তিন বন্ধুর শেয়ার মার্কেটে আকাশ ছোয়া স্বপ্ন

মোশাররফ, হাসান মিয়া আর রনি—তিন বাটপারের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। জেল থেকে বেরিয়ে তারা সত্যি সত্যি “ভালো” হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ভালো হওয়া তো সহজ কথা নয়। টাকা চাই, সম্মান চাই, আর সবচেয়ে বড় কথা—রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন।

একদিন বিকেলে চায়ের দোকানে বসে মোসা ভাই চশমা ঠিক করতে করতে বলল, “ভাইয়েরা, এবার শেয়ার মার্কেট।”

হাসান মিয়া তার বিশাল পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “শেয়ার? ওই যেখানে একদিনে লাখ টাকা লাভ হয়?”

রনি সন্দেহের চোখে তাকাল, “আর লোকসানও তো হয় একদিনে। শুনছি অনেকে ঘরবাড়ি বিক্রি করে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।”

মোসা ভাই হাসল, “আরে বোকা! আমরা কি সাধারণ মানুষ? আমরা তিন বাটপার। আমরা যদি শেয়ার খেলি, তাহলে বাজারই আমাদের কাছে হারবে।”

তিনজন মিলে প্রথমে ছোট ছোট করে শুরু করল। মোসা ভাইয়ের শালা একটা ব্রোকারেজ হাউজে কাজ করত। সে বলল, “ভাইয়া, এই কোম্পানির শেয়ার কিনুন। আগামী মাসে দ্বিগুণ হবে।”

প্রথম মাসে সত্যি সত্যি লাভ হলো। মোসা ভাই ৫০ হাজার টাকা ইনভেস্ট করে ৭৫ হাজার করল। হাসান মিয়া তার অপারেশনের পর জমানো টাকা ঢেলে ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার করল। রনি সবচেয়ে সাবধানী ছিল, সে মাত্র ৩০ হাজার দিয়ে ৪৫ হাজার করল।

তিনজনের চোখ চকচক করতে লাগল। রাতে ফোনে কনফারেন্স কল।

“ভাই, এবার বড় খেলা।” মোসা ভাই উত্তেজিত। “সব টাকা ঢালব।” হাসান মিয়া। “আমি একটু সাবধানে...” রনি।

কিন্তু লোভ বড় শত্রু। মোসা ভাই তার স্ত্রী রোবেনার গয়না বন্ধক রেখে ৩ লাখ টাকা তুলল। হাসান মিয়া তার বাড়ির কিস্তির টাকা থেকে ৪ লাখ জোগাড় করল। রনি তার বোনের বিয়ের জন্য জমানো ২ লাখ টাকা নিয়ে নিল। মোট প্রায় ১০ লাখ টাকা।

তারা একটা “হট টিপ” পেল। একটা নতুন কোম্পানি— “ফিউচার টেক”। বলা হচ্ছে, এই কোম্পানি বিদেশ থেকে বড় ইনভেস্টমেন্ট পাবে। শেয়ারের দাম আকাশছোঁয়া হবে।

পুরো টাকা ঢেলে দিল তিনজন। প্রথম সপ্তাহে দাম ১৫% উঠল। তারা লাফাতে লাফাতে দোকানে গিয়ে হালিম খেল। হাসান মিয়া বলল, “এবার আমি নতুন গাড়ি কিনব।” মোসা ভাই বলল, “আমি ছেলের জন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল।” রনি চুপ করে হাসল।

কিন্তু তারপর যা হলো, তা ছিল স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

ধস নামল

একদিন সকালে মোবাইলে নোটিফিকেশন এল—শেয়ারের দাম ৮% কমেছে। মোসা ভাই বলল, “কোনো সমস্যা নাই, মার্কেট ওঠানামা করে।”

দ্বিতীয় দিন আরও ১২% কম। হাসান মিয়া ঘামতে শুরু করল। রনি বলল, “ভাই, বের করে নেই?”

মোসা ভাই ধমক দিল, “এখন বের করলে লোকসান। আরেকটু দেখ।”

তৃতীয় দিন বাজারে খবর ছড়াল—কোম্পানির চেয়ারম্যান বিদেশে পালিয়েছে। অডিটে বড় গণ্ডগোল। শেয়ার সাসপেন্ড হয়ে গেল। যখন আবার ট্রেডিং শুরু হলো, দাম নেমে গেছে ৭০%।

তিনজনের মোট ১০ লাখ টাকার মধ্যে বাকি রইল মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

হাসান মিয়া বাড়িতে গিয়ে চুপ করে বসে রইল। তার স্ত্রী দোলি জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?” সে কিছু বলতে পারল না। শুধু চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। সেই হাসান মিয়া, যে কখনো কাঁদে না।

মোসা ভাইয়ের বাড়িতে ঝড় বয়ে গেল। রোবেনা চিৎকার করছে, “আমার গয়না! আমার ছেলের ভবিষ্যৎ! তুমি বাটপারি করতে গিয়ে সব শেষ করলা!”

মোসা ভাই চশমা খুলে টেবিলে রেখে বলল, “আমি ভাবছিলাম...”

রনির বোন কাঁদতে কাঁদতে বলল, “দাদা, আমার বিয়ের টাকা... এখন কী হবে?”

তিন বন্ধুর রাত

সেই রাতে তিনজন কোথাও যায়নি। প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়িতে বসে ছিল। কিন্তু ফোনে কথা হচ্ছিল।

মোসা ভাই বলল, “ভাইয়েরা, সব আমার দোষ। আমি তোমাদের উসকে দিয়েছি।”

হাসান মিয়া গলা ভেঙে বলল, “না ভাই। আমি তো লোভে পড়ে সব ঢেলে দিয়েছি।”

রনি চুপ করে শুনছিল। তারপর বলল, “আমরা তিনজন একসাথে ছিলাম। লাভ হলে একসাথে, লোকসানও একসাথে। এখন কী করব?”

তিনজনই চুপ। অনেকক্ষণ পর মোসা ভাই বলল, “কাল সকালে চায়ের দোকানে দেখা করি।”

পরদিন

চায়ের দোকানে তিনজন বসেছে। চোখ লাল, মুখ শুকনো। দোকানদার জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে ভাই? অসুস্থ লাগতেছে।”

হাসান মিয়া হাসার চেষ্টা করল, “অসুস্থ না, দেউলিয়া।”

মোসা ভাই একটা কাগজ বের করল। “আমি হিসাব করেছি। আমাদের এখনো ২ লাখ ৮০ হাজার আছে। এটা দিয়ে আমরা ছোট একটা ব্যবসা শুরু করতে পারি। মুদি দোকান, কিংবা ফলের দোকান।”

রনি মাথা নেড়ে বলল, “আর শেয়ার না?”

“না।” তিনজন একসাথে বলল।

কিন্তু মানুষের লোভ সহজে মরে না। বিকেলে আবার একটা নতুন টিপ এল। কেউ বলল, “এবার সত্যি সোনার খনি।” তিনজন তাকাল একে অপরের দিকে।

মোসা ভাই হাসল, “না ভাইয়েরা। এবার না। এবার আমরা সত্যি সত্যি খাটব।”

ছয় মাস পর

তিনজন মিলে একটা ছোট সুপার শপ খুলেছে। নাম দিয়েছে “তিন বন্ধু স্টোর”। সকালে হাসান মিয়া মাল আনে, মোসা ভাই হিসাব রাখে, রনি কাস্টমারদের সাথে কথা বলে।

লাভ কম, কিন্তু ঘুম ভালো। রোবেনা এখন আর চিৎকার করে না। হাসান মিয়ার স্ত্রী দোলি প্রতিদিন দোকানে খাবার পাঠায়। রনির বোনের বিয়ে হয়ে গেছে—টাকা ধার করে হলেও।

একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করে তিনজন ছাদে বসেছে। মোসা ভাই বলল, “জানো, শেয়ার মার্কেটে যে লোকসান হয়েছে, সেটা টাকার চেয়ে বড় শিক্ষা দিয়েছে।”

হাসান মিয়া হাসল, “আর কখনো লোভ করব না।”

রনি চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু যদি কোনোদিন আবার...”

তিনজন হেসে উঠল। কারণ তারা জানে, বাটপারের রক্ত একেবারে মরে না। শুধু একটু ঘুমিয়ে থাকে।

শেষ

শেয়ার মার্কেট শুধু টাকা নয়, স্বপ্ন আর ভয়ের খেলা। যারা লোভ সামলাতে পারে, তারাই টিকে থাকে। আর যারা পারে না, তারা হয়তো একদিন আবার নতুন করে শুরু করে—যেমন তিন বাটপার করেছিল।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url