির ভাই, তোমার পিঠে একটা সোনালি মাছ লেগে আছে। আমি তুলে দিচ্ছি।” কুমির মুখ খুললে ছুটন্ত একটা সোনালি পাথর ছুড়ে দিয়ে মাছ ধরে নিয়ে চলে এল।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ: চাঁদের আলো ধরে আনা। ছুটন্ত পূর্ণিমার রাতে একটা ঝিলের কাছে গেল। ঝিলের জলে চাঁদের প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছিল। সে জলে একটা বড় চকচকে পাথর ফেলে ছিটকে ওঠা পানি ধরে একটা চকচকে শামুকের খোলস তুলে নিয়ে বলল, “এই তো চাঁদের আলো!” লাবণ্যর বাবা খুশি হয়ে তাদের বিয়ে দিলেন।

ছুটন্ত ও লাবণ্য মিলে একটা বড় ও আরামদায়ক গর্ত বানাল। তারা অনেক ছানার জন্ম দিল। ছুটন্ত তার ছানাদের শেখাত, “দৌড়ানোর চেয়ে বুদ্ধি দিয়ে সমস্যা সমাধান করা অনেক ভালো।”

কিন্তু জঙ্গলে আবার বিপদ এল। একটা বিশাল দানব এসে জঙ্গলের ঘাস ও গাছ খেয়ে শেষ করে দিচ্ছিল। প্রাণীরা না খেয়ে মরতে বসেছিল। ছুটন্ত সবাইকে জড়ো করে বলল, “আমরা একত্রিত হয়ে লড়ব।”

পরিকল্পনা ছিল:

  • পাখিরা দানবের চোখে ধুলো ছুড়বে।
  • বানররা গাছ থেকে ফল ও পাথর মারবে।
  • হাতিরা পেছন থেকে ধাক্কা দেবে।
  • ছুটন্ত নিজে দানবের সামনে গিয়ে বলবে, “দানব রাজা, আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু পাহাড়ের ওপারে। আমি আপনাকে নিয়ে যাব।”

দানব লোভে ছুটন্তের পিছু নিল। ছুটন্ত তাকে নিয়ে একটা বিশাল কাদার জায়গায় নিয়ে গেল। ছুটন্ত হালকা শরীরে লাফিয়ে পার হয়ে গেল। দানব ভারী শরীরে কাদায় আটকে গেল। ছুটন্ত ও তার বন্ধুরা মিলে পাথর ছুড়ে দানবকে আরও গভীরে ডুবিয়ে দিল। দানব আর উঠতে পারল না।

জঙ্গল আবার সবুজ হয়ে উঠল। সব প্রাণী ছুটন্তকে সম্মান দিল। ছুটন্ত একটা নিয়ম চালু করল — প্রতি মাসে সবাই মিলে খাবার ভাগ করে খাবে। ছোট প্রাণীদের জন্য আলাদা নিরাপদ জায়গা বানাল।

একবার ভয়ঙ্কর খরা এল। পানি শুকিয়ে গেল। ছুটন্ত তার দল নিয়ে দূরের পাহাড়ে একটা ঝরনার খোঁজ পেল। সবাই মিলে খাল কেটে জল আনল। জঙ্গল বেঁচে গেল।

ছুটন্ত বুড়ো হলে তার ছানাদের ডেকে বলল, “বাবারা, মনে রেখো — ছোট শরীর মানে ছোট বুদ্ধি নয়। পর্যবেক্ষণ করো, ধৈর্য ধরো, সুযোগ তৈরি করো এবং সবসময় ভালোর জন্য চালাকি করো।”

এক শান্ত সন্ধ্যায় লাবণ্যর পাশে বসে ছুটন্ত চোখ বন্ধ করল। জঙ্গলে শোক নামল, কিন্তু তার গল্প চিরকাল বেঁচে রইল। আজও খরগোশেরা তাদের ছানাদের ছুটন্ত খরগোশের চালাকির গল্প শোনায়।

গল্পের শিক্ষা

চালাকি যখন সঠিক কাজে লাগে, তখন তা শুধু নিজেকে নয়, পুরো সমাজকে রক্ষা করে। ছুটন্ত খরগোশ আমাদের শেখায় যে, আকার নয়, বুদ্ধি ও সাহসই আসল শক্তি।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url