তবুও ভালোবাসি | পর্ব -২১



সোফায় বসে আছি আদিল আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে আর আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। আদিলের থেকে দূরে থাকার কতো চেষ্টা করলাম কিন্তু নিয়তি আমাদের আবার এক করে দিল, দুজনের ভাগ্যে যে কি আছে আল্লাহ্ জানেন। দরজায় টোকা পড়লো, এই আদিলটা যে কি অফিসের দরজা লক করে রেখেছে সবাই কি ভাববে।
আদিল: আমি খুলছি।
আমি: হ্যাঁ তুমিই খুলো তুমিই তো লক করেছিলে। (আদিল আমার দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কেটে দরজা খুলতে গেল আমি চুপচাপ সোফায় বসে আছি)
আদিল: ওহ তুই আমিতো ভেবেছিলাম যে আমাদের রোমান্সে ডিস্টার্ব করেছে তাকে দিবো এক ধমক। (ওর কথা শুনে দরজায় তাকালাম প্রান্ত দাঁড়িয়ে আছে, তারমানে আদিল প্রান্তকে ছিনে?)
প্রান্ত: অফিস কি রোমান্স করার যায়গা? আমার জায়গায় অন্য কেউ আসলে দরজা লক করা দেখলে কি ভাবতো?
আদিল: কি আর বস আর ম্যানেজার প্রেম করছে হাহাহা..
আমি: তোমরা দুজন দুজনকে ছিনো?
আদিল: হ্যাঁ ও আমার কলেজ ফ্রেন্ড, আমিতো ওর থেকেই তোমার সব খবর নিতাম। (প্রান্তর দিকে অবাক হয়ে তাকালাম, সকালে কি নিখুঁত অভিনয় করেছে আদিলকে চাকরিটা দেওয়ার জন্য)
প্রান্ত: এবার আমার চাকরি থাকলেই হলো।
আদিল: আমার বউ করবে তোকে চাকরি থেকে বাদ? অসম্ভব আমার বউ তো খুব লক্ষী।
আমি: প্রান্ত আমাকে একবারের জন্যও বুঝতে দেয়নি যে তোমরা দুজন...
প্রান্ত: আদিলের নিষেধ ছিল আমার কোনো দোষ নেই।
আমি: সকালেও তো কতো সুন্দর অভিনয় করেছেন, বলেছেন আদিল ফোন করেছিল রিকুয়েস্ট করেছে চাকরিটার জন্য।
প্রান্ত: কি করবো সারাদিন অফিসে কাজ করে রাতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে ফোনে বকবক করতে কার ভালো লাগে? আদিল আমাকে রোজ রাতে ফোন করে আর আপনি সারাদিন কি কি করেছেন কি রঙের শাড়ি পড়ে এসেছিলেন দুপুরে খেয়েছেন কিনা সব একে একে আদিলকে বলতে হয়। ওর অত্যাচার নিতে পারছিলাম না তাই নিজেই আপনাকে... (প্রান্ত মাথা চুলকাচ্ছে, আমি আদিলের দিকে তাকিয়ে আছি এতোটা ভালোবাসে আমাকে?)
আদিল: কি করবো তোমার খুঁজ না নিয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রান্ত: মেডাম ফাইলটা?
আমি: টেবিলে রেখে দিন।
প্রান্ত: আসছি আমি। (প্রান্ত ফাইল রেখে চলে যেতেই আদিল এসে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো)
আদিল: রাগ করেছ?
আমি: আব্বু আর ফুফু কিন্তু আমাকে বারণ করেছিল তোমার সাথে যেন...
আদিল: তাহলে আমার সাথে কথা বলছ কেন যাও নিজের বাবা আর ফুফুর কাছে গিয়ে বসে থাকো। আমাকে তো প্রয়োজন নেই আমি চলে যাচ্ছি। (আদিল উঠে চলে যাচ্ছিল ওর হাত ধরে সোফায় বসালাম)
আমি: এতো রেগে যাচ্ছ কেন?
আদিল: তো কি করবো তোমার কাছে যদি ওদের নিষেধ বড় হয়ে থাকে তাহলে আমাকে ভালোবাসার প্রয়োজন নেই ভুলে যাও আমাকে।
আমি: (নিশ্চুপ)
আদিল: আনিশা তুমি জানো নীরব আর মিতু একে অপরকে ভালোবাসে?
আমি: হুম জানি।
আদিল: কিন্তু আমাকে তো বলনি কখনো।
আমি: ওদের নিষেধ ছিল কারণ ওরা ভয় পেতো তুমি যদি না মেনে নাও।
আদিল: আমি মেনে নিয়েছি কিন্তু আম্মু মেনে নেয়নি।আম্মু কি বলেছে জানো হয় তোমাকে ছাড়তে হবে নাহয় মিতুকে অন্যদিকে বিয়ে দিয়ে দিবে।
আমি: মানে?
আদিল: হ্যাঁ এটাই বলেছে তোমাকে ডিভোর্স দিলে আম্মু মিতু আর নীরবের বিয়ে দিবে আর নাহলে
মিতুকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিবে। এখন তুমি বলো আমি কি করবো তোমাকে ডিভোর্স দিয়ে ওদের সুখী দেখবো নাকি নিজের সুখের কথা ভেবে বোন আর বন্ধুকে কষ্টের সাগরে ভাসিয়ে দিবো? (কি বলবো এখন আমি যে আদিলকে খুব ভালোবাসি। কিন্তু মিতু আর নীরব ওরাও তো দুজন দুজনকে খুব ভালোবাসে)
আদিল: আম্মুর এমন সিদ্ধান্ত শুনার পর থেকে মিতু খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অসুস্থ হয়ে পড়েছে ও। মিতুও আমারই মতো দুটানায় পড়ে আছে এইটা ভেবে যে নিজের সুখ খুঁজবে নাকি ভাইয়ের।
আমি: এছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই? মানে মা কি কোনোভাবে...
আদিল: আম্মু স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছে ওদের সুখী দেখতে হলে তোমাকে ডিভোর্স দিতে হবে।
আমি: হুম দিয়ে দাও ডিভোর্স।
আদিল: মানে কি বলছ এসব?
আমি: নিজের ভালোবাসার জন্য তো ওদের কষ্ট দিতে পারিনা। মিতু তোমার একমাত্র বোন পারবে ওকে সারাজীবন কাঁদতে দেখতে?
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: তোমাদের পরিবারে তো মায়ের সিদ্ধান্তেই সব হয়, মা যদি মিতুকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দেন তাহলে মিতু কষ্ট পাবে সারাটা জীবন ওকে ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণায় কাঁদতে হবে। আজ মা'কে বলে দিও তুমি আমাকে ডিভোর্স দিবে।
আদিল: আমি পারবো না।
আমি: তাহলে মিতুর কান্না দেখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো।
আদিল: (নিশ্চুপ)
আমি: আদিল তুমি কেন বুঝতে পারছ না ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করা এতো সহজ নয়। আমাদের চোখের সামনেই তো দুটু ভালোবাসার মানুষ মারা গেল, মিতু ছোট ও যদি রাইমা আর আবির ভাইয়ার মতো সুইসাইড করে বসে?
আদিল: না.. (আদিল চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, নিজের বোন মারা যাবে এইটা কে চায়? মা কেন যে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন)
আদিল: ভাইয়াকে হারিয়েছি এখন শুধুমাত্র মিতু আছে ওকে হারালে আমি বাঁচতে পারবো না, কিন্তু আমার বেঁচে থাকার জন্য তোমাকেও প্রয়োজন।
আমি: প্রিয় জিনিস একসাথে দুটু পাওয়া যায় না আদিল, একটাকে পেতে হলে অন্যটাকে সেক্রিফাইজ করতে হয়। আর ভাই হিসেবে বোনের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেওয়া তোমার কর্তব্য। মিতু খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে অসুস্থ হয়ে পড়েছে আর কিছুদিন এভাবে কাটলে হয়তো মিতু...
আদিল: না মিতুর কিছু হবে না আমি মিতুকে সুখী করবো।
আমি: কেঁদো না সব ঠিক হয়ে যাবে। (আদিলের কাধে মাথা রাখলাম ও আমাকে জড়িয়ে ধরেছে, আমারো তো কান্না পাচ্ছে আমিও যে ওকে ভালোবাসি কিন্তু আদিলের সামনে কাঁদা যাবে না মিতুর সুখের জন্য আমাদের ভালোবাসা বিসর্জন দিতেই হবে। রাইমাকে বাঁচাতে পারিনি মিতুও তো আমার বোন ওকে নাহয় বাঁচাবো)
আমি: আদিল আমাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে যাবে?
আদিল: কিন্তু আম্মু...
আমি: সমস্যা নেই উনাকে বলবো আমরা ডিভোর্স এর জন্য রাজি।
আদিল: আচ্ছা আনিশা সিহাব কি তোমাকে আগে থেকে পছন্দ করতো?
আমি: জানিনা সেদিন হুট করে বললো আমাদের ডিভোর্স এর পর ও আমাকে বিয়ে করতে চায়।
আদিল: জানো আম্মুর সাথে সিহাবের যোগাযোগ আছে।
আমি: হুম আমি আন্দাজ করেছিলাম।
আদিল: সিহাব আম্মুকে ফোন করে, মাঝেমাঝে আমাদের বাসায়ও যায়। আমার কি মনে হয় জানো? সিহাব নিশ্চয় আম্মুকে এমন কিছু বলেছে যার কারণে আম্মু তোমাকে সহ্য করতে পারেনা।
আমি: কিন্তু কি বলেছে?
আদিল: সেটা তো আম্মু নাহয় সিহাব বলতে পারবে।
আমি: সিহাব নিজের অপরাধ নিজে স্বীকার করবে না আম্মুর থেকে জানতে হবে, আমাকে তোমাদের বাসায় নিয়ে চলো।
আদিল: ঠিক আছে।

ড্রাইভ করছি পাশে আদিল বসে আছে, ওকে বারবার আড়চোখে দেখছি। আদিলের দুচোখে পানি টলমল করছে, হয়তো আমাকে বেঁচে নিবে নাকি মিতুকে সে সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খাচ্ছে। মা কেন এমন করছেন সেটা জানতে পারলে হয়তো কোনো সমাধান করা যেতো। আজ একবার বাসায় গিয়ে সিহাবকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে।

বাসায় এসে আদিল কলিংবেল চেপে যাচ্ছে আর আমি পাশে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ওদের বাসা দেখছি বিশাল বড় দুতলা বাড়ি।
আদিল: একমাত্র এই বাড়িটাই আছে বাকি সব ভাইয়ার চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দিতে হয়েছে।
মিতু: ভাবি.. (মিতুর ডাক শুনে দরজায় তাকালাম, মিতু আমাকে দেখে হা হয়ে তাকিয়ে আছে)
মিতু: তুমি আমাদের বাসায়? (মিতু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো, মেয়েটা একদম রোগা হয়ে গেছে হয়তো নীরবকে হারানোর ভয়ে)
আদিল: আম্মু কোথায়রে?
মিতু: জানিনা কোথায় যেন গিয়েছে সেই সকাল বেলায়।
আদিল: আর নীরব?
মিতু: আম্মু ওকে খুব বকেছে তাই রাগ করে কোথায় যেন চলে গেছে।
আদিল: ফোন করে বল আনিশা এসেছে ও যেন বাসায় আসে।
মিতু: ঠিক আছে, তুমি ভাবিকে নিয়ে ভিতরে এসো।

ভিতরে ঢুকে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি হঠাৎ দেয়ালে টাঙানো একটা ছবিতে চোখ আটকে গেল। ছবিতে আদিলদের পরিবারের সবাই আছে তবে আরো দুজন আছে যাদের আমি ছিনিনা।
আদিল: কি দেখছ?
আমি: ওরা..
আদিল: আম্মু আব্বু।
আমি: আচ্ছা তুমি তো আমাকে এখনো বলনি উনি আসলে কে? উনি তোমাদের আসল মা নন সে... (আদিল আমার মুখ চেপে ধরলো)
আদিল: আস্তে বলো প্লিজ মিতু শুনে ফেলবে।
আমি: সত্যিটা শুনলে সমস্যা কি?
আদিল: পরে বলবো।
আমি: ঠিক আছে।
আদিল: দাদুর সাথে দেখা করবে না?
আমি: হ্যাঁ দাদুর রুম...
আদিল: চলো আমার সাথে।
আমি: হুম চলো।

দাদু চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটু বন্ধ করে বসে আছেন, কতোদিন পর দাদুকে দেখছি।
আমি: দাদু?
দাদু: কে? (দাদু চমকে উঠে আমার দিকে তাকালেন)
দাদু: শেষ পর্যন্ত আসলি তাহলে?
আমি: আসলাম কোথায় আবার তো চলে যেতে হবে।
দাদু: একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে আর শিরিন নিজে তোকে নিয়ে আসবে এই বাসায়।
আমি: সেদিনের অপেক্ষাতেই আছি, বাদ দিন তো আপনার শরীর কেমন আছে?
দাদু: এতো টেনশনের মধ্যে ভালো থাকা যায়?
আমি: আপনি মা'কে বুঝাতে পারেন না?
দাদু: আমার এই মেয়েটা খুব জেদি কারো কথা শুনে না নিজের মন যা চায় তাই করে। তবুও আমি বুঝানোর চেষ্টা করেছিলাম শিরিন তো রেগে আগুন, আমার কি মনে হয় জানিস শিরিন কোনো পুরনো রাগ থেকে এসব করে প্রতিশোধ নিচ্ছে।
আমি: কিন্তু কার উপর? আমিতো এ বাসার কারো কোনো ক্ষতি করিনি। হ্যাঁ রাইমার জন্য আবির ভাইয়া সুইসাইড করতে গিয়ে পাগল হয়েছিল কিন্তু এখন তো দুজনেই মৃত।
দাদু: জানিনা শিরিন এসব কেন করছে, একদিকে শিরিন রেগে আছে অন্যদিকে তোর চাচাতো ভাই সিহাব এসে তোর নামে আজেবাজে কথা বলে শিরিনের রাগ বাড়িয়ে দিচ্ছে ঠিক আগুনে ঘি ঢালার মতো।
আমি: সিহাবের ব্যবস্থা আমি আজ করবো।
দাদু: তুই যেন তাড়াতাড়ি এই বাসায় ফিরে আসতে পারিস সেই দোয়া করি।
আদিল: কি করে আসবে দাদু আম্মু তো বলে দিয়েছে আমি আনিশাকে ডিভোর্স না দিলে আম্মু মিতুর বিয়ে অন্য কারো সাথে দিয়ে দিবে।
দাদু: হুম সেটাই তো ভাবছি, এই কয়দিনে মিতুটা একদম চুপচাপ হয়ে গেছে কারো সাথে কথা বলেনা হাসে না কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছে।
আমি: সব ঠিক হয়ে যাবে দাদু মিতু আবার আগের মতো হবে, আমাদের সুখের জন্য তো মিতুকে কষ্ট দিতে পারিনা। আমরা ডিভোর্স এর জন্য রাজি।
মিতু: কিন্তু আমি এই বিয়েতে রাজি না। (মিতুর কথা শুনে দরজায় তাকালাম ও হয়তো দরজায় দাঁড়িয়ে সব শুনছিল)
আমি: মানে?
মিতু: আমার ভাই ভাবিকে আলাদা করে দিয়ে আমি নীরবকে নিয়ে সুখী হতে পারবো না, আমার এমন বিয়ে চাই না।
আদিল: কিন্তু মিতু এছাড়া যে আর উপায় নেই।
মিতু: আছে তো সুইসাইড করবো।
আদিল: মিতু? (আদিল মিতুকে থাপ্পড় মেরে দিলো, মেয়েটা এমনি চুপসে গেছে। মিতুকে জড়িয়ে ধরলাম)
আমি: পাগল হয়ে গেছ ওকে মারছ কেন?
আদিল: তো কি করবো ভাইয়া আমাকে ছেড়ে চলে গেছে ও চলে গেলে আমি বাঁচবো কিভাবে?
মিতু: ভাবিকে ছাড়া বাঁচতে পারবে?
আদিল: (নিশ্চুপ)
মিতু: আমি জানি তোমরা আমার জন্য নিজেদের ভালোবাসা সেক্রিফাইজ করতে চাইছ কিন্তু আমি তা হতে দিবো না।
আদিল: তাহলে যা মা'কে গিয়ে বুঝিয়ে বল। (আদিল রেগে রুম থেকে বেরিয়ে গেল)
মিতু: ভাইয়া আমার উপর রাগ করে চলে গেছে তুমিই পারবে রাগ ভাঙাতে।
আমি: হুম যাচ্ছি কিন্তু ওর রুম...
মিতু: দুতলায়।
আমি: ঠিক আছে।

আদিলের রুম খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ একটা রুমে নজর পড়লো, রুমের ভিতর জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে আছে কেমন যেন অন্ধকারও। রুমের ভিতর ঢুকতে যাবো তখনি আদিল আমার হাত ধরে টেনে ওর রুমে নিয়ে আসলো।
আমি: কি হলো?
আদিল: ওইটা ভাইয়ার রুম।
আমি: তো? রুমের ভিতরে গেলে প্রবলেম কি?
আদিল: হঠাৎ করে আম্মু এসে পড়লে তোমাকে ওই রুমে দেখলে আরো রেগে যাবে।
আমি: হুম।
আদিল: তখন জানতে চেয়েছিলে না উনি আসলে কে? উনি আমাদের ফুফু।
আমি: ফুফু?
আদিল: হ্যাঁ। তখন ভাইয়া ক্লাস নাইনে পড়তো আমি ফাইভে আর মিতু মাত্র দশ দিনের ছোট বাচ্চা। আব্বু আর আম্মু মিতুকে নিয়ে হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরছিলেন হঠাৎ করে এক্সিডেন্ট হয়, আব্বু আম্মু দুজন মারা গেলেও বেঁচে যায় মিতু। বাবা মা হারা সন্তান নিজেকে অনাথ মনে করবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু ফুফু চায়নি আমরা নিজেকে অনাথ মনে করি বিশেষ করে মিতু। সেই থেকে উনি আমাদের ফুফু থেকে মা হয়ে যান, আমাদের তিন ভাই বোনকে ফুফু একা সামলে রেখে বড় করেছেন। ভাইয়া আর আমি সত্যিটা জানলেও মিতু জানে উনিই আমাদের আম্মু। আর আম্মু বা দাদু কেউই চায় না যে মিতু সত্যিটা জেনে নিজেকে অনাথ মনে করুক বা কষ্ট পাক।
আমি: কিন্তু উনি এখন মিতুকে কষ্ট দিতে চাইছেন কেন?
আদিল: আমার জন্য, আমি যেন তোমাকে ডিভোর্স দেই তাই।
আমি: ডিভোর্স হলে তো তুমিও কষ্ট পাবে।
আদিল: আম্মু মনে করেন আমি তোমার সাথে থাকলে বেশি কষ্ট পাবো। কারণটা আমি নিজেও জানিনা।
আমি: কবে যে মা আমাকে বুঝবেন।
আদিল: যে ফুফু আমাদের জন্য বিয়ে করেনি আমাদের মা হয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিয়েছে তাকে আমি কি করে কষ্ট দেই বলো। এজন্যই আম্মু যা বলেন আমি তাই শুনি।
আমি: তাই বলে অন্যায় কাজ গুলোও?
আদিল: আম্মুর কাজ গুলো আমাদের কাছে অন্যায় মনে হচ্ছে কিন্তু আম্মুর কাছে সেটা মনে হচ্ছে না, আর মনে না হওয়ার কারণ অবশ্যই একটা কিছু আছে। সে কারণটা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। জানো আনিশা আম্মু মাঝেমাঝে বলে আব্বু আম্মুর গাড়ি এক্সিডেন্ট হয়নি উনাদের নাকি খুন করা হয়েছে।
আমি: খুন?
আদিল: হুম আর আম্মুর এই কথাটা সত্যি কিনা সেটাই আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
আমি: খুঁজে লাভ কি সেই তো ডিভোর্স... (আদিল আমার মুখ চেপে ধরলো)
আদিল: এই শব্দটা মুখে এনো না আমি তোমাকে ডিভোর্স দিতে পারবো না, বাঁচতে পারবো না আমি তোমাকে ছাড়া।
আমি: আমি মনে হয় পারবো? (কাঁদতে কাঁদতে আদিলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম)
আদিল: এই প্রথম আমাদের এ বাসায় এসেছ আমার রুমে এসেছ কোথায় একটু রোমান্স করবো তা না উল্টো কাঁদছ তুমি?
আমি: এই সময় তোমার রোমান্স করতে ইচ্ছে হচ্ছে?
আদিল: আনিশা পাগলীটা পাশে থাকলেই আমার রোমান্স করতে ইচ্ছে হয় কারণ এই মায়াবী মুখের দিকে যখন তাকাই তখন আমার সমস্ত কষ্ট ভুলে যাই। (আদিল আমার দুচোখের পানি মুছে দিয়ে আমার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিলো)
আমি: মা এসে যদি...
আদিল: দরজা বন্ধ করা আছে। (আদিল চোখ টিপ দিয়ে মুখে দুষ্টু হাসির রেখা টেনে আমাকে কোলে তুলে নিলো)
আমি: কি করছ?
আদিল: বেশি কিছুনা রোমান্স করবো শুধু।
আমি: ফাজিটা।
আদিল আমাকে বিছানায় শুয়ে দিয়ে দুষ্টু হাসি হাসছে দেখে দুহাতে মুখ ঢেকে ফেললাম। আদিল আমার বুকে তুথুনি রেখে মুখ থেকে আমার দুহাত সরিয়ে ফেললো, আদিল আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক দৃষ্টিতে। আমিও ওর দুচোখের দিকে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি পারবো তো মায়ের সব ভুল ভাঙিয়ে আদিলকে সারাজীবনের জন্য আপন করে নিতে...

চলবে😍
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url