সহীহ বুখারী হাদিস নং ১১৬, ১১৭, ১১৮,১৯১৯ এবং ১২০

সহীহ বুখারী ইসলামের অন্যতম বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ হিসেবে মুসলিম বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। এটি সংকলন করেছেন মহান মুহাদ্দিস ইমাম মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল আল-বুখারী। তিনি দীর্ঘ বছর পরিশ্রম, গবেষণা এবং অসংখ্য হাদিস যাচাই-বাছাই করার মাধ্যমে এই গ্রন্থটি প্রস্তুত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, কথা, কাজ এবং অনুমোদিত বিষয়সমূহ এই গ্রন্থে সংরক্ষিত হয়েছে। মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা, ইবাদত, আচার-আচরণ এবং নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সহীহ বুখারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সহীহ বুখারীতে প্রায় সাত হাজারেরও বেশি হাদিস সংকলিত হয়েছে (পুনরাবৃত্তিসহ)। ইমাম বুখারী (রহ.) প্রতিটি হাদিস গ্রহণের আগে বর্ণনাকারীদের সততা, স্মৃতিশক্তি এবং হাদিসের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত কঠোরভাবে পরীক্ষা করতেন। এজন্যই কুরআন মাজিদের পর সহীহ বুখারীকে ইসলামের সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়। এই গ্রন্থে ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, পারিবারিক জীবন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

মুসলিম উম্মাহর কাছে সহীহ বুখারী শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন নির্দেশিকা। ইসলামের সঠিক শিক্ষা ও সুন্নাহ সম্পর্কে জানার জন্য আলেম-উলামা, গবেষক এবং সাধারণ মুসলমানরা এই গ্রন্থের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। যুগে যুগে অসংখ্য ইসলামি পণ্ডিত সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ লিখেছেন, যা ইসলামী জ্ঞানচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তাই ইসলামের মূল শিক্ষা ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ জীবন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য সহীহ বুখারীর গুরুত্ব অপরিসীম।

হাদিস নং - ১১৬

আরবি: حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ عُفَيْرٍ، قَالَ حَدَّثَنِي اللَّيْثُ، قَالَ حَدَّثَنِي عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ خَالِدٍ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنْ سَالِمٍ، وَأَبِي بَكْرِ بْنِ سُلَيْمَانَ بْنِ أَبِي حَثْمَةَ أَنَّ عَبْدَ اللَّهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ صَلَّى بِنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْعِشَاءَ فِي آخِرِ حَيَاتِهِ، فَلَمَّا سَلَّمَ قَامَ فَقَالَ ‏"‏ أَرَأَيْتَكُمْ لَيْلَتَكُمْ هَذِهِ، فَإِنَّ رَأْسَ مِائَةِ سَنَةٍ مِنْهَا لاَ يَبْقَى مِمَّنْ هُوَ عَلَى ظَهْرِ الأَرْضِ أَحَدٌ ‏"‏‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) তাঁর জীবনের শেষ দিকে আমাদের নিয়ে ইশার নামায পড়ালেন। সালাম ফিরিয়ে উঠে বললেন: “তোমরা কি এই রাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করেছ? আজ রাতে পৃথিবীর বুকে যারা আছে, একশ বছর পর তাদের কেউ জীবিত থাকবে না।” (সহীহ বুখারী ১১৬)

হাদিস নং - ১১৭

আরবি: حَدَّثَنَا آدَمُ، قَالَ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ حَدَّثَنَا الْحَكَمُ، قَالَ سَمِعْتُ سَعِيدَ بْنَ جُبَيْرٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ بِتُّ فِي بَيْتِ خَالَتِي مَيْمُونَةَ بِنْتِ الْحَارِثِ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم وَكَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم عِنْدَهَا فِي لَيْلَتِهَا، فَصَلَّى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم الْعِشَاءَ، ثُمَّ جَاءَ إِلَى مَنْزِلِهِ، فَصَلَّى أَرْبَعَ رَكَعَاتٍ، ثُمَّ نَامَ، ثُمَّ قَامَ، ثُمَّ قَالَ ‏"‏ نَامَ الْغُلَيِّمُ ‏"‏‏.‏ أَوْ كَلِمَةً تُشْبِهُهَا، ثُمَّ قَامَ فَقُمْتُ عَنْ يَسَارِهِ، فَجَعَلَنِي عَنْ يَمِينِهِ، فَصَلَّى خَمْسَ رَكَعَاتٍ ثُمَّ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ نَامَ حَتَّى سَمِعْتُ غَطِيطَهُ ـ أَوْ خَطِيطَهُ ـ ثُمَّ خَرَجَ إِلَى الصَّلاَةِ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি আমার খালা মায়মুনা বিনতে হারিস (রা.)-এর ঘরে রাত কাটালাম। নবী (ﷺ) সেদিন তাঁর সাথে ছিলেন। নবী (ﷺ) ইশার নামায পড়ে ঘরে এসে চার রাকাত নামায পড়লেন, তারপর ঘুমালেন। পরে উঠে বললেন, “ছেলেটি কি ঘুমিয়েছে?” (অথবা অনুরূপ কথা)। তারপর তিনি নামাযের জন্য উঠলেন। আমি তাঁর বাম পাশে দাঁড়ালাম, তিনি আমাকে ডান পাশে নিয়ে গেলেন। তিনি পাঁচ রাকাত তারপর দুই রাকাত নামায পড়লেন। তারপর ঘুমালেন, আমি তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনলাম। পরে ফজরের নামাযের জন্য বেরিয়ে গেলেন। (সহীহ বুখারী ১১৭)

হাদিস নং - ১১৮

আরবি: حَدَّثَنَا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ، قَالَ حَدَّثَنِي مَالِكٌ، عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، عَنِ الأَعْرَجِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ إِنَّ النَّاسَ يَقُولُونَ أَكْثَرَ أَبُو هُرَيْرَةَ، وَلَوْلاَ آيَتَانِ فِي كِتَابِ اللَّهِ مَا حَدَّثْتُ حَدِيثًا، ثُمَّ يَتْلُو ‏{‏إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ‏}‏ إِلَى قَوْلِهِ ‏{‏الرَّحِيمُ‏}‏ إِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الْمُهَاجِرِينَ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الصَّفْقُ بِالأَسْوَاقِ، وِإِنَّ إِخْوَانَنَا مِنَ الأَنْصَارِ كَانَ يَشْغَلُهُمُ الْعَمَلُ فِي أَمْوَالِهِمْ، وَإِنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ كَانَ يَلْزَمُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِشِبَعِ بَطْنِهِ وَيَحْضُرُ مَا لاَ يَحْضُرُونَ، وَيَحْفَظُ مَا لاَ يَحْفَظُونَ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, লোকেরা বলে, আবূ হুরায়রা অনেক হাদিস বর্ণনা করে। আল্লাহর কিতাবে দুটি আয়াত না থাকলে আমি একটি হাদিসও বর্ণনা করতাম না। তারপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন: “নিশ্চয় যারা আমার অবতীর্ণ স্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েত গোপন করে...” (সূরা বাকারা ১৫৯-১৬০)। আমাদের মুহাজির ভাইয়েরা বাজারে ব্যবসায় ব্যস্ত থাকতেন, আর আনসার ভাইয়েরা তাঁদের সম্পদের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি আবূ হুরায়রা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সাথে লেগে থাকতাম, পেট ভরার খাবার নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতাম। আমি এমন সবকিছু উপস্থিত থাকতাম যাতে তারা উপস্থিত থাকতেন না এবং যা তারা মুখস্থ করতেন না তা আমি মুখস্থ করতাম। (সহীহ বুখারী ১১৮)

হাদিস নং - ১১৯

আরবি: حَدَّثَنَا أَحْمَدُ بْنُ أَبِي بَكْرٍ أَبُو مُصْعَبٍ، قَالَ حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ بْنِ دِينَارٍ، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّي أَسْمَعُ مِنْكَ حَدِيثًا كَثِيرًا أَنْسَاهُ‏.‏ قَالَ ‏"‏ ابْسُطْ رِدَاءَكَ ‏"‏ فَبَسَطْتُهُ‏.‏ قَالَ فَغَرَفَ بِيَدَيْهِ ثُمَّ قَالَ ‏"‏ ضُمُّهُ ‏"‏ فَضَمَمْتُهُ فَمَا نَسِيتُ شَيْئًا بَعْدَهُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার কাছ থেকে অনেক হাদিস শুনি কিন্তু ভুলে যাই।’ তিনি বললেন, “তোমার চাদর বিছিয়ে দাও।” আমি বিছিয়ে দিলাম। তিনি তাঁর দু’হাত দিয়ে যেন কিছু তুলে আমার চাদরে ঢেলে দিলেন এবং বললেন, “এটি গুটিয়ে নাও।” আমি গুটিয়ে নিলাম। এরপর আমি আর কিছুই ভুলিনি। (সহীহ বুখারী ১১৯)

হাদিস নং ১২০

আরবি: حَدَّثَنَا إِسْمَاعِيلُ، قَالَ حَدَّثَنِي أَخِي، عَنِ ابْنِ أَبِي ذِئْبٍ، عَنْ سَعِيدٍ الْمَقْبُرِيِّ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ حَفِظْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وِعَاءَيْنِ، فَأَمَّا أَحَدُهُمَا فَبَثَثْتُهُ، وَأَمَّا الآخَرُ فَلَوْ بَثَثْتُهُ قُطِعَ هَذَا الْبُلْعُومُ‏.‏

বাংলা অনুবাদ: আবূ হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে দুই ধরনের ইলম সংরক্ষণ করেছি। তার একটি আমি তোমাদের কাছে প্রচার করেছি। আর দ্বিতীয়টি প্রচার করলে এ গলা কেটে ফেলা হতো (অর্থাৎ আমাকে হত্যা করা হতো)। (সহীহ বুখারী ১২০)

পরিশেষে বলা যায়, সহীহ বুখারী ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ, যা মুসলমানদের জীবন পরিচালনার জন্য অমূল্য দিকনির্দেশনা প্রদান করে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী, কর্ম ও আদর্শকে বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থের অবদান অতুলনীয়। কুরআনের শিক্ষাকে সঠিকভাবে বুঝতে এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে সহীহ বুখারীর হাদিসসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইমাম বুখারী (রহ.)-এর অসাধারণ গবেষণা, সতর্কতা ও নিষ্ঠার ফলে এই গ্রন্থটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। তাই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং সুন্নাহভিত্তিক জীবন গঠনের জন্য সহীহ বুখারী অধ্যয়ন ও অনুশীলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু একটি হাদিসগ্রন্থ নয়, বরং মানবজাতির জন্য কল্যাণ, ন্যায় ও সত্যের পথে চলার এক অনন্য আলোকবর্তিকা।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url