তিন বাটপারের কমেডি গল্প

অধ্যায় ১: সকালের যানজট বাটপারি

ঢাকা শহরের সকাল। সূর্য উঠেছে কিন্তু রাস্তায় যেন রাতের অন্ধকার লেগে আছে। গাড়ির হর্ন, ধুলো, আর মানুষের চিৎকার মিলে এক অদ্ভুত সিম্ফনি তৈরি করেছে। এই সিম্ফনির মাঝে তিনজন বীরপুরুষ বসে আছে একটা সাদা মাইক্রোবাসে।

মোশাররফ, যাকে সবাই চেনে “মোসা ভাই” নামে। লম্বা, চশমা পরা, মুখে সবসময় একটা চালাক হাসি। পাশে এ কে এম হাসান, যাকে বলা হয় “হাসান মিয়া” – মোটা, গোলগাল, সবসময় খিটখিটে। আর পেছনে রাউনক হাসান, “রনি” – স্লিম, চুপচাপ কিন্তু যখন মুখ খোলে তখন আগুন। এরা তিনজনই “বাটপার”। পেশায় ছোটখাটো চাকরি করে, কিন্তু আসল পেশা হলো জীবনকে বাটপারির মাধ্যমে সহজ করা।

“ভাই, গাড়ি ঘুরাও। এই রাস্তায় কেন আসলা?” মোসা ভাই চশমা ঠিক করতে করতে বলল।

হাসান মিয়া স্টিয়ারিং ধরে গজগজ করছে, “তুমি তো বললা শর্টকাট। এখন যানজট।”

রনি পেছন থেকে হাসতে হাসতে বলল, “দুইজন বাটপার মিলে একজনকে বাটপারি করতেছে। আমি তো শুধু দেখতেছি।”

হঠাৎ সামনে একটা গাড়ি ব্রেক কষল। হাসান মিয়া প্রায় ধাক্কা খেতে খেতে থামল। পেছনের গাড়ির ড্রাইভার চিৎকার করে উঠল, “কী হইছে ভাই? চোখ নাই?”

মোসা ভাই জানালা দিয়ে মাথা বের করে বলল, “আরে ভাই, আপনার গাড়ি তো মাঝখানে। আমরা তো সোজা যাইতেছিলাম।”

ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। রাস্তা জ্যাম হয়ে গেল। তিন বাটপার নেমে পড়ল। হাসান মিয়া তার বিশাল শরীর নিয়ে ড্রাইভারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “তুমি কি চশমা পরলে জেন্টেলম্যান হওয়া যায় নাকি বানরের মতো লাগে?”

রনি হাসতে হাসতে বলল, “ভাই, চিল্লাইয়েন না। অফিসে লেট হইয়া গেলে বস আবার বকবেন।”

কিন্তু কেউ শোনে না। শেষে এক পুলিশ এসে তাদের থামাল। পুলিশ দেখে তিনজনই একসাথে বলে উঠল, “স্যার, আমরা ভালো মানুষ। এই লোকটা...”

পুলিশ হেসে বলল, “তোমরা তিনজন মিলে রোজ এমন করো। যাও, চলে যাও।”

অফিসে পৌঁছে তারা দেখল আজ অফিস ছুটি। কারণ? কেউ জানে না। মোসা ভাই বলল, “দেখলা? আমরা তিনজন একসাথে বসলে অফিস ছুটি হয়। আমরা তো জাদুকর।”

অধ্যায় ২: অফিসের বাটপারি ও ফর্ম ফিলাপ

অফিসে বসে তিনজন চা খাচ্ছে। হাসান মিয়ার টেবিলে সবসময় ফাইলের স্তূপ। সে বলল, “আজ ফর্ম ফিলাপের লাস্ট ডেট। মনিরকে ফোন দে।”

মোসা ভাই ফোন করল, “হ্যালো মনির? ফর্ম ফিলাপ করছস?”

মনিরের গলা শোনা গেল, “ভাই, আমি তো বলছি না।”

রনি ফোন কেড়ে নিয়ে বলল, “তুই না করলে আমরা তিনজন মিলে তোর বাড়িতে যামু।”

ফোনের ওপাশে হাসি। আসলে এরা তিনজন কখনো সত্যি কথা বলে না। ফর্ম ফিলাপের নাম করে তারা আসলে একটা পিরামিড স্কিমে টাকা ঢালার প্ল্যান করছে। “পাঁচজন লোক আনলে দশজন, ডাবল টাকা। রাতারাতি নবাব।”

হাসান মিয়া বলল, “আমার শালা আছে, সে পাঁচজন আনবে।”

মোসা ভাই হাসল, “তোর শালা তো নিজেই বাটপার। সে আনলে সবাই পালাবে।”

বিকেলে তারা অফিস থেকে বেরিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসল। সেখানে রুনা খান (মোসা ভাইয়ের স্ত্রী চরিত্রের মতো এক মহিলা) এসে হাজির। “কী হইছে? আবার ঝগড়া করছ?”

মোসা ভাই বলল, “না না, আমরা তো শান্তি প্রিয় মানুষ।”

কিন্তু রুনা জানে এদের সব কথা মিথ্যা। সে হেসে বলল, “তোমরা তিন বাটপার। একদিন ধরা খাইবা।”

অধ্যায় ৩: বড় স্বপ্নের ধাপ্পা

সন্ধ্যায় তারা একটা ছোট অফিসে গেল। সেখানে পিরামিড স্কিমের মিটিং। লোকজন জড়ো হয়েছে। বক্তা বলছে, “টাকা ঢালুন, রাতারাতি লাখপতি হবেন।”

হাসান মিয়া তার সব টাকা ঢালতে চায়। মোসা ভাই বাধা দেয়, “ভাই, আগে টেস্ট করি। আমার শালাকে পাঠাই।”

রনি বলল, “না, আমার চাচাতো ভাই। সে বোকা, টাকা হারালেও কিছু বলব না।”

শেষে তারা তিনজন মিলে প্ল্যান করল। একজনকে লোভ দেখিয়ে টাকা আনবে, তারপর নিজেরা সরে পড়বে। কিন্তু প্ল্যানটা উল্টো হয়ে গেল। তাদেরই এক বন্ধু এসে বলল, “ভাই, এটা স্ক্যাম। পুলিশ আসতেছে।”

তিনজন দৌড় দিল। রাস্তায় দৌড়াতে দৌড়াতে হাসান মিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এবার সত্যি সত্যি চাকরি করমু।”

মোসা ভাই হাসল, “কাল থেকে। আজ রাতে একটা নতুন প্ল্যান আছে।”

অধ্যায় ৪: বাড়ির জটিলতা ও প্রেমের বাটপারি

মোসা ভাইয়ের বাড়িতে তার স্ত্রী রোবেনা রেজা জুই অপেক্ষা করছে। “কোথায় ছিলা সারাদিন?”

“অফিসে। খুব পরিশ্রম।” মোসা ভাই মিথ্যা বলল।

রনির বাড়িতে তার বোন এসে বলল, “দাদা, তোমার বন্ধুরা তোমাকে খারাপ পথে নিয়ে যাচ্ছে।”

রনি বলল, “না রে, আমরা তো ভালো কাজ করি।”

হাসান মিয়ার বাড়িতে তার স্ত্রী দোলি জোহুর বলল, “তোমার ওজন কমাও। আর বন্ধুদের সাথে এত ঘুরো না।”

তিনজন রাতে ফোনে কথা বলল। “কাল নতুন প্ল্যান। একটা বড় বিজনেস।”

অধ্যায় ৫: নতুন স্কিম ও বিপদ

পরদিন তারা একটা জমির দালালির কাজ শুরু করল। “জমি বিক্রি করব, কমিশন পাব।” কিন্তু জমিটা আসলে অন্যের। মালিক এসে ধরল।

“তোমরা তিন বাটপার!”

তারা তিনজন মিলে এমন অভিনয় করল যে মালিক হেসে ফেলল। “ঠিক আছে, এবার সত্যি বলো।”

শেষে তারা সত্যি বলল। মালিক বলল, “তোমরা ভালো মানুষ কিন্তু বাটপারি করো। একটা সুযোগ দিলাম।”

অধ্যায় ৬: বন্ধুত্বের গভীরতা

দিন যায়। তাদের অনেক ঝামেলা হয়। একবার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, একবার স্ত্রীদের কাছে। কিন্তু তিনজন কখনো একে অপরকে ছেড়ে যায় না।

একদিন বড় বিপদ। হাসান মিয়ার অপারেশন লাগে। টাকা নেই। মোসা ভাই আর রনি তাদের সবকিছু বিক্রি করে টাকা জোগাড় করে। হাসপাতালে বসে মোসা ভাই বলল, “আমরা বাটপার হইতে পারি, কিন্তু বন্ধুর জন্য সব করতে পারি।”

রনি বলল, “এটাই আমাদের আসল বাটপারি – ভালোবাসার বাটপারি।”

হাসান মিয়া সুস্থ হয়ে উঠে বলল, “এবার সত্যি সত্যি ভালো কাজ করমু।”

কিন্তু পরদিন আবার তারা নতুন প্ল্যান করছে। কারণ জীবন তো বাটপারির খেলা।

অধ্যায় ৭: ক্লাইম্যাক্স – বড় ধাপ্পা

একটা বড় কোম্পানির টেন্ডার। তারা তিনজন মিলে জাল কাগজপত্র তৈরি করে বিড করে। কিন্তু ধরা পড়ে যায়। পুলিশ আসে।

তিনজন জেলে যাওয়ার আগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। “আমরা আবার ফিরব।”

জেলে বসেও তারা নতুন প্ল্যান করছে – জেল থেকে বের হয়ে কী করবে।

অধ্যায় ৮: শেষ ও নতুন শুরু

জেল থেকে বেরিয়ে তারা দেখে তাদের স্ত্রীরা অপেক্ষা করছে। রুনা, জুই, দোলি।

“এবার সত্যি ভালো হইবা?”

তিনজন একসাথে বলল, “হ্যাঁ।”

কিন্তু চোখে চোখ রেখে হাসল। কারণ বাটপারির রক্ত তো শরীরে আছে।

ঢাকার রাস্তায় আবার তিনজন। আবার যানজট। আবার হাসি। আবার জীবন।

তিন বাটপার কখনো মরে না। তারা শুধু রূপ বদলায়।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url