গল্পঃ বিশেষ কেউ । মুনিয়া রহমান

“ক্লাস নাইনকে প্রেমের ক্লাস বলা হয়।
খোঁজ নিয়ে দেখো ইতিহাসে যত বিখ্যাত প্রেম রয়েছে তার শুরুটা ক্লাস নাইন থেকেই হয়েছিলো।”
আমি যখন দাইয়ান নামের বোকা সোকা ছেলেটাকে এই কথা গুলো বলতে ব্যাস্ত।
দাইয়ান তখন মনের সুখে তার নতুন খাতায় মার্জিন টানছে।
আমি দুই মিনিট চুপ করে বোঝার চেষ্টা করলাম আদৌ দাইয়ান আমার কথা শুনছে কি না ?
আমার কথায় দাইয়ান কোনো রেসপন্স করলো না।
প্রচণ্ড রাগে আমি খাতাটা টান দিতেই কলম সরে পুরো খাতায় আড়াআড়ি একটা দাগ পড়ে গেল।
এবার ভ্রু কুুচকে দাইয়ান আমার দিকে তাকিয়ে বললো –সমস্যাটা কি তোমার ?
–এই সমস্যাটা আমার নয় তোমার।
কত সময় ধরে আমি কত কিছু বলছি তুমি কোন পাত্তাই দিচ্ছনা আমায়!
কলমের ক্যাপ আটকিয়ে দাইয়ান এবার আমার দিকে ঘুরে বসলো।
মুখে যথেষ্ট পরিমাণ হাসি ফুটিয়ে বললো
–তা আমার কি সমস্যা! আসলে আমি সেটা বুঝতে পারছি না।
তুমি একটু ক্লিয়ার করে বলে দাওতো?
আমি তখন খুব ভাব নিয়ে বললাম
–তুমি জানো আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন ? কত সময় ধরে তোমার পাশে এসে তোমাকে কত কিছু বলছি আর তুমি আমার কথা শুনছোই না। আর এর শাস্তি তোমার কি হতে পারে ?
–তা ক্লাস ক্যাপ্টেনের কাজ বুঝি প্রতিটা স্টুডেন্টএর প্রেমের ব্যাপারে খোঁজ নেয়া? কথাটি বলেই দাইয়ান আমার দিকে একটু ঝুঁকে বসলো।
দাইয়ান এভাবে আমার দিকে ঝুঁকে কথা বলার স্টাইলটা আমার একটুও পছন্দ হলো না। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় তখন বলছে যতটা বোকা সোকা আমি ওকে ভেবেছিলাম ওতটাও বোকাসোকা সে নয়।
আমি এবার নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত করে বললাম
–যেহেতু একই ক্লাসে পড়ি সুতরাং আমরা বন্ধু। আর একজন বন্ধুতো অপর বন্ধুকে প্রেমের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই পারে।এখন বলো তুমি কি প্রেম করো ?
–প্রেমতো লুকিয়ে করার ব্যাপার। সবাইকে বলে দিলেতো আর সেটা প্রেম হলোনা। তাছাড়া আমি তোমাকে বন্ধু হিসেবে মানিনা।
বলেই দাইয়ান হো হো করে হাসতে শুরু করলো।
আমার তখন রাগে মাথা ফেটে যাওয়ার মত অবস্থা।
দাইয়ান আর আমি একই ক্লাসে অর্থাৎ নাইনে পড়ি।
দাইয়ান এর বাবা সেনাবাহিনীর উচ্চ পদে চাকরি করেন।
দাইয়ান এর মা ও একজন সরকারি কর্মকর্তা।
মায়ের চাকরীর বদলীর জন্যই দাইয়ান আমাদের এলাকায়৷আমাদের স্কুলে ভর্তি হয়েছে তিনদিন হতে চললো।
প্রথম দিন ক্লাস টিচার এসে দাইয়ানের এত এত প্রশংসা করে আমাদের সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
আর এই ব্যাপারটাই কেন জানি আমি মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না।
বিগত বছর গুলোতে আমি ক্লাসে প্রথম হয়েও টিচারদের কাছে এত প্রশংসা পায়নি।
তখনই মাথায় আসলো একটু ছেলেটাকে বাজিয়ে দেখা দরকার।
যদি ছেলেটা পড়ালেখা নিয়ে সিরিয়াস হয়। তাহলে আমার নিজেরও পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হতে হবে।
আর যদি তেমন না হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই ।
এখনকার ছেলে মেয়েতো ক্লাস সিক্স, সেভেন থেকে প্রেম করে।
সে হিসেবে ক্লাস নাইন অনেক বেশি। তার উপর শহরে পড়াশোনা করা ছেলে।
মায়ের মুখে শুনেছি প্রেম এমন এক ব্যপার যা অল্প বয়সে এলে বুদ্ধিমানকে একদম গোবর বানিয়ে ফেলে।
আর সঠিক বয়সে এলে বোকাকে চালাক।
যদি ছেলেটা প্রেম করে তাহলে অবশ্যই সে পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রেমিকাকেই সময় দেবে।
আর ওদিকে আমি পড়াশোনাকেই সময় দেবো।
ফলাফল আমার ভালো রেজাল্ট হবে আর ও গোল্লায় যাবে।
এই ভেবেই প্রশ্নটা করা।
–ধৃতি !তোকে রুবিনা ম্যাম ডাকেন।
কথাটি আমার বান্ধবী টুশি বলেই চলে গেল।
আমি ম্যাম এর রুমের দরজায় গিয়ে সালাম দিতেই ম্যাম হাসি মুখে বললেন।
–ধৃতি ভেতরে আসো! দাইয়ান এর সাথে কি তোমার পরিচয় হয়েছে ?
-জ্বি..জ্বি ম্যাম।
– শোনো দাইয়ান আজ থেকে আমার কাছে বায়্যোলজি পড়বে। গত দুই মাসে তোমাদের যে নোটস গুলো আমি দিয়েছি। ওগুলো তুমি একটু ওকে দিয়ে দিও।
–ঠিক আছে ম্যাম।
ম্যাম একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন
–বড় ব্রিলিয়্যান্ট ছেলে। জেএসসিতে গোল্ডেন প্লাস পেয়েছিলো।এই বছরও ছেলেটা ভর্তি হয়েছিলো ভালো স্কুলে কিন্তুু মায়ের এই আকস্মিক ট্রান্সফার এর কারণে সব ভেস্তে গেল। এত মেধাবী একটা ছেলে এই মফস্বল থেকে কি করে যে ভালো করবে? আহা!
ম্যামের এমন আহ্লাদীপনা দেখে আমার হুট করে প্রচণ্ড রাগ হলো।
কিন্তুু এই রাগটা দাইয়ান জেএসসিতে গোল্ডেন প্লাস পেয়েছে বলে নাকি আমি গোল্ডেন প্লাস পায়নি।
এই জন্য বুঝতে পারলাম না।
দাইয়ান সব সময় অল্প কথা বলে ।তবে ওই অল্প কথাতেই থাকে যথেষ্ট পরিমাণ মুগ্ধতা।
যা প্রতিটা মানুষকেই মোহিত করে রাখতে পারে।
যার ফলে অল্প সময়েই পুরো ক্লাসের সকলের সাথেই বন্ধুত্ব হয়ে গেল। শুধু বাকি রইলাম আমি!
দুই সপ্তাহ পর থেকে অদ্ভুত রকম ভাবে প্রতি ক্লাস টেস্টে আমি দাইয়ানের থেকে কম নাম্বার পাওয়া শুরু করলাম। ঘুম, খাওয়া বাদ দিয়ে আমি একরকম উঠে পড়ে পড়া শুরু করলাম কিন্তুু আমার এই সমস্ত চেষ্টা বৃথা প্রমাণ করে দাইয়ান বার্ষিক পরীক্ষায় আমার থেকে গুনে গুনে সতেরো নাম্বার বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়ে গেল।
ব্যাচমেট এবং টিচাররা হাসি মুখে দাইয়ানকে কংগ্রেস করছে।
আর দাইয়ান হাসিমুখে সবার সাথে কথা বলছে।
ঠিক সেই সময়ে দাইয়ানের হাসি মুখ দেখে আমার পুরো শরীর অপমানে নীল হয়ে গেল।
যার ফলে রেজাল্ট কার্ড হাতে নিয়ে স্কুলের মাঠে বসে হাত পা মেলে আমি কান্না শুরু করলাম।
আমাকে সান্ত্বনা দিতে আমার মা সাথে দাইয়ানের মা এলেন।
আমার চোখের পানি দেখে দাইয়ানের মা অবশেষে বলেই ফেললেন।
–মা! আমি যদি আগে জানতাম আমার ছেলে এখানে ভর্তি হওয়াতে তুমি এত কষ্ট পাবে তাহলে ভর্তি করতাম না।
রেজাল্টের পরে দশম শ্রেনীতে ক্লাস শুরু হতেই আমি খুব অদ্ভুত আচরণ শুরু করলাম।
নিজ ইচ্ছায় ক্লাস ক্যাপটেন নামক দায়িত্বের পদবীটা ছেড়ে দিলাম।
ক্লাসে সবার পেছনে বসতাম।টিচাররা কিছু লিখতে দিলে সবার পরে খাতা জমা দিতাম।
আমার এমন আচরণের কারণ টিচাররা কয়েকবার জানতে চাইলেও আমি মুখ বন্ধই রেখেছিলাম।
আমার এই সব কর্মকাণ্ড দাইয়ান চুপ করেই দেখতো শুধু।
আষাঢ় কোনো এক বিকালে স্কুল শেষে কেমিস্ট্রি প্রাইভেট পড়ে বের হতেই ঝুম বৃষ্টি নামা শুরু করলো।
আমি সেদিন ছাতা নেইনি। যারা ছাতা এনেছে। তারা একে একে সবাই বাসায় চলে যাওয়া শুরু করলো।
আমি হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি পাঁচটা বিশ বাজতে চলেছে৷ একে বৃষ্টি অন্যদিকে সন্ধ্যে।
আমার থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে দাইয়ান কিছু জুনিয়র এর সাথে কথা বলছে।
আর আমি নিরুপায় হয়ে বৃষ্টি থামার জন্য অপেক্ষা করছি।
– আজকে বাড়ি যাবেনা?
আচমকা দাইয়ানের এমন কথা শুনে একটু কেঁপে উঠলাম।আশে পাশে তাকিয়ে দেখি সবাই চলে গেছে প্রায়।
আমি সহজ গলায় বললাম
–ছাতা আনিনি যাবো কি করে?
–তুমি ইচ্ছাকৃত ভাবে যে কাজ গুলো করছো। তাতে যে টিচার, স্টুডেন্ট এর কাছে তোমার ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। এই ব্যাপারটা কি তুমি বুঝতে পারছো না?
আমি এবার তাচ্ছিল্য করে বললাম
–তাতে কি তোমার ইমেজতো ভালো হচ্ছে?
দাইয়ান এবার প্রচণ্ড রেগে আমার দু কাঁধ চেপে ধরে বললো
–আমার ইমেজ, আমার পড়াশোনা, আমার রোল সব সময় সব কিছু শুধু আমার উপর দিয়ে দাও কেন?
কিসের এত শত্রুতা তোমার আমার সাথে বলো ?
–আমি অবাক হয়ে দাইয়ানের দিকে তাকিয়ে আছি। রাগের কারণে দাইয়ানের চোখ লাল হয়ে গেছে।
সেই সাথে হাত দুটো অনবরত কাঁপছে।
–আমার ক্লাসে আমার চেয়ে কেউ ভালো করুক আমি এটা চাই না।আমার পছন্দ না।
আমার সামনে সকল টিচার তোমার প্রশংসা করে সেটাও আমার একদম ভালো লাগে না।
দাইয়ান সেদিন ছাতাটা আমার হাতে দিয়ে শুধু বললো
–ছাতাটা নিয়ে যাও তুমি।
আমাকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বৃষ্টি মাথায় করে হন হন করে বেরিয়ে গেল।
পুরো এক বছর আমার আর দাইয়ানের মাঝে অদৃশ্য একটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চললো।
যদিও আমি বা দাইয়ান কেউ কারও সাথে কথা বলতাম না।
আমাদের এই অদৃশ্য যুদ্ধটা একদম এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত চললো।
আমাদের এক্সাম শেষ হওয়ার পরই দাইয়ানের মা ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেল ঢাকা।
দাইয়ান এসএসসিতে গোল্ডেন প্লাস পেল।আর আমি শুধু প্লাস।
দাইয়ান এর সাথে আমার ভালো কোন স্মৃতি নেই।
ওর ভালো আমি কখনও চাইনি।
তারপরও আমাকে কেউ যদি বলে আমার ভালো বন্ধু কে?
আমি নিঃসন্দেহে দাইয়ান এর নামটা বলবো।
কেন বলবো জানিনা? শুধু জানি আমি তার খারাপ চাইলেও সে কখনওই আমার খারাপ চায়নি।
আমাদের এলাকার একটা কলেজেই এইচ.এস সিতে ভর্তি হলাম আমি।
দুই বছর খুব ব্যাস্ততার মধ্য দিয়েই কাটলো।
এইচ এস সি পরীক্ষার পর মেডিকেল এডমিশনের জন্য প্রিপারেশন নিলাম।
কিন্তুু ফলাফল ভালো হলো না। মেডিকেলে চান্স হলো না।
প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিলাম। বাবা মাকে বললাম ইয়ার লস দেবো।
সেকেন্ড টাইম কোচিং করবো এবং এবার কোচিং করবো ঢাকায়।
প্রিপারেশন এবার বেস্ট হওয়া চাই।আমার বাবা মানতে নারাজ।
তিনি আমাকে কোনোভাবেই ঢাকা কোচিং করতে দিবেন না।
অন্যদিকে যখন থেকে শুনেছে আমি ঢাকা যেতে চাই।
আমার মা একটু পর পর নাক টেনে টেনে চোখের পানি ফেলছে।
আমার বাবা মায়ের কথায় সায় দিয়ে আমার ক্লাস ফাইভে পড়া ভাইও একটু পর পর বলছে
আমি ঢাকা গেলে নাকি হারিয়ে যাবো।
সবার সব চিন্তা দূর করলো দাইয়ানে মা রুনা আন্টি।
তিনি আমার মায়ের কাছে ফোন দিয়ে জানালেন দাইয়ান নৌবাহিনীতে চান্স পেয়েছে।
আমার কথা জানতে চাইলে আমার মা আমার ব্যাপারে সব কিছুই আন্টিকে বললেন এবং আমার এই চরম বিপদে তিনি পাশে এসে দাড়ালেন।
আন্টি ফোন দিয়ে বাবাকে বললেন আমাকে যেন ঢাকায় কোচিং এ ভর্তি করায়।
এবং আমি যেন উনার বাসায় থেকে কোচিং করি।বাবা প্রথমে রাজি না হলেও এক পর্যায়ে রাজি হন।
আমারতো তখন হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশি ।
এত এত খুশিতে আমি ভুলেই গেলাম ওখানে গেলে দাইয়ান নামক মানুষটার সাথে দেখা হবে আমার।
চলবে…